প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১৬, রমাদান-শাওয়াল ১৪৩৭ হিজরী, আষাঢ়-শ্রাবন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
হযরত আবু কাতাদাহ মদিনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের বনী সুলামা শাখার সন্তান। তাঁর আসল নামের ব্যাপারে মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন আল হারিস আবার কেউ বলেছেন আমর। আল-কালবী ও ইবন ইসহাকের মতে আন-নুমান। তবে আল-হারিস অধিকতর প্রসিদ্ধ। ইতিহাসে তিনি আবু কাতাদাহ এ ডাক নামেই খ্যাত। পিতা রাবৎয়ী ইবন বালদামা এবং মাতা কাবশা বিনতু মুতহরিরঃ। তিনিও খাযরাজ গোত্রের বনী সুলামার সাওয়াদ ইবনে গানাম শাখার মেয়ে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিযরাতের ১৮ বছর পূর্বে ৬০৪ খ্রীষ্টাব্দে মদীনায় জন্ম গ্রহণ করেন। (উসদুল গাবা- ৫/২৭৪ আল ইসাবা-৪/১৫৮; আল-আলাম ২/১৫৪) তাবুক যুদ্ধে যোগদান না করার কারণে যে কাব ইবন মালিক আল-আনসারীর শাস্তি হয় এবং পরে আল্লাহপাক যাকে ক্ষমা করেন, তিনি আবু কাতাদাহর চাচাতো ভাই। সে সময় তিনিও অন্য সকলের মতো কাবকে বয়কট করেন। (হায়তুস সাহাবা-১/৪৬৭)
শেষ আকাবার পরে কোন এক সময় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। বদর যুদ্ধে তাঁর অংশ গ্রহণের ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতবিরোধ আছে। অনেকে তাঁকে বদরী সাহাবী বলেছেন। তবে মুসা ইকবা বা ইবন ইসহাক, এঁদের কেউই বদরী সাহাবীদের তালিকার মধ্যে তাঁর নামটি উল্লেখ করেননি। উহুদসহ পরবর্তী সকল যুদ্ধে রাসূল্লুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যোগ দেন। (আল-ইসাবা = ৪/১৫৮; উসদুল গাবা-৫/২৭৪)
৬ হিজরীর রবীউল আউয়াল মাসে জীকারাদ বা গাবা অভিযান পরিচালিত হয়। সেই অভিযানে তিনি দারুন দুঃসাহসের পরিচয় দান করেন। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটগুলো জীকারাদ নামক একটি পল্লীতে চরতো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাস রাবাহ ছিলেন সেই উটগুলির দায়িত্বে। গাতফান গোত্রের কিছু লোক রাখালদের হত্যা করে উটগুলি লুট করে নিয়ে যায়। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত সালমা ইবন আকওয়া ্এ সংবাদ পেয়ে আরবের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মদীনার দিকে মুখ করে শত্র“র আক্রমণের সর্তক ধ্বনি ইয়া সাবাহ! বলে তিনবার চিৎকার দেন। অন্যদিকে রাবাহকে দ্রুত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পাঠিয়ে দিয়ে নিজে গাতফানী লুটেরাদের পিছে ধাওয়া করেন। হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সাহায্যের জন্য দ্রুত তিনজন অশ্বারোহীকে পাঠিয়ে দেন এবং তাঁদের পিছনে তিনি নিজেও বেরিয়ে পড়েন। আবু কাতদাহ আল-আনসারী, আল-আখরাম আল-আসাদী এবং তাঁদের পিছনে মিকদাদ আল-কিন্দী বাতাসের বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে আসছেন। এই অশ্বারোহীদের দেখে গাতফানীদের উট ফেলে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু আল-আখরাম আল- আসাদীর মধ্যে তখন শাহাদাতের তীব্র বাসনা কাজ করছে। তিনি সালামার নিষেধ অমান্য করে গাতফানীদের পিছে ধাওয়া করেন। এ পর্যায়ে তাঁর ও আবদুর রহমান গাতফারীর মধ্যে হাতাহাতি লড়াই হয় এবং আল-আলরাম শাহাদাত বরণ করেন। আবদুর রহমান আল-আখরামের ঘোড়াটি নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। এমন সময় আবু কাতাদাহ এসে উপস্থিত হন এবং তিনি বর্শার এক খোচায় আবদুর রহমানকে হত্যা করেন। (আল-কামিল ফী আত- তারীখ- ২/১৮৯- ১৯১; আর-ইসাবা-৪/১৫৮;হায়াতুস সাহাবা-১/৫৬১; সহীহ মুসলিম- ২/১০১)
