প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৪র্থ সংখ্যা,অক্টোবর ২০১৭, জিলহজ-মুহাররম ১৪৩৯ হিজরী,আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
লক্ষ্মী
শুধু হিন্দুদের মধ্যেই নয়, মুসলমানদের মধ্যেও লক্ষ্মী কেন্দ্রিক, লক্ষ্মীভিত্তিক ও লক্ষ্মী যুক্ত সম্বোধন প্রায়ই শোনা যায়, এমনকি মুসলমানদের লেখায়ও দেখা যায়। হিন্দুরা লক্ষ্মী শব্দ ব্যবহার করেন সঙ্গত কারণে। কারণ, তাদের দেবীর নাম তারা উচ্চারণ করবেনই, এ নাম তাদের লেখালেখিতেও আসবে। লক্ষ্মী মা, লক্ষ্মী ছেলে, লক্ষ্মী সোনা, লক্ষ্মী মেয়ে, এসব সম্বোধন মুসলমান পরিবারে এতো আ’মভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা শুনলে মনে হয়, ‘লক্ষ্মী’ শব্দটি হিন্দু-মুসলমানের কমন শব্দ। প্রকৃতপক্ষে এ যে হিন্দু সংস্কৃতির প্রতি মুসলমানের আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কিছু নয়। স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন সৃষ্টি হয়, মুসলমানদের সংস্কৃতি ভাণ্ডারে কি মব্দের এতোই আকাল পড়েছে যে, লক্ষ্মীর বিকল্প কোন শব্দ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না? যদি না থাকে, তাহলে নাইবা উচ্চারণ করলাম। কিন্তু তাই বলে কি লক্ষ্মীর পিছনে ঘুরে জাত-ধর্ম খুয়াবো? মেয়েটি কতো ভালো বা ছেলেটি কতো ভালো, এমন সম্বোধন করলে কি বাক্য ভুল হয়ে যায়? কি হীনমন্যতা রোগে আমরা ভুগছি?
হিন্দু ধর্ম মতে, লক্ষ্মী হলেন বিষ্ণুপত্নী। তিনি ধন-সম্পদ ও সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তিনি কমলা, রমা, সৌভাগ্য, শোভা, ইন্দিরা, পদ্মা, পদ্মালয়া প্রভৃতি নামেও হিন্দুরা লক্ষ্মীকে সম্বোধন করে থাকেন। লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা। পেচাঁ তো অশুভের প্রতীক। সমীকরণটা তাহলে কিভাবে হলো?
হিন্দুদের মতে, লক্ষ্মীর সুনজরে যারা আছেন, তারা হোন সৎ, শান্ত, সুবোধ ও ধনবান। আর যাদের ওপর লক্ষ্মীর সুনজর নেই অথবা লক্ষ্মী যাদের ছেড়ে চলে গেছেন, তারা হন হতভাগা, দুষ্টু, দরিদ্র এবং অশান্ত। এ হচ্ছে হিন্দু শাস্ত্রীয় বিশ্বাস। এবার বলুন তো, তাদের এই শাস্ত্রীয় বিশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে আমরা অর্থাৎ মুসলমানরা কি লক্ষ্মীকে দেবতা মেনে তার নাম সব সময় জপ করতে পারি? লক্ষ্মী নাম কি আমরা উপমায় আনতে পারি? যদি আনি, তাহলে আমাদের ঈমান থাকছে কোথায়?
