প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ ২য় সংখ্যা, আগষ্ট ২০১৭, শাওয়াল-জিলকদ ১৪৩৮ হিজরী, শ্রাবন-ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

সচেতন পিতা-মাতার পরিচয় হলো, সন্তানের সার্বিক বিষয়ের প্রতি লক্ষ রাখা। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, পিতা-মাতার অসচেতনতা, অদূরদর্শিতা এবং দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতার দরুন সন্তানদের দুনিয়া-আখেরাত সব বরবাদ হয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম ক্রমে দ্বীন-ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং প্রযুক্তির সয়লাবে গা ভাসিয়ে দিয়ে আখলাক-চরিত্র সব খোয়াতে বসেছে। এসব কিছুর পেছনে যে বিষয়টি রয়েছে তা হলো, সন্তানদের সময়মতো বিবাহ না দেওয়া। ছেলেমেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গেলে পিতা-মাতার দায়িত্ব হলো দ্বীনদার পাত্র-পাত্রী দেখে বিয়ে দিয়ে দেওয়া। ছেলেদের দাড়ি গজানোর দ্বারা আর মেয়েদের ঋতু শুরু হওয়ার দ্বারা পিতা-মাতাকে এ কথা বোঝানো হয় যে তাদের বিয়ের বয়স হয়ে গেছে, আর দেরি করা যাবে না। অতএব প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর দ্রুত সময়ের মধ্যেই তাদেরকে বিবাহ করিয়ে দেওয়া পিতা-মাতার কর্তব্য। এরপরও যদি না দেওয়া হয়, আর এ কারণে ছেলেমেয়ে কোনো গোনাহে লিপ্ত হয়, অন্য কারো সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে যায়, ইন্টারনেটে অশ্লীল ছবি দেখে, তাহলে এ গোনাহের দায়দায়িত্ব পিতা-মাতার ওপর বর্তাবে। হাদীস শরীফে আছে,

সন্তান জন্মগ্রহণের পর পিতা-মাতার দায়িত্ব হলো তার সুন্দর নাম রাখা এবং দ্বীন শিক্ষা দেওয়া, আর বালেগ হয়ে গেলে বিবাহ করিয়ে দেওয়া। যদি বালেগ হওয়ার পরও বিবাহ না করায়, আর সন্তান কোনো গোনাহে লিপ্ত হয়, তাহলে এর দায়ভার পিতার ওপরই বর্তাবে। (বায়হাকী, হাদীস নং ৮২৯৯)
অন্য একটি হাদীসে আছে, পিতা-মাতার ওপর সন্তানের হক্ব হলো, সুন্দর নাম রাখা, আকীকা করা, দ্বীন শিক্ষা দেওয়া, বালেগ হওয়ার পর বিয়ে দেওয়া। (কিতাবুল বিররি ওয়াস্ সিলাহ, হাদীস নং ১৫৫)

কাজেই পিতা-মাতার দায়িত্ব শেষ হবে সন্তানকে বিয়ে দেওয়ার পর। (আওলাদ কো মুসলামন বানানে কা তরীকা, ২৭৩)
অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয়, আজ মুসলিম উম্মাহ ইহুদি-খ্রিস্টানদের নানামুখী ষড়যন্ত্রের শিকার। এ দেশে যত এনজিও আছে, এর অধিকাংশই ইহুদি-খ্রিস্টানদের অর্থে পরিচালিত। তারা সমন্বিত প্রচেষ্টায় সরকারকে দিয়ে এ আইন পাস করিয়েছে যে ১৮ বছরের আগে কোনো মেয়ের বিয়ে দেওয়া যাবে না। তাদের ভাষায় এটা হলো “বাল্যবিবাহ”। অথচ মেয়েরা সাধারণত আরো চার-পাঁচ বছর আগেই বালেগা হয়ে থাকে। কিছুদিন আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একবার বলেছিলেন, এই আইনটা ১৬ বছরে করা হোক। কারণ মেয়েরা এতটা সময় (১৮ বছর) বসে থাকে না। পারিপার্শ্বিকতাসহ বিভিন্ন কারণে তাদের পক্ষে চারিত্রিক পবিত্রতা ধরে রাখা সম্ভবপর হয় না। বন্ধু-বান্ধবের হাত ধরে চলে যায়, নানা অঘটন ঘটায়। কিন্তু এনজিওদের হৈচৈয়ের কারণে সেটা আর সম্ভবপর হয়নি। এনজিওগুলো এই আইনটি পাস করিয়েছে মূলত যিনা-ব্যভিচারকে ব্যাপক করার জন্য। এর জন্য তারা মুড়ি-মুড়কির মতো দেদার জন্মবিরতীকরণ ট্যাবলেট ও বিভিন্ন উপকরণ সাপ্লাই দেয়। এরপরও কোনো মেয়ে যদি বিপদে পড়ে যায়, পেটে অবৈধ সন্তান চলে আসে-এর জন্য তারা ‘মেরি স্টোপস’ প্রতিষ্ঠা করেছে, যার কাজ হলো মাতৃসেবার ছদ্মনামে অবৈধ গর্ভপাতের নিরাপদ আলয় তৈরি করা। আর মুসলমানরা মনে করছে, আমাদের স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য সরকার কত রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। (হামারে আয়েলী মাসায়েল, ১৬০)

