প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ ২য় সংখ্যা, আগষ্ট ২০১৭, শাওয়াল-জিলকদ ১৪৩৮ হিজরী, শ্রাবন-ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
মালিকের শ্রেষ্ঠত্বেই মূলত ঘরের শ্রেষ্ঠত্ব। বাড়ির সুপরিচিতি, সুখ্যাতি ও তার আভিজাত্য- কৌলীন্য নির্ভর করে মালিকের ওপর। যিকরে ইলাহী ও আল্লাহ তা’আলার ঘর হওয়ার সুবাদেই পৃথিবীর বুকে মসজিদ সবচেয়ে প্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ জায়গা। আর বায়তুল্লাহ শরীফের কি কোনো তুলনা হয়? তা শুধুমাত্র একটি ঘর নয় বরং পৃথিবীর বুকে প্রথম ইবাদতগাহ, তা শুধু ইসলামের মারকায নয় বরং ঐশী বাণীর প্রাণকেন্দ্র; সকল সৌন্দর্যের মূর্তপ্রতীক, হাজারো হৃদয়ের লালিত স্বপ্নের তীর্থভূর্মি হাবীবে খোদার এই জন্মভূমি।
মদীনা মুনাওয়ারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হিজরতের পূর্বে একটি কৃষিপ্রধান শহর ছাড়া আর কিইবা ছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হিজরতভূমি হওয়ার পর সে শহরের সম্মান ও মর্যাদা এতই বৃদ্ধি পেল, যে শহর একসময় মরুভূমি ছাড়া আর কিছুই ছিল না তা সেকালের-একালের ও সর্বকালের মুসলিম বিশ্বের স্বপ্নের নগরীতে পরিণত হয়ে গেল।
শহরটির প্রাচীন নাম ছিল ইয়াসরিব কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র বাসস্থান হওয়ায় তার নাম হয়ে যায় মদীনা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নূরানিয়াতে পরিণত হয় মুনাওয়ারায় (আলোকিত)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বরকতে মদীনা শরীফের বহু ফজীলতের কথা মুসলিম উম্মাহর সম্মুখে দৃশ্যমান। মদীনা শরীফের বহু নাম রয়েছে, যা তা মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। ওয়াফাউল ওয়াফা নামের গ্রন্থপ্রণেতা মদীনার প্রায় ৯৬টি নাম উল্লেখ করেছেন।
প্রিয় হাবীব মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুভাগমনে ইয়াসরিব নামক সাধারণ একটি জনপদ মদীনা মুনাওয়ারা (আলোকিত শহর) নামে ধন্য হয়ে অসাধারণ হয়ে উঠল।
আবহাওয়া হয়ে উঠল সুস্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব। সেই প্রিয় শহরটিতে বসবাস করা দুনিয়া-আখেরাতের সফলতা ও কামিয়াবীর বিশেষ মাধ্যম হয়ে গেল। সে শহরের বিপদ-আপদ ও কষ্টের ওপর ধৈর্যধারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শাফায়াত পাওয়ার উপায় হয়ে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হিজরতের বদৌলতে মদীনার প্রতিটি জিনিসে বরকতে বরকতে ভরে যেতে লাগল। এমনকি খাদ্যদ্রব্য, ফলমূল, শাক-সবজিসহ সর্বত্র বরকতের আমেজ বিরাজ করতে লাগল। তাঁর বরকতে সোনার মদীনায় তাউন তথা মহামারী রোগ ও দাজ্জালের প্রবেশ চিরতরে নিষিদ্ধ হলো। মদীনাবাসীর সাথে ধোঁকা ও চক্রান্তকারীর ব্যাপারে লবণের মতো গলে যাাওয়ার কঠিন ধমকি উচ্চারিত হলো। মদীনা শরীফে জীবনযাপন-মরণের বহু ফজীলত বর্ণিত হয়েছে।
