প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ-৮ম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারী ২০১৭, রবি.সানি-জমা.আউ ১৪৩৮ হিজরী, মাঘ-ফাল্গুন ১৪২৩বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
বিসমিল্লায় গলদ
ব্যবহারিক অর্থ হচ্ছে সূচনাতেই ভুল বা ত্রুটি । এই শব্দ যে সব মুসলিম লেখক ব্যবহার করেন, তারা শব্দটির অর্থ, ভাবার্থ এবং ঈমান-আক্বিদার দিকটি চিন্তা করে ব্যবহার করেন কিনা তা জানি না। চিন্তা-ভাবনা করে ব্যবহার করলে নিশ্চয়ই কোনো মুসলমান এর ব্যবহার করতে পারতেন না। ভুল কর বা বেখেয়ালে যারা ব্যবহার করেন, আল্লাহ তাদের মাফ করে দিতে পারেন। কিন্তু যারা জেনে বুঝে ব্যবহার করেন, তারা কবিরা গুণাহ করেন। ঈমানের বিরুদ্ধে তা ব্যবহার করেন। তারা জানেন কিনা যে, এই শব্দটির আবিষ্কারক মুসলিম বিদ্বেষী লেখক? তারা বিসমিল্লায় গলদ দেখিয়ে বিসমিল্লাহভিত্তিক ইসলামের যাবতীয় কর্মকা-কে গলদ প্রমাণ করতে চান। তারা তাদের চিন্তা অনুযায়ী হীনমন্যতার পরিচয় দিতে পারেন। কিন্তু মুসলমান লেখকরা কিভাবে তাদের অনুসরণ করে নিজেদের ঈমানের গলায় ছুরি চালাতে পারেন, তা আমার বুঝে আসে না।
ইসলামে বিসমিল্লাহর গুরুত্ব কতো গভীর অর্থবহ, ব্যাপক, বরকতময়, তা প্রত্যেক মুমিন-মুসলমানই জানেন। কালামে পাকে একটি মাত্র সূরা ছাড়া প্রত্যেক সূরার শুরুতে বিসমিল্লাহ ব্যবহার স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন করেছেন, সব কাজের শুরু বিসমিল্লাহ দিয়ে করেছেন। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণ করেছেন সকল সাহাবী এবং সাধারণ মুসলমান। এই সিলসিলা এখনো জারি আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে। বিসমিল্লাহ বলে কাজ শুরু করলে আল্লাহ বরকত দেন কাজে। কাজের জটিলতা দূর করে সহজে সম্পন্নের সহায়তা করেন আল্লাহ পাক। এই বরকতময় বিসমিল্লাহতে কেমন করে গলদ থাকতে পারে, তা বোধগম্য নয়। আরম্ভে ভুল-ত্রুটি অর্থে যারা বিসমিল্লাহকে গলদের বাহন বানিয়েছেন, তাদের মতলব ছিল খারাপ। মুসলমানদের মধ্যে যারা এ শব্দকে ব্যবহার করেন, তারা কি চিন্তা করে দেখেছেন যে, বিসমিল্লায় যদি গলদ থাকে, তাহলে শুদ্ধ আর কোথায় পাওয়া যাবে?
