প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ-৭ম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৭, রবি আউঃ-রবি সানী ১৪৩৮ হিজরী, পৌষ-মাঘ ১৪২৩বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
১. মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া এক বড় অন্যায় এবং জিবে উৎপন্ন এক মহাপাপ। পক্ষান্তরে সত্য সাক্ষী দেওয়া এক মহৎগুণ, যার প্রতি ইসলাম মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায় বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাক এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দাও-যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়। সে বিত্তবান হোক অথবা বিত্তহীন হোক আল্লাহ উভয়ের যোগ্যতর অভিভাবক। সুতরাং তোমরা ন্যায় বিচার করতে খেয়াল-খুশির অনুগামী হয়ো না। যদি তোমরা পেঁচালো কথা বল অথবা পাশ কেটে চলো তবে (জেনে রাখ যে,) তোমরা যা কর আল্লাহ তার খবর রাখেন। (সূরা নিসা, ১৩৫ আয়াত)
২. হে মুমিনগণ! আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানে তোমরা অবিচল থাক, কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনো সুবিচার না করার উপর প্ররোচিত না করে। সুবিচার কর, এটা তাকওয়া (আল্লাহ ভীতি) এর নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ তার খবর রাখেন। (সূরা মায়েদাহ, ৮ আয়াত)
৩. যারা সাক্ষ্যদানে অটল এবং নিজেদের নামাযে যত্নবান তারাই সম্মানিত হবে জান্নাতে। (সূরা মাআরিজ, ৩৩-৩৫ আয়াত)
৪. (দয়াময় আল্লাহর নেক বান্দা তারা) … যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং অসার ক্রিয়া-কলাপের সম্মুখীন হলে সম্ভ্রান্তের মত অতিক্রম করে চলে। (সূরা ফুরকান, ৭২ আয়াত)
৫. প্রিয় নবী মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদেরকে কি অতি মহাপাপের কথা বলে দেব না? এইরূপ তিনবার বললেন, আল্লাহর সাথে কিছুকে শরীক (শিরক) করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্যাচরণ করা। অতঃপর তিনি হেলান ছেড়ে উঠে বসলেন এবং বললেন, শোনো, আর মিথ্যা সাক্ষ্য। অতঃপর শেষোক্তের এই কথাটি তিনি বার বার বলতে থাকলেন। এমন কি সেই বলাতে সাহাবীগণ (আপোষে বা মনে মনে) বললেন, ‘যদি তিনি চুপ হতেন।’ (বুখারী ও মুসলিম)
৬. উক্ত হাদীস হতে মিথ্যা সাক্ষ্যদান যে এক বৃহৎ সর্বনাশ তা তিনভাবে প্রতিপাদিত হয়।
প্রথমত : এ কাজ করলে মহাপাপী হতে হয়; যা শিরকের মত অতি মহাপাপের সাথে সংযুক্ত করে ব্যক্ত করা হয়েছে। যেমন : আল্লাহপাক উক্তরূপে উভয়কে সংযুক্ত করে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, সুতরাং তোমরা মূর্তিরূপ অপবিত্রতা বর্জন কর এবং মিথ্যা কথন (সাক্ষ্য) হতে দূরে থাক। (সূরা হাজ্ব ৩০ আয়াত)
দ্বিতীয়ত : আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। কিন্তু ঐ দুষ্কর্মের ভয়াবহতা ও গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে সকলকে সাবধান করে উঠে বসে তা উল্লেখ করলেন।
তৃতীয়ত : তা পুনঃপুনঃ ফিরিয়ে ফিরিয়ে বলে তার সর্বনাশিতা বর্ণনা করলেন। সুতরাং জিবের এমন পাপ অত সহজ নয় যত সহজে মানুষ তা জিব হেলিয়ে করে থাকে।
৭. বহু মানুষ না জেনে ও ঘটনা দর্শন না করে কারো পক্ষে বা কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে থাকে, কারো প্রতি হিংসা ও শত্রুতা থাকার জন্য তার বিপক্ষে অথবা কারো প্রতি আত্মীয়তা ও সম্প্রীতি থাকার জন্য, অথবা তার অর্থলোভে, অথবা তার কথায় আস্থা রেখে, অথবা তার প্রতি সদয় হয়ে তার সপক্ষে মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে থাকে।
৮. তদানুরূপ অনেকে বহু মিথ্যা সাক্ষীদান করে থাকে। হারাম লেন-দেনে সাক্ষ্য প্রদান করে, অন্যায়ভাবে কারো জমি-সম্পদ আত্মসাত করাতে, অন্যায়ভাবে কারো জমি কারো নামে লিখিয়ে নিতে বা দিতে সাক্ষী দিয়ে থাকে। অথচ তা বৈধ নয়।
৯. হযরত জাবের (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং তার উভয় সাক্ষ্যদাতাকে অভিশাপ করেছেন। আর বলেছেন, (পাপে) ওরা সকলেই সমান। (মুসলিম, ১৫৯৮)
