প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ ২য় সংখ্যা, আগষ্ট ২০১৭, শাওয়াল-জিলকদ ১৪৩৮ হিজরী, শ্রাবন-ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

দিনকতেক আগে আমাদের কাছে একটি ফোন আসে। এক ভদ্রলোক জানতে চান ট্রেতে করে খানা পরিবেশন করলে দস্তরখানা বিছানোর প্রয়োজন আছে কি না? অনেকে বলেছেন, আমরা যে পাত্রে খানা খাই সেটাই দস্তরখানা। পাত্রের নিচে যে কাপড়, চামড়া, প্লাস্টিক বা রেক্সিন দস্তরখান হিসেবে বিছানো হয় বাস্তবে তা দস্তরখান নয়।

দস্তরখান মুসলিম সমাজে এমন নতুন কোনো বস্তু নয়, যা ব্যাখ্যা করে বোঝানোর প্রয়োজন পড়ে। যুগ যুগ ধরে এই সুন্নাতের ওপর আমল চলে আসছে। এ ক্ষেত্রে নতুন করে যে ব্যাখ্যা পেশ করা হচ্ছে, এর সঠিকতা কী সেটাই ভাবনার বিষয়। যারা দস্তরখানের সুন্নাত আদায়ে অভ্যস্ত নয়, তাদের কথা বাদই দিলাম, কিন্তু যারা এ সুন্নাত দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে আছে তাদেরকে সন্দিহান করে তোলার মাঝে অন্তত দ্বীনি কোনো স্বার্থ থাকতে পারে না। দস্তরখানের এমন ব্যাখ্যা অতীতের কোনো ফিকাহ-ফাতওয়ার কিতাবে বহু চেষ্টা করেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুরাতন বিষয়ে নতুন ব্যাখ্যা আর কতটুকু গ্রহণযোগ্য হতে পারে? ফকীহুল মিল্লাত মুফতী আব্দুর (রহ.) বলতেন, পুরাতন বিষয়ে নতুন কোনো মুহাক্কিকের কথা মানা হবে না। তাঁর এ দৃষ্টিভঙ্গিটি যে কত সুদূরপ্রসারী ও দূরদর্শী ছিল ক্ষণে ক্ষণে তা সকলে উপলব্ধি করতে পারবে। বস্তুত পুরাতন বিষয়ে নতুন তাহকীক মুসলিম সমাজে দ্বিধাবিভক্তি ছাড়া বেশি কিছু উপহার দিতে পারেনি।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দস্তরখান :

আমরা যে পাত্রে খানা খাই তা দস্তরখান নয়। দস্তরখান থালা-বাসন ভিন্ন স্বতন্ত্র একটি বস্তুর নাম। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দস্তরখান দেখে আমরা অন্তত এটা বুঝতে পারি। দস্তরখান বিষয়ে প্রসিদ্ধ হাদীস যার শেষাংশে বলা হয়েছে,

হযরত কাতাদাহ (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, তবে তাঁরা কিসের ওপন খানা খেতেন? তিনি বললেন, দস্তরখানের ওপর। (বুখারী, তিরমিযী)

এখানে সুফরা শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যা খাবারের পাত্রভিন্ন একটি বস্তু। খাবারের পাত্রের জন্য হাদীসে ব্যবহৃত শব্দ হচ্ছে, ইত্যাদি।
অপর একটি হাদীস যাতে উম্মুল মুমিনীন হযরত সফিয়্যা (রা.)-এর ওলীমার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে তাতে বলা হয়েছে,

হযরত বেলাল (রা.)-কে দস্তরখান বিছানোর নির্দেশ দেওয়া হলে তা বিছিয়ে দেওয়া হলো। অতঃপর এর ওপর খেজুর পনির ও ঘি ঢেলে দেওয়া হয়। (বুখারী) এখানে শব্দটি দস্তরখানের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যা থালা-বাসন থেকে ভিন্ন একটি বস্তু।
এক হাদীসে এসেছে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবী হযরত যাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.)-কে সঙ্গে করে নিজ গৃহে প্রবেশ করে কিছু খাবার দিতে বললেন। ঘর থেকে তিনটি রুটি দেওয়া হলো। বর্ণনাকারী বলেন,

