প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১৬, রমাদান-শাওয়াল ১৪৩৭ হিজরী, আষাঢ়-শ্রাবন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

রোগীর গায়ে অন্যের রক্ত দেওয়ার মাসআলা

এই মাসআলার বিশ্লেষণ নিম্নরূপ : রক্ত মানুষের শরীরের অংশ। শরীর থেকে বের করে নেওয়ার পর তা নাপাক। তদনুসারে প্রকৃত প্রস্তাবে একজনের রক্ত অন্যজনের শরীরে প্রবেশ করানো দু-কারণে হারাম হওয়া উচিত। প্রথমত, মানুষের যে কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্মানিত এবং আল্লাহ কর্তৃক সংরক্ষিত। শরীর থেকে পৃথক করে নিয়ে তা অন্যত্র সংযোজন করা সে সম্মান ও সংরক্ষণ বিধানের পরিপন্থি। দ্বিতীয়ত, এ কারণে যে, রক্ত নাজাসাতে-গলীযা বা জঘন্য ধরনের নাপাকী, আর নাপাক বস্তুর ব্যবহার জায়েয নয়।

তবে নিরুপায় অবস্থায় এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়ত যেসব সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে, সেগুলোর ভিত্তিতে চিন্তা-ভাবনা করলে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় :

প্রথমত, রক্ত যদিও মানুষের শরীরেরই অংশ, তথাপি এটা অন্য মানুষের শরীরে স্থানাস্তরিত করার জন্য যার রক্ত, তার শরীরে কোনো প্রকার কাটা-ছেঁড়ার প্রয়োজন হয় না, কোনো অঙ্গ কেটে পৃথক করতে হয় না। সুঁই-এর মাধ্যমে একজনের শরীর থেকে রক্ত বের করে অন্যজনের শরীরে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়। তদনুসারে রক্তকে দুধের সাথে তুলনা করা যেতে পারে; যা অঙ্গ কর্তন ব্যতিরেকেই একজনের শরীর থেকে বের হয়ে যেতে পারে; যা অঙ্গ কর্তন ব্যতিরেকেই একজনের শরীর থেকে বের হয়ে অন্যের শরীরের অংশে পরিণত হয়ে থাকে। শিশুর প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ করেই ইসলামী শরীয়ত মানুষের দুধকে মানবশিশুর খাদ্য হিসাবে নির্ধারণ করেছে এবং স্বীয় সন্তানকে দুধপান করানো মায়ের উপর ওয়াজিব সাব্যস্ত করে দিয়েছে। সন্তানদের পিতা কর্তৃক তালাকপ্রাপ্তা হলে অবশ্য শিশুকে দুধপান করানো মায়ের উপর ওয়াজিব থাকে না। কেননা, সন্তানদের খাদ্যসংস্থানের দায়িত্ব পিতার; মায়ের নয়। তাই পিতা তখন সন্তানকে দুধপান করানোর জন্য অন্য স্ত্রীলোক নিয়োগ করবে অথবা অর্থের বিনিময়ে সন্তানের মাতাকেই দুধপান করানোর জন্য নিয়োগ করবে।
কুরআনের নির্দেশ হচ্ছে,

যদি তোমাদের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীগণ তোমাদের সন্তানদের দুধপান করায়, তবে তার বিনিময় পরিশোধ করে দেবে। (সূরা তালাক : আয়াত-৬)

মোটকথা, মায়ের দুধ মানবদেহের অংশ হওয়া সত্ত্বেও প্রয়োজনের খাতিরে শিশুর জন্য তা ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এমনকি ঔষধরূপে বড়দের জন্যও। যেমন ফতওয়ায়ে আলমগীরীতে বলা হয়েছে

অর্থাৎ ঔষধ হিসাবে স্ত্রীলোকের দুধ পুরুষের পক্ষে নাকে প্রবেশ করানো কিংবা পান করায় দোষ নেই। (আলমগীরী খণ্ড-৪)
ইবনে মুদামাহ রচিত মুগনী গ্রন্থে এ মাসআলা সম্পর্কিত আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। (মুগনী, কিতাবুস সায়েদ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ২০৬)

