প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১৬, রমাদান-শাওয়াল ১৪৩৭ হিজরী, আষাঢ়-শ্রাবন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

২০. শহীদের রক্তের চেয়ে জ্ঞানীর কালি উত্তম

ইলমের ফযীলতে বানানো একটি জাল হাদীস:
“শহীদের রক্তের চেয়ে জ্ঞানীর কালি উত্তম।” সাখাবী, যারকানী, মোল্লা আলী কারী প্রমুখ মুহাদ্দিস জানিয়েছেন যে, কথাটি খুব সুন্দর শোনালেও তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা নয়। যারকাশী বলেছেন : বাক্যটি আসলে তাবিয়ী হাসান বসরীর (রাহ) উক্তি। (সাখাবী, আল-মাকাসিদ, ৩হ৭৭ পৃ: যারকানী, মুখতাসারুল মাকাসিদ ১৭২ পৃ:, মোল্লা কারী, আল আসরার, ২০৭ পৃ, আল-মাস্নূয়, ২৫৫ পৃ, শাওকানী, আল-ফাওয়াইদ ২/৩৬৯)
“আমার উম্মতের আলিমগণ বনী ইসরাঈলের নবীগণের মত।”

মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এ বাক্যটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা নয়, বরং তাঁর নামে প্রচলিত একটি ভিত্তিহীন, সনদহীন মিথ্যা, বানোয়াট ও জাল কথা। (সাখাবী, আল-মাকাসিদ, ২৯৩ পৃ; মোল্লা কারী, আল আসবার, ১৫৯ পৃ, আল-মাসনূ ১৯৬ পৃ; যারকানী, মুখতাসারুল মাকাসিদ ৬৫২ পৃ, শাওকানী, আল-ফাওয়াইদ ২/৩৬৮) অনেক ওয়ায়িয এ মিথ্যা হাদীসকে কেন্দ্র করে বানোয়াট গল্প বলেন যে, মূসা (আ)- এর সাথে নাকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল! নাঊযূ বিল্লাহ্! কি জঘন্য বানোয়াট কথা!!
এখানে উল্লেখ্য যে, আলিমদের ফযীলতে বর্ণিত একটি হাসান হাদীস :
“আলিমগণ নবীদের উত্তরাধিকারী।”
তিরমিযী, আবূ দাউদ, ইবনু মাজাহ প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীসটি সংকলন করেছেন্ আমাদের উচিত বানোয়াট কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে বলে গোনাহগার না হয়ে এ সকল গ্রহনযোগ্য হাদীস আলোচনা করা।

২২. আলিমের চেহারার দিকে তাকানো

আলিমদের ফযীলতে বানানো অন্য একটি জাল হাদীস :
“আলিমের চেহারার দিকে তাকানো আল্লাহর কাছে ৬০ বছরের সিয়াম (রোযা) ও কিয়াম (তাহাজ্জুদের) ইবাদতের চেয়ে অধিক প্রিয়।”
অন্য জাল হাদীসে বলা হয়েছে:
“আলিমের চেহারার দিকে তাকানো একটি এবাদত।”
এ দুটি বাক্যের কোনটিই হাদীস নয়। মুহাদ্দিসগণ বাক্য দুটিকে মিথ্যা বা বানোয়াট হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। (সাখাবী, আল-মাকাসিদ, ৪৪২ পৃ, মোল্লা কারী, আল আসরার, ২৫৩ পৃ, যারকানী, মুখতাসারুল মাকাসিদ ১৯৬ পৃ।)

২৩ আলিমের ঘুম ইবাদত

এ ধরনের আরেকটি জাল হাদীস:
“আলিমের ঘুম ইবাদত।” মোল্লা আলী কারী বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা (মারফূ হাদীস) হিসেবে এ বাক্যটির কোন অস্তিত্ব নেই।” (মোল্লা আলী কারী, আল আসরারু, ২৫৫ পৃ)

২৪. মুর্খের ইবাদতের চেয়ে আলিমের ঘুম উত্তম

অনুরূপ আরেকটি ভিত্তিহীন জাল কথা:
“মূর্খের ইবাদতের চেয়ে আলিমের ঘুম উত্তম।”
দুটি বাক্যই জাল। সহীহ্, যয়ীফ বা মাউযূ কোনো সনদেরই এ কথা দুটির কোনো অস্তিত্ব নেই। তবে কাছাকাছি অর্থে একটি যয়ীফ হাদীস আছে :
“ইলম-সহ নিদ্রা যাওয়া মুর্খতা-সহ সালাত আদায় করা থেকে উত্তম। (আবূ নুয়াইম ইসপাহানী, হিলইয়াতুল আউলিয়া ৪/৩৮৫; মোল্লা আলী কারী, আল-আসরার, পৃ. ২৫৫; আলবানী, যায়ীফুল জামি, পৃ. ৮৬১)

২৫. আলিমের সাহচর্য হাজার রাকআত সালাতের চেয়ে উত্তম

এ বিষয়ে অন্য একটি বানোয়াট হাদীস :
“একজন আলিমের মাজলিসে উপস্থিত হওয়া এক হাজার রাকআত নামায পড়ার চেয়ে উত্তম।”
মুহাদ্দিসগণ বাক্যটিকে মিথ্যা হাদীস বলে গণ্য করেছেন। (মোল্লা কারী, আল আসরার, পৃ. ১১৩; আল-মাসনূ, পৃ. ৬৫; শাওকানী, আল-ফাওয়াইদ ২/৩৬৬) এ জাল হাদীসটির উপর ভিত্তি করে পরবর্তীকালে আরেকটি কথা তৈরি করা হয়েছে: ওলীদের সাহচর্যে এক মুহূর্ত থাকা একশত বৎসর রিয়াহীন নামায পড়ার চেয়েও উত্তম।” সৎ ও নেককার মানুষদের সাহচর্যে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু সাহচর্যের এ ফযীলত বানোয়াট।