রুটিগুলো দস্তরখানের ওপর রাখা হলো। (মুসলিম) এখানে শব্দ দস্তরখানের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যা থালা-বাসনের মতো কোনো পাত্র ছিল না বরং তা ছিল ভিন্ন একটি বস্তু।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আমার খালা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গুই, পনির ও দুধ হাদিয়া পাঠালেন, অতঃপর সকলকে তা খেতে আহ্বান করা হলো। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দস্তরখানে এগুলো খাওয়ানো হলো। তবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপছন্দ করে ভক্ষণ থেকে বিরত থাকলেন। (বুখারী) এই হাদীসের মাঝে বলে দস্তরখানের যে উল্লেখ রয়েছে তা কিন্তু থালা-বাটি বা প্লেট-বাসন জাতীয় কোনো পাত্র নয় বরং স্বতন্ত্র একটি বস্তু। অতএব বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফের উল্লিখিত হাদীসগুলোর মাঝে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দস্তরখান যেভাবে চিত্রায়িত হয়েছে তা থেকে এ কথা সহজেই অনুমান করা যায় যে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দস্তরখান প্লেট-বাসন বা থালা-বাটি জাতীয় কোনো পাত্র ছিল না। তাই এ ধরনের পাত্র দ্বারা দস্তরখানের সুন্নাত আদায় হতে পারে না।

দস্তরখানের সংজ্ঞা :

হাদীস শরীফে দস্তরখানের অর্থে চারটি শব্দ ব্যবহার হতে দেখা যায়, এর একটিও পাত্রজাতীয় নয়। বরং বিছানাজাতীয় বস্তু। যথা-
অর্থ দস্তরখান। অর্থ চামড়ার বিছানা। অর্থ উল বা পশমে মোটা কাপড়। অর্থ দস্তরখান। তবে এর মাঝে দস্তরখানের অর্থ সবচেয়ে স্পষ্ট এবং স্বতন্ত্র শব্দ হচ্ছে । অধিকাংশ হাদীসে দস্তরখানের আলোচনায় এই শব্দটিই ব্যবহৃত হয়েছে। ইমাম বুখারী (রহ.) ও ইমাম তিরমিযী (রহ.) সহ অন্য মুহাদ্দিসগণ দস্তরখানের অধ্যায়ে শব্দ ব্যবহৃত হাদীস উল্লেখ করেছেন। দস্তরখানের হুকুম আলোচনা করতে গিয়ে পরবর্তী মুহাদ্দিস ও ফকীহগণ শব্দকেন্দ্রিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পেশ করেছেন।

তা ছাড়া বাকি তিনটি শব্দ তথা একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন এর অর্থ লিখতে গিয়ে বলা হয়েছে,
অর্থাৎ শব্দটির অধিকাংশ ব্যবহার ওই চামড়ার বিছানার বেলায় হয়ে থাকে, যার ওপর আসামিকে কতল করা হয়।
এর অর্থ লেখা হয়েছে,

অর্থাৎ ওই টেবিল, যার ওপর খাদ্য ও পানীয় রাখা হয়েছে। অথবা খাবারকেও বলা হয়। বোঝা গেল দস্তরখানের অর্থে এ সকল শব্দ অস্পষ্ট। তাই দস্তরখানের আলোচনায় শুধুমাত্র শব্দটির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ স্থান পেয়ে থাকে।

সুফরা কাকে বলে :

এখানে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের বাস্তব জীবনের নমুনা উল্লেখ করা যেতে পারে।

হযরত কাতাদা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, তবে তারা কিসের ওপর খাবার খেতেন? তিনি বললেন সুফরার ওপর। (বুখারী, তিরমিযী)
এ হাদীস থেকে বোঝা যায় যে সুফরার ওপর রেখে খানা খাওয়া নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দায়েমী আমল বা সাধারণ অভ্যাস ছিল। অতএব প্রত্যেক খাদ্যের আলোচনায় ভিন্ন ভিন্ন করে সুফরার উল্লেখ নিস্প্রয়োজন।

অভিধানে সুফরা :

