প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১২ম সংখ্যা, জুন ২০১৬, শাবান-রমাদান ১৪৩৭ হিজরী, জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

হযরত ড. খোন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) এর মৃত্যু সংবাদ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে ১১ মে বুধবার সকাল নয়টার মধ্যেই পুরো বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। সারাদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ ঝিনাইদহে ড. সাহেব (রহ.) এর বাড়িতে এসে হাজির হতে থাকেন। ঢাকার দারুস সালামে মৃত্যু সংবাদ পৌঁছার সাথে সাথে কান্নার রোল পরে যায়। এক শোক সংতপ্ত পরিবেশ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ঢাকায় ড. সাহেব (রহ.) এর ইন্তেকালের সংবাদ পৌঁছার সাথে সাথে ফুরফুরার গদ্দিনশীন পীর সাহেব হুজুর আল্লামা আবু বকর আবদুল হাই মিশকাত সিদ্দিকী সাহেব গাড়ি নিয়ে ঝিনাইদহের উদ্দেশ্যে ঢাকার দারুস সালাম থেকে রওনা হয়ে যান। এরপর পরই পীর সাহেব হুজুরের মেজ ভাই যিনি মেজ হুজুর নামে পরিচিত হযরত আবুল আরাফাত মোস্তফা মাদানী সিদ্দিকী সাহেব ও পীর সাহেব হুজুরের ছোট ভাই যিনি ছোট হুজুর নামে পরিচিত হযরত শাহ ফাতেহ আলী আয়াতুল্লাহ সিদ্দিকী সাহেবদ্বয় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রওনা হয়ে যান। আমি পুরান ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে রওয়ানা দেই ঝিনাইদহের উদ্দেশ্যে। পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত প্রায় দশটা বেজে যায়। হযরত পীর সাহেব হুজুরের নির্দেশ মোতাবেক ঢাকার দারুসসালাম তারবিয়াতুল মিল্লাত একাডেমীর সহকারী শিক্ষক জনাব তানজিল আহম্মেদ সাহেব লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ি নিয়ে ঝিনাইদহে পৌঁছে যান।

ঝিনাইদহ পৌঁছে দেখি ড. সাহেবের আত্মীয় স্বজনেরা দূর-দূরান্ত থেকে এসে অনেকেই পৌঁছে গেছেন। ড. সাহেবের ছোট চাচা শ্বশুর যিনি ফুরফুরার ছোট পীর সাহেব হুজুর নামে পরিচিত জনাব হযরত মাও: আব্দুল্লাহ সিদ্দিকী সাহেবের একমাত্র সন্তান ভারত থেকে আগত হযরত মাও: সাওবান সিদ্দিকী সাহেব উপস্থিত রয়েছেন। ফুরফুরার সেজ পীর সাহেব হুজুর জনাব হযরত মাও: মতিউল্লাহ সিদ্দিকী সাহেবের ছোট সাহেবজাদা হযরত মাওলানা মিফতাহুল জান্নাহ সিদ্দিকী সাহেব উপস্থিত হন। আত্মীয় স্বজনসহ শুভানুধ্যায়ী অনেকেই এসে হাজির হন। দেশ বিদেশ থেকে এসে ওনাকে শেষ বারের মত এক নজর দেখা ও ওনার জানাযায় শরিক হয়ে ওনাকে শেষ বিদায় দেওয়ার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন কারণে এসে পৌঁছাতে পারেননি অনেকই।
তার লাশ ঝিনাইদহে পৌঁছলে হাজারো মানুষের ঢল নামে তাকে এক নজর দেখার জন্যে। দুপুরের পর আস-সুন্নাহ ট্রাস্টের অফিস থেকে ঘোষণা দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয় ১২ মে রোজ বৃহষ্পতিবার বাদ মাগরীব ঝিনাইদহ গভর্মেন্ট হাই স্কুল মাঠে ড. সাহেব (রহ.) এর নামাজে জানাজা অনুতি হবে। বেশ কিছু জেলা থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে ভক্তজনেরা আসতে থাকেন। ১১ মে জানাজা না হওয়ার কারণে অনেকেই গাড়ি নিয়ে এসে দলবল সহকারে পরের দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকা সম্ভব না হওয়ার কারণে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। ধোপাঘাটা গোবিন্দপুর নতুন বাস টার্মিনালের নিকটে হাইওয়ে রোডের পাশে উত্তর পশ্চিম কোণে ড. সাহেব (রহ.) এর নিজ বাড়িতে তার প্রাণপ্রিয় আস্-সুন্নাহ ট্রাস্ট প্রাঙ্গঁনে লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ীতে সারা রাত তাঁর লাশ রাখা থাকে। ঠাকুরগাঁর জনাব সাকলাইন সাহেব ও আসসুন্নাহ মাদ্রাসার কয়েকজন ছাত্রসহ রাতজেগে দায়িত্ব পালন করেন ফজর পর্যন্ত। মেইন রোডের পাশে গাড়ি রেখে সারা রাতই অনেক লোক এসে তাঁকে এক নজর দেখে গেছেন। ফজরের পর পর ঢাকার দারুসসালাম মাদ্রাসার মহতামিম হযরত মাওলানা হাফেজ আব্দুল কাইয়ুম সাহেব বেশকিছু আলেম-ওলামা ও অসংখ্য ছাত্রসহ বলাকা পরিবহন রিজার্ভ করে ঝিনাইদহে এসে পৌঁছান। প্রথম দিনই পাকশি খানকাহ থেকে শিক্ষক ছাত্রসহ গাড়ি রিজার্ভ করে ঝিনাইদহে পৌঁছান।

