প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১১ম সংখ্যা, মে ২০১৬, রজব-শাবান ১৪৩৭ হিজরী, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
১. বান্দাগণের স্বীয় ইবাদত, উপাসনা কাজ কারবার তথা যাবতীয় ব্যাপারে পথ নির্দেশ এবং বান্দাদের পারস্পরিক ঝগড়া বিবাদ, মামলা-মোকাদ্দমা ইত্যাদি সম্পর্কে হুকুম-আহকাম, বিধি-নিষেধ আরোপ করার একমাত্র অধিকার শুধুমাত্র আল্লাহরই, যিনি সমস্ত মানবকুলের প্রভু এবং সমগ্র সৃষ্টি জগতের স্রষ্টা।
اَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَ الْاَمْرُ ؕ تَبٰرَكَ اللهُ رَبُّ الْعٰلَمِيْنَ
তারই কাজ সৃষ্টি করা এবং আদেশ করা। আল্লাহ বরকতময়, যিনি প্রতিপালক বিশ্বজগতের। (সূরা আরাফ : ৫৪)
আর মহান আল্লাহপাকই সম্যকভাবে অবগত আছেন যে স্বীয় বান্দার জন্য কোন জিনিস অধিক কল্যাণকর হবে। সুতরাং তিনি ঐ জিনিস বা ঐ বিষয়কেই বান্দার জন্য নির্ধারণ করে দেন।
২. সুতরাং আল্লাহ তায়ালা প্রভুত্বের দাবিতেই বান্দাদের জন্য নীতি মালা প্রণয়ন ও নির্ধারণ করে দেন। আর বান্দাগণও মহান প্রভুর প্রতি একনি আনুগত্য ও দাসত্বের নিদর্শন হিসেবে প্রভুর বিধানগুলো মাথা পেতে কবুল করে নেয়।
আর এ মানামানির উপকারিতা ও ফল বান্দাগণই ভোগ করে থাকে। আল্লাহ বলেন-
فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا
অত:পর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দিকে প্রত্যার্পন কর, যদি তোমরা আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই হল কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম। (সূরা নিসা : ৫৯)
৩. মহান আল্লাহ আরো বলেন-
وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِن شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللهِ ۚ ذَٰلِكُمُ اللهُ رَبِّي
তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ করো তার ফায়সালা আল্লাহর কাছেই সোপর্দকৃত। ইনিই আল্লাহ যিনি আমার পালনকর্তা। (সূরা শুরা : ১০)
৪. আর মহান আল্লাহতায়ালাকে বাদ দিয়ে তাঁর বান্দাগণ কর্তৃক দ্বিতীয় কোন নীতিমালা ও শরিয়ত প্রবর্তন বা গ্রহণ করাকে তিনি অনুমোদন দেন নি। তিনি বলেন- তাদের কি এমন শরীক দেবতা আছে যারা তাদের জন্য ঐ ধর্ম বা শরিয়ত সিদ্ধ করেছে যার অনুমতি আল্লাহপাক প্রদান করেননি। (সূরা শুরা, ২২)
৫. সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ প্রদত্ত শরিয়ত বাদ দিয়ে অন্য শরিয়ত বা তরীকা গ্রহণ করল সে আল্লাহর সাথে শিরক করল আল্লাহতায়ালা এবং তদীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুমোদন বহির্ভূত ইবাদতরূপী কাজগুলো হল বিদআত। আর সর্ব প্রকার বিদআত বা নব আবিস্কার হল গোমরাহী।
৬. আল্লাহ ও তদীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বিধান বহির্ভূত যে সমস্ত শাসন ব্যবস্থা ও আইন কানুন প্রয়োগ করা হয় এগুলো শয়তানী বিধান এবং মুর্খপনা হুকুম।
اَ فَحُكْمَ الْجَاهِلِيِّةِ يَبْغُوْنَؕ وَ مَنْ اَحْسَنُ مِنَ اللهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُّوْقِنُوْنَ
তারা কি মুর্খতার বিধানগুলো কামনা করছে, (কিন্তু) বিশ্বাসী লোকদের জন্য আল্লাহর চেয়ে উত্তম ফয়সালাকারী আর কে? (সূরা মায়দা, ৫০)
