প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ-৭ম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৭, রবি আউঃ-রবি সানী ১৪৩৮ হিজরী, পৌষ-মাঘ ১৪২৩বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
কারো নাম স্মরণ রাখা তার প্রতি আপনার গুরুত্বের পরিচায়ক। কারো সঙ্গে আপনার ব্যাংকে, বিমানে কিংবা বিয়ের কোনো অনুষ্ঠানে পরিচয় হলো। তার নাম ঠিকানা জেনে নিলেন। পরবর্তীতে অন্য কোথাও তার সঙ্গে আবার সাক্ষাত হলো। আপনি যদি তার দিকে এগিয়ে যান আর তার নাম ধরে ডেকে তাকে স্বাগত জানান তাহলে এটা অবশ্যই চমৎকার একটি কাজ হবে। আপনার এ আচরণে সে মুগ্ধ হবে, তার অন্তরে আপনার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানবোধ সৃষ্টি হবে।
আপনি কারো নাম মনে রাখলে তার মনে এ ধারণা অবশ্যই জন্মাবে যে, আপনি তাকে মূল্যায়ন করেন। একজন শিক্ষক ছাত্রদের নাম মুখস্থ রাখেন অন্যজন মুখস্থ রাখেন না এমন দুই শিক্ষকের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। প্রথমজনের প্রতি ছাত্রদের আন্তরিকতা অবশ্যই বেশি থাকবে। ছাত্রকে হে ছাত্র! দাঁড়াও না বলে হে অমুক! (নাম বলে) দাঁড়াও বলে সম্বোধন করা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
মোবাইল কল রিসিভ করার ক্ষেত্রেও নাম ধরে সম্বোধন করবেন। আপনি যার কাছে কল করেছেন তিনি ফোন রিসিভ করে বললেন, কে? কিংবা বললেন, হ্যালো ! অন্য একজন রিসিভ করেই হাসিমুখে বললেন, হে খালেদ ! তোমাকে স্বাগতম অথবা বললেন, হ্যালো, আব্দুল্লাহর আব্বু…। আপনার নামের শব্দটি আপনার কানে পৌঁছার আগে আপনার অন্তরে তার মুগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে দেবে।
সাধারণত সভা-সেমিনারে আলোচনা করার পর তরুণরা আমাকে ধন্যবাদ জানাতে এবং করমর্দন করতে ভীড় জমায়। আমি তাদেরকে সবসময় বলে থাকি, আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘজীবী করুন। ভাই! আপনার নামটা কি জানতে পারি? তাদের প্রতি আমার এই গুরুত্ব প্রকাশের কারণে তারা অনেক খুশি হয়।
একবার কুশল বিনিময়ের পর সবাই বিদায় নিল। তাদের একজন কী জন্য যেন আবার এলে আমি তাকে বললাম, খালেদ! আবার এলে কেন? সে অবাক হয়ে বললো, মাশাআল্লাহ! আপনি আমার নাম মনে রেখেছেন!
সেনা কর্মকর্তাদের ইউনিফরমে বুকের ওপর ব্যাজ থাকে। তাতে তাদের নাম লেখা থাকে। আমি একবার এক সেনানিবাসে বয়ান করেছিলাম। বয়ানের পর অনেকেই আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। একজন অফিসারকে দেখে মনে হলো, তিনি আমার সাথে দেখা করতে চাচ্ছেন। কিন্তু ভীড়ের কারণে পারছিলেন না।
আমি তার ব্যাজের ওপর নজর দিয়ে তার নাম দেখে নিলাম। এরপর তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, স্বাগতম হে অমুক! আমার কথা শোনার সাথে সাথে খুশিতে তার চেহারা উজ্জ্বল হয়ে গেল। আশ্চর্য হয়ে সে মুসাফাহার জন্য তার হাত বাড়িয়ে হাসিমুখে বললো, আশ্চর্য! আপনি আমার নাম জানলেন কী করে?!
আমি বললাম, ভাই! যাদেরকে আমরা ভালোবাসি, তাদের নাম তো অবশ্যই জানতে হবে। আমার এ আচরণ তার ওপর বিরাট প্রভাব ফেলেছে। অনেকেই এমন আছেন যে, তার নাম অন্য কেউ মনে রাখলে খুশি হয় এবং মনে মনে কামনা করে, যদি আমিও অন্যদের নাম মনে রাখতে পারতাম!
অন্যের নাম মনে রাখতে না পারার পেছনে অনেক কারণ থাকে। বড় একটি কারণ হলো, কারো সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তাকে গুরুত্ব না দেয়া। আরেকটি হলো, কারও সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সময় অন্যমনস্ক থাকা কিংবা নাম শোনার সাথে সাথে তা মনে না গাঁথা।
তাছাড়া সাক্ষাতকারীর প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গীও এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। আপনি হয়তো মনে করেন, তার সঙ্গে আপনার আর কোনোদিন সাক্ষাৎ হবে না। তাই তার নাম মনে রাখার প্রয়োজন বোধ করেন না। কিংবা সাক্ষাতকারী হয়তো সাধারণ মানুষ। তাই তার প্রতি গুরুত্ব দেয়ার আগ্রহ নেই। অথবা যখন সে নাম বলেছিল তখন আপনি তার নাম মনোযোগ দিয়ে শোনেন নি, এখন নতুন করে জিজ্ঞেস করতে সঙ্কোচবোধ করছেন। এসব কারণে অন্যদের নাম মনে থাকে না।
নাম মনে রাখার বিভিন্ন কৌশল আছে। একটি হলো, কারো নাম শোনার সময় এ কথা ভাবা যে, কয়েক মিনিট পর আমাকে নামটি জিজ্ঞেস করা হবে। আরেকটি হলো, কারও নাম শোনার সময় তার চেহারার প্রতি মনোযোগ নিবন্ধ করা।
কারও সঙ্গে কথা বলার সময় আপনি তার অবয়ব, কথা বলার ভঙ্গি ও হাসার ধরণ ভালোভাবে লক্ষ্য করবেন। যেন তা আপনার স্মৃতিপটে গেঁথে যায়। কথার ফাঁকে ফাঁকে বারবার তাকে নাম ধরে ডাকুন। এভাবে বলুন, হে অমুক! ঠিক বলেছেন, হে অমুক! আপনি এটা শুনেছেন? হে অমুক! আপনি কি আমার সঙ্গে একমত? এভাবে বারবার বলুন।
কাউকে নাম ধরে ডাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কুরআনে দেখুন, আল্লাহ তায়ালা নবীদেরকে তাদের নাম ধরেই সম্বোধন করেছেন
হে ইবরাহীম! তুমি এটা থেকে বিমুখ থাক।
হে নূহ! সে তোমার পরিজনভুক্ত নয়
হে দাউদ! আমি তো তোমাকে পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি বানিয়েছি
সারকথা…
আমার নাম মনে রেখে, নামসহ সম্বোধন করে
আমার প্রতি আপনার গুরুত্ব ও ভালোবাসা প্রকাশ করুন।
আমি অবশ্যই আপনাকে হৃদয়ে স্থান দেব।