ড. সাহেব (রহ.) এর নিজ বাড়ির সম্মুখভাগে পশ্চিমে মসজিদের উপরে বালক হিফজ বিভাগ ও উত্তরে আস্-সুন্নাহ ট্রাস্ট অফিস, প্রকাশনা সংস্থা ও লাইব্রেরি আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স ও আস-সুন্নাহ মহিলা কর্মসংস্থান কেন্দ্রিয় অফিস। ঐ ভবনের ২য় তালায় আস-সুন্নাহ বালিকা মাদ্রাসার হেফজ বিভাগ, পূর্ব দিকে আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট এর বালক বিভাগের দাওরা বিভাগ, কিতাব বালক বিভাগ, গবেষণা বিভাগ, এছাড়াও রয়েছে উচ্চতর হাদীস বিভাগ, নুরানী বিভাগ, দুস্থ পূনর্বাসন কেন্দ্র, মাজলিস্ সুন্নাহ, মারকাজুস সুন্নাহ ইত্যাদিসহ আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট এর অন্তর্ভূক্ত সকল প্রতিানসমূহ।

পরেরদিন সকাল থেকে গাড়িতে করে মাইক দিয়ে সারাদিন জানাজার সময়ের প্রচার হতে থাকে। যোহরের আগ মুহূর্তে ড. সাহেবের একমাত্র পুত্র সন্তান উসামা খোন্দকার সাহেব সৌদি আরবের রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিজ বাড়িতে এসে পৌঁছেন। হযরত পীর সাহেব হুজুরের নির্দেশ মোতাবেক ঢাকার দারুসসালাম তারবিয়াতুল মিল্লাত একাডেমীর সহকারী শিক্ষক হযরত পীর সাহেব হুজুরের পিএস জনাব মাওলানা সাইফুল্লাহ জাকি আনসারী সাহেব ওনাকে ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। ওনার আগমন বার্তায় চতুর দিক থেকে এলাকাবাসীরাসহ অসংখ্য মানুষ জড়ো হয়ে ভিড় জমায়। হৃদয় বিদারক এক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। জোহরের নামাজের আগ মুহুর্ত থেকেই ওনার নামাজে জানাযায় শরীক হওয়া ও শেষবারের মত ওনাকে এক নজর দেখার জন্য সারা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো মানুষ এসে জড়ো হতে থাকে। সারিবদ্ধ হয়ে লাইন দিয়ে ওনাকে দেখতে থাকেন। বিকাল প্রায় ৩.৪৫ মিনিটের দিকে ওনার লাশ বাহি গাড়ি বাড়ির ভিতরে পরিবারের সদস্যদের দেখার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। পরিবারের সদস্যদের থেকে শেষ বিদায় নিয়ে বিকাল প্রায় ৪.৩৯ এর দিকে আবারও মসজিদের সম্মুখে বিশাল আঙিনায় আগতদের লাশ দেখার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