৭. অনুরূপভাবে হালাল-হারাম সাব্যস্ত করা একমাত্র আল্লাহতায়ালারই বিশেষত্ব। দ্বিতীয় কাউকে এ ব্যাপারে আল্লাহর সংগে শরীক করা কিছুতেই সিদ্ধ নয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে সব জন্তুর উপর আল্লাহ তায়ালার নাম উচ্চারণ করা হয় নি, তোমরা এগুলো থেকে ভক্ষন করো না। ইহা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। নিশ্চয় শয়তানরা তার বন্ধুদের প্রত্যাদেশ করে যেন তারা তোমাদের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়। সুতরাং যদি তোমরা তাদের আনুগত্য করো তবে তোমরাও মুশরিক হয়ে যাবে। (সূরা আনআম, ১২১)
সুতরাং উক্ত আয়াতে শয়তান ও তার সহচরদের আনুগত্য করে আল্লাহ কর্তৃক হারামকৃত জিনিসকে হালাল জ্ঞান করাকে আল্লাহপাক শিরক বলে আখ্যা দিয়েছেন।
৮. অনুরূপভাবে যারা আল্লাহ কর্তৃক হালালকৃত বস্তুকে হারাম ও হারামকৃত বস্তুকে হালাল জ্ঞান করার মাধ্যমে তথাকথিত আলেম উলামা ও নেতৃবর্গের অনুগত হয়ে থাকে তারা যেন আল্লাহকে ত্যাগ করে একাধিক প্রভু গ্রহণ করল। এ প্রেক্ষাপটেই মহান আল্লাহ বলেন-
اتَّخَذُوْا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَٰهًا وَاحِدًا ۖ لَّا إِلٰهَ إِلَّا هُوَ ۚ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ
তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের পন্ডিতবৃন্দ ও সংসার বিরাগীদেরকে এবং মরিয়মের পুত্র ঈসা (আ:) কে
প্রতিপালকরূপে গ্রহণ করেছে। অথচ একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের জন্যই তারা আদিষ্ট ছিল। তিনি ছাড়া আর কোন প্রভূ নাই। মুশরিকদের কথিত শিরক হতে তিনি পবিত্র। (সূরা তাওবাহ, ৩১)
৯. হাদীস শরীফের বিশুদ্ধ গ্রন্থসমূহে বর্ণিত আছে যে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উক্ত আয়াতখানা হাতেম তাঈর পুত্র হযরত আদি (রা:) এর সামনে তেলাওয়াত করলেন। আদি ইবনে হাতেম তাঈ বললেন যে, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমরা তো আমাদের ধর্মীয় গুরুদের উপাসনা করিনা। এরপর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তারা কি তোমাদের জন্য আল্লাহ কর্তৃক হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষিত বস্তুকে হালাল বা বৈধ বলে প্রচার করে নি, অত:পর তোমরাও উক্ত বস্তুকে হালাল হিসেবে গ্রহণ করেছ। অনুরূপভাবে তারা কি আল্লাহ কর্তৃক বৈধ ও হালাল ঘোষিত বস্তুকে হারাম বলে আখ্যা দেয় নি? অত:পর তোমরাও ঐ বস্তুকে হারাম বলেই গ্রহণ করেছ।
১০. হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এ কথার জবাবে হযরত আদি বললেন যে, হুজুর হ্যাঁ। (আমাদের ধর্মীয় অবস্থা এমনই)। তখন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন যে, এটাই হল ধর্মীয় গুরুদের পূজা করা। সুতরাং হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করার ব্যাপারে ধর্মীয় গুরুদের আনুগত্য করার নামই হল তাদের উপাসনা করা। আল্লাহর সাথে শরীক করা। আর এটা হল উচ্চ পর্যায়ের শিরক যা আল্লাহর একত্ববাদের অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন প্রভু নাই- এ মূলনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থি। কেননা এ কালেমার দাবি ও চাহিদা এটাই যে সর্ব প্রকার বৈধ অবৈধ করার সার্বিক ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহতায়ালারই। দ্বীনের