২৬. আসরের পরে লেখাপড়া না করা

আমাদের দেশে অনেক আলিম ও তালিবুল ইলমদের মধ্যে প্রচলিত আছে যে, আসরের পরে লেখাপড়া করলে চোখের ক্ষতি হয়। একটি বানোয়াাট হাদীস থেকে ধারণাটির উৎপত্তি। উক্ত বানোয়াট হাদীসে বলা হয়েছে :
“যে ব্যক্তি তার চক্ষুদ্বয়কে ভালবাসে সে যেন আসরের পরে না লেখে।”
কথাটি হাদীস নয়। এর কোন ভিত্তি নেই। কম আলোতে, অন্ধকারে বা আলো-আঁধারিতে লেখাপড়া করলে চোখের ক্ষতি হতে পারে। ডাক্তারগণ এ বিষয়ে অনেক কিছু বলতে পারেন। কিন্তু এ বিষয়ে কোন হাদীস নেই। (সাখাবী, আল-মাকাসিদ, পৃ: ৩৯৭; মোল্লা কারী, আল-আসরার, পৃ: ২১৬; আল-মাসনূ, পৃ: ১৪১; যারকানী, মুখতাসারুল মাকাসিদ, পৃ: ১৭৮)

২৭. চীনদেশে হলেও জ্ঞান সন্ধান কর

আমাদের দেশের বহুল পরিচিত একটি কথা:
“চীনদেশে হলেও জ্ঞান সন্ধান কর।”
অধিকাংশ মুহাদ্দিস একে জাল হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ একে অত্যন্ত দুর্বল হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। সনদ বিচারে দেখা যায় দুজন অত্যন্ত দুর্বল রাবী, যারা মিথ্যা হাদীস বর্ণনা করতেন শুধুমাত্র হাদীসটিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা হিসাবে প্রকার করেছেন। (ইবনু আদী, আল-কামিল ১/২৯২, ইবনুল জাওযী, আল-মাউযূআত ১/১৫৪, সাখাবী, আল-মাকাসিদ, পৃ: ৮৩, নং ১২৫, সুয়ূতী, আল-লাআলী ১/১৯৩, যারকানী, মুখতাসারুল মাকাসিদ, পৃ ৬১, নং ১০৯, আলবানী, সিলসিলাতুল যায়ীফা ১/৬০০, নং ৪১৬, ইবনু র্আরাক, তানযীহুশ শারীয়াহ ১/২৫৮)

২৮. রাতের কিছু সময় ইলম চর্চা সারা রাত ইবাদতের চেয়ে উত্তম

একজন লেখক বলেন: “বোখারী শরীফের আরও একটি হাদীসে আছে;
অর্থাৎ: হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, রাত্রির এক ঘণ্টা পরিমাণ (দ্বীনী) ইলেম শিক্ষা করা সমস্ত রাত্রি জাগরিত থাকিয়া ইবাদত করার চেয়েও ভাল।” (মো. গোলাম রহমান, মকছুদোল মোমেনীন, পৃ. ২৫)
এ কথাটি সহীহ বুখারী তো দূরের কথা অন্য কোনো হাদীস গ্রন্থেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী হিসাবে সংকলিত হয়নি। সুনান দারিমীতে অত্যন্ত দুর্বল সনদে ইবনু আব্বাসের (রা) বাণী হিসাবে কথাটি সংকলিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে এ অর্থে যা কিছু বলা হয়েছে সবই জাল ও বানোয়াট। (দারিমী, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্দুর রাহমান (২৫৫ হি), আস-সুনান ১/৯৪, ১৫৭; সিদ্দীক হাসান কান্নুজী (১৩০৭ হি), আবজাদুল উলূম ১/৯৭; ইবনু র্আরাক, তানযীহ ১/২৭৮)

২৯. ইলম, আমল ও ইখলাসের ফযীলত

ইলম, আমল ও ইখলাসের গুরুত্ব সম্পর্কে কুরআন-হাদীসে অনেক নির্দেশনা রয়েছে। পাশাপাশি কিছু জাল হাদীস সমাজে প্রচলিত। যেমন:
“সকল মানুষ মৃত/ধ্বংসের মধ্যে নিপতিত, শুধু আলিমগণ ছাড়া। আলিমতগণ সকলেই ধ্বংসপ্রাপ্ত শুধু আমলকারীগণ ছাড়া। আমলকারীগণ সকলেই ধ্বংসপ্রাপ্ত/ডুবন্ত শুধু মুখলিসগণ কঠিন ভয়ের মধ্যে।”
মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এ কথাগুলো জাল। কোনো সহীহ, যয়ীফ বা মাউযূ সনদেও তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়নি। দরবেশ হূত বলেন: “সামারকানদী তার তানবীহুল গাফিলীন পুস্তকে এ হাদীসটি উল্লেখ করেছে। আর ওয়াযিযগণ তা নিয়ে মাতামাতি করেন। এ পুস্তকটিতে অনেক মিথ্যা ও মাউযূ হাদীস রয়েছে। এজন্য পুস্তকটির উপর নির্ভর করা যায় না। (দরবেশ হূত, আসনাল মাতালিব, পৃ ২৪৬। আরো দেখুন: সাগানী, আল-মাউদূআত, পৃ. ৩৮, আজলূনী, কাশফুল খাফা ২/৪১৫; আলবানী, যায়ীফাহ ১/১৭৪)