মদীনা শরীফের ফল-ফলাদিতেই শুধু নয় বরং এই পবিত্র শহরের পবিত্র মাটিতেও রাখা হয়েছে শেফা ও আরোগ্যতা। মদীনার বাসিন্দাদের সাথে সদাচরণ ও মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহারের অসিয়ত করা হয়েছে। এমনকি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াাসাল্লাম) ঘোষণা করলেন, হযরত ইবরাহীম (আ.) পবিত্র মক্কা নগরীকে মর্যাদাপূর্ণ বানিয়েছেন এবং হারাম সাব্যস্ত করেছেন। আমি মদীনাকে মর্যাদাপূর্ণ বানিয়েছি এবং হারাম ঘোষণা করছি মদীনার দুই প্রান্ত্রের মধ্যবর্তী এলাকাকে। আর মদীনার পবিত্রতা ও সম্মানের দাবি হলো, মদীনা শহরের উপকণ্ঠে কোনো যুদ্ধ-কলহ ও রক্তপাত না করা, যুদ্ধের জন্য অস্ত্র হাতে না নেওয়া এবং গাছের পাতা না ছিঁড়া। (মুসলিম শরীফ, মদীনার ফজীলত অধ্যায় : ১৩৭৪)
পবিত্র মক্কার হারাম ও মদীনা শরীফের হারাম উভয়ের মধ্যে ফিকহী দৃষ্টিকোণে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও সম্মান ও মর্যাদার ক্ষেত্রে উভয় নগরী হারামাইন শরীফাইন হওয়ার ক্ষেত্রে কেউ দ্বিমত পোষণ করেননি। উপরন্তু মদীনা শরীফ নববী বাসস্থান হওয়ার সুবাদে যেভাবে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন হয়েছে এবং মদীনা শরীফের আনসারী সাহাবা ও মুহাজের সাহাবাগণ যেভাবে পৃথিবীজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করলেন তা আর কারো নিকট গোপন নয় বরং তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মোবারক মুখনিঃসৃত সেই ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তব প্রতিফলন, যা তিনি নিজ জীবদ্দশায় করে গিয়েছিলেন। তিনি ইরশাদ করেন, আমাকে এমন শহরে হিজরত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যে শহরটি সকল শহরের ওপর গালেব ও বিজয়ী থাকবে। (বুখারী শরীফ)
উপরোক্ত দীর্ঘ ভূমিকায় যে প্রশ্নগুলো উঠে আসে তা হলো, প্রাচীন ইয়াসরিব মদীনা মুনাওয়ারা (আলোকিত শহর) কেন হলো? কেনই বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শুভাগমনে তার মাটি এত পবিত্র হলো? কেনই বা তার পাক মাটি সম্মান ও মর্যাদার শীর্ষ চূড়ায় সমাসীন হলো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হিজরতের পূর্বেও তো সেখানে মানুষ জীবনযাপন ও মৃত্যুরবণ করত; কিন্তু কোন সুবাদে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হিজরতের পরে সেখানে জীবনযাপনও ইবাদত এবং মরণও ইবাদতে পরিণত হয়? তার প্রতিটি বালুকণা সূর্য্যতুল্য ও চন্দ্রতুল্যই বা কেন হলো? মুসলিম উম্মাহ তার মাটিকে চোখের সুরমা বানিয়ে রাখতে এত আনন্দবোধ ও গর্ববোধ করে কেন? মোদ্দাকথা, দিলে যতই প্রশ্ন জাগুক সব প্রশ্নের একটাই জবাব, সেই প্রাচীন ইয়াসরিব আর শুধু ইয়াসরিব নয় বরং তা মদীনাতুর রাসূলে পরিণত হয়েছে। এ শহর সেই মহামানবের শহরের মর্যাদা লাভে ধন্য হয়েছে।
যাকে কেন্দ্র করে এই বিশ্ব-মহাবিশ্বের সৃষ্টি। যাঁকে কেন্দ্র করে পৃথিবীজুড়ে যত সৌন্দর্য রয়েছে, জগৎজুড়ে যত আলো রয়েছে, যত ভালো রয়েছে, যত নূর-তাজাল্লীয়াত রয়েছে এককথায় সব কিছুই যাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি করা হয়েছে, সেই রাহমাতুল্লিল আলামীনের পদধূলি পেয়ে চির ধন্য হয়েছে।
হে ইয়াসরিব! হে মদীনা! যে মহিমান্বিত মহামানবের ওপর খোদ আল্লাহ তা’য়ালা ও মাসুম ফেরেশতা দরুদ পড়েন, যাঁর সামনে জিবরাইল (আ.) হাঁটু গেড়ে আদবের সাথে বসেন, সে হাবীব খোদার সান্নিধ্যে-সৌরভ পেয়ে চির খোশনসিব তুমি হে মদীনা! হে তাইয়্যেবা!!