হিন্দুরা লক্ষ্মীর পূজা করেন। দুর্গাপূজার অব্যবহিত পরের পূর্ণিমাকে হিন্দুরা লক্ষ্মী পূর্ণিমা বলে থাকেন। মুসলমানরা লক্ষ্মী পূজা করেন না, লক্ষ্মী পূর্ণিমার অনুষ্ঠানও করেন না, কিন্তু লক্ষ্মীর নাম প্রায়ই মুখে নিয়ে ঈমানের বিরুদ্ধে কেন ভূমিকা রাখেন, তা বোধগম্য নয়।
একজন মুসলমানের স্ত্রী অবশ্যই মুসলমান, মুসলমান স্বামী-স্ত্রীর সন্তানও মুসলমান। যদি তাই হয়, তাহলে তাদের ছেলেমেয়ে কেমন করে লক্ষ্মী ছেলে আর লক্ষ্মী মেয়ে হয়? মুসলমানের ছেলেমেয়েরা মা-বাবাকে লক্ষ্মী মা লক্ষ্মী বাবা কেমন করে বলতে পারে? পরিবারে পারস্পরিক সম্বোধনের ভাষা যদি এই হয়, তাহলে তাদের ছেলেমেয়ে কেমন করে হবে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের অনুসারী? যেখানে লক্ষ্মী সেখানে হিন্দু ধর্ম, সেই সংস্কৃতি, সেই কৃষ্টি, সেই ধর্মের আমেজ ও মেজাজ থাকবেই। যেখানে লক্ষ্মী সেখানে আল্লাহর রহমত তো বর্ষণ হতে পারে না।
লক্ষ্মীর জায়গায় লক্ষ্মী আছেন এবং থাকবেনও তাদের জন্য, যাদের কাছে তিনি পূজিত। আমরা কেন তাকে নিয়ে টানাটানি করি? তিনি তো আমাদের নন। আমাদের ছেলেমেয়েদের জীবন ও চরিত্র আর তকদীরকে সুন্দর, বরকতময়, পবিত্র ও রহমতের বারিধারায় সিক্ত করার মতো সর্ব শক্তিমান আল্লাহ যখন আছেন, তখন কেন বিষ্ণুর স্ত্রী লক্ষ্মীর শরণাপন্ন হই? লক্ষ্মীতো নিজেই স্বাধীন নন, তিনি অন্যের স্ত্রী, তিনি কতোটুকু আমাদের দিতে পারেন?
সর্বশক্তিমান আল্লাহ চান তার জিকির, তার এবাদত, তার কাছে আত্মসমর্পিত মোনাজাতরত বান্দাহর হাত, তিনি চান তার করুণার কাঙালদের। তাকে ছেড়ে কেন আমরা বিষ্ণুর স্ত্রীকে সৌভাগ্যের মালিক মনে করি? কেন আমরা লক্ষ্মীর নাম জপ করি? এমন আত্মভোলা ও পরের ধর্ম-সংস্কৃতির প্রতি অনুরক্তদের নাম যতোই ইসলামী হোক না কেন, ইসলামের নজরে ওরা শুধু জাহেল মুর্খই নয়, ওরা মুনাফিক এবং ইসলামের দুশমন। ওরা লক্ষ্মীর অনুসারী, আল্লাহর রহমত পাওয়ার অযোগ্য। যারা না জেনে, বেখেয়ালে ‘লক্ষ্মী’কে কথায় ও লেখায় আনেন, তাদের তওবা করে ভবিষ্যতের জন্য লক্ষ্মী পূজা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি।
লীলা
বিভিন্ন অভিধানে অভিন্ন যে অর্থ লেখা আছে, তা হচ্ছে এই, লীলা অর্থ ক্রীড়া, কেলি, প্রমোদ, বিলাস, ভাবভঙ্গি, হাবভাব ইত্যাদি। দেবতার কার্যকলাপ যা বোধগম্য এবং বোধগম্য নয়, সবই লীলা। উদাহরণ স্বরূপ বলা হয়, কে বোঝে তোমার লীলা লীলাময়ী তারা। যেমন কৃষ্ণের নরলীলা, জীবলীলা, অবলীলা ইত্যাদি। ‘লীলা’ যুক্ত হয়ে যেসব শব্দের সৃষ্টি, তাহলো লীলা কমল, লীলা পদ্ম, লীলা কানন, লীলা ক্ষেত্র, লীলাভূমি, লীলা চঞ্চল, লীলাবতী, লীলা বিলাসবতী, লীলাময়ী, লীলায়িত, লীলায়িতা, লীলাস্থলী প্রভৃতি শব্দ। এসব শব্দ গঠিত হয়েছে লীলাকে সামনে নিয়ে। ভিন্ন শব্দ প্রথমে বসে, তারপর লীলা যুক্ত হয়ে শব্দ গঠিত হয়েছে, তাহলো তাণ্ডবলীলা ও ধ্বংসলীলা প্রভৃতি শব্দ।
