প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৭ম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৬, রবি আউঃ-রবি সানি ১৪৩৭ হিজরী, পৌষ-মাঘ ১৪২২ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
আল্লাহ কুরআনে বলেছেন: বহু দুঃখ আছে তাদের, যারা মাপে বা ওজনে কম দেয়, যারা মানুষের কাছ থেকে যখন মেপে নেয়, পূর্ণমাত্রায় নেয়। আর যখন অন্যকে মেপে ও ওজন করে দেয়, তখন কমিয়ে দেয়। তারা কি চিন্তা করে না, তাদের এক মহা দিবসে জীবিত করে ওঠানো হবে? যেদিন সব মানুষ রাব্বুল আলামীনের সামনে দাঁড়াবে। (সূরা মুতাফফিফীন : আয়াত ১-৬)
মাপে কম দেয়া একটি মারাত্মক গোনাহ
আপনাদের সামনে আমি সূরা মুতাফফিফীন- এর শুরুর দিকের আয়াতগুলো তেলাওয়াত করলাম। আল্লাহ তাআলা এ আয়াতগুলোর মাধ্যমে একটি জঘন্য গোনাহর প্রতি আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। তাহল মাপে কম দেয়ার গোনাহ।
আরবী ভাষায় একে বলা হয়- তাতফীফ। এ তাতফীফ শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং শব্দটির অর্থ আরো ব্যাপক। যে কোন ব্যাপারে প্রাপককে প্রাপ্য থেকে কম দেয়াও তাতফীফ -এর অন্তর্ভুক্ত।
উল্লেখিত আয়াতগুলোর অর্থ এই- যারা মাপে কম করে, তাদের জন্য দুর্ভোগ। (আল্লাহ তাআলা এখানে শব্দ ব্যবহার করেছেন। এর অর্থ দুটি দুর্ভোগ এবং মর্মন্তুদ শাস্তি। দ্বিতীয় অর্থ অনুযায়ী আয়াতের অর্থ হবে এই-) কঠিন শাস্তি তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয় তথা প্রাপককে তার প্রাপ্য থেকে কম দেয়। এরাই তারা, যারা লোকের কাছ থেকে যখন মেপে নেয়, তখন পূর্ণমাত্রায় নেয় (এক আনাও নিয়ে নেয়)। আর যখন অন্য লোককে মেপে দেয় কিংবা ওজন করে দেয়, তখন কম করে দেয় (প্রাপককে তার সম্পূর্ণ প্রাপ্য দেয় না)। (তারপর আল্লাহ বলেন) তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে, সেই মহা দিবসে যেদিন সব মানুষ বিশ্ব পালনকর্তার সামনে দাঁড়বে? (সেদিন ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র আমলও কেউ গোপন করে রাখতে পারবে না। সবার আমলনামা চোখ ধাঁধিয়ে স্পষ্ট হয়ে যাবে। অতএব, তারা কি চিন্তা করে না যে, পার্থিব জগতের এ ক্ষুদ্র লোভ-লাভের কারণে তারা দোযখের শাস্তি ভোগ করবে?\’
এ হল মাপে কম দেয়ার শাস্তি। তাই কুরআনুল কারীম এ জঘন্য কাজ থেকে বারবার সতর্ক করেছে। হযরত শুআইব (আ.) এর কওমের বর্ণনাও এ প্রসঙ্গে এসেছে।
হযরত শুআইব (আ.) এর জাতির অপরাধকর্ম
