প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ-৮ম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারী ২০১৭, রবি.সানি-জমা.আউ ১৪৩৮ হিজরী, মাঘ-ফাল্গুন ১৪২৩বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
যাকাত ও সাদাকা বিষয়ক
অবুঝদের হাতে ধনসম্পদ তুলে দেয়া নিষেধ
তোমরা নিজেদের ধন-সম্পদ যা আল্লাহ্ তা আলা তোমাদেরকে নিজেদের জীবন পরিচালনার জন্য দিয়েছেন তা অবুঝদের হাতে তুলে দিও না। বরং তা থেকে তাদেরকে খাদ্য-বস্ত্র দাও এবং তাদের সাথে ভালো কথা বলো। (নিসা : ৫)
মায়ের পেটে মরা বাচ্চাকে ওয়ারিশ বানানো নিষেধ
জাবির বিন্ আব্দুল্লাহ্ ও মিস্ওর্য়া বিন্ মাখ্রামাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : কোন বাচ্চা কারোর সম্পদের ওয়ারিশ হবে না যতক্ষণ না সে মায়ের পেট থেকে বের হওয়ার পর কোন ধরনের আওয়াজ করে। কোন ধরনের আওয়াজ দেয়া মানে, চাই সে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর কান্না করুক, চিৎকার কিংবা হাঁচি দিক। (ইবনু মাজাহ, হাদীস ২৮০০)
জমিনের কোন নির্দিষ্ট অংশের ফসলের বিনিময়ে উক্ত জমিন কারোর নিকট ভাড়া দেয়া নিষেধ
সা দ (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : আমরা নালার পাড়ের ফসলের বিনিময়ে যাতে নালার পানি সহজে পৌঁছে জমিন ভাড়া দিতাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করতে নিষেধ করেন এবং তিনি সোনা-রূপার বিনিময়ে জমিন ভাড়া দিতে আদেশ করেন। (আবু দাউদ, হাদীস ৩৩৯১)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেন জমিনের নির্দিষ্ট কোন অংশের বিনিময়ে তা ভাড়া দিতে নিষেধ করেছেন তা নিম্নোক্ত রাফি বিন্ খাদীজ্ (রা) এর হাদীস থেকে সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায়।
হানজালাহ বিন্ ক্বাইস্ আনসারী (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি রাফি বিন্ খাদীজ্ (রা) কে সোনা-রুপার বিনিময়ে জমিন ভাড়া দেয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন: তাতে কোন অসুবিধে নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে লোকেরা নদী-নালার পাড়ের এবং নির্দিষ্ট কোন অংশের ফসলের বিনিময়ে জমিন ভাড়া দিতো। তখন দেখা যেতো উক্ত নির্দিষ্ট অংশটুকুতেই শুধুমাত্র ফসল হয়েছে। অন্যটুকুতে নয়। অথবা অন্যটুকুতেই শুধুমাত্র ফসল হয়েছে। উক্ত নির্দিষ্ট অংশটুকুতে নয়। আর তখন এভাবেই ভাড়া চলতো। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করতে নিষেধ করেন। তবে নির্ধারিত যা কিছুর নিশ্চয়তা রয়েছে তার বিনিময়ে অবশ্যই ভাড়া দেয়া যাবে। (আবু দাউদ, হাদীস ৩৩৯২)
বিচারকের ভুল ফায়সালায় অন্যের সম্পদ অবৈধভাগে ভোগ করা নিষেধ
