প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ২য় সংখ্যা, আগষ্ট ২০১৬, শাওয়াল-জিলকদ ১৪৩৭ হিজরী, শ্রাবন-ভাদ্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

পোশাক-আশাক, চাল-চলন, আহার-বিহার ইত্যাদিতে বিধর্মীদের বেশ ধারণ করাও একপ্রকার ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। আহমদ ও আবু দাউদ শরীফে হযরত ইবনে ওমর (রা.) এর রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছেÑ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে কেউ ভিন্ন ধর্মাবলম্বী জাতির অনুকরণ করবে সে সেই জাতির অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে।

মুসলিম শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আবিল আস বর্ণনা করেন, আমার গায়ে কুসুম রঙের দুটুকরা কাপড় দেখে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ কাপড় নিঃসন্দেহে কাফেরদের পোশাক, একে পরিধান করো না।
আবু দাউদ বর্ণিত এক হাদীসে আছে, হযরত আবু রায়হানা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশটি জিনিস নিষিদ্ধ করেছেন, তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, আজমীদের অনুকরণ করে কাঁধে রেশমের টুকরা লাগানো। বুখারী মুসলিম শরীফেও বর্ণিত অপর এক হাদীসে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) রেওয়ায়াত করেন, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইহুদী ও খ্রিস্টানরা খেযাব ব্যবহার করে না, তোমরা তাদের বিরোধিতা কর। এছাড়াও এ সম্পর্কে আরো অসংখ্য হাদীস রয়েছে। এ সকল হাদীস থেকে নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত হয় যে, কাফেরদের অনুকরণ করা হারাম। কোন কোন হাদীসে তাদের মতো পোশাক পরতে নিষেধ করা হয়েছে, কোন কোন হাদীসে তাদের রঙে রঞ্জিত হতে নিষেধ করা হয়েছে, আর কোন কোন হাদীসে তো সামগ্রিক ব্যাপারে তাদের অনুকরণ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। বর্তমান কালে অনেক লোকের মনে এ ব্যাপারটি বিন্দুমাত্রও দাগ কাটে না। কোন কোন সাহেব এইসব হাদীসকেই অস্বীকার করে বসেন, হাদীসের কোন মূল্যই নেই যেন তাদের কাছে। কি স্পর্ধা! কি অনাচার! যে শিক্ষার প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশও সংকলক তথা সংকলনের সময়কাল বর্ণনাকারী থেকে শুরু করে রসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন ও বিশুদ্ধ বর্ণনা পরস্পর দ্বারা প্রমাণিত এবং সকল যুগের প্রত্যেক বর্ণনাকারীর জন্ম-মৃত্যু, চালচলন, শিক্ষক-ছাত্র, ধার্মিকতা, সত্যবাদিতা, স্মরণশক্তি, আক্বীদা-বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা ইত্যাদি যাবতীয় অবস্থার চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ করে তবেই এক-একটা হাদীস গ্রহণ করা হয়েছে। আর কোন কিছুতে সামান্য বেশ-কম বা শোবা-সন্দেহ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এত কিছু যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যে বিষয় সংকলিত হয়েছে, তাকে নির্ভরযোগ্য মনে না করে, হাজারো রকমের সত্য-মিথ্যার সমন্বয়ে লিখিত ইতিহাস শাস্ত্রের প্রতিটি অংশকে যেন ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংগরূপে ধারণা করা হয়। অথচ ইতিহাসে লিপিবদ্ধ অনেক কথাই ঐতিহাসিকগণ আন্দায-অনুমানের উপর ভিত্তি করে লিখে ফেলেছেন। অনেক ব্যাপারে ঐতিহাসিকগণ এত বেশি মতবিরোধ করেছেন যে, এর মধ্যকার অসংগতি দূর করা কোন প্রকারেই সম্ভব নয়। ঐতিহাসিকদের ঈমান, সত্যবাদিতা ও স্মরণশক্তি কোনটাই মুহাদ্দিসগণের সমপর্যায়ের নয়। তারপরও বে-ইনসাফির তো কোন সীমা আছে !