সুফরা ওই বস্তুকে বলা হয়, যার ওপর খানা খাওয়া হয়। যেহেতু আহারের সময় তা বিছানো হয় তাই এটাকে সুফরা বলা হয়। অন্যত্র বলা হয়েছে,

যার ওপর খাবার বিছানো হয়। এতে বোঝা যায় সুফরা এমন বস্তু, যা মাটিতে বিছানো যায় এবং এর ওপর খাবার বিছানো যায়।
মুহাদ্দিসীনের মতে ‘সুফরা’ হলো,

ওই খাবার, যা মুসাফির তার সাথে নিয়ে থাকে। অধিকাংশ সময় তা কোনো চামড়ার ভেতর রাখা হতো। এভাবে খাবারের নামে ওই চামড়ার নামকরণ করা হয়েছে। (ফতহুল বারী ও উমদাতুল ক্বারী)
বোঝা গেল সুফরা এমন চামড়া, যার ভেতর খাবার পেঁচিয়ে রাখা যায়।
মোল্লা আলী কারী (রহ.) কৃত মিশকাত শরীফের প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যাগ্রন্থ মিরকাতে আছে,

সুফরা (দস্তরখান) ওই খাবারকে বলা হয়, যা মুসাফির সঙ্গে নেয়। অধিকাংশ সময় ওই খাবার এক ধরনের গোলাকৃতির চামড়ায় বহন করা হতো । এভাবে খাবারের নাম চামড়ায় স্থানান্তরিত হয়ে তার নামকরণ করা হয় সুফরা। অতঃপর যে বস্তুর ওপর খাবার রাখা হয় সেটাই দস্তরখান হিসেবে প্রসিদ্ধ লাভ করে। (মেরকাত ৮/১২) বোঝা গেল সুফরা/দস্তরখান মূলত এমন চামড়া, যাতে খাবার পেঁচিয়ে বহন করা সম্ভব। উপরন্তু চামড়া না হয়ে কার্যকরিতার দিক থেকে চামড়ার মতো অন্য কোনো বস্তু হলেও তা দস্তরখান হতে পারে। যেমন – কাপড়, রেক্সিন ইত্যাদি। এগুলোর ভেতরও খাবার পেঁচিয়ে বহন করা সম্ভব।
আল্লামা ইবনুল আরাবী (রহ.) বলেন,

সুফরা/দস্তরখান ওই সকল বিছানো বস্তুকে বলে, যার ওপর আহারের জন্য এমন খাবার পরিবেশন করা হয়, যা তরল, তৈলজাতীয় বা পানীয় নয়। পক্ষান্তরে যদি খাবার এমন তরল ধরনের হয় তবে তা খাবার পাত্রের নামও ভিন্ন হবে। (আরিযাতুল আহওয়াযি ৭/২০১৭)

এখানে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হলো যে সুফরা/দস্তরখান এমন বিছানো বস্তু, যাতে তরল খাবার খাওয়া যায় না, এটা শুধুমাত্র শুকনা খাবার খাওয়ার উপযোগী। আর তরল খাবারের উপযোগী পাত্রের নাম সুফরা নয়।

পাত্র বনাম সুফরা :

উল্লিখিত আলোচনায় সুফরা/দস্তরখানের যে বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠল তা থালা-বাটি ইত্যাদি খাবারের পাত্রের মাঝে পাওয়া যায় কি না একটু তুলনা করে দেখা যাক।

(ক) সুফরার মাঝে খাবার পেঁচিয়ে রাখা যায়, বহন করা যায় যেমনটি উল্লেখ হয়েছে ফাতহুল বারী এবং মেরকাত গ্রন্থে। পক্ষান্তরে থালা-বাটি ইত্যাদি পাত্রে কোনো কিছু পেঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

(খ) সুফরা/দস্তরখান বিছানো ও গুটানো যায় যেমনটি লিসানুল আরব অভিধানে বলা হয়েছে। পক্ষান্তরে থালা-বাসন ইত্যাদি পাত্র বিছানো ও গুটানোর মতো বস্তু নয়।

