প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ-৮ম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারী ২০১৭, রবি.সানি-জমা.আউ ১৪৩৮ হিজরী, মাঘ-ফাল্গুন ১৪২৩বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
হযরত ফাতেমা যোহরা (রা.)-এর বিবাহ
সর্বপ্রথম হযরত আবুবকর (রা.) ও হযরত উমর (রা.) একে একে হুযুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ফাতেমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব পেশ করেন। কিন্তু রসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত অল্প বয়স্কা ফাতেমাকে বিয়ে দিতে সম্মত হননি। অতঃপর আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের চাপে, কোন বর্ণনামতে হযরত আবুবকর ও হযরত উমর (রা.)-এর অনুপ্রেরণা হযরত আলী (রা.) লজ্জাবনত মস্তকে হুযুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে উপস্থিত হয়ে হযরত ফাতেম তাকে (রা.) তার হাতে সোপর্দ করার প্রস্তাব দেন।
এ থেকে বুঝা গেল, বিয়ের প্রস্তাবনা তথা পান-চিনি নামে বর্তমানে যেসকল রীতি-নীতি পালিত হয় থাকে সেগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও সুন্নাত বিরোধী। মৌখিক প্রস্তাবনা ও প্রস্তাব গ্রহণই এর জন্য যথেষ্ট। বিয়ের সময় হযরত ফাতেমা (রা.)-এর বয়স ছিল সাড়ে পনর বছর আর হযরত আলী (রা.) ছিলেন একুশ বছর বয়স্ক। এ থকে জানা গেল, এর চেয়ে অধিক বয়স পর্যন্ত বিয়ে বিলম্বিত করা অনুচিত। এটাও জানা গেল যে, বর-কণের বয়সের ভারসাম্য রক্ষা করা উচিৎ এবং বরের বয়স কণের চাইতে বেশি হওয়া উচিৎ।
হযরত রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আনাস (রা.) কে বললেন, যাও, আবুবকর, উমর, উসমান, তালহা, যুবায়র (রা.) এবং আরো একদল আনসার সাহাবাকে ডেকে নিয়ে আস। এ থেকে বুঝা গেল, বিয়ের অনুষ্ঠানে আপন লোকদেরকে দাওয়াত করাতে কোন দোষ নেই। এতে করে বিয়ের প্রচার কার্যও হয়ে যায়। তবে বিয়ের অনুষ্ঠানের সমাবেশ অযথা আড়ম্বরপূর্ণ না হওয়াই উচিৎ। উপস্থিত সময় যে কয়জনকে কাছে পাওয়া যায় তাদেরকে নিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করা যায়। উপরোক্ত সাহাবায়ে কিরাম সমবেত হওয়ার পর হুযুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মর্মস্পর্শী খুতবা দিয়ে বিয়ের আকদ সম্পন্ন করে দেন। অতএব বুঝা গেল, মেয়ের পিতার পক্ষে সমবেত মেহমানদের চোখের আড়ালে অবস্থান করা সুন্নতের খেলাফ বরং খোদ পিতা মেয়ের আকদ পড়াবেন-এটাই উত্তম। উকিলও। উকিলের উপর ওয়ালীর প্রাধান্য সর্বজনস্বীকৃত।
তুহ্ফাতুয যাওজাইন ইত্যাদি কিতাবের বর্ণনা অনুযায়ী হযরত ফাতেমা (রা.)-এর মোহর ছিল চারশ মিসকাল রৌপ্য। বর্তমান হিসাবে চারশ মিসকাল একশত পঞ্চাশ তোলা রৌপ্যের সমপরিমাণ। অতএব বুঝা গেল, বিয়েতে অত্যধিক লম্বা-চওড়া মোহর নির্ধারণ করা সুন্নতের খেলাফ। বরং মোহর ফাতেমীই যথেষ্ট এবং বরকতময়। বর মোহরে ফাতেমী আদায়ে অসমর্থ হলে তার চেয়ে কম মোহর রাখাই উত্তম হবে। আকদ সম্পন্ন করে হুযুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত সকলের মাঝে এক তরক খেজুর ছড়িয়ে বিলিয়ে দেন। যাহাবী প্রমুখ মুহাদ্দিসীনে কেরাম এই বর্ণনাকে দুর্বল আখ্যায়িত করেছেন। বড় জোর এক সুন্নাতে যায়েদার পর্যায়ভুক্ত বলা যায়। শরীয়তের নিয়ম হচ্ছে, কোনমুবাহ বা মুস্তাহাব কাজ যখন ফ্যাসাদ সৃষ্টির সহায়ক হয় তখন পরিত্যাগ করা উত্তম। খেজুর ছড়িয়ে বিলিয়ে দিতে গিয়ে আজকাল অনেক বিপাকের সম্ভাবনা দেখা দেয়। তাই হাতে হাতে বিতরণ করে দেওয়াই উত্তম।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উম্মে আইমান (রা.)-কে সঙ্গে দিয়ে হযরত ফাতেমাকে (রা.) হযরত আলী (রা.)