কেউ কেউ বলে থাকেন, অনুকরণ সম্পর্কিত হাদীসগুলো দুর্বল। বড় আশ্চর্যের কথাবার্তা! যারা দুর্বল হাদীসের সংজ্ঞাই জানে না তারা আবার কোনটা সবল কোনটা দুর্বল তা নির্ধারণ করে! আচ্ছা জনাব একটা হাদীস হলে না হয় তা দুর্বল বলেই মেনে নিতাম, কিন্তু এ অসংখ্য হাদীসসমূহকে কি একেবারে বিনা প্রমাণেই দুর্বল বলে ফেলবো? ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অনুকরণের বিষয়টা তো আমরা খোদ কোরআন শরীফ দ্বারাই সমাধান করে নিতে পারি। কোরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন, হে ঈমানদারগণ! পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো।

অপর আয়াতে আছে হে ঈমানদারগণ! তোমরা কাফেরদের মতো হয়ো না।

একটু কষ্ট স্বীকার করে এ আয়াতদ্বয়ের তফসীর ও শানে নুযুল পাঠ করার অনুরোধ করছি। দ্বিতীয় আয়াতে ব্যবহৃত কাফ বর্ণ যে অনুরূপ বুঝানোর উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তা যদি জানেন তাহলে নিশ্চিত হতে পারবেন যে কোরআন শরীফে এ বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। তাহলে কি এখন কোরআনকেই দুর্বল প্রতিপন্ন করার চিন্তা-ভাবনা করবেন? আল্লাহ তাদের মঙ্গল করুন, অনেকে তো এ ব্যাপারে বুদ্ধিগত সন্দেহ করে বসেন। তারা যুক্তি দেখান, অনুকরণ যদি হারামই হয় তাহলে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দাও, চেহারা থেকে নাক কেটে ফেল ইত্যাদি ইত্যাদি, কেননা এসব দিক দিয়েও তো অন্য জাতির সাথে আমাদের মিল রয়েছে। ব্যাপারটা তো এরকম হলো, যেমন, কেউ ব্যভিচার হারাম হওয়ার ব্যাপারে সন্দিগ্ধ হয়ে বললো, আরে সাহেব! ব্যভিচার যদি হারাম হয় তাহলে তো বিয়েকেও হারাম বলতে হয়, কেননা, উভয় কর্মই মূলতঃ অনুরূপ। কথা হচ্ছে, যে বিষয়ের উপর যার দখল নেই সে বিষয় আলাপ করা তার পক্ষে সমীচীন নয়। খামাখা নিজেকে অপদস্ত করার কোন মানে আছে? এটা শরীয়তের মাসআলা, শরীয়ত বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে অনুকরণ হারাম হওয়ার কারণ প্রথমে ভালভাবে জেনে নিয়ে অতঃপর যা বলার তাকে বলুন।
এ ব্যাপারে সঠিক তথ্য হচ্ছে এই যে, যে বিষয় স্বয়ং নিন্দনীয় ও গর্হিত সে বিষয়ে অনুকরণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যেমন, টাখনু ঢেকে প্যান্ট-পায়জামা পরা। এতে যদি কোন বিধর্মীর অনুকরণ নাও হয়, তবুও টাখনুর নীচে নামার কারণে তা নিষিদ্ধ। এ সম্পর্কিত হাদীসের বর্ণনা ইতোপূর্বে এসেছে। অনুকরণ দোষে দুষ্টু হয়ে তা আরো পাপ বাড়ায়। আর খোদ বিষয়টি নিন্দনীয় ও গর্হিত না হলেও তা যদি অন্য ধর্মাবলম্বীকে অনুকরণের উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা হয় অথবা বিষয়টি যদি ভিন্ন জাতির