প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৪র্থ সংখ্যা,অক্টোবর ২০১৭, জিলহজ-মুহাররম ১৪৩৯ হিজরী,আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

তরিকতপন্থীর পক্ষে নিষ্ঠুরতা পরিত্যাগ করা একান্ত কর্তব্য।

ছহীহ বোখারী ও মুসলিমে আছে, ‘যে ব্যক্তি মনুষ্য জাতির উপর দয়া না করে, আল্লাহ তায়ালা তাহার উপর দয়া করিবেন না।’
আবু দাউদ ও তিরমিযী বর্ণনা করিয়াছেন, ‘দয়াময় (আল্লাহ তায়ালা) দয়াশীল লোকদের উপর দয়া করেন। তোমরা ভূমিবাসীদিগের উপর দয়া কর, তাহা হইলে আকাশের পরিচালক (আল্লাহ তায়ালা) তোমাদের উপর দয়া করিবেন।’
আহমদ ও তিরমিযীর বর্ণনা-‘হতভাগ্য ব্যতীত কেহ নির্দয় হয় না। তিরমিযীর বর্ণনা-‘যে ব্যক্তি আমার (উম্মতের) শিশু সন্তানের প্রতি দয়া না করে, বৃদ্ধ লোকের সম্মান না করে, সৎকার্যে উৎসাহ প্রদান না করে এবং অসৎকার্য করতে নিষেধ না করে, সে ব্যক্তি আমার অনুগত দলের মধ্যে গণ্য নহে।’

ইমাম বোখারী ও মুসলিমের বর্ণনা-মোসলমানেরা একে অন্যের প্রতি দয়া করিবে, একে অন্যের সহিত প্রীতিস্থাপন করিবে এবং একে অন্যের সাহায্য করিবে, ইহার দৃষ্টান্ত যেমন একটি পূর্ণ অবয়ব তন্মধ্যে কোন এক অঙ্গ পীড়িত হইলে, অবশিষ্ট প্রত্যঙ্গ যাতনা অনুভব করে।’

ইমাম মুসলিমের বর্ণনা-মুসলিম সম্প্রদায় একটি মনুষ্যের তুল্য, যদি তাহার চক্ষু পীড়িত হয় তবে তাহার সর্বাঙ্গ পীড়িত হয়, যদি তাহার মস্তক পীড়িত হয়, তবে তাহার সমস্ত দেহ পীড়িত হয়।

ইমাম বোখারী ও মুসলিমের বর্ণনা-‘এক মুসলমান অন্য মুসলমানের ভ্রাতা, একে অন্যের প্রতি অত্যাচার করিবে না, অন্যকে সাহায্য করিতে কুণ্ঠিত হইবেনা। যে ব্যক্তি আপন মুসলমান ভ্রাতার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিতে তৎপর হয়, আল্লাহ তায়ালাও তাহার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিতে তৎপর হন। যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের একটি বিপদ উদ্ধার করে, আল্লাহ তায়ালা বিচার দিবসের বিপদরাশি হইতে তাহার একটি মহা বিপদ উদ্ধার করিবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ গোপন করে, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতে তাহার দোষ গোপন করিবেন।’

ইমাম মুসলিমের বর্ণনা- যে ঋণদাতা দরিদ্র ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে ঋণ পরিশোধের জন্য অবকাশ দেয়, আল্লাহ তায়ালা ইহজগতে এবং পরজগতে তাহার কার্য সহজসাধ্য করিয়া দেন। যত দিবস মনুষ্য আপন মুসলমান ভ্রাতার সহায়তা করিতে থাকে, ততদিন আল্লাহও তাহার সহায়তা করিতে থাকেন।’

ইমাম বোখারী ও মুসলিমের বর্ণনা-‘মনুষ্য যাহা আপনার জন্য পছন্দ করে, যতক্ষণ তাহা আপন (মুসলমান) ভ্রাতার জন্য পছন্দ না করে, ততক্ষণ পরিপক্ক ঈমানদার হইতে পারে না।’

