প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১০ম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৬, জমা.সানী-রজব ১৪৩৭ হিজরী, চৈত্র-বৈশাখ ১৪২২ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

আপামর

এই শব্দটিকে মুসলমানরা কোন বিবেচনায়ই গ্রহণ করতে পারেন না। কেন পারেন না, তা ব্যাখ্যা করলেই বোঝা যাবে। আ+পামর অর্থাৎ পামর পর্যন্ত। উচ্চ-নীচ অভেদে সকলে। আপামর ক্রিয়া বিশেষণ আর পামর হচ্ছে বিশেষণ। পামর অর্থ হচ্ছে পাপি, নরাধম, মূর্খ, নীচ। জনসাধারণকে বোঝানোর জন্য বর্তমানে আপামর শব্দ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। স্বভাবত প্রশ্ন জাগে, জনসাধারণকে কি পাপি, নরাধম, মূর্খ ও নীচ? কেন, কখন আর কোন্্ প্রেক্ষাপটে পামর শব্দের ব্যবহার শুরু হয়, তা জানলেই আমরা বুঝতে পারবো, মুসলমান পারস্পরিক আলাপ-আলোচনায়, বক্তৃতায় ও লেখায় আপামর শব্দ ব্যবহার করতে পারেন কিনা।

ইতিহাসে যারা আর্য বলে পরিচিত, তারা ভারতবর্ষে প্রবেশ করেই দেখে এমন এক জাতির বাস, যারা কৃষ্ণকায়। আর্যরা ছিল গৌরকান্তি, দীর্ঘকায় এবং তাদের নাসিকা ছিল উন্নত। বর্তমানের ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমান্ত প্রদেশে এমন আকৃতি সম্পন্ন মানুষ দেখা যায়।

ভারতে প্রবেশকারী দলটি নিজেদের পরিচয় দিল আর্য বা সভ্য এবং তারা এসে ভারতে যাদের দেখলো তাদের নাম দেয় অনার্য বা অসভ্য। ত্বকের বর্ণ, দেহের গঠন ও চেহারার আকৃতি অনুযায়ী বহিরাগত ও স্থানীয়রা দুটি শ্রেণিতে বা জাতিতে বিভক্ত হয়ে গেল। স্থানীয়দের সাথে বহিরাগতদের লড়াই হলো কয়েক দফা। স্থানীয়রা বহিরাগতদের সাথে পেরে উঠলো না। তারা পর্যায়ক্রমে পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে চলে গেল। অনেকে আর্যদের বশ্যতা স্বীকার করে থেকে যায়।

আর্যদের মধ্যে প্রথমে শ্রেণি ভেদ ছিল না। কিন্তু কালক্রমে সামাজিক কর্ম বণ্টনের পরিপ্রেক্ষিতে শ্রেণি ভেদ অনিবার্য হয়ে উঠলো। শ্রেণি ভাগে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত হলো ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় আর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিভুক্ত হলো বৈশ্য ও শূদ্র। এই তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি এবং অনার্যদের মধ্যে যারা আর্যদের বশ্যতা স্বীকার করে থেকে যায়, সবাই বৃহত্তর অর্থে পামর শ্রেণিভুক্ত হয়ে পড়ে। এদের সকলকে নিয়ে যে সমাজ, তা জনসাধারণের সমাজ, তারই নাম হলো পামর।

ভারতীয় জনসমাজকে জাতিগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কোন কোন ঐতিহাসিক ও সমাজ বিজ্ঞানী ৮ শ্রেণিতে বিভক্ত করেন। কেউ কেউ করেন ৭ শ্রেণিতে। ১৯৩৩ সালে ডক্টর জে এইচ হার্টন ৮টি বিভিন্ন জাতিতে ভারতবাসীকে ভাগ করেন। কিন্তু ১৯৩৫, ১৯৩৭ এবং ১৯৪৪ সালে ডক্টর বিএস গুহ বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করে ভারতবাসীতে ৬ ভাগে ভাগ করেন। এর মধ্যে একটি শ্রেণিকে তিনি বলেছেন, প্রোটাঅস্ট্রালয়েড। তার মতে, এ জাতির লোক ভারতবর্ষের প্রায় সর্বত্র (নিম্ন শ্রেণির মধ্যে) দেখতে পাওয়া যায়। এই শ্রেণির মানুষকে পামর, অচ্ছুৎ, হরিজন. অস্পৃশ্য বলে গণ্য করা হয়। আর্যদের জাতিভেদে শূদ্ররাই মূলত পামর। ব্রাহ্মণরা শূদ্রদের সরাসরি পামর বলে থাকে। পামরদের কোন অধিকার ছিল না ধর্ম শাস্ত্র পাঠের এমনকি শ্রবণেরও। ব্রাহ্মণ-আরোপিত ধর্মীয় এই নিষেধ অমান্য করার কারণে কতো পামরকে জীবন দিতে হয়েছে, তার কোন হিসাব নেই। আজও স্বাধীন ভারতে পামরদের ওপর কি জুলুম-নির্যাতন করা হয়, কতো নির্মমভাবে তাদের আগুনে দগ্ধ করা হয়, ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় প্রায়ই এমন খবর ছাপা হয়।

