প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১০ম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৬, জমা.সানী-রজব ১৪৩৭ হিজরী, চৈত্র-বৈশাখ ১৪২২ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

হালাল রুজি উপার্জন করা দ্বিতীয় পর্যায়ের ফরয

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণিত হাদীসে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : হালাল রুজি উপার্জন করা দ্বীনের মৌলিক ফরযসমূহের পর দ্বিতীয় পর্যায়ের ফরয। (কানযুল উম্মাল: খন্ড৪, পৃা ১৬ হাদীস নং ৯২৩১; কাশফুল খাফা: খন্ড২, পৃা ৪৬, হাদীস নং ১৬৭১; সুনানে বায়হাকী : খন্ড২, পৃা ২৪, হাদীস নং ২০৩০; আল্লামা সুয়ুতী কৃত আল-জামিউল কাবীর: খন্ড ১, পৃা ১৪০৮৫, হাদীস নং৩৫; জামিউল আহদীস: খন্ড ১৪, পৃা ১২৮, হাদীস নং ১৩৯৩৭; মিশকাতুল মাসাবীহ: খন্ড ২, পৃা ১২৯ হাদীস নং ২৭৮১; শুআবুল ঈমান: খন্ড ৬, পৃা ৪২১ হাদীস নং৮৭৪১)
যদিও সনদ (বর্ণনার সূত্র) হিসেবে মুহাদ্দিসগণ এ হাদীসটিকে দুর্বল বলেছেন। কিন্তু ওলামায়ে কেরাম অর্থগত দিক থেকে এটাকে গ্রহণ করেছেন এবং এ কথায় ঐক্যমত্য পোষণ করেছে যে, অর্থগত দিক থেকে এ হাদীস বিশুদ্ধ।
এ হাদীসে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহা মূল্যবান কথা বলেছেন। দ্বীনের প্রারম্ভিক ফরযগুলো, যা ইসলামের রোকন নামে পরিচিত সবাই জানে। যেমন নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এই মৌলিক ফরযগুলোর পর দ্বিতীয় পর্যায়ের ফরয হল, হালাল রুজি উপার্জন এবং হালাল রুজি উপার্জনের চেষ্টা করা। রাসূলের এ বাণীটি একেবারে ছোট কিন্তু এর মাঝে অনেক জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে। মানুষ যদি এ হাদীসটি নিয়ে চিন্তা করে তাহলে দ্বীনের বুঝ অর্জনে অনেক সহায়ক হবে।

হালাল রুজি উপার্জন করা দ্বীনেরই অংশ

এ হাদীস থেকে প্রথমত একটি বিষয় বুঝে আসে যে, আমরা সবাই হালাল রুজি উপার্জনে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করি- ব্যবসা হোক, কৃষিকাজ হোক, চাকরি হোক, মজদুরী হোক এসব কাজ দ্বীনের বাইরে নয় বরং এসব কাজ দ্বীনের অংশ। আর ওই কাজ শুধু জায়েয ও বৈধই নয় বরং এ কাজকে ফরয করা হয়েছে। নামায, রোযা ফরয হওয়ার পর এটাকেও ফরয করা হয়েছে। অতএব যদি কেউ এ কাজ না করে, হালাল রুজি উপার্জন না করে হাত-পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকে, তাহলে সে ফরয ছেড়ে দেবার জন্য গোনাহগার হবে। কারণ সে একটি ফরয কাজ ছেড়ে দিল। শরীয়াতের দাবি হল, মানুষ বেকার বসে থাকবে না আর কারো কাছে হাত পাতবে না। আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে হাত পাতবে না। আর এসব কাজ থেকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন। মানুষ নিজের শক্তি- সামর্থ্য অনুযায়ী হালাল রুজি সন্ধান করবে। যার হক আমাদের জন্য পালন করা ওয়াজিব করে দিয়েছেন যেমন আমাদের শরীর, অন্তর ও পরিবারেরও কিছু হক রয়েছে। আর এ হকগুলো হালাল রুজি ছাড়া আদায় হবে না। এজন্য এ হকগুলো আদায় করতে হালাল রুজি উপার্জন করা খুবই জরুরি।

ইসলামে বৈরাগ্যবাদের অস্তিত্ব নেই

এ হাদীসের মাধ্যমে ইসলাম বৈরাগ্যতার শিকড় কেটে দিয়েছে। খ্রিস্টান ধর্মে বৈরাগ্যতার বিধান এভাবে গ্রহণ করা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করার নিয়ম হল, মানুষ তার কাজ কারবার সব ছেড়ে দেবে, জৈবিক চাহিদা ধবংস করে দেবে এবং জঙ্গলে বসে আল্লাহ আল্লাহ করবে। এছাড়া আল্লাহকে রাজি করার ও তাঁর নৈকট্য লাভের কোন পথ নেই। কিন্তু আল্লাহ বলেন, আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার মধ্যে জৈবিক চাহিদা রেখেছি। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, দিয়েছি। শরীর ঢাকা জন্য কাপড়রও প্রয়োজন আছে। মাথা গোঁজার জন্য বাসস্থানের প্রয়োজন আছে। এসব চাহিদা তার মধ্যে আমি সৃষ্টি করেছি। তবে তাদের কাছে আমাদের দাবি হল, তারা তাদের চাহিদাও পূরণ কবে, সাথে সাথে আমি আল্লাহর হকও আদায় করবে, তবেই সে পরিপূর্ণ মানুষ হতে পারবে আর যদি হাতে হাত রেখে বসে থাকে, তাহলে যতই যিকির ও অযিফার লিপ্ত থাকুক না কেন আমাদের মতে আল্লাহর নৈকট্য ও গ্রহণীয়তা অর্জন করতে পারবে না।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হালাল রুজি উপার্জন পদ্ধতি

