প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১৭, রমজান-শাওয়াল ১৪৩৮ হিজরী, আষাঢ়-শ্রাবন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা
জন্ম ও মৃত্যু আল্লাহর হাতে। কার গর্ভে, কার ঔরসে কার জন্ম হবে বা কোন দেশে হবে তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই ফয়সালা করে থাকেন। একইভাবে মৃত্যুও অনিশ্চিত। কার মৃত্যু কখন হবে, কিভাবে হবে এবং কোথায় হবে, সেই আগাম খবর মৃত্যু বরণকারীর কাছেও থাকে না। কাকে তিনি মারবেন আর কাকে বাঁচাবেন, তা তিনিই জানেন। আমরা দেখি, সামান্য অসুখে বা অসুখ ছাড়াই একটি লোক মারা গেলো। আবার বিপরীতও দেখি। কঠিন রোগে দীর্ঘ দিন ভোগে একটি লোক আরোগ্য লাভ করে ভালো করে স্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে আছে অথচ অসুখের এক পর্যায়ে আত্মীয়-স্বজনরা এমনকি ডাক্তাররা পর্যন্ত রোগীর নিরাময়ের আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। অপেক্ষায় ছিলেন কখন মারা যায়-এ সংবাদ শোনার জন্য। এই যখন মানুষের অবস্থা, তখন মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করা বা মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার শক্তি তো রোগীর থাকার কথা নয়। রোগী তো দুর্বল। বিছানায় পড়ে থাকা ছাড়া তার করার মতো আর কি আছে? ডাক্তার-নির্ভর রোগী অসহায়। নিজেই দুর্বল, মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার শক্তি তার কোথায়? রোগীকে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইতে যারা নামায়, তাদের জিজ্ঞেস করি, যখন লোকটি রোগী হয়নি, দেহে ছিলো শক্তি, তখন কেন এই লোকটিকে রোগের সঙ্গে লড়াইতে নামায়নি? তাহলে তা সে রোগী হতো না। আর রোগীর দুর্বল দেহ নিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার ধৃষ্ঠতাও দেখাতো না।
মৃত্যুকে মুকাবিলা করা যায় না, পাঞ্জা বা কুস্তি কোনটাই চলে না। রোগ আল্লাহ দেন, চিকিৎসা জ্ঞানও তারই দান। তিনি ইচ্ছা করলে নিরাময় করবেন, ইচ্ছা করলে আমৃত্যু ভোগাবেন। আবার কিছু দিন ভোগানোর পর তার কাছে ফিরিয়েও নিতে পারেন, সবই তার ইচ্ছা। মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার কথা বলে প্রকারান্তরে আমরা আল্লাহর শক্তির মুকাবিলায় মানুষকে দাঁড় করাচ্ছি। কেউ কেউ হয়তো বললেন, ‘মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা’ এ কথা দ্বারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সাথে বা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার কথা বুঝানো হচ্ছে না। রোগীর ভোগান্তি যে প্রকট, রোগীর অবস্থা যে খুবই খারাপ, শুধু তাই বুঝানো হচ্ছে। আমরা উত্তর, যদি তাই বুঝানো হয়, তাহলে রোগীকে পাহলোয়ান হিসাবে দাঁড় না করিয়ে রোগীর প্রকৃত অবস্থা বুঝানোর জন্য শব্দের কি আকাল পড়েছে। ‘পাঞ্জা ধরার লড়াই’ শব্দগুলো নির্দোষ। কিন্তু এ শব্দগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্র ভিন্ন। রোগীকে দিয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা ধরার লড়াই কেন? আমি নিশ্চিত, শয়তান এমন ব্যবহারের জন্য আমাদের প্ররোচিত করে। শয়তান কুফরী কালাম আমাদের দিয়ে উচ্চারণ করায়।