(গ) সুফরা/দস্তরখান এমন বিছানা জাতীয় বস্তু, যা শুধুমাত্র শুকনা খাবার রেখে খাওয়ার উপযোগী তরল খাবারের উপযোগী নয়। যেমনটি বলেছেন আল্লামা ইবনুল আরবী (রহ.)। পক্ষান্তরে থালা-বাটি ইত্যাদি পাত্র তরল খাবার রেখে খাওয়ার উপযোগী। সুতরাং এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে আমরা যে সকল পাত্রে খানা খাই তা সুফরা/দস্তরখানের সংজ্ঞাভুক্ত হতে পারে না। পাত্রের নাম দস্তরখান নয়। ইবনুল আরবী (রহ.) যা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন যে তরল জাতীয় খাবার রাখার উপযোগী পাত্রের নাম ভিন্ন। হাদীসের ভাষায় এর নাম হতে পারে ইত্যাদি। দেশীয় ভাষায় বলতে পারি থালা, বাসন, প্লেট, বাটি ইত্যাদি। অতএব এ সকল পাত্রে খানা খেলে দস্তরখানে খাওয়া হয়েছে বলা যাবে না।

পাত্রের নিচে দস্তরখান :

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক সময় শুকনা ও তরল খাবার একসাথে খেয়েছেন।

ঘটনা-১. একটি প্রসিদ্ধ দাওয়াতের ঘটনা বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে উল্লেখ হয়েছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এক সাহাবী ছিলেন পেশায় দর্জি। একদা তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দাওয়াত করলেন। সঙ্গে হযরত আনাস (রা.)ও গেলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে জবের রুটি এবং কদু ও শুকনা গোশতের ঝোল পেশ করা হলো। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাটির আশপাশ থেকে বেছে বেছে কদুর টুকরা খেতে লাগলেন। (বুখারী, আবু দাউদ)

এ ঘটনায় দেখা যায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে রুটি এবং ঝোলের বাটি রাখা হয়েছে। সাধারণত এভাবে খাওয়ার সময় বাটি দস্তরখানেই রাখা হয়, এটাই স্বাভাবিক। এতে বোঝা যায় খাবারের পাত্র দস্তরখানের ওপর ছিল আর পাত্রের নিচে দস্তরখান ছিল।

ঘটনা-২. অপর হাদীসে এসেছে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর খালা হযরত উম্মে হুফাইদ (রা.)-একদা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পনির, ঘি এবং গুই হাদিয়া পাঠান। অপর বর্ণনায় ঘি-এর স্থলে দুধ উল্লেখ হয়েছে। এই তিনটি বস্তুই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দস্তখানে পেশ করা হয়। তিনি দুধ পান করেন এবং পনির খান তবে গুই থেকে বিরত থাকেন। (বুখারী ৫৩৮৯,৫৪০২)

উল্লিখিত তিনটি খাবারের মাঝে দুধ নিশ্চয়ই বাটিতে ছিল এবং বাটিসহই তা দস্তরখানে পেশ করা হয়েছে। রয়ে গেল পনির এবং গুইসাপ। আর আরবের গুইসাপ, যা হাদীসের ভাষায় সেটা আমাদের দেশের গুইসাপের মতো নয়। আরবের অনেক লোক এই প্রাণীটি খেত। তবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘৃণাভরে তা পরিহার করেছিলেন। এমন একটি অপছন্দীয় প্রাণীর গোশত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দস্তরখানে রাখা হলো সাথে পনিরও আছে। তাহলে নিশ্চয়ই এখানে দুটি ভিন্ন পাত্র ছিল, দস্তরখানে একসাথে ঢেলে রাখা হয়নি। তাই এ ঘটনা থেকে বোঝা যায় দস্তরখানের ওপর ভিন্ন ভিন্ন বাটিতে দুধ, পনির ও গুই রাখা হয়েছিল। পাত্রের নিচে ছিল দস্তরখান।

মায়েদা অর্থ দস্তরখান :