দেখুন, যত আম্বিয়ায়ে কেরাম এ দুনিয়ায় আগমন করেছেন, প্রত্যেকেই হালাল রুজি অর্জনে চেষ্টা- প্রচেষ্টা করেছেন। আল্লাহ প্রত্যেকেরই দ্বারা হালাল রুজির কাজ নিয়েছেন। কোন নবী মজদুরী করেছেন, কোন নবী কাঠমিস্ত্রীর কাজ করেছেন, কোন নবী বকরি চরিয়েছেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও পারিশ্রমিক নিয়ে মক্কায় পাহাড়ে বকরি চরিয়েছেন। (সহীহ বুখারী : হাদীস নং ২১০২দ সহীহ মুসলীম: হাদীস নং ৩৮২২; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস নং ২১৪০; মুসনাদে আহমদ: হাদীস নং ১১৪৮২;দ সুনানে দারেমী: হাদীস নং ১৩)
পরবর্তীতে বলতেন, আমার স্মরণ হয় যে, আজইয়াদ পাহাড়ে মানুষের বকরি চরাতেন। মোটকথা রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বকরি চরিয়েছেন, ব্যবসা করেছেন, মজদুরী করেছেন, ব্যবসার উদ্দেশ্যে হযরত খাদীজার মাল নিয়ে দুইবার সিরিয়া সফর করেছেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার পাশে জারাফ নামক স্থানে কৃষি কাজ করেছেন। সুতরাং হালাল সব পন্থায় রুজি উপার্জন নবীর অংশগ্রহণ ও এটি তাঁর সুন্নাত। যদি কেউ চাকরিতে থাকে, তাহলে এ নিয়ত করবে আমি নবীর সুন্নাতের অনুকরণে এ চাকরি করছি। যদি কেউ ব্যবসা করে, তাহলে এ নিয়ত করবে আমি নবীর সুন্নাতের অনুসরণে এ ব্যবসা করছি। আর যদি কেউ কৃষিকাজ করে, তাহলে এ নিয়ত করবে আমি নবীর অনুকরণে কৃষিকাজ করছি, তাহলে এভাবে এসব কাজ দ্বীনের অংশ গণ্য হবে।

মুমিনের দুনিয়াও দ্বীনের অংশ

এ হাদীসে একটি ভুল সংশোধন করে দিয়েছে যে, দ্বীন হল পৃথক একটি বস্তু। আর দুনিয়া হল অন্য আরেকটি বস্তুর নাম। বাস্তব কথা হল, যদি মানুষ গভীরভাবে দেখে তাহলে বুঝবে একজন মুমিনের দুনিয়াও দ্বীন। রুজি অর্জনের চেষ্টা ও চিন্তা যা মানুষ দুনিয়ার কাজ মনে করে এটাও মূলত দ্বীনেরই অংশ; যদি সহীহ তরিকায় হয় ও নবীর শিক্ষার অনুকরণে হয়।
এর দ্বারা একথা বুঝে আসল যে, হালাল রুজি উপার্জন করাও দ্বীনের অংশ। একথা যদি হৃদয়ঙ্গম হয়, তাহলে বহু গোমরাহীর রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে।

কতিপয় সুফীবাদ তাওয়াক্কুল করে বসে থাকা

কতিপয় সুফীদের ব্যাপারে বলা হয় যে, তাদের কর্মপন্থা হলো, তারা কোন কাজকর্ম করে না, রুজি-রোজগারের ব্যবস্থাও নেয় না বরং তাওয়াক্কুলের জীবন পার করে দেয়। আপন জায়গায় বসে থাকে। আল্লাহ গায়েব থেকে যা পাঠায় তার উপর সন্তুষ্টি ও শুকরিয়া আদায় করে। আর যদি গায়েব থেকে না আসে তখন ধৈর্য ধারণ করে। এ ব্যাপারে বুঝতে হবে তাদের দুই অবস্থা-

এক : হয়ত এমন সুফী হবে যারা দুনিয়ার অবস্থার ঊর্ধ্বে, দুনিয়ার কোন খবরই রাখেন না, সাধারণ জীবনে নেই। যখন মানুষের হুঁশ, অনুভুতি থাকে না তাদের উপর শরীয়তের বিধান বর্তায় না। এ কারণে যদি তাদের এমন জীবন হয়, তাহলে তাদের ক্ষেত্রে এটা স্বতন্ত্র ব্যাপার। সব মুসলমাদের জন্য এ বিধান প্রযোজ্য নয়।

দুই : অথবা তাদের তাওয়াক্কুল এত শক্তিশালী ও পরিপূর্ণ যে, মাসের পর মাসও যদি না খেয়ে থাকতে হয়, তাতে রাজি; কোন চিন্তা নেই। কারো কাছে হাত পাতবে না। অন্য কারো কাছে ক্ষুধার কথা বলবে না। এসব সুফীগণ অত্যন্ত আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী, উঁচু মানের অলীর স্থানে। যিকির ও অযিফাতেই তারা ব্যস্ত ও সন্তুষ্ট। এর মাঝে ক্ষুধার চাহিদা চলে আসলেও এটাকে তারা কিছুই মনে করেন না। অন্যের হক তাদের উপর সম্পৃক্ত নয়, পরিবার-পরিজন কিছুই তারা রাখেন না যে, অন্যের হক আদায় করতে হবে। অতএব, এ ধরনের সুফীদেরও স্বতন্ত্র অবস্থা এবং তাদের বিশেষ কর্মপদ্ধতি যা আমাদের মত সাধারণ দুর্বলদের অনুসরণযোগ্য নয়। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য সুন্নাতের যে পন্থা বলেছেন, এটাই অনুকরণযোগ্য। আর তাহল অন্যান্য ফরযসমূহের পর দ্বিতীয় পর্যায়ের ফরয হল, হালাল রুজি উপার্জন করা।

চেষ্টা থাকবে কেবল হালাল উপার্জনের

দ্বিতীয় কথা হল, বৈধভাবে রুজি উপার্জন করা ফরয। টাকা-পয়সা, ভাত কাপড় তো আসল উদ্দেশ্যে নয়। এ নিয়ত যেন না থাকে, যে কোন উপায়ে হোক টাকা-পয়সা যোগাতে হবে। চাই বৈধ হোক অথবা অবৈধ হোক, হালাল তরিকায় হোক বা হারাম তরিকায় হোক। এভাবে হলে এটা হালাল উপার্জন হবে না, যার ফযীলত হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে, যা ফরয বলা হয়েছে।
কেননা মুমিনের এ কাজ তখনই দ্বীন হবে যখন ইসলামী শিক্ষা মোতাবেক হবে। যদি হালাল- হারামের পার্থক্য না থাকে, জায়েয নাজায়েযের প্রশ্নই না থাকে, তবে একজন মুসলমান ও কাফেরের রুজি উপার্জনের ব্যবধান থাকবে না। আল্লাহর দেয়া সীমারেখা খেয়াল রেখে রুজি উপার্জন করলে তা বৈধ হবে। এক একটি পয়সার ব্যাপারেও চিন্তা করতে হবে হালালভাবে আসল না কি হারাম পন্থায় আসল। আল্লাহর সন্তুষ্টিতে আসল না এর বিপরীত আসল। যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির বিপরীত আসে তাহলে এটাকে জাহান্নামের আগুন মনে করে বর্জন করতে হবে। খুবই খারাপ সম্পদ এটি। হারামের টাকায় লাথি মারবে, কোনভাবেই এ হারামকে নিজের জীবনের অংশ বানাবে না।