বিশ্বের এমন কোন শক্তিমান ব্যক্তির নাম কি আমরা জানি, যিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বিজয়ী হয়েছেন, অমরত্ব লাভ করেছেন? যদি এমন দৃষ্টতা না থাকে, তাহলে ঈমানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক শব্দ দিয়ে কেন এমন বাক্য তৈরি করি? ‘মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা’ ভিন্ সংস্কৃতির শব্দ নয় বটে, তবে বাক্য গঠনের বেলায় আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যে, শব্দ ব্যবহারে ঈমানের চৌহদ্দি অতিক্রম করছি কিনা। মুসলমানরা তো এমন শব্দ ব্যবহার আলাপচারিতায় বা লেখায় করতেই পারেন না। আল্লাহর শক্তি কুদরতের কাছে আত্মসমর্পণের নামই ইসলাম। বিপদ আল্লাহ দেন, তিনিই বিপদ মুক্ত করেন। জীবন তারই দান, মৃত্যু তারই হুকুম বা ফরমান। রোগী মাত্রই অসহায় ও দুর্বল। এই দুর্বলদের পাঞ্জা বা লড়াইতে আর কেউ নামাবেন না।
মরণের সঙ্গে পন যোগ করে ‘মরণ পণ’ লড়াইও আমরা প্রায়ই করছি। পণ অর্থ বাজি, প্রতিজ্ঞা, দৃঢ় সংকল্প ইত্যাদি। আপনি মহৎ উদ্দেশ্যে জেহাদ করবেন, লড়াই করবেন, যুদ্ধ করবেন। আপনার মূল লক্ষ্য থাকবে আল্লাহর রেজামন্দি। সেই রেজামন্দি আল্লাহ আপনাকে দেবেন কিসের বিনিময়ে, আপনার প্রাণের বদলে, মরণের বদলে, না আপনাকে জিন্দা রাখার বদলে, না আপনার দান-খয়রাত, না এবাদতের বদলে? তা আল্লাহই ভালো জানেন। আপনি কিন্তু নিজেই শর্ত দিয়ে লড়াইতে নামলেন, যদি আপনি লড়াইতে জানটা দেয়ার সুযোগ না পান, তাহলে আপনার ঘোষণা তো মিথ্যা প্রমাণিত হলো। কারণ, মরণ তো আল্লাহর হাতে, তার হাতের বস্তুকে আপনি বাড়ি রাখার কে? জীবন পণ বা জীবনের বাজিও মরণ পণের মতোই শব্দ। জীবন, মরণ বা মৃত্যুকে আমরা পণ বা বাজি রাখার অধিকার রাখি না। এ ধরনের ঘোষণা আত্মহননের শামিল। আপনি মহৎ লক্ষ্যে, নেক নিয়তে দক্ষতার সঙ্গে সংগ্রাম করে যান। আল্লাহ আপনার মেহনত কিভাবে কবুল করবেন, তা তিনি জানেন। জীবনপণ, মরণপণ আর বিয়ের পণের মধ্যে আনুষ্ঠানিকতার পার্থক্য থাকলেও চরিত্রগত পার্থক্য নেই। হ্যাঁ, আল্লাহর পথে শহীদ হওয়ার তামান্না প্রত্যেক মুসলমানের থাকা উচিত। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ইসলামের দুশমনের সামনে গিয়ে স্বেচ্ছায় বুকে বুলেট নেয়া। ইসলামের ইতিহাসে এমন বহু শহীদের কথা জানা যায়, যারা বীরের মতো লড়াই করে অবশেষে শহীদ হয়েছেন। নিজের প্রাণ চলে যাওয়ার আগে বহু দুশমনকে জাহান্নামে পাঠিয়েছেন। মরণপণ লড়াই আর শহীদের জেহাদ এক কথা নয়। এসব শব্দের ব্যাপারেও আমাদের সতর্ক থাকা উচিত। মনে রাখতে হবে, ছিনতাইকারীরাও মরণপণ করে বা জীবনের বাজি রেখে পেশায় নামে, মৃত্যুবরণ করে, বিনিময়ে সে পায় জাহান্নাম।
মুখে ফুল চন্দন পরুক
এ কথা মুসলমান কখনো উচ্চারণ করতে বা লিখতে পারেন না। কারণ, ঈমানের বাধা আছে। কেউ যদি অন্যকে কোন আশার বাণী শোনায়, তাহলে আশার বাণীর শ্রোতা সংবাদদাতাকে বলেন, ‘আপনার মুখে ফুল চন্দন পড়–ক’। অর্থাৎ আপনার কথা যেন সত্য হয়। ফুল চন্দন তো সংবাদদাতাকে দিলেন, কিন্তু কি দিলেন, তা কি জানেন?
হিন্দুদের পূজার বিশেষ উপকরণের অন্যতম হচ্ছে চন্দন মাখানো ফুল, যা দিয়ে দেবতার পূজা করা হয়। এবার বলুন তো, চন্দন মাখানো দেবতার ফুল কি এক মুসলমান অন্য মুসলমানকে দিতে পারেন? ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে তা কবিরা গোনাহর শামিল। পূজাধর্মী এমন উক্তি থেকে আমাদের অবশ্য বিরত থাকা উচিত।
মহাভারত কি অশুদ্ধ হয়ে গেল?
