প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ ১০ম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৭, জমা.সানি-রজব ১৪৩৮ হিজরী, চৈত্র-বৈশাখ ১৪২৩-২৪বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
ভেস্ত/হদিস
ভেস্ত আর হদিস এই দু’টি শব্দ বেহেস্ত এবং হাদীস বানানের বিকৃত বানান ও রূপভেদ। কলিকাতার একটি অভিধানের এ ব্যাখ্যা লেখা আছে। শব্দ দুটি পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন সংবাদ ও প্রতিবেদনের শিরোনামে, বিবরণে ও বয়ানে প্রতিদিন ব্যবহার হচ্ছে। বক্তাদের বক্তব্যেও আসছে। বাংলাদেশে এই শব্দ দুটির ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় সকলেই। অন্য ধর্মাবলম্বী বাংলা ভাষাভাষীরা কোন নিয়তে ব্যবহার করেন তা পরিষ্কার। কিন্তু মুসলমানরা কেন তাদের বেহেস্ত ও হাদীসকে বিকৃত বানানে ও বিকৃত অর্থে ব্যবহার করেন, তা আমি বুঝি না। কলিকাতা থেকে প্রকাশিত সংসদ বাঙ্গালা অভিধান চতুর্থ সংস্করণে ৫৪৯ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে, ‘ভেস্ত-বেহেশত;-এর রূপভেদ বা বানানভেদ। হাদীস সম্পর্কে ৭১১ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, হাদীস আরবী শব্দ।
এর থেকে হদিস-এর উদ্ভব। অর্থ হচ্ছে তত্ত্ব, সন্ধান, খোঁজ। কলকাতার বাবু লিখিয়েরা বেহেস্ত ও হাদীসের বানানের বিকৃত রূপ নিয়েও যদি খুশী থাকতেন, আর আগে বাড়তেন না, তাহলে মনে করতাম, স্বভাব দোষে তারা ইসলামী পরিভাষা ও মুসলমানী নামকে বিকৃত বানানে লিখে থাকেন, এ তাদের ফেৎরত। কিন্তু তারা এ পর্যন্ত ইতি না টেনে দুটি পবিত্র শব্দকে বিকৃত বানানে বিকৃত অর্থে অপপ্রয়োগ করে বুঝিয়ে দিলেন যে, যে সব মুসলমান বেহেশতে যাওয়ার আশা করে, তারা গোল্লায় যায়। আর হাদীস তো খোঁজাখুজি করার একটি শব্দ। এছাড়া তার কোনো মূল্য নেই।
মুসলমানরা কোনো ভাবনা-চিন্তা ছাড়া বাবুদের কলমের ডগা দিয়ে যা আসে, তা যাচাই-বাছাই না করে বিষকে অমৃত মনে করে গলাধঃকরণ করেন। তারা ভেবেও দেখেন না, আসলে শব্দ দুটির অরিজিন অবস্থা কি ছিল, কেন বিকৃত করা হলো, কারা বিকৃত করলো এবং প্রয়োগে কেন অপপ্রয়োগের আশ্রয় নেয়া হলো? না, এদিকে কোনো ভাবনা-চিন্তা নেই। অনেক মুসলমান লেখক, বক্তা নিজ নিজ লেখায় ও বক্তৃতায় এবং সাধারণ শিক্ষিত লোকের আটপৌরে ভাষায়ও বিকৃত বানানের ভেস্ত/হদিস বিকৃত অর্থেই প্রয়োগ হচ্ছে। যারা কথায় কথায় ইসলামী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ টানেন, তারাও পত্রপত্রিকায় লেখেন, ‘প্রকল্পটি ভেস্তে গেছে; অর্থাৎ গোল্লায় গেছে অথবা ‘পুলিশ কোনো হদিস পায়নি আসামির’ অর্থাৎ সন্ধান পায়নি।