পরিশ্রমের সব উপার্জনই হালাল নয়

কতিপয় মানুষ এমন জীবনোপকরণ গ্রহণ করছে যা হারাম। শরীয়ত যাকে অনুমতি দেয় না। যেমন সুদকে জীবনোপকরণ হিসেবে গ্রহণ করছে। যদি তাদের বলা হয়, এটাতো নাজায়েয ও হারাম, এভাবে উপার্জন করা ঠিক নয়। তারা বলে আমারা তো কষ্ট করেই খাচ্ছি, শ্রম দিচ্ছি, সময় ব্যয় করছি, তারপরও যদি হারাম ও নাজায়েয হয়, তাহলে করার কিছুই নেই। ভালভাবে বুঝে নিন, সব ধরনের পরিশ্রম আল্লাহর কাছে জায়েয নয়। আল্লাহর প্রদর্শিত নিয়ম অনুযায়ী হলে সেই পরিশ্রম জায়েয হবে। যদি আল্লাহর তরিকা ছাড়া মানুষ হাজারও পরিশ্রম করে, এর মাধ্যমে পয়সা উপার্জন করে তা হালাল হবে না, উপার্জন হালাল হওয়া উচিত। উপার্জনের হারাম মাধ্যমগুলোকে একথা বলে হালাল করার চেষ্টা করা যে,আমরা তো পরিশ্রম করে উপার্জন করছি, এহেন অবৈধ কর্মের বৈধতা দানের কোন সুযোগ শরীয়াতে নেই। উপার্জনের মাধ্যম্যে উপায়গুলো বৈধ হতে হবে।

এই রুজি হালাল না হারাম ?

যখন উপার্জনের কোন মাধ্যম হাতে আসে তখন দেখতে হবে এটা জায়েয কি না, শরীয়াত এটাকে হালাল করেছে , না হারাম করেছে? শরীয়াত যদি হারাম বলে থাকে তাহলে উপার্জনের এ মাধ্যম থেকে যতই লাভ আসুক, যতই টাকা-পয়সা আসুক এটাকে বর্জন করবে এবং ওই মাধ্যম গ্রহণ করবে, যাতে আল্লাহ রাজি হয়; চাইএর মাঝে লাভ ও উপার্জন কম হোক।

ব্যাংকের চাকরিজীবি কী করবে ?

অনেক লোক ব্যাংকে চাকরি করে আর ব্যাংকে রয়েছে সুদের বহু কারবার। ব্যাংকের চাকরিজীবি যদি সুদে সাহায্যকারী হয়, তাহলে এ চাকরি নাজায়েয ও হারাম। ওলামায়ে কেরাম বলেন, যদি কেউ ব্যাংকের চাকরিজীবি হওয়ার পর বুঝতে পারে যে, আমার এ চাকরি করা ঠিক নয় এবং ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দেয়ার চিন্তা ভাবনা হয়, তাহলে তার উচিত বৈধ কোন উপার্জনের উপায় খুঁজে নেয়া; যখন বৈধ উপায় হয়ে যাবে তখন ওই সুদযুক্ত চাকরি ছেড়ে দেবে। কিন্তু বৈধ উপায় এমনভাবে তালাশ করবে যেমন জীবিকাহীন ব্যক্তি তার জীবিকা তালাশ করে। এমন যেন না হয় যে, নিশ্চিন্তায় ব্যাংকের এ চাকরিতে লিপ্ত রয়েছে আর মনে মনে শুধু এতটুকুই ভাবছে যে, যখন অন্য কোন চাকরি পাব তখন এটা ছেড়ে দেব। বরং এমন আগ্রহী হয়ে তালাশ করবে যেমন কোন চাকরি না থাকে তখন তালাশ করে। আর যখন অন্য চাকরি পাবে, তখন সুদের চাকরি বর্জন করে ওই চাকরি গ্রহণ করবে। যদিও বেতন কম হয়।

হালাল রুজির বরকত!

আল্লাহ তায়ালা হালাল রুজিতে যে বরকত রেখেছেন তা হারামের মধ্যে রাখেননি। হালালের অল্প পয়সায় যে উপকার অর্জিত হয়, হারামের বহু অঙ্কের টাকায় সে উপকার হয় না। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযু করে এ দুআ পড়তেন : হে আল্লাহ! আমার গোনাহ মাফ করে দাও, আমার ঘরে প্রশস্ততা দান কর এবং আমার রিযিকে বরকত দাও। (সুনানে তিরমিযী : হাদীস নং ৩৪২২; মুসনাদে আহমদ; হাদীস নং ১৬০০৪)
আজকাল মানুষ বরকতের মূল্য বুঝে না। শুধু টাকা-পয়সার গণনাই জানে। ব্যাংকে অনেক টাকা দেখেই খুশি হয়ে যায়। টাকার এমাউন্ট অনেক কিন্তু এ টাকার দ্বারা কি উপকার পেলাম, কতটুকু শান্তি হল, কতটুকু নিরাপত্তা হল? এ হিসাব করে না। লক্ষ টাকা আছে কিন্তু শান্তি নেই, নিরাপত্তা নেই, তাহলে এ লক্ষ কোটি টাকা কিসের জন্য? আর যদি টাকা-পয়সা হলো খুবই নগণ্য ব্যাপার কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে শান্তি ও নিরাপত্তায় রেখেছেন তাহলে মূলত এটাই বরকত।