অন্য একটি বর্ণনা মতে এই জীকারাদ যুদ্ধে আবু কাতাদাহ যাকে হত্যা করেন তার নাম হাবীব ইবন উয়াইনা ইবন হিসন। তিনি হাবীবকে হত্যা করে নিজের চাদর দিয়ে লাশটি ঢেকে শত্র“র পিছনে আরও এগিয়ে যান। পিছনের লোকেরা যখন দেখতে পেল, আবু তাতাদাহর চাদর দিয়ে একটি লাশ ঢাকা তখন তারা মনে করলো, নিশ্চয় এ আবু কাতাদাহর লাশ। সাথে সাথে তারা ইন্নালিল্লাহ উচ্চারণ করলো। তারা নিজেরা বলাবলি করতে লাগলো; আবু কাতাদাহ নিহত হয়েছে। একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন; আবু কাতাদাহ নয়; বরং আবু কাতাদাহর হাতে নিহত ব্যক্তির লাশ। সে একে হত্যা করে নিজের চাদর দিয়ে ঢেকে রেখে গেছে, যাতে তোমরা বুঝতে পার, তার ঘাতক সেই। এ যুদ্ধে আবু কাতাদাহর ঘোড়াটির নাম ছিল হাযওয়া। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/২৮৪)
আবু কাতাদাহ বলেন, জীকারাদের দিন অভিযান শেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে আমার দেখা হলে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে দুআ করেনঃ হে আল্লাহ! তুমি তার কেশ ও ত্বকে বরকত দাও। তার চেহারাকে কামিয়াব কর। আমি বললাম: ইয়া রাসূলুল্লাহ। আল্লাহ আপনার চেহারাও কামিয়াব করুন। (উসদুল গাবা-৫/২৭৫) এ দিন তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতার বর্ণনা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মন্তব্য করেন: আবু কাতাদাহ আজ আমাদের সর্বোত্তম অশ্বারোহী। (আল-কামিল ফী আত- তারীখ- ২/১৯১; আল-ইসাবা-৪/১৫৮)
হুদাইবিয়া সন্ধির সফরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আবু কাতাদাহও ছিলেন। এ সফরে ফেরার পথে একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামসহ তাঁর সফর সঙ্গীদের ফজরের নামায কাজা হয়ে যায়। সে কাজা নামায ককন কিভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদায় করেছিলেন তার একটি বিবরণ আবু কাতাদাহ বর্ণিত একটি হাদীস থেকে জানা যায়। (হায়তুস সাহাবা-৩/২৯)
হিজরী সপ্তম অথবা অষ্টম সনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু কাতাদাহকে নেতৃত্বে একটি বাহিনী ইদাম এর দিকে পাঠান। এই ইদাম একটি স্থান বা একটি পাহাড়ের নাম এবং মদীনা থেকে শামের রাস্তায়। তাঁরা ইদাম উপত্যাকায় পৌছানোর পর তাঁদের পাশ দিয়ে আমের ইবন আল-আদবাত আল-আশাজয়ী যাচ্ছিলেন। তিনি আবু কাতাদাহ ও তাঁর বাহিনীর সদস্যদের সালাম দিলেন। তা সত্ত্বেও পূর্ব শত্র“তার কারণে এ বাহিনীর সদস্য মুহাল্লিম ইবন জাসসামা ইবনে কায়েস তাঁকে হত্যা করেন এবং তাঁর উট ও অন্যান্য জিনিস ছিনিয়ে নেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত হয়ে যখন তাঁকে এ ঘটনা অবহিত করেন তখন সূরা আন নিসার ৯৪নং আয়াতটি নাযিল হয়। (আনসাবুল আশরাফ-১/৩৮১; হায়তুস সাহাবা-২/৩৮৯)
হে মুমিনগণ! তোমরা যখন আল্লাহর পথে যাত্রা করবে তখন পরীক্ষা করে নেবে কেউ তোমাদেরকে সালাম দিলে ইহ-জীবনের সম্পদের আকাক্সক্ষায় তাকে বলো না, তুমি মুমিন নও। কারণ, আল্লাহর নিকট অনায়াসলভ্য সম্পদ প্রচুর আছে। তোমরা তো পূর্বে এরূপই ছিলে, তোমরা যা কর আল্লাহ সে বিষয়ে বিশেষভাবে অবহিত। (সূরা আন নিসা-৯৪)
