প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ২য় সংখ্যা, আগষ্ট ২০১৬, শাওয়াল-জিলকদ ১৪৩৭ হিজরী, শ্রাবন-ভাদ্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আলেমে দ্বীন ও মাসিক মদীনা সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (৮৫) গত ২৫ জুন শনিবার বিকেল সাড়ে ৬ টায় ইফতারের কিছুক্ষণ আগে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, তিন ছেলে, দুই মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান দীর্ঘদিন থেকে অসুস্থ ছিলেন। সম্প্রতি তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে কাকরাইল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতলে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে তাকে ল্যাবএইড হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
২৬ জুন রোববার বাদ জোহর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে মরহুমের নামাজে জানাজা অনুতি হয়। পরে তার লাশ নেয়া হয় ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার আনসারনগদ গ্রামের নিজ বাড়িতে। ২৭ জুন সোমবার জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.) ১৯৩৫ সালের ১৯ এপ্রিল কিশোরগঞ্জ জেলাধীন পাকুন্দিয়া উপজেলার সুখিয়া ইউনিয়নের ছয়চির গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার আনসারনগরে। তার বাবা হাকীম মৌলভী আনসারুদ্দীন খান ও মা রাবিয়া খাতুন। পাঁচবাগ মাদরাসা থেকে ১৯৫১ সালে আলিম ও ১৯৫৩ সালে স্কলারশিপসহ ফাজিল পাস করেন। ১৯৫৩ সালে উচ্চ শিক্ষার্থে ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন এবং ১৯৫৫ সালে হাদিস বিষয়ে কামিল ও ১৯৫৬ সালে ফিকহ বিষয়ে কামিল ডিগ্রি লাভ করেন।
মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.) ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। তিনি ১৯৬০ সালে মাসিক দিশারী, ১৯৬৩ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সাপ্তাহিক নয়া জামানা সম্পাদনা করেন ও ১৯৬১ সালে থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মাসিক মদীনা সম্পাদনা করেছেন। এ ছাড়াও তার সম্পাদিত আজ এক সময় সাহিত্য মহলে সাড়া জাগায়। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান ১৯৮৮ সালে সৌদিভত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা রাবিতায়ে আলমে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নিযুক্ত হন। ১৯৭০ সালে অনুতি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে ময়মনসিংহের গফরগাঁও নির্বাচনী এলাকায় জমিয়তের প্রার্থী হিসেবে খেজুর গাছ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালের সম্মেলনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে জমিয়তের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে তিনি নির্বাহী সভাপতির দায়িত্ব লাভ করেন। তিনি ইসলামী ঐক্যজোটের সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
গত শতকের ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান পাকিন্তান জাতীয় পরিষদের সাবেক সদস্য ও ডেপুটি স্পিকার এ টি এম আবদুল মতীনের সহযোগিতায় দারুল উলুম ইসলামী একাডেমি নামে একটি প্রতিান গড়ে তোলেন। স্বাধীনতার পর এ প্রতিানের নাম পরিবর্তন করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন রাখা হয়।
টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে ২০০৫ সালের ৯ ও ১০ মার্চ মাওলানা মুহিউদ্দীন খান ভাতীয় নদী আগ্রাসন প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির ব্যানারে টিপাইমুখ অভিমুখে ঐতিহাসিক লংমার্চের ডাক দেন। এতে দেশের প্রায় ৩০টি সংগঠন যোগদান করে।
অসহায়, দরিদ্র ও ইয়াতিম ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ, সম্বলহীন লোকদের বসতবাড়ি নির্মাণসহ সার্বিক কল্যাণে তিনি কাজ করে গেছেন। বান্দরবন জেলার কয়েক শ উপজাতি পরিবার তার সহযোগিতায় ইসলাম গ্রহণ করে। সেখানে প্রায় তিন শতাধিক নারী-পুরুষকে তিনি তাওহিদ মিশন নামক সংস্থার মাধ্যমে পুনর্বাসন করেন।
প্রতিভাধর মাওলানা মুহিউদ্দীন খান বাংলা ভাষায় ইসলামী সাহিত্য রচনা, সম্পাদনা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বাংলা ভাষায় সিরাত সাহিত্যের বিকাশে তার অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি প্রায় ১০৫ খানা গ্রন্থ অনুবাদ ও রচনা করেন। তার সম্পাদিত মাসিক মদীনার প্রশ্নোত্তর সঙ্কলন সমকালীন জিজ্ঞাসার জবাব ২০ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।
শোক তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ ও রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিবৃতি দিয়েছেন বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন।
