প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ২য় সংখ্যা, আগষ্ট ২০১৬, শাওয়াল-জিলকদ ১৪৩৭ হিজরী, শ্রাবন-ভাদ্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
১. যিনি উপযুক্ত কামেল ও মোকাম্মেল পীর হইবেন তিনি শরীয়তর বিদ্যায় অবশ্যই বিজ্ঞ হইবেন। যথা হাদীস, তাফসীর, ফিকহ ইত্যাদি। যদি বিদ্যাভ্যাস দ্বারা বিদ্বান না হন, তবে শরীয়াতের বিধানসমূহ বিশেষরূপে জ্ঞাত থাকিবেন ও ইলমে লাদুন্নিতে তাহার অধিকার থাকিবে এবং সুন্নাত অল-জামাতের আলেমগণের মতেই তাহার মত থাকিবে।
২. সর্বদা শরীয়তের আদেশ পালন ও তদানুযায়ী কার্য করিবেন। জ্ঞান সত্বে শরীয়ত বিরুদ্ধ কাজ তাহা হইতে দৃষ্ট হইবে না। তিনি বিশেষ মোত্তাকী অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালাকে ভয়কারী ও পরহেজগার হইবেন। সর্বদা মন্দ কার্য ও মন্দ বস্তু হইতে দূরে থাকিবেন।
৩. তাহার সংসর্গে মনের ভাব পরিবর্তন হইবে। আল্লাহ তায়ালার প্রেম মনোমধ্যে উদিত হইতে থাকিবে এবং সংসার চিন্তা দূর হইতে থাকিবে। অসৎ ও মন্দ কার্য করিতে বিরক্ত বোধ হইবে। কোন অন্যায় কার্য করিলে তৎক্ষণাৎ মনের মধ্যে অনুতাপ ও অস্থিরতা উপস্থিত হইবে।
৪. যিনি উপযুক্ত পীর হইবেন, তাহাকে কোন এক তরীকার বা একাধিক তরীকার ছলুক আদ্যোপান্ত শিক্ষা সমাপ্তি করা ও উহাতে পূর্ণ কামালিয়াৎ ও নেছবাৎ সিদ্ধ করা অতি আবশ্যক। পীরের তরফ হইতে মুরিদ ও তালীম করিবার খেলাফত ও এজাজত থাকা আবশ্যক। বর্তমান সময় খেলাফত প্রাপ্ত নামধারী বহু পীর আছেন। তাহারা পীরের নিকট গিয়া দুই এক ছবক লইয়াই পীরকে অনুরোধ করিয়া মৌখিক সনদ বা লিখিত খেলাফতনামা লইয়া থাকেন, যেন মুরিদ করিয়া অর্থোপার্জন করিতে ও পীর হইতে পারেন। এইরূপ সনদ প্রাপ্ত পীরদের হস্ত হইতে মুক্তি পাওয়া দুষ্কর। লোকগন হাবভাব দেখিয়া মুরিদ হইয়া মনে করিয়া থাকে যে, এই পর্যন্তই পীরী-মুরিদীর সীমা। এইরূপ তরীকার ছলুকাতে অজ্ঞ পীরগণ মুরিদগণকে অন্য আলেম ও পীরের দরবারে যাইতে ও ওয়াজ শুনিতে নিষেধ করেন। এইজন্য হযরত মাওলানা শাহ কারামত আলী জৌনপুরী (রহঃ) ছাহেব তাঁহার কিতাব কওলুচ্ছাবিতের ৩০ পৃায় লিখিয়াছেন যে, পীর শুধু শাজরা দান করার জন্যই নহে। শিক্ষা দান ও শিক্ষা লাভ করাই পীরী মুরিদীর উদ্দেশ্য। অধিকাংশ পীরের মধ্যে রছম হইয়াছে যে, তাহারা মুরীদ করিয়া শাজরা দান করাকেই পীরী মুরিদী মনে করেন।উত্ত জৌনপুরী মাওলানা ছাহেবের জাদুত্তাকওয়ার ১৪ পৃায় আরও লিখিয়াছেন যে, যদি কেহ কোন সত্য পীরের নিকট মুরীদ হইতে মনে প্রাণে ইচ্ছা করে, তাহা হইলে বাপ-দাদার পীর বংশের কোন বে-শরা, বেনামাযী, জাহেল ও ফাছেক পীর থাকিলেও মুরিদকে ভয় দেখাইয়া থাকে যে, আমাদের বংশ ভিন্ন অন্য স্থানে মুরিদ হইলে সর্বনাশ করিয়া ফেলিব।