হিজরী ৮ম শনের শাবান মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজদের খাদরাহ নামক স্থানের দিকে পনেরো সদস্যের একটি বাহিনী পাঠান। আবু কাতাদাহ ছিলেন এই বাহিনীর আমীর। সেখানে গাতফান গোত্রের বসতি ছিল। তারা ছিল মুসলমানদের চরম শত্র“ এক লুটেরা গোত্র। তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল। একারণে সারা রাত চলতেন এবং দিনে কোথাও লুকিয়ে থাকতেন। এভাবে হঠাৎ তাঁরা গাতফান গোত্রে পৌছে যান। তারাও ছিল ভীষণ সাহসী। সাথে সাথে বহুলোক উপস্থিত হয়ে গেলে এবং যুদ্ধ শুরু হলো। আবা কাতাদাহ সঙ্গীদের বললেন, যারা তোমাদের সাথে লড়বে শুধু তাদেরকেই হত্যা করবে। সবাইকে ধাওয়া করার কোন প্রয়োজন নেই। এমন নীতি গ্রহণের ফলে দ্রুত যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। মাত্র ১৫ দিন পর প্রচুর গণীমতের মাল সংগে নিয়ে মদিনায় ফিরে আসেন। গণীমতের মালের মধ্যে ছিল দুশো উট, দু হাজার ছাগল এবং বহু বন্দী। এই মালের এক পঞ্চমাংশ পৃথক করে রেখে বাকী সবই তাঁদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়। এ ঘটনার কিছু দিন পর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান মাসে ৮জন লোকের একটি দল বাতানে আখাম-এর দিকে পাঠান। এঁদেরও নেতা ছিলেন আবু কাতাদাহ। বাতানে আখাম- এর অবস্থান হচ্ছে জী-খাশাব ও জী-মারওয়ার মাঝামাঝি মদীনা থেকে মক্কার দিকে তিন মানযিল দূরে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় সেনা অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মানুষ যাতে একথা মোটেই বুঝতে না পারে এ জন্য এই দলটিকে পাঠান। মূলত: মানুষের চিন্তা অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই একাজ করেন। সুতরাং তারা সুকাইয়্যা নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাহিনীর সাথে মিলিত হন। (তাবাকাত : মাগাযী অধ্যায়-৯১)
মক্কা বিজয়ের পর হুনাইন অভিযান পরিচালিত হয়। এ অভিযানে লড়াই এত তীব্র ছিল যে, মুসলমানদের অনেক বড় বড় বীরও পিছু হঠতে বাধ্য হন। আবু কাতাদাহ এ যুদ্ধে দারুণ বীরত্ব প্রদর্শন করেন। এ স্থানে একজন মুসলমান ও একজন মুশরিক সৈনিকদের মধ্যে হাতাহাতি লড়াই হচ্ছে। দ্বিতীয় একজন পিছন দিক থেকে মুসলিম সৈনিকদের আক্রমণের পায়তারা করছে। ব্যাপারটি আবু কাতাদাহর নজরে পড়লো। তিনি চুপিসারে এগিয়ে গিয়ে পিছন দিক থেকে লোকটির কাঁধে তরবারির ঘা বসিয়ে দিলেন। লোকটির একটি হাত কেটে গেল,কিন্তু অতর্কিত সে দ্বিতীয় হাতটি দিয়ে আবু কাতাদার গলা পেচিয়ে ধরলো। লোকটি ছিলো অতি শক্তিশালী। সে এত জোরে আবু কাতাদাহকে চাপ দিলো যে, তার প্রাণ বেরিয়ে যাবার উপক্রম হলো। দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি চলছে, এর মধ্যে লোকটিরদেহ থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় সে দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সুযোগে আবু কাতাদাহ লোকটির দেহে আরেকটি ঘা বসিয়ে দেন। লোকটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