হযরত শুআইব (আ.) আল্লাহর এক প্রেরিত নবী। নিজ কওমের কাছে পাঠানো হয়েছিল তাঁকে। তাঁর জাতি ছিল একটি অকৃতজ্ঞ জাতি। কুফর, শিরক, মূর্তিপূজাসহ নানা অপরাধে তারা ছিল নিমগ্ন। এছাড়াও একটি অপরাধ তাদের মাঝে ব্যাপক ছিল। তাহল তারা মাপে কম দিত। এ ব্যাপারে তাদের যথেষ্ট দুর্নাম ছিল। আরেকটি অপরাধও তারা করত। তাহল পথচারীদের মালামাল লুটপাট করে খেয়ে ফেলত। হযরত শুআইব (আ.) তাদেরকে বুঝালেন। কুফর ও শিরক থেকে সতর্ক করলেন। তাওহীদের প্রতি আহ্বান জানালেন। ওজনে কম না দেয়ার এবং পথচারীকে নিরাপদে সফর করতে দেয়ারও নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তাঁর জাতি ছিল নিজেদের কুকর্মে অটল, তারা হযরত শুআইব (আ.) -এর এসব দরদমাখা কথার কোন পাত্তা দিল না, বরং বলল:
আপনার নামায কি আপনাকে এই শিখায় যে, আমরা ওইসব উপাস্যের পূজা ছেড়ে দেই, আমাদের পূর্ব পুরুষেরা যার পূজা করে আসছে; আর আমাদের ধন-সম্পদকে নিজেদের ইচ্ছামত ব্যবহার করার অধিকারী না থাকি? কোনটা হালাল আর কোনটা হারাম – সবই কি আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে করতে হবে। (সূরা হুদ : আয়াত ৮৭)
হযরত শুআইব (আ.) তাদেরকে যতই বুঝালেন, কোন কাজ হল না। দুর্ভাগ্য তার জাতির। অবশেষে তাই ঘটল, যা নবীদের কথা অমান্য করলে ঘটে থাকে।
হযরত শুআইব (আ.) এর জাতির উপর আযাব
আল্লাহতাআলা হযরত শুআইব (আ.) -এর জাতির ওপর তীব্র গরম চাপিয়ে দিলেন। তিন দিন পর্যন্ত এ শাস্তি অব্যাহত থাকল। সে এক অসহনীয় জ্বালা। আসমান থেকে যেন আগুন পড়ছিল, আর যমীন থেকে যেন আগুন উগলে বের হচ্ছিল। ফলে তারা ঘরের ভেতরে ও বাইরে কোথাও শান্তি পেত না। তিন দিন পর হঠাৎ সেই জনপদের ওপর অন্ধকার মেঘ দেখা ছিল। এ মেঘের নিচে শুশীতল বায়ু ছিল। গরমে অস্থির জাতি দৌড়ে দৌড়ে এ মেঘের নিচে জমায়েত হয়ে গেল, তখন মেঘমালা তাদের ওপর পানির পরিবর্তে আগুন নিক্ষেপ শুরু করল। ফলে সবাই ছাই-ভস্ম হয়ে গেল। এদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
তারপর তারা শুআইব (আ.) কে মিথ্যাবাদী বলল, ফলে তাদেরকে মেঘাচ্ছন্ন দিবসের আযাব পাকড়াও করল।\’ (সূরা শুআরা : আয়াত ১৮৯)
অন্যত্র তিনি বলেছেন :’আমি অনেক জনপদ ধবংশ করেছি, যার অধিবাসীরা তাদের জীবনযাপনে মদমত্ত ছিল। এগুলোই এখন তাদের ঘর-বাড়ি, তাদের পর এগুলোতে মানুষ সামান্যই বাস করছে। অবশেষে আমিই মালিক রয়েছ। (সূরা কাসাস : আয়াত ৫৮)
যে ব্যক্তি ওজনে কম দেয়, সে তো মনে করে, এর দ্বারা আমার সম্পদ বাড়ছে। অথচ এগুলো কিছুই তো তার কাজে আসবে না।
এটা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ
ডাণ্ডা মেরে এক ছটাক, দুই ছটাক কিংবা এক তোলা, দুই তোলা হয়ত মেরে দিয়েছ, এর দ্বারা কয়েকটা পয়সা তোমার ঝুলিতে হয়ত জুটেছে, মূলত এটা পয়সা নয়, বরং আগুনের স্ফুলিঙ্গ। তোমার পেটে এ পয়সায় কেনা মাল ঢুকাচ্ছো না বরং অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ঢুকাচ্ছো। হারাম মাল এবং তার ভক্ষণকারী সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
যারা ইয়াতীমের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করে, তারা নিজেদের পেটে আগুনই ভর্তি করেছে এবং সত্ত্বরই তারা আগুনে প্রবেশ করবে। (সূরা নিসা: আয়াত ১০)