বরকত কেনার জিনিস নয়

আর বরকত এমন জিনিস, যা বাজােের থেকে খরিদ করে আনা যায় না। লক্ষ কোটি টাকা খরচ করেও অর্জন করা যায় না; বরং এটা আল্লাহর দান। আল্লাহ যাকে দান করেন তারই ভাগ্যে এ নেয়ামত নসীব হয়। অন্য কারো নসীব হয় না। আর এ বরকত হালাল রিযিকের মাধ্যমে হয়, হারাম মালে এ বরকত আসে না; হারাম মাল যত বেশিই হোক।
অতএব মানুষ যা উপার্জন করে তা নিয়ে চিন্তা করবে যে, পরিবার-পরিজনের মুখে যে লোকমা যাচ্ছে, আমার হাতে টাকা-পয়সা যা আসছে-এগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী কিনা, শরীয়াতের বিধান অনুযায়ী কিনা? এ বিবেচনা প্রত্যেকেই নিজের মধ্যে সৃষ্টি করবে।

বেতনের এ অংশটুকু হারামের অন্তর্ভূক্ত

কিছু কিছু হারাম মাল এমন আছে যা সবাই জানে। যেমন সুদ হারাম, ঘুষ হারাম ইত্যাদি সবার জানা। কিন্তু আমাদের জীবনে এছাড়া অনেক উপার্জন এমনভাবে আসে যার সম্পর্কে হারাম হওয়ার কল্পনাও করি না। যেমন আপনি কোথাও বৈধ ও শরীয়তসম্মত চাকরি করেন। কিন্তু যে পরিমাণ সময় চাকরির সিদ্ধান্ত হয়েছে ওই সময় আপনি ত্র“টি করছেন, পূর্ণ সময় ব্যয় করছেন না। যেমন এক ব্যক্তির আট ঘণ্টা ডিউটি। সে এর মধ্যে এক ঘণ্টা সময় চুরি করে অন্য কাজে নষ্ট করে। এর ফলে মাস শেষে সে যে বেতন পাবে তার আট ভাগের এক ভাগ হারাম হয়ে গেল। ওই আট ভাগের এক ভাগ হালাল রিযিক হল না; বরং হারাম হল। কিন্তু আমাদের এ অনুভুতি হয় না যে, হারাম মাল আমাদের উপার্জনের সাথে মিলে যাচ্ছে।

থানা ভবন মাদরাসা শিক্ষকদের বেতন কর্তন করিয়ে নেয়া

হাকীমূল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) এর খানকায়ে অবস্থিত যে মাদরাসা ছিল, ওই মাদরাসার সব উস্তাদ এবং কর্মচারীদের কাছে একটি করে ডায়েরী রাখা হত। উদাহরণস্বরূপ একজন শিক্ষক তার ৬ ঘণ্টা পড়ানোর দায়িত্ব। কিন্তু সবক পড়ানোর সময় মেহমান আসলে তাকে সময় দিলে ডায়েরীতে মেহমান আসা ও যাওয়ার সময় নোট করে রাখা হত। এভাবে পূর্ণ মাস লেখা হত। মাস শেষে বেতন নেয়ার সময় হলে উস্তাদ দফতরে এ বলে দরখাস্ত জমা করতেন যে, এ মাসে মেহমানদের সঙ্গে আমার এ পরিমাণ সময় ব্যয় হয়েছে। অতএব ওই পরিমাণ বেতন কম করে দেয়া হোক। এভাবে প্রত্যেক উস্তাদ ও কর্মচারী দরখাস্ত দিয়ে বেতন কর্তন করাতেন। শুধু মেহমান নিয়ে কথা নয় বরং মাদরাসার সময় ব্যক্তিগত কাজে ব্যয় করলে নোট করে বেতন কর্তন করাতেন। কারণ এ সময় তো মাদরাসাকে দেয়া। এ সময় তো আমার নয়। যে প্রতিানে আপনি চাকরি করনে সময় ওই প্রতিানের মালিকানায় চলে যায়। যদি প্রতিানের সময় নষ্ট করেন, তাহলে নষ্ট হওয়া ওই পরিমাণ সময়ের বেতন আপনার জন্য হারাম হবে। বর্তমানে আমাদের এ দিকে খেয়াল করা হয় না। আমরা শুধু সুদ, ঘুষকে হারাম মনে করি, কিন্তু বিভিন্নভাবে আমাদের উপার্জনে হারামের মিশ্রণ হচ্ছে সে দিকে আমাদের বিবেক লক্ষ্য করে না।

ট্রেন ভ্রমণে পয়সা বাঁচানো

আপনি ট্রেনে সফর করছেন এবং যে শ্রেণির টিকেট খরিদ করেছেন তার চেয়ে উপরের শ্রেণীতে ভ্রমণ করলেন। তাহলে দুই শ্রেণীর মাঝে ভাড়ার যে পরিমাণ ব্যবধান হয় সে পরিমাণ ভাড়া আপনি বাঁচালেন। এ পরিমাণ বাঁচানো টাকা আপনার জন্য হারাম। আপনার বৈধ উপার্জনের সঙ্গে এ হারাম টাকা মিশে যাচ্ছে। অথচ আপনার খরবই নেই যে, এটা আমার জন্য হারাম।
অতিরিক্ত সামানের ভাড়া

হযরত থানবী (রহ.) এর সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিদের ব্যাপারে প্রসিদ্ধ ছিল যে, তারা ট্রেনের সফরে মালের ওজন করাতেন। একজন মুসাফিরের যে পরিমাণ সামান নেয়ার অনুমতি থাকে, তার চেয়ে মালের ওজন বেশি হলে অতিরিক্ত মালের ভাড়া রেলওয়েকে পরিশোধ করতেন। তারপর সফর শুরু করতেন। এ ব্যবস্থাপনা ছাড়া তাদের সফর করার কল্পনাও হত না।