আবু কাতাদাহ যখন তার হত্যা কর্মে ব্যস্ত তখন মক্কার এক মুসলিম সৈনিক সেই পথে যার্চ্চিল। সে নিহত ব্যক্তির সকল সাজ-সরঞ্জাম ও জিনিসপত্র হাতিয়ে নিয়ে গেল। এরপর মুসলিম বাহিনীর মধ্যে দারুন ত্রাস ছড়িয়ে পড়ে। তারা ময়দানে থেকে যে যেদিক পারে, পালিয়ে গেল। আবু কাতাদাহও এক দিকে যাচ্ছেন। পথে এক স্থানে হযরত উমারের (রা) সাথে দেখা। আবু কাতাদাহ তাকে জিজ্ঞেসা করলেন: কী ব্যাপার? উমার (রা) বললেন, আল্লাহর যা ইচ্ছা এর মধ্যে মুসলমানরা দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে এবং রণক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করে।
আবু কাতাদাহ বলেনঃ যুদ্ধ থেমে গেল। আমরাও বিশ্রাম নিচ্ছি। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করলেন: কেউ কোন ব্যক্তিকে হত্যা করলে হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত জিনিস লাভ করবে। আমি বললাম: ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি একজন সাজ-সরঞ্জামবিশিষ্ট ব্যক্তিকে হত্যা করেছি। আমি যখন তার হত্যা কর্মে ব্যস্ত তখন কে একজন তাঁর জিনিস ছিনিয়ে নিয়ে গেছেন। আমি তাকে চিনিনে। তখন মক্কার সেই ব্যক্তি বললোঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! সে সত্য বলেছে। নিহত ব্যক্তির জিনিস আমার কাছে আছে। সেগুলি আমাকে দেওয়ার জন্য তাঁকে একটু রাজী করিয়ে দিন।
সাথে সাথে আবু বকর (রা) বলে উঠলেন: আল্লাহর কসম! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে রাজী করাবেন না। একজন শেরে খোদা আল্লাহর রাহে জিহাদ করেছে, আর তুমি তার প্রাপ্য জিনিস হাতানোর মতলবে আছ? নিহত ব্যক্তির জিনিস তাকে দিয়ে দাও। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : আবু বকর সত্য বলেছে। তুমি তার লুণ্ঠিত দ্রব্য ফিরিয়ে দাও। আবু কাতাদাহ বলেনঃ আমি সেই জিনিসগুলি নিয়ে বিক্রী করি এবং অর্থ দিয়ে দশটির মত খেজুর গাছ ক্রয় করি। ইসলাম গ্রহণের পর এই ছিল আমার প্রথম কোন সম্পদ ক্রয়। (সীরাতু ইবনে হিশাম- ২/৪৪৮, ৪৪৯; হায়াতুস সাহাবা-২/৯০,৯১; মুসনাদে-৫/৩০৬)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পর খলীফাদের সময় আবু কাতাদাহর কর্মকান্ডের বিস্তারিত তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। হযরত উসমান (রা) যখন বিদ্রোহীদের দ্বারা মদিনায় নিজ গৃহে ঘেরাও অবস্থায়, তখন হজ্জ মওসুম। সে সময় একদিন আবু কাতাদাহ অন্য একজন লোককে সংগে করে খলীফা উসমানের (রা) নিকট গিয়ে হজ্জে যাওয়ার অনুমতি চান। তিনি তাদেরকে অনুমতি দেন। তখন তারা খলীফার নিকট জানতে চানঃ যদি এই বিদ্রোহীরা বিজয়ী হয় তাহলে তাঁরা কার সাথে থাকবেন? খলীফা বললেন: সংখ্যা গরি জামায়াতের সাথে। তাঁরা আবার প্রশ্ন করেন: যদি এই সংখ্যা গরি জামায়াতই আপনার ওপর বিজয়ী হয় তখন কার সাথে থাকবো? সংখ্যা গরি দল যারাই হোক না কেন তাদের সাথে থাকবে। (হায়াতুস সাহাবা-২/১২৬)
হযরত আলী (রা) তাঁকে একবার মক্কার আমীর নিয়োগ করেন। পরে তাঁর স্থলে কুছাম ইবন আব্বাসকে নিয়োগ করেন। হিজরী ৩৬ সনে উটের যুদ্ধে এবং এর পরের বছর সিফফীনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। হযরত আবু কাতাদাহ (রা) দুটি যুদ্ধেই হযরত আলী (রা) পক্ষে যোগ দেন। (আল-আলাম-২/১৫৪; আল-ইসাবা-৪/১৫৮) হিজরী ৩৮ সনে খারেজীরা বিদ্রোহের পতাকা উডডীন করে। হযরত আলী (রা) যে বাহিনী নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন, আবু কাতাদাহ ছিলেন তার পদাতিক দলের অফিসার।