পারিশ্রমিক কম দেয়া গোনাহ
ওজনে কম দেয়া ইবাদাতের মধ্যেও রয়েছে। কেননা শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। যেমন তাফসীরশাস্ত্রের ইমাম হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) সূরা মুতাফফীনের প্রথম আয়াতগুলো তাফসীর করতে গিয়ে বলেছেন :
অর্থাৎ যারা নিজেদের নামায, যাকাত ও রোযা ইত্যাদিতে কম করে তথা ক্রটি করে, তাদেরও রয়েছে কঠোর শাস্তি। আখেরাতে এদেরকেও ওজনে কম দেয়ার অপরাধে পাকড়াও করা হবে। (তানভীরূল মিকায়াছ মিন তাফসীরি ইবনে আব্বাস : খন্ড, ২, পৃষ্ঠা ১৩২)
শ্রমিকের বিনিময় দিতে বিলম্ব করবে না
অথবা মনে করুন, কোন মালিক তার চাকরকে খুব খাটায়। আরামের সামান্য সুযোগও চাকরকে সে দেয় না। কিন্তু বেতন দেয়ার সময় তার চোখ কপালে ওঠে যায়। গড়িমসি করে, যেন কলজেটা তার ছিঁড়ে যায় অথবা দেয় ঠিক, তবে সময় মত দেয় না; বরং নিজের ইচ্ছে মতো দেয়, তাহলে এটাও ওজনে কম দেয়ার শামিল। রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : শ্রমিকের পারিশ্রমিক তাকে দিয়ে দাও, তার ঘাম শুকানোর আগেই। (সুনানে ইবনে মাজাহ : হাদীস নং ২৪৩৪)
চাকর-বাকরের মজুরি কেমন দিতে হবে?
হাকীমূল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন, আপনি হয়ত একজন চাকর রেখেছেন এবং তার ব্যাপারে নির্দিষ্ট বেতন আর দু\’বেলা খানা দেয়ার সিদ্ধান্ত স্থির করেছেন। কিন্তু খানার সময় যখন হল, নিজে তো পোলাও-জর্দ্দা খেলেন, আরো উন্নত মানের খানা পেটে দাফন করলেন, অথচ চাকর বেচারা! তার ভাগ্যে জুটল ওইসব উচ্ছিষ্ট ও অবশিষ্ট খাবার, যেগুলো কোন রুচিশীল মানুষের খাবার হতে পারে না। তাহলে এটাও এক প্রকার \’তাতফীর\’ বা অসমতা। কেননা আপনি যখন তার জন্য দু\’বেলা খানার বিষয়টি ধার্য করলেন- এর অর্থ হল, তাকে এমন খানা দিতে হবে যা হবে, রুচিসম্মত তৃপ্তিদায়ক। সুতরাং তাকে উচ্ছিষ্ট খাবার দেয়ার অর্থ হল, তার হক নষ্ট করা এবং তার প্রতি এক প্রকার অবিচার করা। আর এটাও উল্লেখিত তাতফীকের অন্তর্ভুক্ত।
চাকরির সময় মাপে কম করা
কোন ব্যক্তি যদি তার কোম্পানীর সঙ্গে আট ঘন্টার ডিউটিতে চুক্তিবদ্ধ হয়, আর সেই আট ঘন্টার ভেতর যদি সে কাজে ফাঁকি দেয়, তাহলে এটাও \’তাতফীর\’ তথা মাপে কম দেয়ার অন্তর্ভুক্ত।
কেননা আট ঘন্টার ওপর চুক্তিবদ্ধ হওয়ার অর্থ হল, এ আটটি ঘন্টা কোম্পানীর কাছে বিক্রি করে দেয়া। এখন আট ঘন্টার পরিবর্তে যদি সে ডিউটি করে সাত ঘন্টা, তবে এর অর্থ হবে, এ ব্যক্তি এ ঘন্টা ফাঁকি দিয়েছে। এটা হারাম ও কবীরা গোনাহ, যেমননিভাবে মাপে কম দেয়া কবীরা গোনাহ। আট ঘন্টার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে ডিউটি করল, সাত ঘন্টা অথচ বেতন নেয়ার সময় বেতন নিল সম্পূর্ণটা, তাহলে এটা তো অবশ্যই হারাম হবে।
প্রতিটি মিনিটের হিসাব দিতে হবে