গোড়ায় গলদ, সূচনায় গলদ, মূলে ভুল, শুরুতেই ভুল-এসব শব্দ দ্বারা সুন্দরভাবে ভাব প্রকাশ করা যায়। বিসমিল্লাহতে গলদ এ শব্দ লেখার সময় মুসলিম লেখকের তো হাত কাঁপার কথা। আমরা এ ভুল আর যেন না করি।
বিদ্যাপীঠ
অধ্যয়ন, অনুশীলন ও অধ্যবসায় দ্বারা লব্ধ জ্ঞানই বিদ্যা। পীঠ অর্থ মন্দির, বেদী ইত্যাদি। প্রাচীনকালে গুরুর পাদপীঠে অর্থাৎ পা রাখার স্থানে শিষ্যরা বসে ধর্মশাস্ত্র চর্চা করতেন। মধ্যযুগে এমনকি আধুনিক যুগের প্রথম কয়েক শতাব্দীতেও পীঠ বলতে মন্দিরকে বুঝাতো। কারণ, সেকালে হিন্দুদের বিদ্যা চর্চা মন্দিরভিত্তিক ছিল। মন্দির থেকে বিদ্যা চর্চা যখন পৃথক স্থানে চলে যায়, তখন নাম দেয়া হয় বিদ্যালয়। আধুনিককালের অনেক মুসলমানও বিদ্যাপীঠ শব্দটি ব্যবহার করে বিদ্যালয়কে বুঝিয়ে থাকেন। সাংস্কৃতিক দাসত্ব একেই বলে। বিদ্যালয়, শিক্ষালয়, জ্ঞানালয় প্রভৃতি শব্দই তো উপযোগী শব্দ। নিজ সংস্কৃতির সাথে সাংঘর্ষিক যে কোন ধর্মের শব্দকে এড়িয়ে চলা তাকওয়ার দাবি।
ভাবমূর্তি
ইংরেজি শব্দ image এর বাংলা তরজমা করা হয়েছে ভাবমূর্তি। ইংরেজি ইমেজ শব্দের বাংলা তরজমা দাঁড়ায় প্রতিফলন, ছায়া, আয়নায় বস্তুর বা ব্যক্তির যে ছায়া পড়ে তাও ইমেজ। ভাবমূর্তির অর্থ করা হয়েছে ধ্যান বা কল্পনার দ্বারা গঠিত মূর্তি । শব্দটির ব্যবহার আমরা এভাবে করি। যেমন বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিদেশে যাতে বৃদ্ধি পায় এভাবে প্রবাসীদের চলাফেরা ও জীবন-যাপন করা উচিত । মুসলমানরা বিশেষ করে বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানরা আকিদাগত কারণে ইমেজের এ তরজমা গ্রহণ করতে পারে না। মূর্তি পাথরের হোক, খড়-বাঁশ ও মাটির হোক অথবা ভাবের বা কল্পনারই হোক, মূর্তি তো মূর্তি। এ মূর্তিকে পূজা করা হোক বা না হোক তাতে কিছু যায় আনে না। মুসলমানদের কাছে মূর্তিযুক্ত শব্দ আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলাম এই দুনিয়াতে এসেছে মূখ্য যে ক টি কাজ করতে তন্মধ্যে একটি হলো মূর্তির উৎসাধন, তা কল্পনার মূর্তি হোক বা বাস্তবের মূর্তি হোক। মূর্তি পূজারী যারা আছে তারা মূর্তিতে পূজা করুক। ইসলামের পরিধিতে এর প্রবেশ বা অনুপ্রবেশ নিষিদ্ধ। যারা মাটি দিয়ে মূর্তি না বানিয়ে ভাব দিয়ে মূর্তি বানিয়ে মুসলমান দ্বারা সুকৌশলে ব্যবহার করাচ্ছেন, তারা সত্যিই ধূর্ত আর মুসলমানরা সেই ধূর্তদের জালের শিকার।
দেশের ইমেজ বৃদ্ধি মানে দেশের ইজ্জত বৃদ্ধি, সম্মান বৃদ্ধি, মর্যাদা বৃদ্ধি। ভাবমূর্তি বৃদ্ধি তো বেমানান। ভাবমূর্তি বিশেষ এক সম্প্রদায়ের কাছে পরিচিত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইজ্জত, সম্মান ও মর্যাদা পরিচিত। মূর্তি নিয়ে মূর্তি পুরাজীরা থাকুক, আমরা মূর্তির অঙ্গন থেকে বেরিয়ে এসে দেশের ইজ্জত, সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করি। ভাব কে যদি একান্তই রাখতে হয় তাহলে মূর্তি কে ভাবের সম্মুখ থেকে সরিয়ে মর্যাদা শব্দটি বসাতে পারি। তাহলে শব্দটি হবে ভাব মর্যাদা। বলুন তো ভাবমূর্তি শব্দ থেকে কি ভাব মর্যাদা অবয়বে, সৌন্দর্যে ও ছন্দে খারাপ দেখায় বা শোনায়?