প্রচলিত প্রথাগত বৈশিষ্ট্য হয় তাহলে এমন বিষয়গুলোও নাজায়েয হবে। আর কোন হালাল কর্ম সম্পাদনে যদি অন্য জাতির অনুকরণের উদ্দেশ্য না থাকে এবং তা যদি অন্য জাতির বৈশিষ্ট্যও না হয়, তাহলে এমন কাজ করা জায়েয হবে। শরীয়তি বিধি-বিধান ও মূলনীতিসমূহের প্রতি সূক্ষ্ম দৃষ্টিপাত করলে উপরোক্ত নীতিমালাকে সত্যায়ন করা কষ্টকর হবে না। এখন আর নাক কেটে ফেলা ও আহার পরিহার করার মত অ™ভূত সন্দেহের অবকাশ থাকার কথা নয়। সাধারণ মানুষ যে সমস্ত নিষিদ্ধ অনুকরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে, উপরোক্ত আলোচনা থেকে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ সম্ভব। প্রথমত যে সমস্ত জিনিসে অনুকরণ করা হয় সেগুলো একটা জাতির বৈশিষ্ট্য। একারনেই বিজাতীয় বেশধারী স্বদেশীদের দেখে সাধারণ জনগোী ক্ষেপে উঠে আর কোন জাতির বিশেষ ধরণের রীতি-নীতি গ্রহণ নিষিদ্ধ হওয়ার কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। কোন জাতির জাতীয় রীতিকে কেউ যদি জোর করে সকল দেশ ও সকল জাতির সাধারণ প্রচলিত রীতি বলে দাবি করে বসেন তাহলে তা হবে নিতান্তই অমুলক ও অযৌক্তিক। শুধু তাই নয় একটু গভীরে গেলে দেখা যাবে, এসব রীতি জনসমাজে এত ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়ে যায়নি যে, এখন এসবকে কোন বিশেষ জাতির বৈশিষ্ট্য বলে ধারণা করা হয় না। কোন দেশের শাসকগোী বা শাসনকার্যের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ছাড়া অন্য সবাই তাদের পুরানো রীতিকে আঁকড়ে থাকে। কোন জাতির বৈশিষ্ট্যকে তাদের বৈশিষ্ট্য নয় বলে আপতত স্বীকার করে নিয়েও এ কথা অস্বীকার করার জো নেই যে, যিনি সে রীতিকে গ্রহণ করেন তিনি অনুকরণ প্রীতিতেই তা করে থাকেন। অনেক সময় মনের অজান্তে স্বীকার করে নিয়ে অনেকে বলে থাকেন, জনাব! এ তো শাসকদের রীতি, একে দেখলে লোকে সম্মান করে, ভয় করে, তাই তো একে গ্রহণ করে নিয়েছি। মোটকথা, স্বীকারোক্তি ও অকাট্য দলিল দ্বারা বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেছে। কাজেই অনুকরণের উদ্দেশ্য থাকলেই তা হারাম হয়ে যাবে।

অনেকে বলেন, আমরা তুর্কী টুপি পরতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, এখন এটা সবাই পরে, এ টুপি পরা এখন আর কোন প্রশংসনীয় কাজ নয়, কাজেই তুর্কী টুপি পরলে অনুকরণ হবে না। অনেকে আরো একটু অগ্রসর হয়ে বলেন, আচ্ছা না হয় টুপিতে অনুকরণ হবে মনে করে তুর্কী টুপি পরা ত্যাগ করলাম। এতে করে তো একটা পাপ কমলো, বাকী যত ব্যাপার অনুকরণ করা হয় সেগুলো তো যথা তথা রয়েই গেল। সেই পাপ থেকে মুক্ত হওয়ার তো কোন উপায় হলো না। আরো অনেক অপদার্থের মুখে এ ধরণের নানা শোবা-সন্দেহ প্রকাশ পেয়ে থাকে।