এই হাদীসের মাঝে দস্তরখানের জন্য শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যার এক অর্থ তথা টেবিল। অথচ অপর হাদীসে এসেছে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো টেবিলে খানা খাননি। এর সমাধান কী? হযরত শায়খ আহমদ আলী সাহারনপুরী (রহ.) বুখারী শরীফের টিকাকার বলেন, মূলত এখানে কোনো সংঘর্ষ নেই, কেননা এখানে অর্থ
সুফরা/দস্তরখান বা রুমাল ইত্যাদি যার ওপর খাবার রাখা হয় মাটি থেকে বাঁচানোর জন্য। কাঠ ইত্যাদি দ্বারা নির্মিত টেবিল এখানে উদ্দেশ্য নয়। (বুখারী-২/৮১১ টীকা : ১৩)

ঘটনা-৩. নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন হযরত আয়েশা (রা.)-এর ঘরে প্রবেশ করে খাবার চাইলেন। চুলায় গোশত রান্না হচ্ছিল। অতঃপর তাঁর কাছে রুটি এবং ঘরের সালুন পেশ করা হলো। তিনি বললেন, গোশত রান্না হতে দেখলাম মনে হয় পরিবারের লোকেরা বলল-জি হ্যাঁ, তবে সেটা বারিরাকে সদকা করা হয়েছিল তিনি আমাদেরকে হাদিয়া দিয়েছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সেটা ওর জন্য সদকা, আমাদের জন্য হাদিয়া। (বুখারী-৫৪৩০)
এখানে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুটি আর সালুন খেলেন। এখন সালুনের পাত্র কোথায় ছিল বলা হবে? দস্তরখানের ওপরে রুটির পাশে থাকাই তো স্বাভাবিক।

ঘটনা-৪. নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে নিজ গৃহে উপস্থিত হলেন, খাবার দিতে বললে তিনটি রুটি দস্তরখানে রাখা হলো। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি নিলেন জাবের (রা.)-কে দিলেন একটি আর তৃতীয়টি দুই টুকরা করে দুজন নিলেন। এরপর সালুন চাওয়া হলে সিরকা পেশ করা হলো। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
আনো আনো, এটা খুব ভালো সালুন। (মুসলিম-৫৩৫৫)

এখানে রুটি ছিল দস্তরখানে আর সিরকার পাত্র কোথায় রাখা হয়েছে বলা হবে? নিশ্চয়ই সেটাও দস্তরখানেই ছিল। তাহলে বোঝা গেল পাত্রের নিচে দস্তরখান আর দস্তরখানের ওপর পাত্র ছিল। পাত্র আর দস্তরখান ভিন্ন জিনিস।

দস্তরখানের ওপর পাত্র :

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উত্তম আখলাকের বিবরণ দিতে গিয়ে হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সাহাবীদের সাথে অবস্থান করছিলেন। আমি তাঁর জন্য খাবার তৈরি করতে লাগলাম, অন্যদিকে হাফসাও খাবার তৈরি করতে লাগলেন। হাফসার রান্না আগে শেষ হয়ে যেতে দেখে আমি খাদেমাকে বললাম-যাও, গিয়ে বাধা দাও, তার পেয়ালা যেন আগে পৌঁছাতে না পারে। সে গিয়ে দেখল হযরত হাফসা (রা.) তাঁর পেয়ালা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে পেশ করতে চাচ্ছেন। সে বাধা দিতে গেলে পেয়ালাটি ভেঙ্গে গেল এবং খাবারগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই পেয়ালা এবং খাবারগুলো জমা করে দস্তরখানের ওপর রাখলেন । সকলে মিলে ওই খাবার খেলেন। অতঃপর আমার পেয়ালা পাঠানো হলো। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাবারসহ পেয়ালাটি হাফসা (রা.)-কে দিয়ে বললেন-নাও, তোমার পাত্রের পরিবর্তে এ পাত্রটি নিয়ে যাও এবং এতে যে খাবার আছে তা খেয়ে ফেলো। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) এ ঘটনা বর্ণনা করার পর বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা মোবারকের কোনো প্রতিক্রিয়া আমি দেখতে পাইনি। (ইবনে মাজাহ, পৃ: ১৬৮)

