প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৪র্থ সংখ্যা,অক্টোবর ২০১৭, জিলহজ-মুহাররম ১৪৩৯ হিজরী,আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

১. হযরত খুসাইফ ইবনে আবদুর রহমান (হুসাইন ইবনে আব্দুর রহমান) বলেন, আমি হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রা:)-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে কে গত রাতে ভাঙ্গা তারা দেখেছ? জবাবে আমি বললাম, আমি দেখেছি এবং আমি আরো বললাম, আমি নামাযরত ছিলাম না; বরং আমাকে একটি বিষাক্ত কীট দংশন করেছে। (সে ব্যথার কারণে আমি জাগ্রত ছিলাম) তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, দংশনের প্রতিকার স্বরূপ তুমি কি করেছিলে? আমি বললাম, ঝাড়-ফুঁক করেছি। তিনি বললেন, কিসে তোমাকে তা করতে উদ্বুদ্ধ করলো। আমি বললাম, শা‘বী (রহ.) কর্তৃক আমার নিকট বর্ণিত একটি হাদীস আমাকে এ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তিনি বললেন, কি সেই হাদীস? আমি হযরত বুরাইদা ইবনুল হাসাব আসলামীর বর্ণিত হাদীস উল্লেখ করলাম। তিনি বলেন, শুধু নযর লাগলে অথবা কোনো বিষধর কীট দংশন করলে ঝাড়-ফুঁক করা ও করানো জায়েয আছে। হযরত সাঈদ (রা:) বললেন, তার শ্রুত বিষয়টিও ভালো।

তবে হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন, নাবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমার সামনে পৃথিবীর শুরু থেকে অদ্য পর্যন্ত সকল উম্মতকে পেশ করা হয়েছে। তখন আমি এক নাবীকে দেখতে পেলাম, যার সাথে এক কাফেলা সমান উম্মত আছে। কোনো নাবীর সাথে উম্মত হচ্ছে এক বা দুই ব্যক্তি মাত্র। কোনো কোন নাবীর উম্মতই নেই।

এরপর একটি বড় দলকে আমার সামনে আনা হলো। আমি ধারণা করলাম, এরা আমার উম্মত। কিন্তু আমাকে বলা হলো, এরা মুসা (আ:)-এর উম্মত। আমাকে বলা হলো, আপনি এক দিগন্ত লক্ষ্য করুন। আমি লক্ষ্য করে দেখলাম, সেখানে বিশাল সংখ্যক লোক রয়েছে। তখন আমাকে বলা হলো, এরা হলো আপনার উম্মত, এদের মাঝে এমন ৭০ হাজার লোক রয়েছে, যারা কোনো হিসাব-নিকাশ ও কোনো প্রকার কষ্ট ব্যতীতই জান্নাতে প্রবেশ করবে।

এতটুকু বলার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখান থেকে উঠে স্বীয় কক্ষে তাশরীফ নিলেন। তখন লোকেরা সে সকল লোক প্রসঙ্গে আলোচনা করতে লাগলো যারা কোনো হিসাব নিকাশ এবং কোনো প্রকার কষ্ট ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বলতে লাগলেন, নাবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণ-ই হলেন সে সকল সৌভাগ্যবান ব্যক্তি। কেউ কেউ বললেন, সে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হলো তারা, যারা মুসলমান হিসাবেই জন্মলাভ করেছে এবং আল্লাহর সঙ্গে কখনো কাউকে শরীক করে নি। এছাড়াও বিভিন্ন জন বিভিন্ন মন্তব্য করতে থাকলেন।

ইত্যবসরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের নিকট তাশরীফ এনে বললেন, তোমরা পরস্পরে কোন ব্যাপারে আলোচনায় লিপ্ত? সাহাবাগণ (রা:) আলোচনার বিষয় খুলে বললে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হলো তারা, যারা ঝাড়-ফুঁক ও তাবীয, মন্ত্র করে নি ও করায় নি এবং কোনো কু-লক্ষণ গণনা করে নি; বরং একমাত্র স্বীয় প্রভুর উপরই ভরসা করতো।

হযরত উকাশা (রা:) দাঁড়িয়ে আরয করলেন, আমার জন্য দু’আ করুন, যেন আল্লাহ তাআলা আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। তখন অন্য এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আরয করলো, আমার জন্য দু’আ করুন যেন আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, উকাশা তোমার থেকে অগ্রগামী হয়ে গেছে। (মুসলিম, বুখারীতে لايرقو ن শব্দটি নেই)

২. সুতরাং প্রতীয়মান হলো, নাবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একমাত্র খালিছ তাওহীদ মেনে চলা ও তাওহীদ পরিপন্থী কার্যাববলি হতে বিরত থাকাকেই বিনা হিসাবে জান্নাত লাভের মাধ্যম নির্ণয় করেছেন। অন্যের নিকট হতে ঝাড়-ফুঁক, তাবীয-মন্ত্র গ্রহণ না করা, কু-লক্ষণ গণ্য না করা ও একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করাই হলো বিনা হিসাবে জান্নাত লাভকারীর গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য। কু-লক্ষণ গণ্য করাও এক প্রকার র্শিক। সুতরাং সে কু-লক্ষণ গণ্য করবে না ও আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উপর ভরসা করবে না। কেননা, এটাই তাওয়াক্কুলের চূড়ান্ত পর্যায়।

৩. শুধু সত্তর হাজারই নয়, বরং ঐ সত্তর হাজারের প্রত্যেক হাজারের সাথে আরো সত্তর হাজার করে (অর্থাৎ, ৪৯ লক্ষ) মুসলিম জান্নাতে প্রবেশের সুযোগ লাভ করবে। অন্য এক বর্ণনা মতে ঐ সত্তর হাজারের প্রত্যেক ব্যক্তির সাথে আরো সত্তর হাজার করে মুসলিম জান্নাতে প্রবেশ করবে। (মুসনাদে আহমাদ, সিলসিলাহ সহীহ হা/১৪৮৪) অর্থাৎ উম্মাতে মুহাম্মাদিয়ার ৪৯০ কোটি মানুষ বিনা হিসাব ও আযাবে জান্নাতে প্রবেশ লাভ করবে।

এক বর্ণনা অনুসারে মহান আল্লাহ তিন অঞ্জলি অতিরিক্ত মুসলিমকে বিনা হিসাবে ও বিনা আযাবে জান্নাতে প্রবেশের অধিকার দেওয়া হবে। আর তার সংখ্যা কেবল তিনিই জানেন।

সম্ভবত এই অগ্রগামীদের কথাই মহান আল্লাহ কুরআন কারীমে বলেছেন,

وَالسَّابِقُوْنَ السَّابِقُوْنَ أُوْلٰئِكَ الْمُقَرَّبُوْنَ فِیْ جَنَّاتِ النَّعِيْمِ ثُلَّةٌ مِّنَ الْأَوَّلِيْنَ وَقَلِيْلٌ مِّنَ الْاٰخِرِيْنَ

আর অগ্রবর্তীগণ তো অগ্রবর্তী। তারাই তবে নৈকট্যপ্রাপ্ত। তারা থাকবে সুখময় জান্নাতসমূহে। বহুসংখ্যক হবে পূর্ববতীদের মধ্য হতে এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে। (সূরা আল ওয়াক্বিয়া : আয়াত ১০-১৪)