হযরত আবু কাতাদাহ (রা) মৃত্যু সন নিয়ে দারুন মতভেদ আছে। কুফাবাসীদের মতে হিজরী ৩৮ সনে তিনি কুফায় মারা যান এবং হযরত আলী (রা) সাত তাকবীরের সাথে তাঁর জানাযার নামায পড়ান। ইমাম শাবী বলেন, সাত নয়, বরং ছয় তাকবীরের সাথে হাসান ইবন উসমান বলেন, তিনি হিজরী-৪০ সনে মারা যান। ওয়াকিদী বলেন, হিজরী ৫৪ সনে ৭২ বছর বয়সে মদীনায় মারা যান। আবার কেউ বলেছেন, ৭২ নয় বরং ৭০ বছর বয়সে । ইমাম বুখারী আল -আওসাত গ্রন্থে যারা হিজরী ৫০ থেকে ৬০ সনের মধ্যে মারা গেছেন, তাদের মধ্যে আবু কাতাদাহর নামটি উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, মারওয়ানা যখন মুয়াবিয়ার (রা)পক্ষ থেকে মদিনায় ওয়ালী তখন তিনি আবু কাতাদাহকে একবার দেখা করার জন্য ডেকে পাঠান এবং তিনি মারওয়ানের সাথে দেখা করেন। ্এর সমর্থনে আর একটি বর্ণনা দেখা দেয়। মুয়াবিয়া (রা) যখন মদীনায় আসেন তখন সর্বশ্রেণীর -মানুষ তার সাথে দেখা করে। তখন তিনি আবু কাতাদাহকে ডেকে বলেন: শুধু আপনারা-আনসাররা ছাড়া সব মানুষই আমার সাথে দেখা করেছে। এসব বর্ণনা দ্বারা নিশ্চিতভাবে বুঝা যায় তিনি হিজরী ৪০ সনের পরে মারা গেছেন। (দ্র: আল-ইসাবা৪/১৫৯; আল-আলাম-২/১৫৪; উসুদুল গাবা-৫/২৭৫)
হযরত আবু কাতাদাহর (রা) দৈহিক আকার-আকৃতি সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। তবে তিনি ঘাড় পর্যন্ত চুল রাখতেন যাকে হামিয়্যা বলা হয়। চুলের মাঝে মাঝে চিরুনী করতেন। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার তাঁর চুলের অযতœ ও বিক্ষিপ্ত অবস্থা দেখে বলেন, এগুলি একটু ঠিক কর। মানুষের উচিত চূল রাখলে তার যতœ নেওয়া । অন্যথায় সে রাখার ফায়দা কি?
তাঁর ছিল চার ছেলে: আবদুল্লাহ, মাবাদ, আব্দুর রহমান ও সাবিত। শেষের জন ছিলেন দাসীর গর্ভজাত। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল সালাফা বিনতে বারা ইবন মারুর ইবন সাখার। সুলামা খান্দানের এক অভিজাত ঘরের মেয়ে। তিনি নিজেও একজন সাহাবিয়্যা (মহিলা সাহাবী) এবং তাঁর পিতা বারা ইবন মারুর ইবন শাখারও ছিলেন একজন খ্যাতিমান সাহাবী।
হযরত আবু কাতাদাহ কুরআন-হাদীসের প্রচার প্রসারের দায়িত্ব সম্পর্কে মোটেই উদাসীন ছিলেন না। হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে ছিলেন দারুন সতর্ক। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে কিজব আলার রাসূলে বা রাসূলের প্রতি মিথ্যা আরোপের হাদীস শোনার পর থেকে হাদীসের ব্যাপারে দারুন সতর্কতা আবলম্বন করেন। (মুসনাদ-৫/২৯২)
একদিন তাবেঈনদের একটি মজলিসে হাদীসের চর্চা হচ্ছিল। প্রত্যেকেই বলছিলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন বলেছেন। আবু কাতাদাহ তাঁদের এসব আলোচনা শুনে বললেন; হতভাগার দল, তোমাদের মুখ থেকে এসব কী বের হচ্ছে ? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারীদের জাহান্নামের শাস্তির কথা বলেছেন। (মুসনাদ-৫/৩১০)
এত সতর্কতা সত্ত্বেও তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ১৭০ (একশত সত্তর)। তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্যে যেমন শ্রে সাহাবাগণ আছেন, তেমনি আছেন শ্রে তাবেইনগণও। যেমনঃ আনাস ইবনে মালিক, কাব ইবন মালিক, কাবশা বিনতু কাব ইবন মালিক আবদুল্লাহর ইবন রাবাহ, আতা ইবনে ইয়াসার, আবু সালামা ইবন আবদির রহমান ইবন আউফ, উমার ইবন সুলাইম যারকী, আবুদুল্লাহ ইবন মাবাদ, মুহাম্মদ ইবন সীরীন, সাঈদ ইবন মুসায়্যিব প্রমুখ। উল্লেখিত ব্যক্তিগণের সকলেই হাদীস শাস্ত্রের এক একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র।