এই হাদীসে আমরা দেখতে পাই দস্তরখান এবং পাত্রের সমন্বিত ব্যবহারের রুপরেখা। এখানে পেয়ালা আর দস্তরখান ভিন্ন দুটি বস্তু এবং ব্যবহার হচ্ছে একসাথে। দস্তরখানের ওপর পেয়ালা রাখালেন স্বয়ং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। পেয়ালাটি ভেঙে যাওয়া সত্ত্বেও তিনি খাবার দস্তরখানে ঢেলে পেয়ালা সরিয়ে দেননি বরং ভাঙা পেয়ালাতে করেই খাবারগুলো দস্তরখানে রাখলেন। এতে বোঝা যায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাধারণ অভ্যাস ছিল খাবারের পাত্র দস্তরখানের ওপর রাখা। অতএব পাত্রকে দস্তরখান ভেবে এর নিচে দস্তরখান না বিছানোর মতটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

তাওয়াতুরে আমলী :

তা’আমুল এবং তাওয়ারুস ইসলামের মাঝে গ্রহণযোগ্য একটি দলিল। যে সকল আমল সাহাবায়ে কেরামের সময় থেকে আজ পর্যন্ত যুগ যুগ ধরে একই নিয়মে পালন হয়ে আসছে তার একটা গ্রহণযোগ্যতা আছে। এটাকে আমল পরস্পরা বলা যায়। এ ধরনের আমলের বৈধতা বা প্রামাণ্যতা কোনো হাদীস বা সনদের ওপর মওকুফ থাকে না। বরং উম্মতের মাঝে এর প্রচলন হয়ে পড়াটাই এমন মজবুত একটি দলিল, যা ইলমুল ইয়াকিনের কাজ দেয়। যেমন ত্রিশ পারা কোরআন। আমাদের হাতে যে কোরআন যুগ যুগ ধরে নকল হয়ে আসছে এটাই যে প্রকৃত কোরআন এর জন্য ভিন্ন কোনো দলিল প্রমাণের দরকার পড়ে না।

তদ্রুপ দস্তরখানের ব্যাপারটিও এমন। দস্তরখানে ব্যবহারের যে পদ্ধতি উম্মতের মাঝে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে তা হচ্ছে, চামড়া, কাপড় বা রেক্সিন জাতীয় কিছু একটা দস্তরখান হিসেবে মাটিতে বিছানো হয়। এর ওপর খাবারের বিভিন্ন ধরনের ছোট-বড় পাত্র থালা-বাটি ইত্যাদি রাখা হয়। শুকনা খাবার হলে অনেক সময় তা সরাসরি দস্তরখানে রেখে পাশাপাশি তরল খাবারের পাত্রও রাখা হয়। সর্বাবস্থায় পাত্রের নিচে বিছানো বস্তুটিকেই দস্তরখান বলা হয়। পাত্রকে কেউ দস্তরখান মনে করে দস্তরখান পরিত্যাগ করে না। দস্তরখানের এই প্রচলন আমাদের দেশে উদ্ভূত আঞ্চলিক কোনো প্রথা নয়। বিশ্বের যেখানেই মুসলমান আছে সকলের মাঝে এই প্রচলন দেখা যায়। দারুল উলূম দেওবন্দের মসজিদে রশিদে বহু লোক ই’তিকাফ করে থাকেন। সেখানে রেক্সিনের এক ধরনের গোল দস্তরখান বিছানো হয়। এর মাঝে তরকারির পাত্র রাখা হয় আর চতুর্দিকে রুটি দেওয়া হয় সরাসরি দস্তরখানের ওপর বিরিয়ানির পাত্র দস্তরখানে রাখা হয়। ইফতারের সময় লম্বা দস্তরখানের ওপর শুকনা চনা-ছোলা, বিভিন্ন ভাজাপোড়া ঢেলে দেওয়া হয়। আর বিভিন্ন ফল দিয়ে তৈরি চাটনি বাটিতে করে দস্তরখানে রাখা হয়। পাত্রকে দস্তরখান মনে করে শুধু পাত্রে খাওয়ার প্রচলন সেখানে দেখা যায় না।