ভারতে ইসলাম বিজয়ী বেশে প্রবেশের পর মুসলমানদের ম্লেচ্ছ, যাবন, নেড়ে, পামর ইত্যাদি গালি দ্বারা বর্ণ হিন্দুরা চিহ্নিত করতো। এই উপমহাদেশ বিভাগের পূর্ব পর্যন্ত উগ্র বর্ণ হিন্দুরা তাদের লেখায় ও বক্তৃতায় মুসলমানদের এসব নামেই ডাকতো। এ নিয়ে অনেক দাঙ্গা-হাঙ্গামাও হয়েছে। ব্যাল থ্যাকারদের কণ্ঠে এ সম্বোধন এখনও উচ্চারিত হয়। মুসলমানরা তাদের কাছে অস্পৃশ্য ছিল এবং এখনও এক শ্রেণি তা মনে করেন। মুসলমানের ছায়া তাদের উপর পড়লে সহ্য করতে পারে না। পানি ভর্তি মাটির কলসীর ওপর এ ছায়া পড়লে ভরা কলসী ভেঙ্গে ফেলা হয়। পিতলের কলসীর ওপর মুসলমানের ছায়া পড়লে তা গঙ্গা জলে সাতবার ধৌত করে পবিত্র করতে হয়। এ কারণে তারা মুসলমানদেরও পামর বলে গণ্য করেন।
আপামর শব্দটি বর্ণ বৈষম্য, ধর্ম বৈষম্য এবং মানবিক আচরণের বিষময় বৈষম্যমূলক শব্দ। শুধু তাই নয়, এটি অমানবিক আর অনৈতিক বিদ্বেষ-বৈষম্যে ভরপুর। মুসলমানরা এমন একটি শব্দকে তাদের লেখায় ও বুলি-বচনে ব্যবহার করতে পারে না। জনসাধারণ বললেই তো সর্বস্তরের লোককেই বুঝায়, পামর শব্দ যোগ করার তো কোন মানে হয় না। হিন্দু শাস্ত্র মতে, পামরদের বাস হচ্ছে রৌরব নরকে।

মুসলমানরা কাউকে স্বর্গ-নরকের সার্টিফিকেট দেয় না বা দিতে পারে না। আশরাফ-আতরাফও নির্ণিত হয় পাপ-পূণ্যের দাঁড়িপাল্লায় ওজনের পর। সেই আশরাফ জীবন যার পূণ্য কর্মময়। ক্রীতদাস হযরত বেলাল ইসলামের সীমানায় প্রবেশের পর মুসলমানরা তাকে ইজ্জত ও মর্যাদার যে উঁচু সিঁড়িতে আসীন করেছিলেন, মানব ইতিহাসে এমন দ্বিতীয় নজীর নেই। আজও মুসলমানরা বেলালের নাম উচ্চারণ করেন শ্রদ্ধার সাথে। এক সময়ের ক্রীতদাস যে জাতির গুরুত্বপূর্ণ জেহাদে সিপাহসালারের মহান দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছিলেন, সেই জাতির কোন নরনারী কথায় বা লেখায় আপামর শব্দ দিয়ে জনসাধারণকে কি বোঝাতে পারে? ইসলামী সংস্কৃতি বিরোধী এই শব্দটি মুসলমানরা ঐতিহ্যগত কারণেও ব্যবহার করতে পারেন না।

আলিঙ্গন

এ হচ্ছে সংস্কৃতি শব্দ। আ+লিন্গ্+অন। মূল ধাতু লিন্গ্। আলিঙ্গনের বাংলা প্রতিশব্দ কোলাকুলি, বুকে জড়িয়ে ধরা, আশ্লেস। আলিঙ্গন মানে লিঙ্গ পর্যন্ত। কোলাকুলি বা জড়িয়ে ধরার সীমানা আলিঙ্গন শব্দের মধ্যেই নিহিত। সুতরাং কোলাকুলি আর আলিঙ্গন পরোক্ষভাবে দূরতম দিক দিয়ে একই অর্থবোধক হলেও এই দুটি শব্দ একই ভাব প্রকাশ করে না। স্বাভাবিক আবেগে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থাকলে কোলাকুলি হয় পুরুষে পুরষে বা নারীতে নারীতে, নারী-পুরুষে অবশ্যই নয়। আলিঙ্গন কিন্তু কোলাকুলির চৌহদ্দি মানে না। লিন্গ্ ধাতু দ্বারা গঠিত শব্দে লিঙ্গের প্রাধান্য রয়েছে এবং তা গোপনে নয়, প্রকাশ্য ঘোষণা দ্বারা। আলিঙ্গন হচ্ছে বিশেষ অবস্থার জড়াজড়ি। এক মুসলমান অন্য মুসলমানের সাথে কোলাকুলি করেন, কিন্তু জড়াজড়ি বা আলিঙ্গন করতে পারেন না। তাই আমাদের লেখালেখিতে বা কথাবার্তায় কোলাকুলি গ্রহণযোগ্য, আলিঙ্গন পরিত্যজ্য।