১০. নু‘মান বিন বাশীর (রাঃ) বলেন, আমার আম্মা আমার জন্য আব্বার নিকট কিছু সম্পদ হেবা চাইলেন। তিনি ভালো বুঝলে আমার নামে কিছু হেবা করলেন। কিন্তু আম্মা বললেন, এতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাক্ষী না মানা পর্যন্ত আমি নিশ্চিত হব না। তাই আব্বা আমার হাত ধরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হলেন। তখন আমি কিশোর ছিলাম। আব্বা বললেন, রাওয়াহার বেটি এর মা এর জন্য আমার নিকট হতে কিছু হেবা চেয়েছে (তাই আপনাকে সাক্ষী মানতে চাই?) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘এ ছাড়া তোমার অন্য সন্তান আছে কি? আব্বা বললেন, হ্যাঁ। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবিচারে আমাকে সাক্ষী মেনো না। অন্য এক বর্ণনায় আছে, তিনি বললেন, অবিচারে আমি সাক্ষী দেব না। (বুখারী)
১১. মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে বিচারককে ন্যায় বিচার করা হতে ভ্রষ্ট করা হয়। যার ফলে ঐ ব্যক্তি অবিচারের কারণ হয়। আর বিচারপতি বাধ্য হয়ে অজান্তে নাহক ফায়সালা করে থাকে।
১২. যার সপক্ষে মিথ্যা সাক্ষী দেওয়া হয় তার প্রতিও অন্যায় করা হয়। যেহেতু এই সাক্ষী দ্বারা তার এমন সম্পদ বা অর্থ লাভ হয় যাতে তার কোন হক বা অধিকার নেই। ফলে সে তা গ্রহণ করে দোযখের আগুন গ্রহণ করে। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা আমার নিকট বিবাদ দিয়ে আস। সম্ভবত তোমাদের কেউ কেউ নিজের হুজ্জত পেশ করণে সুনিপুণ। সুতরাং যদি কারো কথা মত তার ভাইয়ের হক নিয়ে তার পক্ষে ফায়সালা করে দিই, তাহলে (জেনে রেখো যে,) তার জন্য জাহান্নামেরই এক টুকরা কেটে দেই। অতএব সে যেন তা গ্রহণ না করে। (বুখারী)
১৩. যার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া হয় তার উপর বড় জুলুম করা হয়। যেহেতু ঐ মিথ্যা সাক্ষ্য দ্বারা তার নিজস্ব অধিকার ও স্বত্ব হাতছাড়া হয়। যাতে সে অত্যাচারিত হয় এবং অত্যাচারিতের দুআ আল্লাহর দরবারে মঞ্জর করা হয়। সে দুআ ও আল্লাহর মাঝে কোন অন্তরাল থাকে না। (বুখারী ও মুসলিম) ঐ দুআর জন্য আকাশের দুয়ার খোলা হয় এবং আল্লাহ পাক বলেন, আমার ইজ্জত ও সম্ভ্রমের শপথ! আমি তোমাকে (অত্যাচারিত প্রার্থনাকারীকে) অবশ্যই সাহায্য করব। যদিও বা কিছু পরে। (আবু দাউদ, তিরমিযী)
১৪. মিথ্যা সাক্ষ্য দ্বারা অপরাধীদেরকে অপরাধের শাস্তি হতে নিষ্কৃতি দেওয়া হয়। যার ফলে দুষ্কৃতিকারীরা সহযোগিতা ও আশ্বাস পেয়ে দুষ্কর্মে উদ্বুদ্ধ ও অবিচলিত হয়; নির্ভয়ে পাপাচার চালিয়ে যায়।
১৫. মিথ্যা সাক্ষ্যর ফলে একাধিক হারামকর্মে আপতিত হতে হয়, কত নিরপরাধ মানুষের জীবন হতাহত হয়, কত মানুষের অর্থ ও সম্পদ নাহক আত্মসাত করা হয়। ঐ সাক্ষ্য দ্বারা বিচারকারী এবং যার বিরুদ্ধে বিচার করা হয়ে থাকে সে কিয়ামতের বিচারকোর্টে মহান বিচারক আল্লাহর সামনে মিথ্যা সাক্ষীদাতার প্রতিবাদী হয়ে ইনসাফ চাইবে।
১৬. অযোগ্য অথবা অপরিচিত ব্যক্তির সার্টিফাই করাও মিথ্যা সাক্ষী দেওয়ার শামিল। যেহেতু প্রশংসাকারী তার প্রশংসায় প্রশংসার যোগ্য নয় এমন ব্যক্তির প্রশংসা করলে অথবা তার অজ্ঞাত ব্যক্তিত্বের সদ্গুণ বর্ণনা করলে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া হয়। যেমন মিথ্যা সাক্ষ্যদানকারী অত্যাচারীর নির্দোষিতা বর্ণনা করে প্রশংসা এবং অত্যাচারিতের দোষ বর্ণনা করে দুর্নাম করে। এর দ্বারায় সে বিচারক ও মানুষকে ধোকায় ফেলে থাকে।
১৭. মিথ্যা সাক্ষ্যদানে সেই সমাজপতি ও আলেমরাও শামিল যারা অপরকে ভ্রষ্ট করে, সৎ জানা সত্ত্বেও অসৎ পরামর্শ ও নির্দেশ দান করে থাকে। সুপথ জানা সত্ত্বেও কুপথকে সুশোভিত করে অজ্ঞ মানুষকে তাতে চলতে আহ্বান করে। সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরও তা গোপন রেখে মিথ্যার উপর নির্বিচল থাকে এবং মিথ্যাকেই সত্যরূপে মানে ও প্রকাশ করে। এমন সর্বনাশীদের সংখ্যা মোটেই স্বল্প নয়। সুতরাং আল্লাহ আমাদেরকে আশ্রয় দিন। (মাজাল্লাতুল বহুসিল ইসলামিয়াহ, ১৭ সংখ্যা, ২৫৫-২৭২ঃ)