উম্মু সালামাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : আমি তো মানুষ মাত্র। আর তোমরা আমার কাছে মাঝে মাঝে বিচার নিয়ে আসো। হয়তো বা তোমাদের কেউ কেউ নিজ প্রমাণ উপস্থাপনে অন্যের চাইতে অধিক পারঙ্গম। অতএব আমি শুনার ভিত্তিতেই তার পক্ষে ফায়সালা করে দেই। সুতরাং আমি যার পক্ষে তার কোন মুসলমান ভাইয়ের কিছু অধিকার ফায়সালা করে দেই সে যেন তা গ্রহণ না করে। কারণ, আমি উক্ত বিচারের ভিত্তিতে তার হাতে একটি জাহান্নামের আগুনের টুকরাই উঠিয়ে দেই। (বুখারী, হাদীস ২৪৫৮, ২৬৮০, ৬৯৬৭, ৭১৬৯, ৭১৮১, ৭১৮৫ মুসলিম, হাদীস ১৭১৩)
ফল বিক্রিতে যা নিষেধ
আব্দুল্লাহ্ বিন্ আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন ফল শক্ত বা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কামুক্তির পূর্বেই এবং কোন গাছের ফল গাছপাড়া ফলের বিপরীতে বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। (বুখারী, হাদীস ২১৮৭)
দু জাতীয় বেচা-বিক্রি কিংবা দু ভাবে পোশাক পরা নিষেধ
আবু হুরাইরাহ্ (রা) নিষেধ করেন দু জাতীয় বেচা-বিক্রি, দু ভাবে পোশাক পরা ও দু সময়ে নামায পড়া থেকে। তিনি নিষেধ করেন ফজরের পর নামায পড়তে যতক্ষণ না সূর্যোদয় হয় এবং আসরের পর নামায পড়তে যতক্ষণ না সূর্যাস্ত হয়। তিনি আরো নিষেধ করেন কাপড়ের একাংশ এক ঘাড়ে সেঁটে রেখে অন্য ঘাড় খালি রাখতে এবং এমনভাবে একটি কাপড় পুরো শরীরে পেঁচিয়ে রাখতে যাতে করে লজ্জাস্থানটি খোলাবস্থায় আকাশের রোদ্র পোহাতে থাকে। তিনি আরো নিষেধ করেন কোন বস্তু শুধুমাত্র নিক্ষেপ এবঙ শুধুমাত্র হাতে ধরার ভিত্তিতেই বিক্রি করতে যাতে করে বস্তুটি ভালোভাবে দেখার কোন সুযোগই থাকে না। (বুখারী, হাদীস ৫৮৪ মুসলিম, হাদীস ৮২৫)
সর্বপ্রথম নিজের অংশীদারকে না জানিয়ে কোন জমিন কিংবা বাগান অন্যের নিকট বিক্রি করা নিষেধ
জাবির (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : তোমাদের কারোর নিকট কোন জমিন কিংবা খেজুর বাগান থাকলে সে যেন তা বিক্রি না করে যতক্ষন না তা নিজের অংশীদারের সামনে উপস্থাপন করে। (আহ্মাদ্ ৩/৩০৭ নাসায়ী ২/২৩৪)
জীবিত ছাগলকে গোস্তের বিনিময়ে বিক্রি করা নিষেধ
সামুরাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন জীবিত ছাগলকে গোস্তের বিনিময়ে বিক্রি করতে। (অহীহুল-জা মি, হাদীস ৬৯৩৩)
ঘোড়া, উট কিংবা গরু ও ছাগলকে খাসি করানো নিষেধ
আব্দুল্লাহ্ বিন্ উমর (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন ঘোড়া ও গৃহপালিত চতুষ্পাদ জন্তু তথা উট, গরু, ছাগল ইত্যাদি খাসি করতে। (স্বী হীহুল-জ ম , হাদীস ৬৯৫৯)
মূলতঃ উক্ত নিষেধাজ্ঞা খাসির মাধ্যমে কোন পশুর বংশ বিস্তার রোধের মানসিকতার কারণেই এসেছে। তবে কোন পশুকে তরতাজা কিংবা তার গোস্তকে সুস্বাদু করার জন্য খাসি করা হলে তাতে কোন অসুবিধা নেই।
আয়িশা ও আবু হুরাইরাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কুরবানী করার ইচ্ছা পোষণ করতেন তখন তিনি শিঙ বিশিষ্ট বড় সাইজের দু টি সুদর্শন ভেড়া খাসি খরিদ করলেন। যার একটি যবাই করতেন তাঁর উম্মতের পক্ষ থেকে যারা আল্লাহ্ তা আলার ব্যাপারে তাওহীদের সাক্ষ্য দিয়েছে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ব্যাপারে তাওহীদের বাণী পৌঁছে দেয়ার সাক্ষ্য দিয়েছে। আর অন্যটি জবাই করতেন তিনি ও তাঁর পরিবারবর্গের পক্ষ থেকে। (ইবনু মাজাহ্, হাদীস ৩১৮০)