‘বিধবাদের ও দরিদ্রদের তত্ত্বাবধানকারী ব্যক্তি, আল্লাহর পথে দানকারী, বিনা শৈথিল্যে রাত্র জাগরণকারী ও বৎসরব্যাপী রোজা পানকারীর তুল্য।’

ইমাম বোখারীর বর্ণনা-‘হযরত তর্জনী ও মধ্যমা অঙ্গুলিদ্বয়ের দিকে ইশারা করিয়া ও উভয়ের মধ্যে কিঞ্চিৎ ফাঁক করিয়া বলিলেন, যে, আমি ও পিতৃহীন সন্তানের প্রতিপালক বেহেস্তের মধ্যে এইরূপ থাকিবে।’

ইমাম মুসলিমের বর্ণনা-‘তিন ব্যক্তি বেহেস্তবাসী হইবেন, প্রথম-শক্তিসম্পন্ন ন্যায় বিচারক দাতা ও ধর্মকার্যে লিপ্ত ব্যক্তি, দ্বিতীয়-কোমল হৃদয়, প্রত্যেক আত্মীয় ও মুসলমানের পক্ষে দয়াশীল ব্যক্তি; তৃতীয় দরিদ্র-হারাম হইতে বিরত ও ভিক্ষাবৃত্তি হইতে বিমুখ ব্যক্তি।’

উক্ত ইমামদ্বয়ের বর্ণনা-‘এক অসতী স্ত্রীলোক একটি কুপের শিরোদেশে কোন মরণাপন্ন কুকুরের নিকট উপস্থিত হইয়াছিল, কুকুরটির জিহ্বা বাহির হইয়া পড়িয়াছিল, তৎপরে স্ত্রীলোকটি আপন মোজা খুলিয়া চাঁদরের সহিত বন্ধন করতঃ উহার জন্য পানি উত্তোলন করিয়াছিল, এই হেতু আল্লাহ তায়ালা তাহাকে ক্ষমা করিয়াছিলেন।’

ইমাম মুসলিমের বর্ণনা-একটি লোক মনুষ্যের যাতনাপ্রদ (কণ্টকময়) বৃক্ষকে পথ হইতে কর্তন করিয়াছিল, (এ দয়ার কার্যের জন্য ক্ষমাপ্রাপ্ত হইয়াছিল), আমি তাহাকে বেহেস্তের মধ্যে আনন্দে ধাবিত হইতে দর্শন করিয়াছি।’

তফসীরে মনিরে আছে, ‘হযরত মূসা (আ.) তুর পর্বতে আল্লাহ তায়ালার নিকট জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন যে, আল্লাহ, আপনি কি জন্য আমাকে এত উচ্চপদ দান করিয়াছেন? তদুত্তরে আল্লাহ তায়ালা বলিয়াছিলেন, তোমার বাল্য জীবনের একটি মহৎ কার্যের জন্য তোমাকে এত উচ্চপদ দান করিয়াছি। হযরত মূসা (আ.) বলিলেন, সে কি কার্য? তদুত্তরে আল্লাহ তায়ালা বলিলেন, যে সময় তুমি বাল্য জীবনে ছাগ ছাগী চরাইতেছিলে, একটি ছাগ দল ত্যাগ করতঃ পলায়নকরিতে লাগিল, তুমি উহার পশ্চাতে ধাবিত হইলে ছাগটি এমন দ্রুত গমন করিতে লাগিল যে, তুমি উহাকে কিছুতেই ধরিতে পারিলে না।