-এর ঘরে পাঠিয়ে দিলেন। দুই জাহানের শাহজাদীর পিত্রালয় থেকে বিদায়ের এই ছিল দৃশ্য। এতে কোন ধুমধাম ছিল না, বরযাত্রী বা পালকী ছিল না। হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলীর কাছ থেকে খাদেমদের পারিশ্রমিকও গ্রহণ করেননি আর মহল্লাবাসী সকল আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াতও দেননি। আমাদেরও কর্তব্য হুযুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ করা এবং হুযুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মান থেকে নিজেদের সম্মানকে বড় মনে না করা। এ জাতীয় ধারণা থেকে আল্লাহ সবাইকে রক্ষা করুন।
অতঃপর হুযুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ফাতেমার ঘরে প্রবেশ করে তার কাছে পানি চাইলেন। হযরত ফাতেমা (রা.) চার কোণ বিশিষ্ট একটি পাত্রে পানি নিয়ে আসলেন। এ থেকে বুঝা গেল, নববধূর পক্ষে অত্যধিক লজ্জাবনত হয়ে চলাফেরা করা বা হাতে কোন কাজ করাকে দূষণীয় মনে করা সুন্নাতের পরিপন্থী। হুযুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপন মুখের লালা পানিতে ফেলে সেই পানি হযরত ফাতেমা (রা.)-এর বুক ও মাথায় ছিটিয়ে দিলেন এবং দোয়া কররেন- হে প্রভু! একে ও তার সন্তান-সন্তুতিকে বিতাড়িত শয়তানের কবল থেকে তোমার আশ্রয়ে সমর্পণ করলাম। অতঃপর ফাতেমাকে পিছন ফিরিয়ে তার পিঠে পানি ছিটিয়ে দিয়ে পুনরায় উপরোক্ত দোয়া করলেন। এরপর হযরত আলীর হাতে পানি আনিয়ে তার সাথেও একই ব্যবহার করলেন। তবে হযরত আলীর পিঠে পানি ছিটালেন না। এ থেকে বুঝা যায়, বিয়ের পরে বর-কনেকে একত্র করে এই আমল করা তাদের পক্ষে মঙ্গলকর। এ দেশীয় কুসংস্কারের এমনই রীতি যে, বিযের পরও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পর্দা রক্ষা করতে দেখা যায়। নববধূর পা-ধোয়া পানি ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেওয়ার যে রীতি আমাদের দেশে প্রচলিত রয়েছে, তাযকিরায়ে মাওযুয়াত কিতাবে তাকে বানোয়াট কুসংস্কার বলে প্রমাণ করা হয়েছে। অবশেষে হুযুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বিসমিল্লাহ পড়ে ঘরে প্রবেশ করতে বলেছেন।
অন্য এক রেওয়ায়াত মতে, হযরত ফাতেমা (রা.)-এর বিয়ের দিন এশার পরে হুযুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী (রা.)-এর ঘরে প্রবেশ করেন। সেখানে একটি পাত্রে পানি নিয়ে তাতে আপন মুখের লালা ফেলেন এবং সুরা ফালাক ও সুরা নাস পড়ে দোয়া করেন। অতৎপর প্রথমে হযরত আলী ও পরে হযরত ফাতেমাকে সেই পানি পান করতে এবং তা দিয়ে অযু করতে আদেশ দেন। অবশেষে তাদের দাম্পত্য জীবনের সুখ-শান্তি ও পুণ্যবান সন্তানাদির জন্য আল্লাহ তা আলার কাছে মোনাজাত করেন। মোনাজাত শেষে এরশাদ করেন, যাও, আরাম কর গিয়ে। জামাতার বাড়ি কাছে থাকলে এরূপ করা বরকতের কাজ। হযরত ফাতেমা (রা.)-এর বিয়ের সময় পিতা মেয়েকে যেসব জিনিসপত্র দান করেছিলেন তন্মধ্যে দুটি ইয়ামানী চাদর, দুটি তোষক, দুই জোড়া বালিশ, দুইটি রূপার বাজুবন্দ, একটি যাঁতা কল, একটি পানি রাখার পাত্র এবং কোন কোন রেওয়ায়াত মতে একটি পালংও ছিল। (ইযালাতুল খিফা)
কন্যাকে জেহেয দানের সময় নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা বাঞ্ছনীয়-
এক. সামর্থ্যরে অতিরিক্ত পরিমাণ আসবাব দান থেকে বিরত থাকা। দুই. দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র দান করা উচিত। তিন. মেয়েকে কিসব জিনিসপত্র দান কর হচ্ছে, তা সকলকে শুনানো বা প্রচার করে বেড়ানো ঠিক নয়। উপরোক্ত রেওয়ায়াত মোতাবেক এ তিনটি বিষয় হুযুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।
হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী (রা.) ও ফাতেমা (রা.)-এর কার্যক্ষেত্রে নির্দেশ করে বলেছেন-আলী বাইরের কাজ করবেন আর ফাতেমার দায়িত্ব ভিতর বাড়ির কাজ। এ দেশীয় ভদ্র ঘরের মেয়ে নিজ ঘরের কাজ করতে কেন লজ্জাবোধ করেন তা আমার বোধগম্য হয় না। হযরত আলী (রা.)-এর ওয়ালিমায় সামান্য কয়েক সা যব, কিছু খুরমা ও ময়দা ছাড়া আর তেমন কিছুই ছিল না। প্রকাশ থাকা আবশ্যক, এক সা প্রচলিত ওজনে তিন সের ছয় ছটাক। অতএব বুঝা গেল, সাধ্যাতিরিক্ত খরচ না করে এবং লোক দেখানোর ইচ্ছা পরিত্যাগ করে সামর্থ্যরে ভিতর থেকে যতদূর সম্ভব নিজের বিশেষ বিশেষ আপনজনদেরকে দাওয়াত দিয়ে পানাহার করানোই সুন্নতসম্মত ওয়ালিমা।
মুমিন জননীদের বিবাহ
হযরত খাদিজাতুল কোবরা (রা.)-এর বিয়ের মোহর ছিল পাঁচশ দিরহাম বা তার সমমূল্যের উট। হযরত নবী করীম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচা আবু তালেব এ মোহর আদায়ের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। হযরত উম্মে সালামা (রা.)-এর মোহর ছিল দশ দিরহামের জিনিসপত্র। হযরত জুয়াইরিয়া (রা.) ও হযরত সাওদা (রা.) প্রত্যেকের মোহর ছিল চারশ দিরহাম। হযরত উম্মে হাবীবা (রা.)-এর মোহর চারশ দিনার ছিল, যা আবিসিনিয়ার (বর্তমান ইথিওপিয়া) বাদশা পরিশোধ করেছিলেন। হযরত উম্মে সালামা (রা.)-এর ওয়ালিমায় যবের তৈরি খাদ্যের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। হযরত যয়নব বিনতে জাহাশ (রা.)-এর ওয়ালিমায় একটি বকরী যবেহ করে আমন্ত্রিত মেহমানদের গোশত-রুটি পরিবেশন করা হয়েছিল। উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামদের যার কাছে যা ছিল তা-ই একত্র করে হযরত সাফিয়্যা (রা.)-এর ওয়ালিমা সম্পন্ন হয়। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) নিজে বলেন, আমার ওয়ালিমায় উট-বকরী ইত্যাদি কোন কিছুই যবহে করা হয়নি। হযরত সাদ ইবনে উবাদা (রা.)-এর ঘর থেকে আনীত এক পেয়ালা দুধ দিয়ে আমার ওয়ালিমা হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অতি আদরের তন্ময়াগণ এবং নবী-সহধর্মিণীগণের বিয়ের বিস্তারিত বর্ণনা সিয়ারের কিতাবসমূহের আলোচ্য বিষয়। এখানে শুধু একটি মাত্র বিয়ের নাতিদীর্ঘ বর্ণনা দিয়ে অন্যান্যগুলো মোহর ও ওয়ালিমা সম্পর্কি আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমান কালে বিয়ে-শাদীর অনুষ্ঠানাদিতে প্রচলিত আড়ম্বর ও অপব্যয় যে রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসৃত রীতি পদ্ধতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী সেটা দেখানোই এখানে আসল উদ্দেশ্য। উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থেকে সেই উদ্দেশ্য মোটামুটি ভাবে হাসিল করা যেতে পারে। প্রকাশ থাকা আবশ্যক, এক দিরহাম প্রায় সোয়া চার তোলা রৌপ্যের সমান এবং দশ দিরহামে এক দিনার হয়। হিসাব করে দেখুন হুযুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদত্ত মোহরের পরিমাণ কত অল্প ছিল। হুযুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসচ্চল ছিলেন বলে কেউ একে উড়িয়ে দিতে পারবে না, কেননা তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইচ্ছা করলে সারা দুনিয়ার যাবতীয় সম্পদ তার পায়ে পড়ে গড়াগড়ি যেত। একটা বিয়েতে চারশ দিনার মোহর ছিল, তাও এক বাদশাহ প্রদান করেছিলেন। সে চারশ দিনার মোহর ছিল, তাও এক বাদশাহ প্রদান করেছিলেন। সে চারশ দিনারও তো আমাদের দেশে প্রচলিত মোহরের তুলনায় অনেক কম। নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তারই অবলম্বিত রীতি-পদ্ধতির অনুসরণ করা প্রতিটি মুসলমানদের একান্ত কর্তব্য। অন্যথায় দুনিয়া-আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রকট।