রক্তকে যদি দুধের সাথে কিয়াস তথা তুলনা করা হয়, তবে তা সামঞ্জস্যহীন হবে না। কেননা, দুধ রক্তেরই পরিবর্তিত রূপ এবং মানবদেহের অংশ হওয়ার ব্যাপারেও একই পর্যায়ভুক্ত। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, দুধ পাক এবং রক্ত নাপাক। সুতরাং হারাম হওয়ার প্রথম কারণ অর্থাৎ মানবদেহের অংশ হওয়ার ক্ষেত্রে তা নিষিদ্ধ হওয়ার ধারণা যুক্তিতে টেকে না। অবশিষ্ট থাকে দ্বিতীয় কারণ, অর্থাৎ নাপাক হওয়া। এক্ষেত্রেও চিকিৎসার বেলায় অনেক ফিকহবিদ রক্ত ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছেন।

এমতাবস্থায় মানুষের রক্ত অন্যের দেহে স্থানান্তর করার প্রশ্নে শরীয়তের নির্দেশ দাঁড়ায় এই যে, সাধারণ অবস্থায় এটা জায়েয নয়। তবে চিকিৎসার্থে, নিরুপায় অবস্থায় ঔষধ হিসাবে ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে জায়েয। নিরুপায় অবস্থায় অর্থ হচ্ছে, রোগীর যদি জীবন-রক্ষার সম্ভাবনা যদি প্রবল থাকে, তবে সে অবস্থায় তার দেহে অন্যের রক্ত দেওয়া কুরআন শরীফের সে আয়াতের মর্মানুযায়ীও জায়েয হবে, যে আয়াতে অনন্যোপায় অবস্থায় মৃত জন্তুর গোশত খেয়ে জীবন বাঁচানোর সরাসরি অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

আর যদি অনন্যোপায় না হয় এবং অন্য ঔষধ ব্যবহারে চিকিৎসা করা সম্ভব হয়, তবে সে অবস্থায় রক্ত ব্যবহারের প্রশ্নে মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো ফিক্হবিদ একে জায়েয বলেছেন এবং কেউ কেউ নাজায়েয বলেছেন। এ সম্পর্কিত বিস্তারিত বিবরণ ফিক্হর কিতাবসমূহে হারাম বস্তুর দ্বারা চিকিৎসা শীর্ষক আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

শূকর হারাম হওয়ার বিবরণ

আলোচ্য আয়াতে তৃতীয় যে বস্তুটি হারাম করা হয়েছে, সেটি হলো শূকরের মাংস। এখানে শূকরের সাথে লাহ্ম শব্দ সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন, এর দ্বারা শুধু মাংস হারাম-একথা বোঝানো উদ্দেশ্য নয়। বরং শূকরের সমগ্র অংশ অর্থাৎ হাড়, মাংস, চামড়া, চর্বি, রগ, পশম প্রভৃতি সবকিছুই সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। তবে লাহ্ম শব্দ যোগ করে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, শূকর অন্যান্য হারাম জন্তুর ন্যায় নয়, তাই এটি যবেহ করলেও পাক হয় না। কেননা, গোশত খাওয়া হারাম এমন অনেক জন্তু রয়েছে যাদের যবেহ করার পর সেগুলোর হাড়, চামড়া প্রভৃতি পাক হতে পারে, যদিও সেগুলো খাওয়া হারাম। কিন্তু যবেহ করার পরও শূকরের মাংস খাওয়া হারাম তো বটেই, নাপাকও থেকে যায়। কেননা, এটি একাধারে যেমনি হারাম তেমনি নাজাসে-আইন বা সম্পূর্ণ নাপাক। শুধু চামড়া সেলাই করার কাজে শূকরের পশম দ্বারা তৈরি সূতা ব্যবহার করা জায়েয বলে হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে। (জাসসাস, কুরতুবী)

আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর নামে যবেহ করা

আয়াতে উল্লেখিত চতুর্থ হারাম বস্তু হচ্ছে জীবজন্তু, যা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও নামে যবেহ অথবা উৎসর্গ করা হয়। সাধারণত এর তিনটি পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে।

১. আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে যা উৎসর্গ করা হয় এবং যবেহ করার সময়ও সে নাম নিয়েই যবেহ করা হয়, যে নামে তা উৎসর্গিত। এ সুরতে যবেহকৃত জন্তু সকল আলিম ও ফুকাহায়ে কেরামের ঐকমত্যেই হারাম ও নাপাক। এটি মৃত এবং এর কোনো অংশ দ্বারাই ফায়দা গ্রহণ জায়েয হবে না। কেননা, আয়াতে সে সুরতের কথা বোঝানো হয়েছে এ সুরতটি এর সরাসরি নমুনা, যে ব্যাপারে কারও কোনো মতভেদ নেই।

২. দ্বিতীয় সুরত হচ্ছে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর সন্তুষ্টি বা নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে যা যবেহ করা হয়। তবে যবেহ করার সময় তা আল্লাহর নাম নিয়েই যবেহ করা হয়। যেমন অনেক অজ্ঞ মুসলমান পীর-বুযুর্গগণের সন্তুষ্টি অর্জনের মানসে গরু, ছাগল, মুরগি ইত্যাদি মানত করে তা যবেহ করে থাকে। তবে যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম নিয়েই তা যবেহ করা হয়। এ সুরতটিও ফকীহগণের সর্বসম্মত অভিমত অনুযায়ী হারাম এবং যবেহকৃত জন্তু মৃতের শামিল।

তবে দলিল গ্রহণের ক্ষেত্রে এ সুরতটি সম্পর্কে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে। কোনো কোনো মুফাসসির এবং ফিকহবিদ এ সুরতটিকেও আয়াতে উল্লেখিত আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর নামে যবেহকৃত জীবের বিধানের অনুরূপ বিবেচনা করেছেন। যেমন তাফসীরে বায়যাবীর টীকায় বলা হয়েছে,

সে সমস্ত জন্তুই হারাম, যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর নামে উৎসর্গ করা হয়। যবেহ করার সময় তা আল্লাহর নামেই যবেহ করা হোক না কেন। কেননা, আলিম ও ফকীহগণ এ ব্যাপারে একমত যে, যদি কোনো জন্তুকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর নৈকট্য হাসিল করার উদ্দেশ্যে কোনো মুসলমানও যবেহ করে, তবে সে ব্যক্তি মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী হয়ে যাবে এবং তার যবেহকৃত পশুটি মুরতাদের যবেহকৃত পশু বলে বিবেচিত হবে।

দুররে-মুখতার কিতাবের কিতাবুয-যাবায়েহ অধ্যায়ে বলা হয়েছে,

যদি কোনো আমীরের আগমন উপলক্ষে তাঁরই সম্মানার্থে কোনো পশু যবেহ করা হয়, তবে যবেহকৃত সে পশুটি হারাম হয়ে যাবে। কেননা, এটাও আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর নামে যা যবেহ করা হয়-এ আয়াতের নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত, যদিও যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম নিয়েই তা যবেহ করা হয়। শামীও এ অভিমত সমর্থন করেছেন। (এর অর্থ এই যে, পশু যবাই কেবলই বড় কোনো ব্যক্তির প্রতিসম্মান প্রদর্শনার্থে করা হচ্ছে, তাহলে এটা হারাম। আর যদি উদ্দেশ্য হয় মেহমানদারী করা এবং এই মেহমানদারীর জন্যই পশু যবাই করা হয়, অর্থাৎ এই পশুর গোশত মেহমানদের খাওয়ানো উদ্দেশ্য হয় এবং কেবল সম্মান প্রদর্শনার্থেই যবাই করা হচ্ছে না, তাহলে এটা মেহমানদারীর সুন্নাত। এটা জায়েয। উপরোক্ত উভয় সুরতের পার্থক্য এই যে, দ্বিতীয় সুরতে পশু যবাই করা হয় মেহমানদারীর গোশতের ব্যবস্থা করার জন্য। আর প্রথম সুরতে সম্মানার্থেই পশু যবাই করা উদ্দেশ্য হয়। এটা লক্ষণীয় নয় যে, গোশত খাওয়া হবে কি হবে না। দুরবে মুখতার কিতাবে বিষয়টি এভাবেই স্পষ্ট করা হয়েছে। (দুররে-মুখতার, ৫ম খণ্ড, পৃ. ২১৪)