আসরের নামাজের পূর্বেই ওনার নিজ বাড়ি হতে প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার দূরে ঝিনাইদহ শহরের জেলা স্কুল মাঠে লাশ নিয়ে যাওয়া হয়। পূর্ব প্রস্তুতি অনুযায়ী বিশাল ময়দানে চুন গুলে দাগ দিয়ে জামাতের কাতার সোজা রাখার ব্যবস্থা করা হয়। সেই সঙ্গে স্কুল মাঠে বেশ কিছু খুটি পুতে মাইক লাগিয়ে আওয়াজ শোনার বন্দোবস্ত করা হয়। বেশ কয়েকটি পাওয়ার ফুল হ্যালোজেন লাইট দিয়ে আলোর ব্যবস্থা করা হয়। আসরের আগ থেকেই লোকজন ময়দানে সমাবেত হতে থাকেন। স্কুল মাঠেই আসরের নামাজ অনুতি হয়। আসরের নামাজের সাথে সাথেই সারাদেশ থেকে জড়ো হওয়া হাজার হাজার সর্বস্তরের মানুষ, আলেম ওলামা, পীর মাশায়েখ, ছাত্র-শিক্ষক অশ্র“সিক্ত নয়নে ড. সাহেব (রহ.) এর লাশ এক নজর দেখা শুরু করেন। বিশাল দুটি লাইন কণ্ট্রোল করা প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছিল। অসংখ্য সেচ্ছাসেবক হাতে হাত ধরে বিচক্ষণতার সাথে সবাই যেন লাশ দেখতে পাড়ে তার ব্যবস্থা করেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত খতিব জনাব ড. আ.স.ম. শোয়াইব আহমাদ সাহেব মাইকে সকলকে শান্তি শৃঙ্খলার সাথে ধীরস্থিরভাবে মাগরীবের নামাজের আগ পর্যন্ত লাশ দেখার কথা জানান এবং সকলকে দোয়া করতে বলেন।
দূর দূরন্ত থেকে জানাজায় অংশগ্রহণের জন্য সম্মানিত ও স্বনামধন্য ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিগণের সমাগম ঘটতে থাকে। এদের মধ্যে ফুরফুরার গদ্দীনশীন পীর সাহেব আল্লামা আবু বকর আবদুল হাই মিশকাত সিদ্দিকী সাহেব, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত চ্যান্সেলর প্রফেসর ড, আব্দুল হাকিম সাহেব, যশোর জেলা দায়রা জজ, সাবেক ঝিনাইদহ জেলা দায়রা জজ জনাব ইসমাইল হোসেন সাহেব, মেয়র মোহাম্মদ সাজেদুল করিম মিন্টু সাহেব, জেলা প্রশাসক জনাব মাহবুব আলম তালুকদার সাহেব, ভারত থেকে আগত ড. সাহেবের মামা শ্বশুর জনাব রেজওয়ানুল করিম সাহেব, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির প্রধান জনাব এন্তাজ হোসেন সাহেব, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের আল হাদিস বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর জাকির হোসেন সাহেব, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সেক্রেটারী জনাব প্রফেসর ড. ওলিউল্ল্যাহ সাহেব, ছারছীনা মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা শরাফত হোসেন সাহেব, ড. সাহেব (রহ.) এর বড় জামাতা পি.এইচ.ডি ডিগ্রিধারী ড. হাবিবুল্লাহ সাহেব, ড. সাহেব (রহ.) এর মেজ জামাতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলহাদিস বিভাগের অধ্যাপক নুর আলম সাহেবসহ দেশ বিদেশ থেকে আসা বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সকলকেই ২/১ মিনিট করে বক্তব্য রাখার জন্য ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রিয় মসজিদের সম্মানিত খতিব ড. আ.স.ম শোয়াইব আহমদ সাহেব আহ্বান জানান। যদিও সকলের ইচ্ছা ছিল মন খুলে ড. সাহেব সম্পর্কে আলোচনা করার কিন্তু সময়ের স্বল্পতার কারণে ২/১ মিনিটের বেশি সময় দেওয়া মোটেও সম্ভব হচ্ছিল না।

যশোর জেলা জজ জনাব ইসমাইল হোসেন সাহেব ড. সাহেব সম্পর্কে দুচারটি কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ড. সাহেবের সাথে আমার সম্পর্ক আজ প্রায় ২০ বছর যাবত। আমি ঝিনাইদহ থেকে যশোর বদলি হলেও ড. সাহেবের সাথে আমার সম্পর্কের কোন কমতি হয়নি। উনি আমার অন্তরঙ্গ মানুষ ছিলেন। যখনই কোন মাসয়ালার জন্য ফোন কারতাম উনি সুন্দর করে আমাকে সব বুঝিয়ে দিতেন। আমি গত তিন দিন আগে একটি বিষয়ে তার থেকে মাসয়ালা বুঝে নিলাম। ড. সাহেব (রহ.) এর জন্য দোয়া চেয়ে বক্তব্য শেষ করেন।

ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ড. আব্দুল হাকিম সাহেব বলেন : আপনাদের প্রতি সালাম, আমরা এমন এক ব্যক্তিকে হারিয়েছি যিনি ছোট বড় সকলের প্রিয় মানুষ ছিলেন। তিনি অত্যন্ত বিনয়ী ছিলেন। উনি এমন একজন পন্ডিত ব্যক্তি ছিলেন যে, তার মিডিয়া ও টিভির আলোচনা আমাদের প্রজন্মকে অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছে। ওনাকে আজ আমরা হারিয়ে ফেলেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন এক শিক্ষককে হারিয়েছি আমরা, যার ভালবাসা কোনো দিনও ভুলতে পারবো না।

ভারত হতে আগত ড. সাহেবের মামা শ্বশুর জনাব রেজওয়ানুল করিম সাহেব বলেন, আমাদের এমন সময়ে এইভাবে রেখে উনি চলে গেলেন যখন সারা বিশ্বে মুসলমানদের ক্রান্তিকাল চলছে। আল্লাহ ওনাকে জান্নাতের উচ্চ মকাম দান করুন।

ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মাহবুব আলম তালকুদার সাহেব বলেন, অত্যন্ত শোকাতরভাবে অনুভূতি পোষন করছি। তার ইন্তেকাল সংবাদ শুনে হত বিহবল হয়ে পড়েছে সবাই। সবই আল্লাহর ইচ্ছা। সর্ব শক্তিমান আল্লাহ যা করেন তাতে আমাদের করার কিছু নাই। আল্লাহর কাছে দুআ করি তার ইন্তেকালে যে ক্ষতি সাধন হয়েছে, এ ক্ষতি পূরণের ব্যবস্থা করুন। ঝিনাইদহে যোগদানের আগে ওনার সাথে মত বিনিময় করার সুযোগ হয়নি। একদিন মসজিদে প্রাণ ভরে তাঁর বয়ান শুনি। ড. সাহেব আমাকে বললেন, ডি.সি. সাহেব এ বছর মাহফিলে আপনি থাকবেন। আমি বললাম, আল্লাহ পাক বাঁচিয়ে রাখলে থাকব ইনশা-আল্লাহ। যে অসমাপ্ত কাজ উনি তাঁর অনুসারীদের কাছে রেখে গেছেন সে সকল কাজগুলো গুছিয়ে করার তাওফিক দান করুন। আল্লাহ পাক ওনাকে বেহেস্ত দান করুক।

ড. সাহেবের বংশের বড় ভাই খোন্দকার খলিলুর রহমান সাহেব কথা বলতে গিয়ে বলেন, আমি ওর সম্পর্কে যতটুকু জানি, আমার চেয়ে আপনারা বেশি ভাল জানেন। আমি ওকে কোলে পিঠে করে বড় করেছি। আমি রয়ে গেলাম আর ও চলে গেল। আমার ইচ্ছা ছিল আমি ইন্তেকালের পড় জানাজা ও পড়াবে। আজকে তার জানাজা আমাদের পড়তে হচ্ছে। দোয়া চাই, তাঁর একটি মাত্র ছেলে সন্তান বাবার পথ অনুসরণ করে, সৌদি আরবের রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে আসতে পারে। আমার ভাইয়ের উঠা বসা ও চলাফেরা বা লেনদেনে কোন ভুল ত্র“টি হয়ে থাকলে সকলের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল হাদিস বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর জনাব জাকির হোসেন সাহেব বলেন, আমি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ১৯৯৮ ইং সনে ওনাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সেই বোর্ডের চেয়ারম্যান আমি ছিলাম। তিনি দ্বীনের খেদমত যেভাবে এগিয়ে নিয়েছিলেন, তাকে নিয়ে আরো অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার আশা ছিল। আল্লাহর ফায়সালা সাথী সঙ্গী, ভক্তবৃন্দ ও তার যে সন্তান রেখে গেছেন, তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলো আল্লাহ তাদেরকে করার তাওফীক দিন। আমরা সঠিকভাবে সহযোগিতা করব ইনশা-আল্লাহ।