আগেই বলেছি, শব্দ দুটির বিকৃতরূপ ও বিকৃত বানানের জন্মদাতা এক শ্রেণীর হিন্দু লেখক। মুসলমানদের বেহেস্ত নসীব হওয়াকে বা বেহেস্ত যাওয়ার আশাকে গোল্লায় যাওয়ার অর্থে ব্যঙ্গ করে ব্যবহার করেন। এ কারণে তারা বেহেস্তের শুদ্ধ বানানকে উপহাস করে ভুল বানানে লেখেন। অনুরূপভাবে তারা হাদীসকে হদিস বলেন, বিকৃত উচ্চারণ অনুযায়ী বানানও লেখেন। হাদীসের স্থান আল কোরআনের পরই। কোরআনের ব্যাখ্যাই হচ্ছে হাদীস। হাদীস দিয়েই ব্যাখ্যা জানতে হয় আল কোরআনের অনেক আদেশ-নিষেধের। কোরআনে সালাত আদায় করার হুকুম আছে, নির্দেশ আছে। কিন্তু কিভাবে সালাত আদায় করতে হয়, তার বর্ণনা কোরআনে নেই, তা রয়েছে হাদীসে। এ জন্য নেক নিয়াতে সন্ধান অর্থে তারা হাদীসকে গ্রহণ না করে বিকৃত বানানে, অর্থে, ব্যঞ্জনায় এক সাধারণ শব্দে পরিণত করে ব্যবহার করে থাকেন।
কোরআনের পরে যে হাদীসের স্থান, এই হাদীসকে ‘হদিস’ বানিয়ে যেমন ইচ্ছা তেমন ব্যবহার করা হচ্ছে। পুলিশ আসামি খুঁজে পাচ্ছে না, এ ক্ষেত্রেও ‘হদিস’ প্রয়োগ হচ্ছে অর্থাৎ পুলিশ আসামির কোনো হদিস পাচ্ছে না। বাবুর্চি কোথায় চামচ রেখেছে তা খুঁজে পাচ্ছে না, এখানেও ‘হদিসের’ ব্যবহার। কোথায় তিনি মানিব্যাগ রেখেছেন খুঁজে পাচ্ছেন না, এখানেও ‘হদিসের’ ব্যবহার। হিন্দু লেখকরা এই দুই শব্দকে বানানে ও অর্থে বিকৃত করে এবং এর প্রয়োগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে শব্দ দুটিকে মুসলমানদের বিকৃত ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দিয়েছেন। মুসলমানরা বাবুদেরই অনুসরণ করছেন বোকার অনুসরণের মতো।
এক শ্রেণীর হিন্দু লেখক এতোই মুসলিম বিদ্বেষী, তারা ‘মুসলমান’ শব্দকে শুদ্ধ বানানে, ইসলাম পাওয়া যায় ‘ঐশলাম’ বা ‘এশলাম’ বানানে। তারা সোহরাওয়ার্দী আর আকরাম খাকে বরাবরই লিখলেন সুরাবর্দি ও ্আক্রমন খা বানানে। তাদের বদ নিয়তের বদ মতলবের কারিগরিতে আমাদের পরিভাষার বানানের বিকৃতিকে আর অপপ্রয়োগকে আমরা কিভাবে গ্রহণ করতে পারি? আমাদের বেহেস্ত ও হাদীসকে বিকৃত বানানে অভিধানে পৃথকভাবে উল্লেখ করে বিকৃত অর্থ আবিষ্কার করার পর হিন্দু সম্প্রদায় মুসলমানদেরই উপহার দিলেন, কি জঘন্য ধৃষ্টতা। আর আমরাও ব্যবহার করছি তাদের যোগ্য সেবা দাসদাসীদের ন্যায়। এও এক জঘন্য মানসিকতা।
মানুষের ভুল আছে শয়তানের ভুল নেই
যে সব মুসলমান এ কথা বলে থাকেন, তারা শয়তানকে ভুলের ঊর্ধ্বে বোধহয় মনে করেন। শয়তানের জন্মই তার কৃত ভুল থেকে। শয়তান কোন শুদ্ধ কর্ম করতে পারে না। ভুল তার জীবন-ধর্ম। মানুষের ভুল কখনো কখনো হয়। কিন্তু শয়তানের ভুল সদা সর্বদা। শয়তান তো ভুলের মাঝেই আছে। ভুল থেকে তার জন্ম।