৫. পীরে কামেলের তিন বস্তুর নিতান্ত প্রয়োজন। নিজে ছলুক ও দায়রা সমূহ পরের নিকট ভালরূপে আয়ত্ব করা, ফায়েজ হাছেল করা ও তদানুযায়ী ফায়েজ পৌছানোর ক্ষমতা থাকা চাই। সেই ক্ষমতা না জন্মাইয়া যাহারা পীরের খেলাফত লইয়া শুধু কিতাবস্থ রীতিনীতি বয়ান করিয়া থাকেন, তাহাদের নিকট হইতে দূরে থাকা কর্তব্য। এইরূপ পীরের মুরীদ কখনও তরীকায় উন্নতি লাভ করিতে পারিবে না। যেহেতু পীর-মুরীদি পুস্তকস্থ বিদ্যা নহে, উহা আল্লাহর দান বিশেষ।
৬. কামেল পীর হইতে লোভ শূন্য হওয়া নিতান্ত আবশ্যক। লোভী ব্যক্তিকে কখনও ফকীর জ্ঞান করিতে নাই। হিংসুক, হিংসাকারী ও ফাছাদকারী কখনও কামেল পীর নহে। যিনি আল্লাহর ওয়াস্তে মুরীদের হিতার্থে উপদেশ ও তাওয়াজ্জুহ ইত্যাদি দেন তাঁহাকে কামেল পীর বুঝিতে হইবে।
৭. পীর হইতে হইলে শরীয়তের আবশ্যকীয় মাছয়ালা সমূহ জানিতে ও আমল করিতে হয়। বহুকাল পীরের দরবারে থাকিয়া শিক্ষা করিতে হয়। কেহ পীরের নিকট দুই চারি ছবক পাইয়া, আন্তরিক নেছবত প্রাপ্ত না হইয়া শুধু সাধারণকে ভুলাইবার জন্য আন্তরিক নেছবত বুঝিয়াছেন বলিয়া মৌখিক গল্প করেন, কখনও বলেন- “আমার উপর আরশ হইতে ফায়েজ আসিতেছে ইত্যাদি।” এইরূপ মৌখিক ঢংকারী পীরের মুরীদ কখনও শরীয়তের কাজ আমল করিতে পারে না; বরং পীর পীর করিয়া জীবন অতিবাহিত করিতে থাকে। সাবধান! পীরে কামেলের নিকট মুরীদ হইবে।
৮. কামেল পীর হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত মোতাবেক চলিবেন। খাওয়া-দাওয়া, শোওয়া-বসা ইত্যাদি সুন্নাত তরীকা মোতাবেক করিবেন। এমন কি সন্দেহের খাবার খাইবেন না, সন্দেহের খয়রাতও লইবেন না। সর্বদা সকল মুসলমানের উন্নতি ও শিক্ষার সুবন্দোবস্ত করিবেন। আত্ম স্বার্থ বিসর্জন করিবেন, হক ইনছাফি হইবেন ও কবিরা গুণাহ হইতে পরহেজ করিবেন এবং ছগিরা গুণাহ হইতে পরহেজ থাকিবার সচেষ্ট থাকিবেন।
৯. কওলুল জামিল কিতাবে আছে- কামেল পীর হইলে যে বার মাস রোযা রাখিতে হইবে, স্ত্রী হইতে দূরে থাকিতে হইবে, ভাল খানা খাইতে পারিবে না ও জঙ্গলবাসী হইবে, এমন নহে।
১০. ঐ কিতাবে আরো আছে, কারামত দেখান ও পেশা ত্যাগ করিয়া শুধু বসিয়া থাকাও কামালিয়াতের কোন লক্ষণ নহে।