একটা সময় ছিল যখন অফিস-আদালতে মানুষ ব্যক্তিগত কাজ চুরি করে করত। কিন্তু বর্তমানে এর উল্টোটা হচ্ছে। এখন আর চুরি-টুরির দরকার নেই। অফিস সময়ে ব্যক্তিগত কাজ করা এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ (ই. জীবনব্যবস্থা- ৩/১৫) নিজের অধিকার আদায়ের বেলায় সম্পূর্ণ সচেতন। বেতন বাড়ানোর দাবি, সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর আন্দোলন, এর জন্য মতবিনিময় সভা ও সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের আয়োজন চলছে অহরহ। নিজের দায়িত্ববোধ নেই, তবুও যেন দাবি-দাওয়ার শেষ নেই। নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব আদায়ে করে ফাঁকিবাজি, আর সুযোগ-সুবিধা লাভ ও বেতন বৃদ্ধির জন্য একপায়ে খাড়া। মনে রাখবেন, এটাও মাপে কম দেয়ার শামিল। এ জাতীয় লোকের জন্যই কুরআনে কঠিন শাস্তির ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আল্লাহর দরবারে প্রতিটি মূহূর্তের হিসাব দিতে হবে। এ ব্যাপারে ছাড় দেয়া হবে না মোটেও।
দারুল উলূম দেওবন্দের আসাতিযায়ে কেরামের অবস্থা
দারুল উলূম দেওবন্দের নাম কে না জানে। শেষ যামানায় উম্মতের জন্য এক বিরাট রহমত এই প্রতিষ্ঠানটি। এ প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছেন অনেক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব, যাদের কথা শুনলে জীবন্ত হয়ে ওঠে সাহাবায়ে কেরামের পরিশীলিত জীবন।
আমি আব্বাজান মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.)-এর কাছে শুনেছি, যারা দারুল উলূম দেওবন্দের প্রথম সময়কার উস্তাদ ছিলেন, তারা ছিলেন নিঃস্বার্থ মানব। দারুল উলূমের ব্যস্ত সময়ে যদি তাদের কাছে কোন মেহমান আসত, তারা মেহমানের জন্য ব্যয়িত সময়টি নোট করে রাখতেন। গোটা মাস এভাবেই করতেন। মাসের শেষে তারা এ বলে দরখাস্ত দিতেন যে, অমুক সময় আমি ব্যক্তিগত কাজে দারুল উলূমের সময় নষ্ট করেছি। তাই আমার বেতন থেকে ওই পরিমাণে বেতন কেটে নেয়া হোক।
বেতন যেন হারাম না হয়ে যায়
বেতন বাড়ানোর জন্য আবেদন করা বর্তমানের এক সাধারণ বিষয়। কিন্তু বেতন কাটার জন্য আবেদন করা এ সময়ে কল্পনা করা যায় কি? এটা করতে পারেন তারাই, যাদের জীবন তাকওয়ার দীপ্তিতে আলোকজ্জ্বল। বর্তমানে আদর্শের বুলি তো সবাই কপচায়, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে কতজন তা বাস্তবায়ন করে? বর্তমানের সমাজ দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে। মানুষ আজ দিশেহারা।
শ্রমিক শ্রম দিচ্ছে, ঘাম ঝরাচ্ছে, অথচ বাহাদুর (!) এয়ারকিন্ডশনে বসে আড্ডা দিচ্ছে। একদিকে সাহেবের (!) জীবন উদ্দাম খুশি আর অবাধ স্বাধীনতার থৈ থৈ করছে। বলুন, এই সাহেবের বেতন কতটুকু হালাল হচ্ছে? প্রকৃতপক্ষে এর দ্বারা যেমন মাপে কম দেয়ার গোনাহ হচ্ছে, তেমনিভাবে মানুষকে কষ্ট দেয়ার গোনাহও কামাচ্ছে।