ছাগটি পর্বতের অধোদেশে গিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল। তুমি সেই সময় উহাকে ধরিয়া কোপভরে সজোরে বেত্রাঘাত করিতে উদ্যত হইলে, এমতাবস্থায় তোমার হৃদয় দয়ায় বিগলিত হইয়া গেল, তুমি মনে মনে বলিতে লাগিলে, আল্লাহ তায়ালা এই পশুটাকে আমার বাধ্য করিয়া দিয়াছেন, আমি উহার উপর অত্যাচার করিলে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হইবে। এই ধারণায় উহাকে আর প্রহার করিলে না। তৎপরে তুমি উহার ক্লেশ লাঘব করণার্থে উহাকে স্কন্ধে বহন করিয়া দলের মধ্যে ছাড়িয়া দিয়াছিলে। আমি তোমার এই দয়ার জন্য তোমাকে এত উচ্চপদ প্রদান করিয়াছি, ‘কলিমূল্লাহ’ উপাধিতে বিভূষিত করিয়াছি ও তোমার প্রতি তওরাত গ্রন্থ অবতরণ করিয়াছি।’

ইমাম গাজ্জালী (র.) লিখিয়াছেন, হোজাইফা আদাবি ইরারমুক যুদ্ধে কিছু পানিসহ তাহার পিতৃব্য-তনয়ের নিকট উপস্থিত হইল, তিনি পানি দিতে ইশারা করিলেন, এমতাবস্থায় হেশাম বিন আ’স পানির জন্য দীর্ঘ নিঃশ্বাস পরিত্যাগ করিলেন, তখন আমার পিতৃবা-তনয় নিজে পানি পান না করিয়া তাহাকে পানি দিতে ইশারা করিলেন। আমি তৃতীয় লোকটির নিকট উপস্থিত হইয়া দেখি যে, তাহার প্রাণবায়ু বাহির হইয়া গিয়াছে। তৎপরে হেশামের নিকট উপস্থিত হইয়া দেখি যে, তিনি প্রাণত্যাগ করিয়াছেন, তৎপরে আমার পিতৃব্য-তনয়ের নিকট উপস্থিত হইয়া দেখি যে, তাহার প্রাণবিয়োগ ঘটিয়াছে।
ইমাম মুসলিমের বর্ণনা-‘তোমরা অত্যাচার করিও না; কেননা অত্যাচার বিচার দিবসে অন্ধকার হইবে।’
ইমামদ্বয়ের বর্ণনা,-‘তুমি প্রপীড়িত ব্যক্তির অভিশাপ (বদ্ দোয়া) হইতে দূরে থাক, কেননা, উক্ত অভিশাপ ও আল্লাহ তায়ালার মধ্যে কোন আবরণ নাই।’

‘তুমি তোমার ভ্রাতার সহায়তা প্রদান কর, সেই ভ্রাতা অত্যাচারী হউক কিংবা প্রপীড়িত হউক। তৎশ্রবণে এক ব্যক্তি বলিল, হুজুর আমি প্রপীড়িতের সহাযতা প্রদান করিব, কিন্তু অত্যাচারীর কিরূপে সহাযতা করিব? হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, তুমি তাহাকে অত্যাচার প্রদান করিতে বাধা প্রদান করিলে তাহার সহায়তা করা হইবে।’
ইমাম বয়হাকীর বর্ণনা-‘যে ব্যক্তি জ্ঞান-গোচরে কোন অত্যাচারীর সহায়তা করণার্থে তাহার সহিত গমন করে, সে ব্যক্তি ইসলাম হইতে বহির্গত হইয়া যাইবে।’
ইমামদ্বয়ের বর্ণনা-‘নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা অত্যাচারীকে অবকাশ দিয়া থাকেন, এমন কি যখন তাহাকে ধৃত করেন, তখন আর তাকে নিষ্কৃতি প্রদান করেন না।’
ইমাম বোখারির বর্ণনা-‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কাহারও সামান্য ভূমি আত্মসাৎ’ করে, কিয়ামতের দিবস ভূখণ্ডের সপ্তম স্তর পর্যন্ত তাহাকে প্রোথিত করা হইবে।’