হযরত থানভী (রহ.) এর একটি সফর

একবার হযরত থানভী (রহ.)-এর নিজের ক্ষেত্রেই এমন একটি ঘটনা ঘটল। তিনি সফরের উদ্দেশ্যে স্টেশনে পৌঁছে সোজা ওই অফিসে গেলেন যেখানে মাল ওজন করা হয়। ঘটনাক্রমে রেলওয়ে টিকেট মাস্টার ওখানে দাঁড়ানো ছিলেন, যিনি থানভী (রহ.) কে চিনতেন। তিনি বলতে লাগলেন, হযরত! আপনি এখানে কেন? হাকীমূল উম্মত হযরত থানভী (রহ.) বললেন,মাল ওজন করবার জন্য এখানে এসেছি। যদি অতিরিক্ত হয়, তাহলে ভাড়া পরিশোধ করব। মাস্টার বলল, হযরত! আপনি ওজন করার চিন্তা কেন করছেন? আপনি ওজন ছাড়াই সফর করুন, আমি আপনার সঙ্গে থাকব। আমি এ রেলওয়ের টিকেট মাস্টার। চলতি পথে আপনাকে কেউ কিছু বলবে না। যদি মাল অতিরিক্ত হয় তাহলেও আপনার কাছে কেউ জরিমানা চাইবে না। হাকীমুল উম্মত হযরত থানভী (রহ.) বললেন, আমার সঙ্গে কতটুকু রাস্তা যাবেন। সে উত্তর দিল, অমুক স্টেশন পর্যন্ত যাব। হাকীমুল উম্মত হযরত থানভী (রহ.) জিজ্ঞেসা করলেন, এরপর কী হবে?
সে বলল এরপর যে মাস্টার আসবে আমি তাকে বলে দেব, ওনিই মালামালগুলো দেখে রাখবে। হাকীমুল উম্মত হযরত থানভী (রহ.) পুনরায় প্রশ্ন করলেন, ওই মাস্টার কোন পর্যন্ত যাবে?
তিনি উত্তর দিলেন, আপনি যেখানে যাবেন সে পর্যন্ত যাবে। অতএব আপনার কোন ভয় নেই। হযরত থানভী (রহ.) বললেন, আমাকে আরো সামনে যেতে হবে। তিনি বললেন, সামনে কোথায়?
হযরত আশারাফ আলী থানভী (রহ.) বললেন, আমি ওই মনযিলের পর আল্লাহর দরবারে যাব। সেখান কোন মাস্টার আমার সঙ্গে যাবে, যে আমাকে আল্লাহর সামনে প্রশ্নের উত্তর থেকে বাঁচাবে? অতঃপর হযরত থানভী (রহ.) মাস্টার সাহেবকে বললেন, এ রেল আপনার মালিকানা নয়। এতে আপনার কোন এখতিয়ার নেই। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আপনার এ অনুমতি নেই যে, কারো মাল ভাড়া ছাড়া ছেড়ে দেবেন। অতএব আমি আপনার কারণে দুনিয়ার ধড়পাকড় থেকে বেঁচে যাব। এ সামান্য পয়সা যা বাঁচিয়ে নেব এবং পয়সাগুলো আমার জন্য হারাম হবে। এ হারাম পয়সার ব্যাপারে আল্লাহ প্রশ্ন করলে কোন মাস্টার আমাকে বাঁচাবে? কে জবাব দেবে? এ কথাগুলো শুনে স্টেশন মাস্টারের অন্তর খুলে গেল। এবার হাকীমুল উম্মত হযরত থানভী (রহ.) সব সামানপত্র ওজন করিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে সফর শুরু করলেন।

এ হারাম টাকা হালাল রিযিকের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেল

কেউ যদি রেলওয়ে বা উড়োজাহাজের ভ্রমণে অনুমতির অতিরিক্ত মালামাল বহন করে এবং অতিরিক্ত সামান ওজন করিয়ে পৃথকভাবে ভাড়া আদায় না করে এর ফলে যে টাকা বেঁচে গেল তা হারাম। এ হারাম টাকা আমাদের হালাল রিযিকের সাথে মিশ্রিত হয়ে গেল। এ কারণে আমাদের নির্ভেজাল টাকার সাথে হারামের মিশ্রণ হয়ে গেল।

বরকতহীনতা কেন হবে না ?

বর্তমানে আমরা বরকত না থাকার কারণে পেরেশান-দিশেহারা। এক্ষেত্রে লাখপতি, কোটিপতিরাও হতাশ। তারা বলে প্রয়োজন পূরণ হয় না, সংসার চলে না। মূলত এর কারণ হল হালাল- হারামের পার্থক্য না থাকা। হালাল-হারামের চিন্তা না করা। শুধু কয়েকটি বিষয়কে মনে মনে হারাম স্থির করে রেখেছি। এর থেকে তো কোন না কোনভাবে বাঁচার চেষ্টা করি। কিন্তু বিভিন্ন মাধ্যমে হারাম আমাদের উপার্জনে প্রবেশ করছে এর কোন চিন্তা নেই।

টেলিফোন ও বিদ্যুৎ বিল চুরি

টেলিফোন অফিসের সঙ্গে অবৈধ চুক্তি বা বন্ধুত্ব করে নেয়া এবং এ সুবাদে দেশে-বিদেশে কল করা, হাজারো কথা বলা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা, এক পয়সাও বিল না দেয়া, এটা মূলত দেশের সম্পদ চুরি করা। আর এ চুরির মাধ্যমে যে পয়সা থেকে যায় এটা হারাম। অথবা বিদ্যুতের মিটার বন্ধ করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা। এভাবে যে টাকা বেঁচে যাচ্ছে এটাও হারাম। ফলে হালাল-হারাম মিশ্রিত হয়ে যাচ্ছে। এভাবে অজানা বহু ক্ষেত্রে আমরা নিজের জন্য হারামের দরজা খুলে রেখেছি এবং হালাল-হারাম মিশ্রিত করছি। যার ফলে আমরা বরকত না হওয়ার শাস্তিতে ভুগছি।

হালাল ও হারামের ফিকির করা উচিত

প্রতিটি কাজে দেখতে হবে এটা বৈধ কিনা? যদি মানুষ এ চিন্তা করে জীবন পরিচালনা করে যে, অবৈধ কোন টাকা-পয়সা যেন আমার সম্পদে না আসে, আর সারা জীবনেও যদি সে নফল না পড়ে, যিকির না করে, তাসবীহ পাঠ না করে, কিন্তু হারাম থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে কবরে যায়, তাহলে ইনশাআল্লাহ সে সোজা জান্নাতে চলে যাবে। আর যদি হালাল-হারামের কোন চিন্তাই না করে, কিন্তু তাহাজ্জুদের নামায পড়ে, ইশরাকের নামায পড়ে, যিকির ও তাসবীহ পাঠ করে, তাহলে এ নফল ইবাদত ও যিকির মানুষকে হারাম মালের শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারবে না। আল্লাহ সব মুসলমানকে হেফাযত করুন। আমীন!