এখানে দুটি কথা প্রণিধানযোগ্য। একটি হলো এই, লীলাতে যে অর্থ প্রকাশিত, এ অর্থের সঙ্গে তাণ্ডবলীলা বা ধ্বংসলীলার অন্যদিকে লীলা, এ কেমন করে হতে পারে? তাণ্ডবলীলা, ধ্বংসলীলা শব্দ আমরা ব্যবহার করতে পারি, যদি স্বীকার করি যে, এ সব লীলা দেবতার দ্বারা সংঘটিত। তাণ্ডব অর্থ নৃত্য। তণ্ডুমনি-প্রবর্তিত নৃত্য। পুরুষের নৃত্য, উদ্দাম নৃত্য, শিব তাণ্ডব, বন্যার তাণ্ডব, তাণ্ডবলীলা-এ সবই প্রলংকালীন শিবের উদ্দাম নৃত্য। মুসলমানরা কি তা বিশ্বাস করতে পারে? ধন-প্রাণ বিনাশী এ অবস্থাকে আমরা তাণ্ডব বলতে পারি না।
দ্বিতীয় কথা হলো, লীলার যে সব অর্থ অভিধানে আছে, তা ক্রীড়া, প্রমোদ, যৌন কেলি, দেবতার কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই লীলা হোক না ভূমি (লীলাভূমি) বা লীলা ক্ষেত্র, তা মুসলমানরা গ্রহণ করতে পারে না। লীলাযুক্ত শব্দগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে, যদি আমাদের জিহ্বা ও কলমকে পবিত্র রাখতে চাই।
সূর্য সন্তান
হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী সূর্যও এক দেবতা। এ দেবতার তিন পুত্র সন্তান : শনি, যম ও কর্ণ। সূর্যের তিন মেয়ে : যমুনা, তপতী ও বিদ্যুৎ। সূর্য বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন রবি, ভানু, ভাস্কর, আদিত্য, দিবাকর, দিনমণি, তপন, মার্তন্ড, অর্যমা, অর্ক, পূষা, সবিতা, নূর, প্রভাকর, বিভাবসু, বিবস্বান, মিত্র ও মিহির। মুসলমানদের মধ্যে যারা গর্ব করে সূর্য সন্তান বলে দাবি করেন বা যারা অন্যদের সূর্য সন্তান বলে পরিচয় দেন, তাদের দাবি বা পরিচয়ে সূর্য দেবতাকে নিশ্চয়ই স্মরণ করেন। অযোধ্যায় পৌরাণিক রাজ বংশের সদস্যরা নিজেদের সূর্য বংশীয় বলে দাবি করতেন। আমাদের ‘সূর্য সন্তান’রা কি সেই বংশের সন্তান? মুসলমানরা কি জেনে-শুনে নিজেদের সূর্য দেবতার সন্তান বা সূর্য কন্যা পরিচয় দিতে পারেন? অগ্নিপুরুষ আর অগ্নিকন্যাও অনুরূপ এক ভুয়া ও অপসংস্কৃতিমূলক দাবি (অগ্নিকন্যা দ্রষ্টব্য)।
সূর্য একটি গ্রহ। সে আল্লাহর সৃষ্ট একটি গ্রহ মাত্র। সৃষ্টির কল্যাণে এর সৃষ্টি। এর বংশ বিস্তারের নিজস্ব কোন ক্ষমতা নেই। সূর্যের স্ত্রী-পুত্র পরিবার কিছুই নেই। সূর্যকে দেবতা জ্ঞান করা অর্থহীন ও অযৌক্তিক। কোন মুসলিম সন্তান কখনো সূর্যের সন্তান দাবি করতে পারে না। এ কবিরা গুণাহ।
সতী সাধ্বী