সরকারি অফিসের অবস্থা
এক সরকারি অফিসারে মুখে শুনেছি, তিনি বলেন- আমার দায়িত্ব হল, উপস্থিতির স্বাক্ষর ও খাতা দেখাশুনা করা। এক সপ্তাহের উপস্থিতি-রিপোর্ট পরের সপ্তাহে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে পেশ করি। কিন্তু সমস্যা হল, আমাদের অফিসে তরুণ-যুবকের সংখ্যা বেশি। এদের অধিকাংশই সন্ত্রাসীও বটে। অফিসের কোন নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা এরা করে না। অনেক সময় অফিসে আড্ডা মারে। বড় জোর আধ ঘন্টা অফিসের কাজ করে। তারপর চলে যায়।
একবার আমি হাজিরা খাতায় লিখে দিয়েছিলাম যে, অমুক অমুক অনুপস্থিত। এতেই ঘটে গেল তুলকালাম কান্ড। পিস্তল-রিভলভার নিয়ে সরাসরি ছুটে এল আমার কাছে। পিস্তল হাঁকিয়ে একজন আমাকে জিজ্ঞেসা করল, হাজিরা দিলেন না কেন? এক্ষুণি হাজিরা লিখে দিন। এই যখন অবস্থা তাহলে বলুন, আমি কী করতে পারি? যদি হাজিরা দিই, তাহলে হবে মিথ্যা। আর যদি না দিই, তাহলে খেতে হবে গুলি। এখন আমি কী করি? এটাই আমাদের অফিসগুলোর হালচাল।
আল্লাহর হকসমূহে ক্রটি করা
সবচেয়ে বড় হক হলো, আল্লাহতাআলার হক। তার হকের ব্যাপারে ক্রটি করাও মাপে কম দেয়ার অন্তর্ভুক্ত। যেমন হযরত ওমর (রাযি.) এক ব্যক্তিকে দেখলেন যে, সে ঠিকঠাক মত নামাযের রুকু-সিজদা ইত্যাদি আদায় করে না এবং নামায দ্রুত শেষ করে দেয়। তিনি তাকে বলেন, অর্থাৎ আমি আল্লাহর প্রাপ্য আদায়ে কম দিয়েছ। (এই বাক্যটি হযরত ওমর (রাযি.) ইবনে অবহেলা করে আসছিলেন। মুআত্তা ইমাম মালেক: হাদীস নং- ১৯; কানযুল উম্মাল: খন্ড ৮ পৃষ্ঠা ৪২, হাদীস নং ২১৭৭৮; জামিউল উসূল মিন আহাদিসির রাসূল : খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৩১১, হাদীস নং ৩১৬৯) মনে রাখবে, যে কোন প্রাপ্য চাই আল্লাহর হক হোক কিংবা বান্দার হক- যদি আদায়ে ক্রটি করে, তাহলে সেটাও \’তাতফীফ\’ তথা মাপে কম দেয়ার শামিল হবে এবং এ ব্যাপারে কুরআনে বর্ণিত সব শাস্তি তার ওপরও বর্তাবে।
বেজাল মেশানোও অধিকার খর্বের অন্তর্ভূক্ত
আসলের সঙ্গে ভেজাল মিশিয়ে দিলে তাও মাপে কম দেয়ার শামিল। যেমন এক ব্যক্তি আটা কিনল এক কেজি। কিন্তু বিক্রেতা তার মধ্যে আধা কেজি অন্য কিছু মিশিয়ে দিল, তাহলে এটা তাতফীফের অন্তর্ভুক্ত। কারণ তাতফীফ তথা মাপে কম দেয়ার বিষয়টি শুধু বেচাকেনা এবং মাপ-পরিমাণে মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। এর মর্মাথ ব্যাপক, ভেজাল মিশ্রিত করে বেচাকেনাও এর অন্তভুক্ত হবে।
যদি পাইকার ভেজাল মেশায়
কেউ কেউ বলে, আমরা হলাম খুচরা বিক্রেতা। আমরা পাইকারীভাবে মাল ক্রয করে পরে তা খুচরা বিক্রি করি। এখন পাইকার যদি ভেজাল মেশায়, তখন আমাদের কী করার আছে? অনিবার্য কারণে আমাদের ভেজাল পণ্য বিক্রি করতেই হয়। এছাড়া আমাদের কোন উপায় নেই।