এখানে মানুষ গড়া হয়

হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলতেন যে, মানুষ যিকির তাসবীহ শেখার জন্য খানকায় যায়। যদি যিকির ও তাসবীহ শিখতে হয়, তাহলে বহু খানকা আছে সেখানে চলে যান। কিন্তু আমাদের এখানে তো মানুষ বানানোর চেষ্টা করা হয়। শরীয়তের বিধানের উপর আমল করার চিন্তা-ভাবনা সৃষ্টি করা হয়। এ কারণে রেল স্টেশনে যদি কোন দাড়িওয়ালা ব্যক্তি সামানপত্র ওজন করতে অফিসে যায়। অফিসম্যান তাকে দেখেই বুঝে নেয় যে, তার সম্পর্ক থানা ভবনের সাথে রয়েছে। এজন্য জিজ্ঞাসা করে আপনি কি থানাভবনে যাবেন।

হাকীমুল উম্মত হযরত থানভী (রহ.) বলতেন, যদি আমাদের সঙ্গে সম্পর্কিত কোন ব্যক্তির ব্যাপারে জানা যায় যে, তার মামুলাত (অযিফা) ছুটে গেছে তাহলে আমার বেশি কষ্ট হয় না। কিন্তু কারো ব্যাপারে যদি জানা যায় যে, সে হালাল-হারামকে এক করে ফেলেছে এবং তার লেনদেনে হালাল-হারামের কোন চিন্তা নেই, তখন এই ব্যক্তির প্রতি আমার ঘৃণা হয়।

হযরত থানভী (রহ.) এর এক খলীফার শিক্ষাণীয় ঘটনা

হাকীমুল উম্মত হযরত থানভী (রহ.) এর একজন বড় খলিফা, যাকে খেলাফত দেয়া হয়েছিল। তিনি একবার সফর শেষে একটি বাচ্চা নিয়ে হযরত থানভীর দরবারে উপস্থিত হলেন। সালাম-কালাম ও কুশল বিনিময়ের পর হযরত থানভী (রহ.) জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কোথা থেকে এসেছেন। তিনি উত্তরে বললেন, অমুক জায়গা থেকে। হযরত থানভী (রহ.) আবার বললেন, রেলে এসেছেন? তিনি জবাব দিলেন, জী হ্যাঁ। হযরত থানভী (রহ.) আবার প্রশ্ন করলেন, আপনার সঙ্গে এ বাচ্চাটির ফুল টিকেট করেছেন না হাফ টিকেট করেছেন? উত্তরে তিনি বললেন, হাফ টিকেট করেছি। হাকীমুল উম্মত হযরত থানভী (রহ.) জিজ্ঞেস করলেন, এ বাচ্চার বয়স কত? জবাব দিলেন, হযরত! এ বাচ্চার বয়স মূলত তেরো বছর, কিন্তু দেখতে বার বছরের মত মনে হয়। এজন্য হাফ টিকেট নিয়েছি। এ জবাব শুনে হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন এবং তার থেকে খেলাফত ফিরিয়ে আনলেন। বললেন, আমি ভুল করেছি, আপনি খেলাফতের উপযুক্ত নন। আপনি খেলাফতের অনুমতিপ্রাপ্ত হতে পারেননি। কারণ আপনার মধ্যে হালাল-হারাম চিন্তা নেই। যখন বাচ্চার বয়স বার বছরের বেশি এক দিনই হোক না কেন তখন আপনার কর্তব্য ছিল ফুল টিকেট নেয়া। আপনি হাফ টিকেট নিয়ে যে টাকা বাঁচিয়েছেন এগুলো হারাম টাকা। আর যে ব্যক্তির হারাম থেকে বাঁচার চিন্তা-ফিকির নেই সে খলীফা হওয়ার উপযুক্ত নয়। এ কারণে আপনার খেলাফত ফিরিয়ে নিলাম। একটু চিন্তা করে দেখুন! খানকায় পীর সাহেব তার মুরীদকে জিজ্ঞাসা করছেন, বাচ্চার হাফ টিকেট কেটেছেন না ফুল টিকেট? অথচ অন্যান্য খানকায় এ প্রশ্নের কল্পনাও নেই। অন্যান্য খানাকায় প্রশ্ন করা হয় মামুলাত পূর্ণ করেছ কি না? তাহাজ্জুদ পড়েছ কি না? ইশরাক পড়েছ কি না ? কিন্তু এখানে প্রশ্ন করা হচ্ছে, যে বাচ্চা আপনার সঙ্গে রয়েছে তার হাফ টিকেট করেছেন না ফুল? যদি কোন ব্যক্তি হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-কে বলতো, হযরত! মামুলাত ছুটে গেছে। হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলতেন, মামুলাত ছুটে যাওয়ার ইস্তিগফার পড়। দ্বিতীয়বার পড়া শুরু কর। সাহস বড় রাখ। প্রতিজ্ঞা কর, ভবিষ্যতে আর ছাড়বে না। মামুলাত ছুটে যাওয়ার কারণে কখনো খেলাফত ফিরিয়ে নেননি। কিন্তু হালাল হারামের ফিকির না থাকার কারণে খেলাফত ফিরিয়ে নিয়েছেন। কাজেই যখন কারো হালাল-হারামের চিন্তা না থাকে তাহলে ওই ব্যক্তি মানুষই নয়। এজন্য রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : অন্যান্য ফরযের পর হালাল উপার্জনও ফরয। (কানযুল উম্মাল : খন্ড ৪, পৃষ্টা ১৬ হাদীস নং ৯২৩ কাশফুল খাফা: খন্ড২, পৃা ৪৬ হাদীস নং ১৬৭১; সুনানে বায়হাকী: খন্ড২, পৃা ২৪, হাদীস নং ২০৩০ আল্লামা সূয়ূতী কৃত আল- জামিউল কাবীর: খন্ড১, পৃা ১৪০৮৫, হাদীস নং ৩৫; জামিউল আহাদীস; খন্ড ১৪; পৃা ১২৮, হাদীস নং ১৩৯৩৭; মিশকাতুল মাসাবীহ: খন্ড ২, পৃা ১২৯, হাদীস নং ২৭৮১; শুআবুল ঈমান; খন্ড৬, পৃা ৪২১; হাদীস নং ৮৭৪১)।