উপরোল্লিখিত নীতিমালাকে পুংখানুপুংখরূপে উপলব্ধি করে নিলে এসব শোবা-সন্দেহ দূর হয়ে যাবে। সন্দিগ্ধজনের উদ্দেশ্যে এখানে আরো দুটো প্রমাণ উপস্থাপনের প্রয়োজন অনুভব করছি। প্রথম প্রমাণ শাস্ত্রীয়-এটা সবার কাছে সমান গ্রহণযোগ্য আর তা হচ্ছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নীতি নির্ধারক ঘোষণা ইসলামে রুহুবানিয়্যাত (খ্রিস্টান বৈরাগ্যবাদ)-এর স্থান নেই।

ইসলামের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে বক্তাগণকে প্রায়ই এ হাদীসটির উদ্ধৃতি দিতে শুনা যায়, মধ্যপস্থা পরিত্যাগ করে নিজেকে অত্যধিক যাতনা দেওয়া নিষিদ্ধ বুঝাবার জন্য রুহবানিয়্যাত শব্দ ব্যবহারের রহস্য কি? রুহবানিয়্যাত এর মানে কি? এটা কি রহব ধাতু থেকে উ™ভূত নয়? রাহিব (রহব-এর কর্তৃকারকীয় রূপ) কাকে বলে? খ্রিস্টান সন্ন্যাসীকে না অন্য কাউকে? নিজের উপর অত্যাধিক কড়াকড়ি করো না বলে দিলেই তো চলতো, সেখানে আবার ইসলামে রহিব হওয়া বৈধ নয় বলার কি প্রয়োজন? এ প্রশ্নমালাকে সামনে রেখে সামান্য চিন্তা করলেই বুঝতে দেরি হবে না যে, হাদীসখানাতে সীমাতিক্রম ও অতিরিক্ত কড়াকড়ি নিন্দনীয় হওয়ার কারণ বর্ণনা করার উদ্দেশ্যে রুহবানিয়্যাত শব্দ ব্যবহার করে বলা হয়েছে, এতে করে রাহিবদের অনুকরণ করা হয়। মুসলমান হয়ে রাহিব হতে যাবে কেন? বিভিন্ন জাতির অনুকরণ হারাম ও নিন্দনীয় হওয়ার আর কি প্রমাণ চান ?

দ্বিতীয় প্রমাণ যুক্তিপ্রসূত। যুক্তিপূজার অপ্রতিবন্ধ প্রবণতার ফলশ্রুতিতে এ প্রমাণ প্রথমটি থেকেও অধিক গ্রহণযোগ্য হবে বলে মনে করি। মনে করুন, অনুকরণ সম্পর্কিত ইসলামী বিধানের ঘোর প্রতিবাদী কোন ভদ্রলোককে যদি পূর্ব অবগতি ছাড়াই ভর মাহফিলে স্ত্রীলোকের জামাজোড়া গায়ে পড়তে অনুরোধ করা হয়, তাহলে নিশ্চিত রূপে বলা যায় যে, ঐ অনুরোধকারীকে হাতের নাগালে পেলে ভদ্রলোক জীবন্ত ছাড়বেন না। কেন জনাব, অনুকরণের ব্যাপারটি যদি এতই অযৌক্তিক বলে মনে হয়, তাহলে এখানে স্ত্রীলোকের বেশ পরিধানের অনুরোধ করতেই এত রেগে চটে একাকার হয়ে গেলেন কেন? সামান্য পার্থক্যের কারণে অন্য মুসলমানকে অনুকরণ করতেই যখন এতই নারাজ, তখন ধর্মীয় বিরোধের কারণে কাফেরদের অনুকরণ করতে তো আরো বেশি অসন্তুষ্ট আরো বেশি লজ্জা হওয়ার কথা। প্রকাশ থাকে যে, উর্দী পরা এ হুকুমের অন্তর্ভুক্ত নয়, এটা ক্ষমতার প্রতীক, এতে কোন জাতির অনুকরণ করা হয় না।