যে মহামানব শুধু নবী ছিলেন না, নবীদের নবী, রাসূলদের রাসূল ছিলেন, শুধু কি তাই? খাতামুন নবীয়্যীন ছিলেন যিনি সেই রাহমাতুল্লিল আলামীনের, সেই পরশমণির পরশ- সৌভাগ্য লাভে চির ধন্য তুমি, চির ভাস্বর হে মদীনা মুনাওয়ারা! হে তাবা!!
যাঁর পবিত্র শানে বেয়াদবী, যার শানে গোস্তাখী করা কুফুরী ও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ; যার ইতাআত ও আনুগত্য ছাড়া হয় না আল্লাহর আনুগত্য-ইতাআত, যাঁর পূর্বে তাঁর মতো আসেনি কেউ, যাঁর পরে তাঁর মতো আসবে না কেউ, সেই তিনিই তোমাকে বানিয়েছেন আবাসস্থল, করে নিয়েছেন আপন হে মদীনাতুর রাসূল! তাই তো দেখা যায় দুনিয়ার সব আশেকান যায় ছুটে যায় তোমার পানে, তোমায় করে নিতে আপন। যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবদ্দশায় চর্মচক্ষু দ্বারা আল্লাহ তা’য়ালার দিদার ও শুভ দর্শন লাভে চির ধন্য হয়েছেন সেই জান্নাতী পুষ্পের সৌরভে তুমি চির সুরভিত! সেই বেহেশতী আলোয় তোমার অলিগলি আজ উদ্ভাসিত!! সেই দিদারে ইলাহী দ্বারা চির ধন্য মানবের দর্শন পেয়ে আজ তুমি চির সৌভাগ্যবান!! তাই তো তোমার দর্শন লাভে ধন্য হতে ছুটে যান সহ¯্র কোটি আশেকান।
মোদ্দাকথা, সরকারে দু আলম বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত, মুহসেনে আযম রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হিজরতভূমি ও আবাসভূমি হওয়াতেই মদীনা তোমার সর্বত্রে চলছে জয়গান!
হে মদীনা তাইয়্যেবা! আমাদের নিরাশ্রয় নবীজিকে তুমি আশ্রয় দিয়েছিলে বলেই তোমার চারদিকে ঝলমল করছে শুধু নূর আর নূর! তোমার বাসিন্দা আনসারী সাহাবাগণ ভেসে গেলেন নূরের জোয়ারে!! ডুবে গেলেন নূরের সাগরে!! তাই তো বারবার মনের পর্দায় ভেসে ওঠে গাযওয়ায়ে হুনাইনে দেওয়া পেয়ারা হাবীবের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ, যার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি কথা আনসারী সাহাবাগণের প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গভীর ভালোবাসার মূর্তপ্রতীক ও চির ভাস্বর হয়ে আছে।
হুনাইন যুদ্ধে মুসলমানদের প্রচুর পরিমাণ গনীমতের মাল হস্তগত হয়, যাতে আনসারে মদীনার ন্যায্য অধিকার ছিল। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমস্ত মাল কোরাইশদের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে আনসারে মদীনার (রা.) মধ্য থেকে কেউ কেউ তাতে গভীর বেদানাহত হলেন, কেউ কেউ তো বলেই ফেললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয়তো নিজ কওমের সাথে মিলে গেলেন, আমাদের ছেড়ে হয়তো মক্কায় থেকে যাবেন? যখন আনসারে মদীনা (রা.)- এর এই মনোভাবের কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুনলেন, তখন তিনি দরদপূর্ণ এক ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, “বলো হে মদীনার আনসার! তোমরা কি খুশি নও যে অন্যরা ফিরে যাবে গনীমতের মাল নিয়ে, আর তোমরা ফিরে যাবে তোমাদের ঘরে রাসূলুল্লাহকে সঙ্গে করে!