হযরত আবু কাতাদাহর মধ্যে ইসলামী উখুওয়াত বা ভ্রাতুত্বের চরম বিকাশ ঘটেছিল। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে এক আনসারী ব্যক্তির মৃতদেহ আনা হলো জানাযার জন্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে জানতে চাইলেন, তার ওপর কোন ঋণ আছে কিনা। লোকেরা বললো তার দুদিনের ঋণ আছে। তিনি আবার জানতে চাইলেন, সে কোন সম্পদ রেখে গেছে কিনা। লোকেরা বললো, না সে কিছুই রেখে যায়নি। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা তার নামায পড়। হযরত আবু কাতাদাহ আরজ করলেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ আমি যদি তার ঋণ পরিশোধ করে দেই, আপনি কি নামায পড়াবেন? বললেনঃ হাঁ। আবু কাতাদাহ লোকটির ঋণ পরিশোধ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খরব দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে জানাযার নামায পড়ান। (মুসনাদে-৫/২৯,২০৩)
একজন মুসলমান তাঁর কাছে কিছু ঋণী ছিল। যখন তিনি তাগাদায় যেতেন তখন সে লুকিয়ে থাকতো। একদিন তিনি লোকটির বাড়ীতে গেলেন এবং তার ছেলের কাছে খবর পেলেন, সে খাবার খাচ্ছে। তিনি চেচিয়ে বললেনঃ তুমি বেরিয়ে এসো, আজ আমি জেনে ফেলেছি। আজ লুকিয়ে কাজ হবে না। সে বেরিয়ে এসে আবু কাতাদাহ তার এভাবে লুকানোর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। লোকটির বললোঃ আসল কথা হলো, আমি খুবই গরীব। আমার কাছে তোমার এমন দূরাবস্থা? সে বললোঃ হাঁ আবু কাতাদাহর চোখে পানিতে ভরে গেল। তিনি তার ঋণ মাফ করে দিলেন। (মুসনাদে-৫/৩৯৮)
হযরত আবুবকরের (রা) খিলাফতকালে রিদ্দার যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধের এক পর্যায়ে খলীফা খালিদ ইবন ওয়ালীদকে পাঠালেন মালিক ইবনে নুওয়াইরা উয়ারবুয়ীর বিরুদ্ধে। মালিক ইবন নুওয়াইরা ইসলাম কবুল করেন। তা সত্ত্বেও যে কোন কারণেই হোক খালিদ তাঁকে হত্যা করেন। খালিদের একাজে আবু কাতাদাহ এতই ক্ষুদ্ধ হন যে, খলীফার নিকট আবেদন করেন; আমি খলিদের অধীনে থাকতে রাজী নই। সে একজন মুসলমানের রক্ত ঝরিয়েছে।
অতি ক্ষুদ্র বিষয়েও তিনি মানুষকে সঠিক আকীদা বিশ্বাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। একবার তিনি ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন। এমন সময় একটা উল্কা ছুটে আসতে থাকে। মানুষ সে দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকে। তিনি তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ এটা বেশী দেখা নিষেধ। (মুসনাদে-৫/২৯৯)
হযরত আবু কাতাদাহ (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সার্বক্ষণিক সাহচার্য ও খিদমতের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। একবার এক সফরে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গী ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের বললেন, পানি কোথায় আছে তা খুঁজে বের কর, অন্যথায় সকালে ঘুম থেকে পিপাসিত অবস্থায় উঠতে হবে। লোকেরা পানি তালাশে বেরিয়ে গেল। কিন্তু হযরত