ফুরফুরার গদ্দিনশীন পীর আল্লামা আবু বকর আব্দুল হাই মিশকাত সিদ্দিকী সাহেব, প্রথমে উপস্থিত সকলকেই উদ্দেশ্য করে বলেন, “মুহতারাম, আপনারা শুনেছেন, ফুরফুরার পীর মোজাদ্দেদে জামান আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.) এর পৃথিবী ব্যাপি বহু খোলাফা ছিলেন। উনাদের মধ্যে আল্লামা রহুল আমীন (রহ.), ছরছীনার নেছারউদ্দিন (রহ.) এনাদেরকে মহান আল্লাহপাক যে নেয়ামত দান করেছিলেন; শ্রদ্ধেয় হযরত ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর সাহেব, যিনি শুধু আমার উস্তাদ নন, আমার মুরুব্বীও বটে, তাকেও আল্লাহ তাআলা সেই নেয়ামত দান করেছেন। ড. সাহেবের একমাত্র পুত্র সন্তান খোন্দকার উসামা। জানাযা সেই পড়াবে। সন্তানই জানাযা পড়ার হকদার। সেই হিসাবে খোন্দকার উসামা জানাযা পড়াবেন। ড. সাহেব আস-সুন্নাহ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ছিলেন, তার স্থলে তার উপযুক্ত সন্তান খোন্দকার উসামা বর্তমানে রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত আছেন, সেই তার পিতার স্থলে আস-সুন্নাহ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন। এ কথাশুনার সাথে সাথে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ আলহামদুলিল্লাহ বলে ওঠেন। আপনারা সকলেই সার্বিকভাবে ট্রাস্টের কাজগুলো চালিয়ে যাওয়ার কাজে সহযোগিতা করবেন। এখন আপনাদের সম্মুখে জানাজার নামাজ পড়াবেন খোন্দকার উসামা সাহেব।”

এরপর ড. সাহেব (রহ.) এর একমাত্র পূত্র সন্তান জনাব খোন্দকার উসামা জানাজার পূর্বে উপস্থিত সকলকে উদ্দেশ্য করে সংক্ষিপ্ত কিছু কথা বলেন। তিনি বলেন, সম্মানিত হাযেরীন, আমার আব্বার কথাবার্তা আচার ব্যবহারে লেনদেনে কেউ মনে কোন কষ্ট পেয়ে থাকলে তার পক্ষ থেকে আপনাদের কাছে মাফ চাচ্ছি। আপনাদের কারো কাছে দেনা পাওনার কোন বিষয় থাকলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করবেন। আল্লাহ-তাআলা যেন আমার আব্বাকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা দান করেন।
এরপর উপস্থিত সকলকে নিয়ে তিনি জানাজার নামাজ আদায় করেন। জানাজায় প্রায় লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়। এত বড় জানাজা ঝিনাইদহবাসী আর কোনো দিন দেখেনি বলে অনেকেই মন্তব্য করেন। ময়দান থেকে মানুষের মাঝ দিয়ে বের হতে না পেরে দীর্ঘ সময় ধরে লাশবাহী গাড়িটিকে মাঠেই অপেক্ষা করতে হয়। জানাজার শেষে ময়দান থেকে হাজার হাজার মানুষ ঝিনাইদহ মেইন রোডে বের হয়ে আসলে রাস্তা ঘাটে সকল প্রকার যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। চার দিকে মানুষের ঢল নেমে যায়। শুধু মানুষ আর মানুষ। দীর্ঘ সময় পড় মানুষের চাপ একটু কমে আসলে লাশ বাহি গাড়িটি ধীরে ধীরে মানুষের মাঝখান দিয়ে আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট এর দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।

এশার নামাজের পূর্ব মুহূর্তে ড. সাহেব হুজুরকে দাফন করা হয়। তখন আবার ভিড় সৃষ্টি হয় এক মুষ্টি করে মাটি দেয়ার জন্য। সেচ্ছা সেবকসহ সিভিল পোশাকে প্রশাসনের বেশ কিছু কর্মকর্তাগণ মাটি দেয়ার কাজে শৃঙ্খলা আনতে সহযোগিতা করেন। এভাবেই অশ্র শিক্ত নয়নে হাজার হাজার মানুষের ও ভক্ত বৃন্দের ভালবাসার ভিতর দিয়ে ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) তার পিতার পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন। আমরা দুআ করছি মহান আল্লাহ পাক ওনাকে বিনা হিসাবে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করেন। আমীন॥