মুসলমানরাও কোন কথা প্রসঙ্গে মহাভারতের উপমা টানেন। যেমন বলে থাকেন, ‘যদি আমি এমন বলেও থাকি তাহলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেলো?’ যারা এভাবে উপমা দেন, তারা নিশ্চয়ই জানেন, মহাভারত আসমানি কোনো কিতাব নয়, এমন কি সাধারণ অর্থে কোন ধর্মগ্রন্থও নয়। তাই মহাভারতে সত্যাসত্য বা শুদ্ধ-অশুদ্ধের উপমা দেয়াই অশুদ্ধ। মহাভারত একটি কাব্যগ্রন্থ মাত্র। তাতে ধর্মীয় কাহিনী আছে, ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের প্রসঙ্গ আছে। কিছু সত্য আছে, অধিকাংশ অসত্য, কাল্পনিক। এই অর্থে মহাভারতই অশুদ্ধ, অন্তত অধিকাংশ তো অশুদ্ধই। কল্প কাহিনীর কাব্যকে ধর্মীয় কাঠামোতে বিচার করা যায় না।
মহাভারত সম্পর্কে হিন্দু পণ্ডিতরা কি বলেন শুনুন :
“The Mahabharata could not have seen the work of any single person, and in order to be brought upto its present size the process of interpolation must have gone on for several centuries. It can not, therefore, be said that the Mahabharata depicts the state of India at any particular period’ R.D. Banarjee : Pre-historic Ancient and Hindu India P-47.
আরডি ব্যানার্জির মতের সঙ্গে একমত হয়ে ড. কিরণ চন্দ্র চৌধুরীও বলেছেন, “গাথা ও নারাশংসি’ অর্থাৎ মানব গুণগাথা হইতেই ক্রমে মহাভারতের ন্যায় মহাবাক্যের উদ্ভব হইয়াছে। মহাভারত বা রামায়ণ কোন এক ব্যক্তির রচিত গ্রন্থ নয়। যুগ যুগ ধরিয়া গাথাজাতীয় কবিতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতে থাকে। অবশেষে এগুলি মহাকাব্যগ্রন্থাকারে রূপ লাভ করে। সুতরাং মহাভারত বা রামায়ণ কোন একটি বিশেষ যুগের বিবরণ নহে। ভারতের ইতিহাস কথা, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬০।
আরডি ব্যানার্জি তার এই গ্রন্থের ৪৭ পৃষ্ঠায় বলেছেন, The Mahabharata is a story or a hero-land belonging to the later vedic period. আশা করি, আর প্রমাণের দরকার নেই। মহাভারত অনেক কবির দ্বারা বিভিন্ন কাল্পনিক ঘটনার কাব্যিক কল্পনা প্রসূত কবিতা বিশেষ। সুতরাং যারা মহাভারতের রেফারেন্স দেন, তারা সত্যের ভুল রেফারেন্স দেন।
যক্ষের ধন
যক্ষের ধন শব্দটি অনেক মুসলিম লেখকের লেখায় আসে। সাধারণ আলাপচারিতায়ও শব্দটি অনেকে ব্যবহার করেন। ‘যক্ষের ধন’ শব্দটির দু’টি অর্থ। প্রথম অর্থ কনজুশের ধন বা কৃপণের ধন। দ্বিতীয় অর্থ দেবযোনী বিশেষ। দেবযোনী হচ্ছে ভূত-প্রেতাদি, উপদেবতা। এই যক্ষ থেকেই যক্ষপতি, যক্ষরাজ ও যক্ষপুরী শব্দের উদ্ভব। কথিত আছে, কৈলাশ পর্বতের উপরে কুবেরের রাজধানী অলকা অবস্থিত। ভূগর্ভে প্রোথিত অর্থরাশির রক্ষক প্রেতযোনী। বলা হয়ে থাকে, অনেক অনেক দিন আগে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সঞ্চিত ধনরত্নসহ একটি জীবন্ত বালককে ভূগর্ভে সমাধি দেয়া হয়। যাতে ঐ বালক মৃত্যুর পর যক্ষরূপ ধারণপূর্বক উক্ত ধনরাশি রক্ষা করছে।
কৃপণেরা অন্ধ সংস্কারের বশে এ অনুষ্ঠান করতো। এখনো কোন কোন কৃপণ ধনাঢ্য হিন্দু যক্ষ দেবতার পূজা করে ধন-সম্পত্তির বৃদ্ধির জন্য। যক্ষ হলো ধনাদির অধিদেবতা কুবের। বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম সমাজে ‘যক্ষের ধন’ শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। যেমন- মায়ের সন্তান, সব সময় মা তাকে কাছে কাছে রাখেন, যেন যক্ষের ধন অথবা ওর থেকে কিছু আদায় করা যাবে না, তার প্রতিটি টাকা যেন যক্ষের ধন। আমার বুকের মাণিক, আমার যক্ষের ধন ইত্যাদি নানা কথায় শব্দটি ব্যবহার হচ্ছে। মুসলমানরা তা ব্যবহার করতে পারেন না। কারণ, এ বিশ্বাস হচ্ছে ঈমান-আক্বিদা বিরোধী। কঞ্জুস অর্থে যদি যক্ষের নাম ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে আমরা সে প্রয়োজন পূরণ করতে পারি কারুণের নাম উচ্চারণ করে। যক্ষ কাল্পনিক নাম, কারুণ বাস্তব এক মানুষের নাম। আসুন, আমরা ইতিহাসকে গ্রহণ করি, বানোয়াট গল্পকে বর্জন করি।