আমরা বলি, তিনি একজন সতী সাধ্বী নারী। সতী হলেন দক্ষ কন্যা ও শিব পত্নী। সাধ্বী অর্থ পতিব্রতী নারী। হিন্দুদের মধ্যে যখন সহমরণ প্রথা চালু ছিল, তখন যে সব নারী স্বামীর শবের সঙ্গে একই চিতায় আরোহণ করে স্বেচ্ছায় জীবন্ত পুড়ে মরতো, তাদের বলা হতো সতী সাধ্বী নারী। সাধারণত সতী বলা হয় সেই নারীকে, যে নারী বিয়ের আগে কুমারীত্ব হারায়নি। দক্ষ কন্যা বা শিব পত্নী কুমারীত্ব রক্ষা কইে স্বামী গৃহে গিয়েছিলেন। সুতরাং তিনি নামে যেমন সতী, কর্মেও সতী। সতী সাবিত্রী শব্দও প্রচলিত, অর্থাৎ সাবিত্রীর ন্যায় সাধ্বী স্ত্রী।
মুসলমান নারীদের মধ্যে সতী-অসতীর কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না। বিবাহের পূর্ব পর্যন্ত কুমারীত্ব রক্ষা করতেই হয়। যারা রক্ষা করে না, তাদের জন্য রয়েছে শরীয়তের শাস্তি। সতী বাছাইয়ের ব্যবস্থা মুসলমানদের মধ্যে নেই। কোন কোন ধর্মে সতীত্ব হারানোতেই পূণ্য লাভ। অতএব মুসলিম সমাজে সতী শব্দটাই গ্রহণযোগ্য নয়। সতী সাধ্বী বা সতী সাবিত্রী মুসলমানদের কোন রূপ প্রয়োগে আসা উচিত নয়।
সতীর্থ
সতীর্থ অর্থ একই সময়ে একই গুরুর ছাত্র। সমান + তীর্থ (গুরু) সতীর্থ। তীর্থ শব্দের এক অর্থ গুরু। এবার চিন্তা করুন, সতীর্থ উচ্চারণের মাধ্যমে বা লেখার মাধ্যমে আমাদের বৈদিক সংস্কৃতির দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর আমরাও ভাষা-সংস্কৃতির পথ ধরে সে গন্তব্যেই যাচ্ছি। আমরা সতীর্থের পরিবর্তে সহপাঠী বলতে পারি। আরো কঠিন ভাষায় যদি বলতে হয় তাহলে বলতে পারি সহাধ্যায়ী।
স্নাতক
বৈদিক যুগে যে ছাত্র বা শিষ্য গুরুগৃহে বিদ্যা শিক্ষান্তে ব্রহ্মচর্য সমাপ্তিসূচক শাস্ত্রোক্ত পবিত্র জলে বা নদীতে স্নান করার পর স্নাতক উপাধি দ্বারা ভূষিত হতো, তারাই হতো স্নাতক। এর মানে ধর্ম জ্ঞান অর্জন করে শাস্ত্রীয় বিধান মতো স্নান করে পাপ মুক্ত হয়েছে এবং বিদ্বান বলে পরিগণিত হয়েছে অর্থাৎ সে স্নাতক হয়েছে। আজকাল আমরা কলিকাতার বাবুদের অনুকরণ করতে গিয়ে গ্রাজুয়েট অর্থে স্নাতক শব্দ গ্রহণ করেছি। পরিতাপের বিষয়, আমরা বৈদিক স্নাতক সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী হয়েছি। স্নাতক না হয়ে গ্রাজুয়েট থাকলে অসুবিধা কোথায়?
হরিলুট
এ শব্দটি মুসলমানরা প্রায়ই ব্যবহার করেন। হরি হলেন হিন্দু শাস্ত্র মতে নারায়ণ, বিষ্ণু, কৃষ্ণ, যম, বায়ু, চন্দ্র, সূর্য, সিংহ, অশ্ব ইত্যাদি। হরিলুট হচ্ছে হরি-সংকীর্তনের পর প্রসাদী বাতাসা তরুণদের বা ভক্তদের মধ্যে ছিটিয়ে বা ছড়িয়ে দেয়া। এই হলো হরিলুট শব্দের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। মুসলমানদের হরি বলতে কেউ নেই। আর নেই বলেই প্রাসাদী বাতাসা তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার কোন প্রশ্নই উঠে না। এ কারণেই মুসলমানরা এ শব্দের ব্যবহার কথায় বা লেখায় ঈমান-আক্বিদাগত কারণেই করতে পারে না।