শোনো হে আনসারে মদীনা! আমার জীবন তোমাদের মাঝে, আমার মরণ তোমাদের মাঝে। সে সত্তার শপথ করে বলছি, যার কুদরতী হাতে মুহাম্মদের জান রয়েছে! নিশ্চয়ই তোমরা সঙ্গে করে যা নিয়ে যাবে তা, অন্যরা যা নিয়ে যাবে তার চেয়ে সহ¯্র হাজার গুণ উত্তম। হে আল্লাহ! রহম করো আনসারদের! রহম করো তাদের সন্তানদের! রহম করো সন্তানদের সন্তানদের!” বর্ণনায় রয়েছে আনসারী সাহাবাগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আবেগপূর্ণ ভাষণ শুনে এত বেশি ক্রন্দন করেছিলেন, যার আবেগ অশ্রুর প্লাবণে তাঁদের দাড়ি পর্যন্ত ভেসে গিয়েছিল এবং সকলে সমস্বরে একবাক্যে বলে উঠলেন,
“বণ্টনে প্রিয় হাবীব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পেয়ে আমরা চির সন্তুষ্ট! চির সুখী!! চির ধন্য!!”
রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ জীবদ্দশায় যেমন সমস্ত মুসলমানের মোহব্বত ও আযমাতের মারকায ছিলেন, তদ্রুপ মৃত্যুর পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রওজা মোবারকও সমস্ত মুসলমানের মোহাব্বত ও আযমাতের মারকায ও প্রাণকেন্দ্র হয়ে আছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রওজা মোবারকের ফজীলত
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ.) নিজ নিজ কবরে জীবিত রয়েছেন। এ আকীদার ওপর জমহুর আইম্মায়ে কেরাম ঐকমত্য পোষণ করেছেন। পবিত্র মদীনার পূণ্যভূমির যে অংশে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মোবারক শরীর শায়িত রয়েছে সে অংশ পৃথিবীজুড়ে সর্বোত্তম ও সর্বোৎকৃষ্ট, এমনকি কাজী আয়াজ (রহ.) ইজমা নকল করেছেন যে, সে অংশ কা’বা থেকেও উত্তম।
রওজা মোবারকের জিয়ারতের ফজীলত
মাওলানা মানযূর নোমানী (রহ.) লিখেছেন, জমহুর আইম্মায়ে কেরাম এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহ সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরাম নিজ নিজ আলোকিত কবরে জীবিত রয়েছেন যদিও জীবনের ধরন নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। বিভিন্ন রেওয়ায়াত ও উম্মতের বুজুর্গ ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতার আলোকে এ কথা প্রমাণিত যে কোনো উম্মতি যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবর মোবারকে উপস্থিত হয়ে সালাম পেশ করে তখন রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সালাম শুনে থাকেন এবং জবাবও দেন। সুতরাং বলা যেতে পারে যে ওফাতের পরে রওজা মোবারকে উপস্থিত হওয়া ও সালাম পেশ করা যেন এক বিবেচনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে হাজির হয়ে সরাসরি সালাম বিনিময় করার একটি রূপ। নিশ্চয়ই একটি এমন সৌভাগ্য, যেকোনো উপায়ে এই সৌভাগ্য অর্জন করার জন্য প্রত্যেক মুমিন বান্দা একান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। (মা’আরিফুল হাদীস : ৪৫৮/৪)
শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দেসে দেহলভী (রহ.) স্বরচিত কিতাব ‘জাযবুল কুলূব ইলা দিয়ারিল মাহবুব’ এ রওজা শরীফের জিয়ারতের ফজীলতবিষয়ক প্রায় ১৩টি রেওয়ায়াত জমা করেছেন, যদিও কিছু রেওয়ায়াতের কালাম রয়েছে। সে বিষয়ে মাওলানা মানুযুর নোমানী (রহ.) বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রওজা মোবারকের জিয়ারতে যেসব উপকারিতা, বরকত ও কল্যাণের কথা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে তা সামনে রেখে যদি সেসব চিন্তা-গবেষণা করা হয়, যেসব হাদীস শরীফে জিয়ারতের উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে তাহলে যদিও সনদের দিক দিয়ে এগুলোর ওপর কালাম করা যেতে পারে; বিষয়গত দিক দিয়ে এগুলোর দ্বীনি চিন্তা-চেতনা ও রীতি-নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হবে এবং বুদ্ধি-বিবেচকসম্পন্ন ব্যক্তিমাত্রই এ কথার সাথে সন্তুষ্টচিত্তে সহমত পোষণ করবেন যে জিয়ারতে কবরের মাধ্যমে কবরে শায়িত মহান সত্তা রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ঈমানী সম্পর্ক ও দিলী মোহাব্বত কল্পনাতীতভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং তা দ্বীনি উন্নতির বিশেষ উসিলা হবে। আমার বিশ্বাস, প্রত্যেক ভাগ্যবান ঈমানদার ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তা’য়ালা জিয়ারতের তাওফীক দান করেছেন তিনি উপরোক্ত সাক্ষ্য দেবেন। (মা’আরিফুল হাদীস: ৪৫৯/৪)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রওজা মোবারক জিয়ারতের হুকুম :
আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ.) যেহেতু কবরে যিন্দা রয়েছেন তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও নিজ কবর মোবারকে জীবিত রয়েছেন। আর এ কারণেই পবিত্র কবরের জিয়ারত প্রচুর ফজীলতপূর্ণ সাব্যস্ত হয়েছে। উপরোক্ত রেওয়ায়াতের আলোকে রওজায়ে মোবারকের জিয়ারত আহনাফের নিকট ওয়াজিবের কাছাকাছি। পক্ষান্তরে জমহুর উলামায়ে কেরামের নিকট মুস্তাহাব আর কিছু মালেকী ও জাহেরীদের নিকট ওয়াজিব।
মোল্লা আলী কারী (রহ.) কাজী আয়াজ মালেকী (রহ.) এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “সকল মুসলমানের ঐকমত্য রায় হলো, রওজায়ে মোবারকের জিয়ারত সুন্নাত। তাতে এমন ফজীলত রয়েছে, যার অর্জনের প্রতি প্রত্যেক মুসলমানের আগ্রহ থাকা উচিত।” (শরহুশ শেফা : ১৫০/২)
সুতরাং সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের দৃঢ়সংকল্প করা উচিত যখনই সুযোগ হবে, রওজায়ে আকদসের জিয়ারত করব। যাঁরা হজে যান তাঁদেরও উচিত রওজা শরীফের জিয়ারত করা এবং রওজা শরীফের জিয়ারতের নিয়্যাতেই মদীনা শরীফের সফর করা। যদিও তা হজের কোনো রুকন না হয়। কেননা সেই সূচনালগ্ন থেকেই উম্মতে মুসলিমার এ আমল চলে আসছে। বিশেষ করে দূর-দূরান্ত থেকে আসেন যাঁরা রওজায়ে পাকের জিয়ারত ও দরুদ ও সালাম পেশ করে চির সৌভাগ্যবান হন তাঁরা। আর এ তা’আমুলের বিরুদ্ধে কারো মতামত পাওয়া যায় না বিধায় তা ইজমার পর্যায়ে। ই’লাউস সুনানের টীকায় রয়েছে, যেসব ব্যক্তি জিয়ারতে রওজায়ে মোবারককে মাকরুহ কিংবা নিষিদ্ধ বলেছেন তাঁদের বিষয়ে মোল্লা আলী কারী (রহ.) বলেন, “জিয়ারতবিষয়ক বহু রেওয়ায়াত রয়েছে এবং তার ফজীলতও মাশহুর। সুতরাং যাঁরা ইনকার করেছেন এবং নিষিদ্ধ মাকরুহ বলেছেন, তাঁরা মূল জিয়ারত ও তার ফজীলতকে অস্বীকার করেননি বরং তাতে যেসব বিদ’আত ও গর্হিত কাজ হতে দেখা যায়, যা গোনাহে কবিরার দিকে নিয়ে যায় তাকে অস্বীকার করেছেন।” (মিরকাতুল মাফাতীহ : ১৯৭/৩)