অপরদিকে এনজিওগুলো জনসাধারণের মস্তিষ্কে বিভ্রান্তির এক ভূত ঢুকিয়ে দিয়েছে যে ১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া যাবে না। আর বাপ-মা খাঁড়া করেছে দুই ভূত।

ক. এক হলো, পড়াশোনা শেষ করা, চাকরি ঠিক হওয়া। অনেক সময় দেখা যায় তাদের প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেটি বন্ধু-বান্ধবদের মাধ্যমে প্রস্তাব দেয়, আব্বা! আমি গোনাহ থেকে বাঁচার জন্য বিয়ে করার দরকার মনে করছি। আর বাপ-মা বলে, তোর তো এখনো লেখাপড়াই শেষ হয়নি, বিয়ে করে বউকে খাওয়াবি কোত্থেকে? (এর উত্তরে আমরা বলব,) কেন, সে কি পড়াশোনার পাশাপাশি দু-একটা টিউশনি করে কিছু রোজগার করতে পারবে না? যদি নাও পারে তাহলে আপনার প্রিয় রাসূল তো বলেই গেছেন,

একজনের খাবার দুজনের জন্য যথেষ্ট। দুজনের খাবার তিনজনের জন্য যথেষ্ট। (মুসলিম শরীফ, হাদীস নং-২০৫৯)
আপনার ফ্যামিলিতে দু-চারজন সদস্য অবশ্যই আছে , আরেকজন এলে কি তার জন্য ব্যবস্থা হবে না? অবশ্যই হবে। তো পড়ালেখা হলেই বিয়ে দিয়ে দেন। রিযিকের মালিক আল্লাহ।

খ. দ্বিতীয় ভূত হলো সিরিয়াল রক্ষা করা। যেমন-এক ছেলে দ্বীনদার, আল্লাহওয়ালাদের সোহবতে যায়। সে গোনাহ থেকে বাঁচার জন্য বিয়ে করতে চায়, কিন্তু সিরিয়ালে তিন নম্বরে। অর্থাৎ তার আগে আরো দুজন রয়ে গেছে। তখন বাবা-মা বলে, আরে! তোর আগে তো আরো দুজন রয়ে গেছে। তাদেরকে বাদ দিয়ে তোকে বিয়ে করাব কিভাবে? প্রিয় পাঠক! শরীয়তে কোনো সিরিয়াল নেই। যার যখন পাত্র/পাত্রী পাওয়া যাবে, বিয়ে দিয়ে দিতে হবে। এর বড় দলিল হলো, হযরত মূসা (আ.) যখন ফেরাউনের রাজত্ব থেকে সঙ্গোপনে হযরত শুআইব (আ.)এর দেশে হিজরত করলেন। আর শুআইব (আ.) তাঁর কন্যাদের কাছ থেকে হযরত মূসা (আ.)-এর দ্বীনদারির এ বর্ণনা শুনলেন যে আসার সময় কন্যারা যখন তাঁর আগে আগে চলে তাঁকে রাস্তা দেখাচ্ছিল তখন মূসা (আ.) তাদের বলেছেন যে তোমরা আমার পেছন পেছন আসো এবং পেছন থেকেই রাস্তা বাতলে দাও। এতে হযরত শুআইব (আ.) বুঝতে পারলেন, এই ব্যক্তি ভবিষ্যতে বড় কিছু হবেন। তখন তিনি হযরত মূসা (আ.)- কে প্রস্তাব পেশ করলেন- দেখো, আমার দুই মেয়ের মধ্যে যাকে তোমার পছন্দ হয় তাকে তোমার সাথে বিয়ে দেব। (সূরা কাসাস, ২৭)
দেখুন, তিনি বলেছেন,

‘আমার এই দুই মেয়ের কোনো একজন। এ কথা বলেননি, বড়জনকে বিয়ে দেব, বরং বলেছেন, দুজনের যাকেই তোমার পছন্দ হয়….। অথচ আমাদের দেশে সিরিয়াল রক্ষা করাকে জরুরি মনে করা হয়। ফলে সিরিয়াল ভেঙে কেউই ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিতে চায় না। এভাবে সময়মতো বিয়েশাদি না দেওয়ার কারণে আজ আমাদের ছেলেমেয়েরা বখে যাচ্ছে, ইন্টারনেটে যত পাপাচার আছে সেগুলো দেখে দেহ-মন সব নষ্ট করে ফেলছে। কাজেই সচেতন অভিভাবকদেরকে বলছি, আপনারা আপনাদের ছেলেমেয়েকে গোনাহ থেকে বাঁচান, মোবাইল, কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের অপব্যবহার থেকেও বাঁচান এবং সময়মতো বিবাহ দিয়ে তাদেরকে গোনাহমুক্ত ইসলামী যিন্দেগী যাপনের সুযোগ করে দিন। আল্লাহ তা’য়ালা আমাদেরকে সহজ-সরল ও পাপমুক্ত জীবন যাপন করার তাওফীক দান করুন। আমীন।