এই সমস্যার সমাধান হল, খুচরা বিক্রেতা তার ক্রেতার কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করে দিতে হবে। এটা বলে দিতে হবে যে, ভাই! এ পণ্যে আসল কতটুকু আর ভেজাল কতটুকু-এর গ্যারন্টি আমার কাছে নেই, তবে আমার জানা মতো, এতটুকু আসল ও এতটুকু ভেজাল।
তবে মার্কেটে যদি এমন কোন পণ্য থাকে, যার ভেজাল সম্পর্কে মোটামুটি সবাই জানে। যেমন বর্তমান সময়ে তো ভেজাল কথাই নেই। এই অবস্থায় বিক্রেতা প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্নভাবে বিষয়টি বলে দিতে হবে না। হ্যাঁ, বিক্রেতা যদি মনে করে, এ বেচারা এটা জানে না যে, পণ্যটিতে ভেজাল আছে, তাহলে তখন জানিয়ে দিতে হবে।
পণ্যের ক্রটি ক্রেতাকে জানাতে হবে
অনুরূপভাবে ক্রটিযুক্ত পণ্যের ক্রটি সম্পর্কে ক্রেতার জানা না থাকলে বিক্রেতাকে তা জানিয়ে দিতে হবে। তখন ক্রেতার ইচ্ছা কিনবে, অন্যাথায় কিনবে না। এ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি ক্রটিযুক্ত পণ্য বিক্রির সময় ওই ক্রটির কথা গোপন রাখে, সে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার অব্যাহত গযবে এবং ফেরেশতাদের অবিরাম লানতের মধ্যে থাকবে। (সুনানে ইবনে মাজাহ : হাদীস নং ২২৩৮)
ধোঁকাবাজরা আমাদের দলভুক্ত নয়
একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারে গিয়েছিলেন। দেখতে পেলেন, এক লোক গম বিক্রি করছে। তিনি গম বিক্রেতার কাছে এগিয়ে গেলেন। তারপর গমের স্তুপের ভেতর হাত ঢুকিয়ে নিচের গম উপরিভাগে নিয়ে এলেন। দেখতে পেলেন, উপরিভাগের গমগুলো ভালো হলেও ভেতরকার গমগুলো ভেজা জ্যাবজ্যাবা ও ভ্যাপসা। ফলে ক্রেতা যখন কিনবে, সে তো উপরিভাগের গমগুলো দেখেই কিনবে। সে মনে করবে, কত সুন্দর সোনালী গম। এজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে জিজ্ঞেসা করলেন, এর কারণ কী? ভালোগুলো উপরে রাখলে আর খারাপগুলোকে ভালোগুলো দ্বারা লুকিয়ে রাখলে কেন? খারাপগুলো যদি উপরে রাখতে, তাহলে ক্রেতা দেখতে পেত, তারপর বিবেচনা করে কিনত, অন্যথায় রেখে দিত।
ওই ব্যক্তি উত্তর দিল, ইয়া রাসূল্লাল্লাহ! বৃষ্টির কারণে কিছু গম নষ্ট হয়ে গিয়েছে, তাই সেগুলোকে আমি ভালোগুলোর দ্বারা ঢেকে দিয়েছি। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এরূপ করবে না। নিচেরগুলো উপরে করে দাও, তারপর তিনি বলেন:
\’যে ব্যক্তি ধোঁকা দেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।\’ (সহীহ মুসলিম : হাদীস নং ১৪৭; সুনানে তিরমিযী; হাদীস নং ১২৩৬; সুনানে মাজাহ : হাদীস নং ২২১৬; মুসনাদে আহমাদ : হাদীস নং ৪৮৬৭; সুনানে দায়েমী : হাদীস নং ২৪২৯)
অর্থাৎ ভেজাল মিশ্রিত করে, ভালো-খারাপ মিলিয়ে যদি বিক্রি করে, তাহলে এটা ভাবা যাবে না যে, আমি ধোঁকা দেইনি। কারণ আমি তো ভেজাল হলেও মাপে কম দেইনি, বরং এটাও ধোঁকা। আর ধোঁকাবাজ মূসলমানদের দলভুক্ত নয়। বরং এটা ম্নুাফেকীর নির্দশন। কোন মুসলমানের প্রতীক এটা নয়।