আবু কাতাদাহ (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথেই থেকে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটের ওপর সওয়ার ছিলেন। ঘুম কাতর অবস্থায় তিনি যখন এক দিকে ঝুকে পড়ছিলেন তখন আবু কাতাদাহ এগিয়ে গিয়ে নিজের হাত দিয়ে সে দিকে ঠেস দিচ্ছিলেন। একবার তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পড়ে যাবারই উপক্রম হলেন। আবু কাতাদাহ দ্রুত হাত দিয়ে ঠোকালেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চোখ মেলে জিজ্ঞেস করলেন : কে? বললেন : সন্ধ্যা থেকে। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জন্য দুআ করলেন এই বলেঃ হে আল্লাহ! আপনি আবু কাতাদাহকে হিফাজত করুন যেমন সে সারা রাত আমার হিফাজত করেছে। (মুসনাদে-৫/২৩৯৮; হায়াতুস সাহাবা-৩/৩৪৭; আল-ইসাবা-৪/১৫৯)
একবার হযরত আবু কাতাদাহ (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি মুজিযা প্রত্যক্ষ করেন। (আবু নুয়ায়িম আদ- দালায়িল গ্রন্থে ৯১৪৪) ইবন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা এক সফরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগে ছিলাম। এ সময় যাত্রা বিরতিকালে তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমাদের সাথে কি পানি আছে? বললামঃ হাঁ। আমার কাছে একটি পাত্রে কিছু পানি আছে। বললেন নিয়ে এসো। আমি পাত্রটি নিয়ে এলাম। তিনি বললেন এর থেকে কিছু পানি নিয়ে তোমরা সবাই অজু কর। অজুর পর সেই পাত্রে এক ঢোক মত পানি থাকলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: আবু কাতাদাহ তুমি এ পানিটুকু হিফাজতে রেখে দাও। খুব শিগগিরই এর একটি খবর হবে। আস্তে আস্তে দুপুরের প্রচন্ড গরম শুরু হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সঙ্গীদের সামনে উপস্থিত হলেন। তারা সাবই বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ। পিপাসায় তো আমাদের জীবন যায় যায় অবস্থা। তিনি বললেন না, তোমরা মরবে না। এই বলে তিনি আবু কাতাদাহকে ডেকে পানির পাত্রটি নিয়ে আসতে বললেন। আবু কাতাদাহ বলেনঃ আমি পাত্রটি নিয়ে এলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমার পিয়ালাটি নিয়ে এসো। পিয়ালা আনা হলো। পানের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারপাশে ভীড় জমে গেল। দারুন হুড়াহুড়ি পড়ে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা ভদ্রভাবে শান্ত থাক, সবাই পান করতে পারবে। আবু কাতাদাহ বলেনঃ একমাত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আমি ছাড়া সকলের পান শেষ হলে তিনি বললেনঃ আবু কাতাদাহ, এবার তুমি পান কর। আমি বললাম! আপনি আগে পান করুন। অতঃপর আমি পান করলাম এবং সবার শেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পান করলেন। সবার পান করার পরেও পাত্রে ঠিক যতটুকু পানি ছিল তাই থেকে গেল। বর্ণনাকারী বলেনঃ সে দিন তিন শো লোক ছিল। অন্য একটি বর্ণনা মতে, লোক সংখ্যা ছিল সাতশো। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৬২০,৬২১)