মুজতাহিদ ও শাস্ত্রবিদ যখন কোন বিষয়ে ভুলবশত সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত না হতে পারেন তখনও তারা সাওয়াব পেয়ে থাকেন, কিন্তু দ্বীন ও ইলমের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তি ও আলেমগণ শরীয়াতের বিপরীতভাবে যে কোন বৈধ বস্তুকে অবৈধ এবং অবৈধ বস্তুকে বৈধ বলে ঘোষণা করলে তাদের আনুগত্য স্বীকার করাকে যখন শরীয়াতে ধর্মীয় গুরুদের পূজা ও শিরক করা হয় বলে উক্ত হয়েছে, তখন যারা কাফের এবং ধর্মে অবিশ্বাসী লোকদের দ্বারা প্রণয়নকৃত অর্থাৎ মানব রচিত আইনের অনুসরণ করে এবং সেগুলোকে মুসলিম বিশ্বে প্রচলন ও বাস্তবায়ন করার জন্য সচেষ্ট হয় তাদের সম্পর্কে নতুন করে মন্তব্য করার প্রয়োজন নেই।
১১. সাধারণত ধর্ম বিশ্বাসীরা পয়গাম্বরদেরকে প্রকৃত শরিয়ত প্রদানকারী মনে করে। কিন্তু এটাও এক প্রকার শিরক। বস্তুত: শরীয়াতের ভিত্তি, আদেশ ও নিষেধ প্রদান করা সব কিছুই আল্লাহর সাথে সুনির্দিষ্ট। পয়গাম্বরগণ শুধু প্রচারক এবং পয়গাম পৌঁছে দেয়ার কাজ করেন। আল্লাহর শিক্ষা লাভের ফলেই শরীয়াতের বিধানাবলী প্রচার করেন।
১২. আল্লামা ইসমাঈল শহীদ (রহ:) তাকভিয়াতুল ঈমান কিতাবে এভাবে লিখেছেন : আল্লাহতাআলা বলেছেন-
وَ لَا تَقُوْلُوْا لِمَا تَصِفُ اَلْسِنَتُكُمْ الْكَذِبَ هٰذَا حَلَالٌ وَّ هٰذَا حَرَامٌ لِّتَفْتَرُوْا عَلَى اللهِ الْكَذِبَ ؕ اِنَّ الَّذِيْنَ يَفْتَرُوْنَ عَلَى اللهِ الْكَذِبَ لَا يُفْلِحُوْنَ
আল্লাহতাআলার উপর মিথ্যা আরোপ করার জন্য; তোমাদের জিহ্বা মিথ্যারূপে ইহা হালাল (বৈধ), ইহা হারাম (অবৈধ) বলে যা বর্ণনা করে, এরূপ কথা বলো না। আল্লাহর উপর যারা মিথ্যা আরোপ করে, নিশ্চয়ই তারা সকলকাম হতে পারে না। (সূরা নহল : ১১৬)
নিজেদের মত মতো ইহা করা দোরস্ত, উহা করা দোরস্ত নহে এরূপ কিছু নির্দিষ্ট করে নেয়া ঠিক নয়। কারন যা কিছু কর্তব্য অকর্তব্য, আল্লাতাআলাই তার বিধানপ্রদান করবার একমাত্র মালিক এবং তিনিই তা নির্ধারিত করে দিয়েছেন। তার মধ্যে নিজের সিদ্ধান্তকে স্থান দিলে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করা হয়। এরূপ কাজ যারা করে, আল্লাহতাআলা তাদের মনের বাসনা কখনই পূর্ণ করেন না।
এই আয়াতের দ্বারা জানা যায় যে, মুর্খ লোকেরা বলে থাকে যে, মহররম মাসে পান খাওয়া, লাল কাপড় পরা উচিত নহে, হযরত বিবির নেয়ায (তাবারুক) পুরষে খাবে না, তা প্রস্তুত করতে অমুক অমুক তরকারী নিশ্চয়ই দিতে হবে, তা দাসী বাঁদী বা দ্বিতীয় স্বামীর স্ত্রী ও নিম্ন শ্রেণীর লোকেরা খেতে পারবে না; শাহ আবদুল হক সাহেবের ছামানা (তুশা), হালুয়া (মিষ্টি) সতর্কতার সাথে প্রস্তুত কর এবং তা হুক্কা সেবীকে প্রদান করো না; অমুক পীরের নজর স্ত্রীলোক খেতে পারবে না, শাহ মাদারের নিয়ায মালিদা, বুআলী কলন্দরের হালুয়া এবং আসহাবে কাহাফের নামের রুটি ও গোশত ইত্যাদি হালুয়া (মিষ্টি) সতর্কতার সাথে প্রস্তুত কর এবং তা হুক্কা সেবীকে প্রদান করো না। বিবাহাদিতে অমুক অমুক আচার পালন করতে হবে ইত্যাদি। এই সমস্তই মিথ্যা, কুসংস্কার এবং শিরকের পর্যায়ভুক্ত। কারণ ইহাতে আল্লাহতাআলার আদেশ নিষেধসমূহের মধ্যে নিজের বাতিল সিদ্ধান্তকে প্রশ্রয় দেয়া হয়। (তাকভিয়াতুল ঈমান, আল্লামা ইসমাঈল শহীদ (রহ:), অনুবাদ মৌ: মো: মনিরুজ্জামান, পৃঃ ৬৭,৬৮)