হারাম মাল হালাল মালকে বরবাদ করে দেয়

উল্লেখিত হাদীস থেকে তৃতীয় কথা বুঝে আসে যে, এ হাদীসে হালাল রিযিকের গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। হালাল রিযিক উপার্জন দ্বীন বহির্র্ভূত কোন বিষয় নয় বরং এটাও দ্বীনের অংশ। হালাল উপার্জন করা কোন পর্যায়ের এ হাদীস আমাদেরকে তাও বলে দিয়েছে। বর্তমান সমাজে জীবিকা, রুজি, টাকা-পয়সাকে জীবনের মূল টার্গেট, উদ্দেশ্য মনে করে। আজ আমাদের সবার চেষ্টা এটাই হচ্ছে যে, পয়সা কীভাবে উপার্জন করা যায়? কীভাবে পয়সা বাড়ানো যায়? কীভাবে জীবিকার উন্নতি হবে এবং এটাকে জীবনের শেষ গন্তব্য মনে করা হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদীসে বলেছেন যে, হালাল রুজি উপার্জন ফরয। কিন্তু অন্যান্য ফরযের পর এটা জীবনের মূল উদ্দেশ্য নয়। বরং এটা জীবরের একটি প্রয়োজন। এ প্রয়োজনের অধীনে মানুষকে শুধু উপার্জনের অনুমতিই দেননি; এর জন্য তাগিদও করেছেন যে, তোমরা হালাল রুজি উপার্জন কর কিন্তু এটা জীবনের মূল উদ্দেশ্যে নয়। বরং জীবনের উদ্দেশ্য অন্য বিষয়। তাহলো আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা, আল্লাহর বন্দেগী ও ইবাদত করা। এটাই হল মানুষের আসল উদ্দেশ্যে। আর জীবিকা হল প্রয়োজন, তবে ফরয, মূল উদ্দেশ্য নয়।

রুজি উপার্জনে ফরয তরক করা জায়েয নেই

যেখানে জীবনোপকরণ এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আরোপিত ফরযের মাঝে বিরোধ হয় সেখানে আল্লাহর ফরয প্রাধান্য পাবে। কতিপয় মানুষ হালাল উপার্জনের কথা শুনে সীমালঙ্ঘনে লিপ্ত হয়ে যায়। এটাকে এত বেশি গুরুত্ব দেয় যে, হালাল উপার্জন দ্বীনের একটি অংশ হিসেবে আমল করতে গিয়ে নামায পর্যন্ত ছেড়ে দেয়। নামাযের খেয়াল করে না, হক হালালের কোন তোয়াক্কা করে না। যদি তাদের বলা হয়, নামায পড়। উত্তরে বলে, যা করছি এটাও দ্বীনের অংশ। আমাদের মতে দ্বীন দুনিয়ার কোন ব্যবধান নেই। অতএব যা করছি এটাও দ্বীনের একটি অংশ।

এক ডাক্তার সাহেবের যুক্তি উত্থাপন

কয়েক দিন আগে এক মহিলা বলল, তার স্বামী ডাক্তার। সে চেম্বারে ডিউটির সময় নামায পড়ে না। যখন চেম্বার বন্ধ করে বাড়িতে আসে তখন তিন ওয়াক্ত নামাজ এক সঙ্গে পড়ে নেয়। আমি স্বামীকে বললাম, আপনি নামায কাযা করেছেন এটাতো ভাল নয়। আপনি সময় মত নামায পড়বেন। জবাবে তিনি উত্তর দিলেন ইসলাম মানবসেবার শিক্ষা দেয়। এ ডাক্তারী ও চেম্বার যা আমি করছি এটাও মানবসেবা, এটাও দ্বীনের একটি অংশ। তাহলে যদি আমি মানব সেবায় নামায ছেড়ে দেই কোন অসুবিধা নেই। একটু ভেবে দেখুন, সে হালাল রুজি উপার্জনের জন্য দ্বীনের প্রাথমিক ফরয নামাযকে ছেড়ে দিল। অথছ রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : হালাল উপার্জন ফরয কিন্তু অন্যান্য ফরযের পর। (কানযুল উম্মাল: খন্ড ৪, পৃা ১৬, হাদীস নং ৯২৩১; কাশফুল খাফা: খন্ড২, পৃা ৪৬, হাদীস নং ১৬৭১; সুনানে বায়হাকী: খন্ড ২, পৃা ২৪, হাদীস নং ২০৩০; আল্লামা সূয়ূতী কৃত আল-জামিউল কাবীর: খন্ড১, পৃা ১৪০৮৫, হাদীস নং ৩৫, জামিউল আহাদীস: খন্ড ১৪পৃা ১২৮ হাদীস নং ১৩৯৩৭ মিশকাতুল মাসাবীহ : খন্ড ২, পৃা ১২৯ হাদীস নং ২৭৮১; শুআবুল ঈমান: খন্ড ৬, পৃা৪২১, হাদীস ৮৭৪১) অতএব জীবিকা উপার্জনের ফরয ও অন্যান্য ফরযের মধ্যে বিরোধ হলে দ্বীনি ফরয প্রাধান্য পাবে।