তিনি স্বভাবগতভাবেই ছিলেন কোমল। জীবের প্রতি ছিল তার দারুন দয়া। একবার ছেলের বাড়ীতে গেলেন। ছেলের বউ অজুর জন্য পানি রেখেছিলেন। একটি বিড়াল তাতে মুখ দিয়ে পানি পান করতে শুরু করলো। হযরত কাতাদাহ (রা) বিড়ালটি না তাড়িয়ে পাত্রটি তার দিকে আরো একটু কাত করে দিলেন,যাতে সে ভালো করে পান করতে পারে। পাশে দাঁড়িয়ে ছেলের বউ এ দৃশ্য দেখছিল। তিনি ছেলে-বউকে বললেনঃ এতে অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বিড়ালের এঁটে না পাক নয়। কারণ, এরা ঘরের মধ্যে বিচরণকারী জীব। (মুসনাদ-৫/৩০৩)
শিকার করা চিল তাঁর বিশেষ শখ। একবার হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যাচ্ছিলেন। পথে যাত্রা বিরতিকালে কয়েকজন সংগী নিয়ে শিকারে বেরিয়ে পড়লেন। স্থানটি ছিল পাহাড়ী এলাকা। খুব দ্রুত পাহাড়ে উঠার অভ্যাস ছিল তাঁর। তিনি সংগীদের নিয়ে পাহাড়ের ওপর উঠে গেলেন। সেখানে একটি জন্তু দেখতে পেলেন। আবু কাতাদাহ একটু এগিয়ে গিয়ে ভালো করে দেখে সংগীদের জিজ্ঞেস করলেন তোমরা বলতো এটা কী জন্তু? তাঁরা বললেনঃ আমরা তো ঠিক বলতে পারছিনা। তিনি বললেনঃ এটা একটা বন্য গাধা। আবু কাতাদাহ পাহাড়ে উঠার সময় তাঁর চাবুকটি ভুলে রেখে গিয়েছিলেন। তিনি সংগীদের চাবুকটি নিয়ে আসতে বললেন। তাঁরা ছিলেন ইহরাম অবস্থায়। একারণে তাঁরা শিকারে কোন রকম সহযোগিতা করলেন না। শেষে তিনি নিজেই বর্শা নিয়ে জন্তুটির পিছু ধাওয়া করে হত্যা করেন। তারপর সেটি ওঠানোর জন্য সংগীদের সাহায্য চান; কেউ তাঁকে সাহায্য করলেন না। অবশেষে তিনি এটাই সেটা উঠিয়ে আনেন এবং গোশত তৈরী করে রান্না করেন। কিন্তু সংগীরা খেতে দ্বিধাবোধ করেন। কেউ কেউ সেই গোশত খেলেন, আবার অনেকে খেতে অস্বীকৃতি জানালেন। আবু কাতাদাহ বললেন, আচ্ছা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জিজ্ঞেস করে কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমাদেরকে বলছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে দেখা করে ঘটনাটি খুলে বললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুনে বললেন ওটা খেতে অসুবিধা কী? ওটা তো আল্লাহ তোমাদের জন্য পাঠিয়েছেন। যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে তাহলে আমার জন্য কিছু নিয়ে এসো। গোশত সামনে আনা হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের বললেন ঃ তোমরাও খাও। (ফাতাহুল বারী-৯/৫২৮)
তিনি ছিলেন অত্যন্ত মিশুক প্রকৃতির। একারণে তাঁর বন্ধুদের একটা দল ছিল। হুদাইবিয়ার সফরে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংগী ছিলেন। তিনি ইয়ার-বন্ধুদের সাথে হাসি-তামাসা ও কৌতুক করতে করতে পথ চলছিলেন। আবু মুহাম্মদও ছিলেন তাঁর বান্ধব মজলিসের একজন সদস্য। (মুসনাদে-৫/২৯৫; ৩০১)
হযরত আবি কাতাদাহ (রা) একবার একটি আদনী (আদনে তৈরী) চাদর গায়ে জড়িয়ে হযরত মুয়াবিয়ার (রা) দরবারে যান। তখন সেখানে আবদুল্লাহ ইবন মাসয়াদাহ বসা ছিলেন। ঘটনাক্রমে আবু কাতাদাহ গায়ের চাদরটি আবদুল্লাহর গায়ে খসে পড়ে। অত্যন্ত রাগের সাথে আবদুল্লাহ সেটি ছুঁেড় ফেলে দেন। আবু কাতাদাহ প্রশ্ন করেন আমীরুল মুমিনীন। লোকটি কে? বললেন আবদুল্লাহ ইবনে মাসয়াদাহ। আবু কাতাদাহ বলেন : আল্লাহর কসম! আমি তার পিতার বুক বর্শা দিয়ে প্রতিরোধ করেছি – যে দিন সে মদীনার উপকণ্ঠে আক্রমণ করেছিল। একথা শুনে আব্দুল্লাহ চুপ থাকে। (আনাবুল আশরাফ- ১/৩৪৯) উল্লেখ্য যে, আবু কাতাদাহ জীকারাদ অভিযানের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। সেই গাতফানী লুটোরাজদের মধ্যে এই আবদুল্লাহর পিতাও ছিল।