তবে হাজীদের জন্য উত্তম হচ্ছে, প্রথমে হজ পূর্ণ করা, অত:পর মদীনা মুনাওয়ারার জিয়ারতে যাওয়া। কেননা হজ হলো ফরয, আর জিয়ারত হলো ওয়াজিবের কাছাকাছি। সুতরাং আল্লাহর হককে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। হযরত হাসান (রহ.) ইমামে আজম আবু হানীফা (রহ.) থেকে নকল করেন তিনি বলেন, “যদি হজ ফরয হয় তবে তার জন্য উত্তম হলো, প্রথমে হজের কাজসমূহ পূর্ণ করা, অত:পর জিয়ারত। যদিও প্রথমে জিয়ারত করার মধ্যে কোনো গোনাহ হবে না এবং তাতে কোনো অসুবিধা হবে না; পক্ষান্তরে হজ যদি নফল হয় তবে তবে পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে যে জিয়ারত কিংবা হজ যেকোনো একটি দিয়ে শুরু করতে পারবে।”
শরয়ী দৃষ্টিকোণে রওজায়ে আকদাসের জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর :
ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, শুধু কবর মোবারকের উদ্দেশ্যে সফর করা নাজায়েয। তিনি বলেন, মসজিদে নববীতে নামায আদায়ের উদ্দেশ্যে সফর করবে, অত:পর রওজায়ে মোবারকের জিয়ারত করবে, শুধু রওজায়ে মোবারকের উদ্দেশ্যে সফর করবে না। বক্তব্যটি একান্ত তাঁর নিজস্ব। জমহুর উলামায়ে কেরাম বলেন, রওজায়ে মোবারকের উদ্দেশ্যে সফর করা শুধু কি জায়েয বরং তা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতও বটে এবং বড় সাওয়াবের কাজ। কেননা রওজায়ে মোবারকের জিয়ারতের ফজীলতসম্বলিত বহু রেওয়ায়াত বর্ণিত রয়েছে। দ্বিতীয়ত, পুরো উম্মতে মুসলিমার ধারাবাহিক আমল চলে আসছে যে, প্রত্যেক হাজী বায়তুল্লা শরীফের এক রাক’আত এক লাখ রাক’আতের মত সাওয়াবকে ছেড়ে চারশ মাইল দূরে মদীনা মুনাওয়ারাতে ছুটে যায়, শুধু কি মসজিদে নববীতে নামায আদায় করতে বরং তাদের নিয়্যাতে এটাই থাকে তারা রওজা মোবারকের জিয়ারত করবে। তা’আমুলও একটি স্বতন্ত্র দলিল। তাই তো ইবনুল হুমাম (রহ.) বলেন, “আমার নিকট উত্তম হলো, খালেস জিয়ারতের নিয়্যাত করবে। কেননা হাদীসের ভাষ্য থেকে সেটাই বোঝা যায়।” (ফাতহুল কাদীর : ১৮০/৩)
শায়খুল হাদীস মাওলানা খলীল আহমদ সাহারানপুরী (রহ.) উলামায়ে দেওবন্দের মাসলাক বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আমাদের ও আমাদের মাশায়েখের নিকট সৈয়্যদুল মুরসালিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের (আমার জীবন তাঁর ওপর কোরবান হোক) কবর মোবারকের জিয়ারত সর্বোচ্চ নৈকট্য, বহু সাওয়াব ও মর্যাদা অর্জনের উৎকৃষ্ট মাধ্যম এবং তা ওয়াজিবের নিকটবর্তী। সুতরাং তার জন্য সফর করা ও জান-মাল খরচ করার তাওফীক হোক আমাদের। সফরের সময় জিয়ারতের নিয়্যাত করা উচিত।
রওজা মোবারকে দরুদ ও সালাম :
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “যে কেউ আমার নিকট সালাম প্রেরণ করে আল্লাহ তা’য়ালা আমার রুহকে ফিরিয়ে দেন, অত:পর আমি সালামের জবাব দিয়ে দিই।” (আবু দাউদ : ২০৪১, কবর জিয়ারতের অধ্যায়)
উপরোক্ত রেওয়ায়াতটিতে রওজা মোবারকের কথা স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ না থাকলেও আবু দাউদের মুসান্নিফ (রহ.) রেওয়ায়াতটিকে জিয়ারতুল কুবুর অধ্যায়ে নিয়ে এসেছেন। তা থেকে এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সমীপে সালাম দেওয়ার অর্থ হলো, রওজা মোবারকের জিয়ারতের সময় সালাম দেওয়া। এর সমর্থনে বায়হাকী শু’আবুল ঈমানে অন্য একটি রেওয়ায়াত পাওয়া যায়। আর তা হলো,