এক কামারের ঘটনা

আমার আব্বাজান হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) থেকে এ ঘটনা শুনেছি যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) একজন বড় মাপের আল্লাহর অলী ছিলেন। ফকীহ, মুহাদ্দিস, সাধক ছিলেন। আল্লাহ তাকে অনেক বড় মর্যাদা দান করেছেন। তার মৃত্যুর পর এক ব্যক্তি স্বপ্নে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারকের সঙ্গে সাক্ষাত হল। ওই ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ আপনার সাথে কী ব্যবহার করেছেন?
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক উত্তরে বললেন, আল্লাহ আমার উপর অনেক মেহেরবাণী করেছেন। কিন্তু আমার বাড়ির সামনের বাড়ির একজন কামার ছিল, তাকে যে মর্যাদা দেয়া হয়েছে, আমার তা হয়নি। তখন তিনি ভাবলেন, ওই কামার কে? তার আমল কী? আল্লাহ আবদুল্লাহ ইবনে মুবারকের মত ব্যক্তির চেয়ে তার মর্যাদা বেশি দিলেন? এজন্য তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারকের মহল্লায় চলে গেলেন এবং জানতে পারলেন আসলেই তার ঘরের সামনের বাড়িতে একজন কামার ছিল। কামারও মৃত্যুবরণ করেছেন। কামারের বাড়ি গিয়ে তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার স্বামী কী করতেন? স্ত্রী বলল, আমার স্বামী কামার ছিলেন। সারাদিন লোহার কাজ করতেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, তার বিশেষ কোন নেক আমল আছে কি, তার মর্যাদা আমার থেকেও বেশি। তার স্ত্রী বললেন, তিনি সরাদিন হাতুড়ি পেটাতেন। কিন্তু একটি সুন্দর কাজ করতেন, তাহল হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রাত্রে যখন তাহাজ্জুদ পড়ার জন্য দাঁড়াতেন তখন আমার স্বামীও নিজের ঘরের ছাদে এভাবে দাঁড়িয়ে যেতেন, যেন একটি কাঠ দাঁড়িয়ে আছে; কোন নড়াচড়া করতেন না। আমাদেরও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারকের বাড়ি ছিল সামনা সামনি। তাই আমাদের ছাদ থেকে তার নামাযের দৃশ্য দেখা যেত। যখন আমার স্বামী তাকে নামাযতর অবস্থায় দেখতেন তখন একথা বলতেন, আল্লাহ তাআলা তাকে সুযোগ করে দিয়েছেন। সে সারারাত ইবাদত করে, তা দেখে ঈর্ষা হয়। যদি আমার ব্যস্ততা না থাকত তাহলে আমারও এভাবে তাহাজ্জুদ পড়ার সুযোগ হত। যেহেতু সারাদিন লোহার কাজ করে রাতে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে যায় এজন্য তাহাজ্জুদ পড়া হয় না। এভাবে দুঃখ করতেন।

নামাযের সময় কাজ বন্ধ

কামারের আরেকটি আমল ছিল। হাতুড়ি পেটার সময় যখন আযানের আওয়াজ কানে আসত ওই সময় যদি হাতুড়ি মাথার উপর থাকত তাহলে হাতুড়ি লোহায় মারা পছন্দ করতেন না বরং হাতুড়ি পেছনের দিকে নিক্ষেপ করতেন। আর একথা বলতেন, আযানের আওয়াজ শোনার পর হাতুড়ি পেটানো আমার জন্য জায়েয নেই। অতঃপর নামাযের জন্য মসজিদে চলে যেতেন। যিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি এসব কথা শুনে মন্তব্য করলেন, এ কারণেই তার এত উঁচু মর্যাদা হয়েছে, যার প্রতি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারকের ঈর্ষা হয়।
বিরোধের সময় এ ফরয ছেড়ে দেবে
কামার হাতুড়ি পেটার কাজ করতেন। এটাও হালাল উপার্জনের ফরয কাজ ছিল। আর যখন আযানের আওয়াজ আসল এটা যেহেতু প্রথম ফরয, তাই তখন তিনি প্রথম ফরযকে প্রাধান্য দিতেন। আর দ্বিতীয় স্তরের ফরযকে ছেড়ে দিতেন। এ কারণে আল্লাহ তাকে এত বড় মর্যাদা দান করলেন। অতএব যেখানে বিরোধ হবে সেখানে প্রথম ফরযকে গ্রহণ করবে এবং হালাল উপার্জনের ফরযকে অল্প সময়ের জন্য স্থগিত রাখবে।

একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দুআ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দুআ পড়ে শিক্ষা দিয়েছেন: হে আল্লাহ! দুনিয়াকে আমাদের পেরেশানীর বড় কারণ সাব্যস্ত কর না, তাবৎ জ্ঞানের চূড়ান্ত পরিণতি দুনিয়াকে বানিও না, আর দুনিয়াকে আমাদের চাহিদার চূড়ান্ত ফসল বানিও না। (রাওযাতুল মুহাদ্দিসীন: খন্ড-৮, পৃা,৪১ হাদীস নং ৩৩১৬; আল-জামিউস সাগীর ওয়া যিয়াদাতুহু: খন্ড ১পৃা ২১৬ হাদীসনং ২১৪৮)
অর্থাৎ হে আল্লাহ! দুনিয়াকেই সবচেয়ে বেশি চিন্তার বস্তু বানিও না। যার কারণে সব সময় দুনিয়া আমাদের বিবেকে বসে থাকবে। শুধুই দুনিয়ার প্রশ্ন টাকা-পয়সা কোথায় পাই। কাজ কীভাবে হবে। বাড়ি কীভাবে হবে ইত্যাদি?
হে আল্লাহ! দুনিয়াকেই জ্ঞানের সীমা বানিও না যে, শুধু দুনিয়ার জ্ঞানই থাকবে। হে আল্লাহ! আমাদের আশা-আকাক্সক্ষার সীমানা দুনিয়াকেই বানিও না, যার কারণে শুধু দুনিয়ার আগ্রহ মনে জাগবে, পরকালের শান্তির আগ্রহ মনে আসবে না।
মূলকথা এ হাদীস তৃতীয়ত এ শিক্ষা দান করে যে, অন্যান্য দ্বীনি ফরযের পরের স্তরে হল হালাল উপার্জনের স্তর। এ দুনিয়া প্রয়োজনের বস্তু কিন্তু মূল লক্ষ্যবস্তু নয়। দুনিয়া বিভোর হওয়ার বস্তু নয়। শুধু দুনিয়াই মনে থাকবে এছাড়া আর কোন চিন্তা ফিকির থাকবে না এমন হওয়া উচিত নয়।

সারকথা

এ হাদীস থেকে তিনটি শিক্ষা বুঝে আসে-

এক. হালাল উপার্জন করাও দ্বীনের একটি অংশ।

দুই. হালাল উপার্জন করা এবং হারাম থেকে বাঁচার চিন্তা করা।

তিন. জীবিকা উপার্জনকে জীবনের লক্ষ্যবস্তু না বানানো। যেহেতু এটা দ্বিতীয় স্তরের ফরয।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে মনের গভীর থেকে এ মৌলিক বিষয়গুলো বুঝার তাওফীক দান করুন। এ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার তাওফীক দান করুন। আমীন!