তবে খাসি করার সময় অত্যন্ত সহজ পন্থাই অবলম্বন করবে। যাতে পশুর বেশি কষ্ট না হয়।
একটি পশু অন্য পশুর বিনিময়ে বাকিতে বিক্রি করা নিষেধ
সামুরাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি পশু আরেকটি পশুর বিনিময়ে বাকিতে বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। (আবু দাউদ, হাদীস ৩৩৫৬)
কুকুর কিংবা বিড়াল বিক্রি করা পয়সা খাওয়া নিষেধ
জাবির বিন্ আব্দুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুর ও বিড়াল বিক্রি করা পয়সা খেতে নিষেধ করেছেন। (আবু দাউদ, হাদীস ৩৪৭৯)
ক্রেতা-বিক্রেতার জন্যে যা নিষেধ
আব্দুল্লাহ্ বিন্ আমর বিন্ আস (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই স্বাধীন (উক্ত ব্যবসায়িক চুক্তি ভঙ্গের ব্যাপারে) যতক্ষন না তারা একে অপর থেকে পৃথক হয়ে যায়। তবে যদি তারা মূল চুক্তিতেই নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যে কোন কারোর অথবা উভয়েরই স্বাধীনতার শর্ত রেখে থাকে তা হলে সে সময় পর্যন্ত উক্ত ব্যক্তির জন্য তা বহাল থাকবে। উপরন্তু এদের কারোর জন্য জায়িয হবে না তার ব্যবসায়িক সাথী থেকে দ্রুত পৃথক হয়ে যাওয়া অন্যের পক্ষ থেকে চুক্তি ভঙ্গের ভয়ে। (আবু দাউদ, হাদীস ৩৪৫৬)
কোন খাদ্য দ্রব্য গুদামে স্টক করে পরিকল্পিতভাবে তার মূল্য বাড়িয়ে দেয়া নিষেধ
মা মার বিন্ আবু মা মার (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : একমাত্র কোন অপরাধী ব্যক্তিই খাদ্য দ্রব্য স্টক করতে পারে। (আবু দাউদ, হাদীস ৩৪৪৭)
স্বর্ণকে বিনিময়ে কিছু বেশকম করে বিক্রি করা নিষেধ
ফাযালাহ্ বিন্ উবাইদ (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : আমি খাইবার দিবসে একটি হার বারো দীনার দিয়ে কিনেছিলাম। যাতে ছিলো কিছু সোনা ও কয়েকটি পাথর দানা। অতঃপর আমি তা ভিন্নভাবে হিসেব করে দেখলাম তাতে বারো দীনারের বেশি স্বর্ণ রয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট ব্যাপারটি বলা হলে তিনি বললেন : এমনিভাবে কোন হার আর বিক্রি করা হবে না যতক্ষণ না তা ভিন্নভাবে হিসেব করে দেখা যায়।
নিজের প্রয়োজনাতিরিক্ত পানি বিক্রি করা নিষেধ
আবু হুরাইরাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
কারোর অতিরিক্ত পানি যেন বিক্রি করা না হয়। তা না হলে একদা ঘাসও বিক্রি করা হবে। (মুসলিম, হাদীস ১৫৬৬)
পশুর স্তনে কয়েকদিন দুধ জমিয়ে রাখা নিষেধ
আবু হুরাইরাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : তোমরা উট ও ছাগলের দুধ কয়েক দিন যাবৎ স্তনে জমিয়ে রেখো না। এমন করার পরও কেউ যদি তা খরিদ করে তা হলে সে দুধ দোহনের পর দু মতের ভালোটি গ্রহণ করবে। যদি সে চায় পশুটি এমতাবস্থায় নিজের কাছে রেখে দিবে। আর যদি চায় তা ফেরত দিবে এবং তার সাথে এক সা (দু কিলো ৪০ গ্রাম) খেজুর। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, এক সা খাদ্য। তবে গম নয়। (বুখারী, হাদীস ২১৪৮ মুসলিম, হাদীস ১৫২৪)