কেউ কেউ অবশ্য উপরোক্ত সুরতটিকে আয়াতের সাথে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করেন না। কেননা, আয়াতের বর্ণনাভঙ্গি অনুসারে একেবারে সরাসরি তা বোঝায় না। তবে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর নৈকট্য বা সন্তুষ্টি লাভের নিয়ত দ্বারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর উদ্দেশ্যে যা উৎসর্গ করা হয় সে আয়াতের প্রতি যথেষ্ট সামঞ্জস্যপূর্ণ বিধায় এ সুরতটিকেও হারাম করা হয়েছে। আমাদের বিবেচনায় এ যক্তিই সর্বাপেক্ষা শুদ্ধ ও সাবধানতাপ্রসূত।

উপরোক্ত সুরতটি হারাম হওয়ার সমর্থনে কুরআনের অন্য আর একটি আয়াতও দলিল হিসাবে পেশ করা যায়। সে আয়াতটি হচ্ছে :

বাতিলপন্থিরা যেসব বস্তুর পূজা করে থাকে, সেই সবকিছুকে বলা হয়। সে মতে আয়াতের অর্থ হয় : সে সমস্ত পশু যেগুলোকে বাতিল উপাস্যের উদ্দেশ্যে যবেহ করা হয়েছে। ইতিপূর্বে উল্লেখিত রয়েছে। এতে বোঝা যায় যে, আয়াতের সরাসরি প্রতিপাদ্য সে সমস্ত পশু, যেগুলো যবেহ করার সময় অন্য কোনো কিছুর নামে যবেহ করা হয়। এরপরই আয়াত এসেছে। এ আয়াতে যবেহ করার সময় আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর নাম নেওয়ার কথা উল্লেখ নেই, শুধু মূর্তি বা বাতিল উপাস্যের সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে যবেহ করার কথা এসেছে। এতে এখানে সে সমস্ত জন্তুও এ সুরতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাচ্ছে, যেগুলো যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম নিয়ে যবেহ করা হলেও আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর সন্তুষ্টির অর্জন করার লক্ষ্যে যবেহ করা হয়েছে। (মাওলানা আশরাফ আলী খানভীর ব্যাখ্যা)
ইমাম কুরতুবীও তাঁর তাফসীরে উপরোক্ত মতই সমর্থন করেছেন। তাঁর অভিমত হচ্ছে,

আরবদের স্বভাব ছিল যে, যার উদ্দেশে যবেহ করা হতো, যবেহ করার সময় উচ্চস্বরে সে নামই উচ্চারণ করতে থাকত। ব্যাপকভাবে তাদের মধ্যে এ রেওয়াজ প্রচলিত ছিল। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য প্রত্যাশা যা সংশ্লিষ্ট পশু হারাম হওয়ার মূল কারণ, সেটাকে (এহলাল) অর্থাৎ উচ্চস্বরে নামোচ্চারণ শব্দ দ্বারা বোঝানো হয়েছে।ইমাম কুরতুবী দু-জন বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আলী (রা.) এবং হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রা.)-এর ফতওয়ার উপর ভিত্তি করেই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।