মক্কা শরীফ ও মদীনা শরীফে সুফরার ওপর ঢেলে খাওয়ার মতো খাবার হলে সরাসরি ঢেলে দেওয়া হয় অন্যথায় পাত্রে নিযে সুফরার ওপর রাখা হয়। বিশেষ করে ই’তিকাফকালীন মদীনা শরীফের সেহেনে লম্বা দস্তরখান বিছানো হয। এর ওপর খাবারের প্যাকেট বা প্লাটিস্টকের প্লেটে খাবার পরিবেশন করা হয়। সরাসরি রাখার মতো হলে দস্তরখানে ঢেলে খাওয়া হয়। কিন্তু সুফরা ছাড়া শুধু পাত্রে খেয়ে দস্তরখানের সুন্নাত আদায় করা হয় না।

অতএব আরব আজম সবখানেই দস্তরখান আর পাত্রের অস্তিত্ব ভিন্ন মনে করে পাত্রের নিচে দস্তরখান বিছানো বা দস্তরখানের ওপর পাত্র রাখার প্রচলন লক্ষ করা যায়। পাত্রকে দস্তরখান ধরে নিয়ে শুধু পাত্রে খাওয়া হয় না। তাই পাত্রকে দস্তরখান ভাবা হলে দস্তরখানের সুন্নাত আদায় হবে না। দস্তরখান ব্যবহারের এই পদ্ধতি সরাসরি কোনো হাদীসে পাওয়া না গেলেও উম্মতের তাওয়াতুরে আমলী দ্বারা এটা প্রমাণিত। এর বিপরীত কারো ব্যক্তিগত মত আমলযোগ্য হবে না।

এক হাদীসে পূর্ণ বিবরণ :
অনেকে বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাত্রে খাবার খাওয়ার সময় পাত্রে নিচে ভিন্ন কোনো দস্তরখান ছিল, এমন পূর্ণাঙ্গ বিবরণ কোনো হাদীসে আছে কি? তাঁদের উদ্দেশ্যে বলা হবে দুই রাক’আত নামাযের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ কোনো এক হাদীসে আছে কি? নামাযের বেলায় যেভাবে এক হাদীসে সব কথা থাকা নিস্প্রয়োজন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদা দস্তরখান ব্যবহার করেছেন, এ কথা প্রমাণিত হওয়ার পর পাত্রে খাওয়ার বিবরণসম্বলিত হাদীসে ভিন্ন করে পুনরায় দস্তরখানের কথা উল্লেখ করার দরকার হয় না। এখানেও দস্তরখান থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তা ছাড়া বিভিন্ন হাদীসে শুকনা ও তরল খাবার একই দস্তরখানে খাওয়ার কথাও পাওয়া যায়, যার বিবরণ পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে পাত্র ও দস্তরখান একসাথে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
মাটিতে পড়া লোকমা :
হাদীস শরীফে বলা হয়েছে,

যখন তোমাদের কারো লোকমা পড়ে যায় তখন সে যেন তার ময়লা পরিষ্কার করে খেয়ে নেয় এবং শয়তানের জন্য ছেড়ে না দেয়। (মুসলিম, তিরমিযী)
এ হাদীস থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় না যে পাত্রের নিচে কোনো কিছু বিছানো ছিল না। কেননা পাত্রের নিচে দস্তরখান বিছানো সত্ত্বেও লোকমা মাটিতে পড়তে পারে। এটা বাস্তব বিষয়। যারা পাত্রের নিচে দস্তরখান বিছিয়ে খানা খায়, এমন অভিজ্ঞতা তাদের সকলেরই আছে। দস্তরখান থাকা সত্ত্বেও খাবার মাটিতে পড়া স্বাভাবিক একটি বিষয়। তাই উক্ত হাদীসে পরিষ্কার করার কথা এসেছে বলেই সেখানে দস্তরখান না থাকা আবশ্যকীয় নয়।

হাদীসটির উদ্দেশ্য হচ্ছে, লোকমাটি শয়তানের জন্য রেখে না দিয়ে উঠিয়ে খাওয়া। এখন যদি পরিষ্কার দস্তরখানে পড়ে তবে উঠিয়ে খেয়ে নেবে। আর যদি ময়লা লেগে যায় তবে পরিষ্কার করে খাবে।