“যখনই কোনো বান্দা আমার রওজায় এসে আমার সমীপে সালাম পেশ করবে।” (শু’আবুল ঈমান : ৩৮৫৯)
মোদ্দাকথা, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এমন নিযাম করে দিয়েছেন যে কেউ যদি রওজা মোবারকে সালাম দেয় তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা শোনেন এবং ওয়াআলাইকাস সালাম বলে তার জবাবও প্রদান করেন। এ হিসেবে বলা যেতে পারে রওজা মোবারকে সালাম পেশ করার মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সরাসরি কথা বলার মতো মর্যাদা অর্জন হয়। যে নিয়ামত পুরো পৃথিবী কেন, অনুরূপ চার-পাঁচটি পৃথিবীর বদলায় অর্জন হলেও একজন উম্মতির জন্য তা সস্তাই বলতে হবে।
শাহ সাহেব (রহ.)-এর মুশাহাদা ও পর্যবেক্ষণ :
হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলভী (রহ.) হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগাতে উপরোক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, “পবিত্র রুহ, যা একমাত্র আল্লাহ তা’আলার মুশাহাদায় মশগুল। কোনো দিকে কোনো ধরনের ভ্রুক্ষেপ পর্যন্ত যাঁর অবশিষ্ট নাই সে রুহ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অনুমতি সাপেক্ষে সালামদাতার দিকে মনোযোগী হয়ে সালামের জবাব প্রদান করেন এবং সালাম পেশ করনেওয়ালা ফয়ুযাত লাভে ধন্য হন।”
শাহ সাহেব (রহ.) বলেন, আমি ১১৪৪ হিজরীতে যখন মদীনা মুনাওয়ারাতে অবস্থান করছিলাম তখন বারবার রুহে নববীর ফয়ূযাত পর্যবেক্ষণ করেছি। (রাহমাতুল্লাহিল ওয়াসি’আ : ৩৪৫/৪)
আল্লামা সাখাভী (রহ.) স্বরচিত গ্রন্থ “আলকাউল বাদী”-এর মধ্যে রওজা শরীফে পেশ করা সালাম সম্পর্কিত কিছু ঘটনা বর্ণনা করেছেন তা থেকে কিছু নি¤েœ উল্লেখ করা হলো। সাথে রয়েছে আরো দুটি ঘটনা। যথা –
১. সোলাইমান ইবনে সাহীম (রহ.) বলেন, আমি স্বপ্নযোগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জিয়ারত করেছি। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম -ইয়া রাসূলুল্লাহ! যেসব ব্যক্তি আপনার রওজা শরীফে হাজির হন এবং আপনার দরবারে সালামের নাযরানা পেশ করেন আপনি কি তা বোঝেন ও অনুভব করতে পারেন? তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিউত্তরে বললেন, “হ্যাঁ, আমি তা শ্রবণ করি এবং তার জবাবও দিয়ে থাকি।”
২. ইবরাহীম ইবনে শায়বান (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি হজ করলাম, অতঃপর হজ থেকে ফারেগ হয়ে মদীনায় গমনপূর্বক রওজা শরীফে উপস্থিত হয়ে যখন সালামের নাযরানা পেশ করলাম তখন রওজা শরীফ থেকে ওয়াআলাইকাস সালামের আওয়াজ শুনতে পেলাম।” (আল কাওলুল বাদী’ফীস সালাতি আলাল হাবীবিশ শফী : ১৬৫/১)
৩. সৈয়দ আহমদ কবীর রিফায়ী (রহ.) যিনি খাজা আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর সমকালীন ছিলেন। বর্ণিত আছে, তিনি যখন ৫৫৫ হি. হজব্রত পালন করেন এবং রওজা শরীফে হাজির হয়ে আরজ করলেন,
হে নানাজান! আসসালামু আলাইকুম।
তখন রওজা শরীফ থেকে জবাব এল
ওয়ালাইকুমুস সালাম, হে আমার প্রিয় ছেলে!
