প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৬ষ্ঠ সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৫, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৭ হিজরী, অগ্র-পৌষ ১৪২২ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

আল্লাহ তোমাকে যা কিছু দিয়েছেন, তার মাধ্যমে আখেরাতের নিবাস লাভ করার চেষ্টা কর এবং দুনিয়া হতে নিজ হিস্যা অগ্রাহ্য করবে না। আল্লাহ যেমন তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, তেমনি তুমিও (অন্যদের প্রতি) অনুগ্রহ কর । আর পৃথিবীতে ফাসাদ বিস্তারের চেষ্টা কর না। (সূরা কাসাস : আয়াত ৭৭)

সূচনা পর্ব

আমার জন্য আনন্দ ও গর্বের বিষয় হল যে, আপনাদের বদৌলতে আজ আমার একটি ধর্মীয় বিষয়ে আলোচনার সুযোগ হতে যাচ্ছে। আপনাদের এই সংস্থা চেম্বার অফ কর্মাসের মাধ্যমে আজকের এই আলোচনা আয়োজন।

এখানে সাধারণত ব্যবসায়িক এবং রাজনৈতিক বিষয়েই আলোচনা হয়ে থাকে বেশি। যেহেতু রাজনৈতিক বিষয়ে সরাসরি আমার কোন সংগঠনের সাথে সক্রিয় সম্পৃক্ততা নেই বরং আমি একজন শিক্ষানবীস তথা তালিবে ইলম। তাই যেখানেই কথা বলার সুযোগ আছে সেখানে আমি ধর্মীয় বিষয়েই আলোচনা করে থাকি। সুতরাং আজকের আলোচনায় ধর্মীয় বিষয়েই কিছু আলোচনা করার আশা রাখি। ইসলাম এমন এক জীবনবিধান যাতে মানবজীবনের এমন কোন দিক নেই, যার সমাধান এতে নেই।

আল্লাহ আমাদের যে ধর্ম দিয়েছেন, তা কেবল মসজিদ এবং ইবাদতশালার ভেতর সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানবজীবনের প্রতিটি স্তর ও ক্ষেত্র আগত তাবৎ সমস্যার সমাধান এতে নিহিত। আজকের এই আলোচনায় আমার জন্য আলোচ্যসূচি নির্ধারণ করা হয়েছে- বর্তমান যুগে একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর দায়িত্বাবলী। আমি এই বিষয়ে আপনাদের সামনে আলোকপাত করার চেষ্টা করব। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন ইখলাস-নিষ্ঠার সঙ্গে সত্য কথা, সহীহ তরিকায় এবং সৎ নিয়তে বলার তাওফীক দান করেন। আমীন!

দ্বীন কেবল মসজিদের ভেতরই সীমাবদ্ধ নয়

কথা মূলত এই যে, যখন মুসলিম উম্মাহ রাজনৈতিক এবং সামাজিক অধঃপতনের দ্বারপ্রান্তে, ওই সময় দুর্ভাগ্যজনকভাবে এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হল যে, দ্বীনকে আমরা অন্যান্য ধর্মের মত কেবলমাত্র কতিপয় ইবাদত-বন্দেগীর গন্ডির ভেতর ধারণা করে নিয়েছি। যতক্ষন আমরা মসজিদে অবস্থান করছি কিংবা নিজের বাড়ি-ঘরে ইবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত রয়েছি ওই সময় পর্যন্ত তো আমাদের আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের কথা স্মরণ থাকছে কিন্তু যখনই আমরা কর্মময় জীবনে প্রবেশ করি, যখন আমরা বাজারে যাই কিংবা যখন আমরা রাজনীতির রাজপথে পদচারণা করি কিংবা সামাজিক অন্য কোন ক্রিয়াকর্মে জড়িয়ে যাই, তখন ওই সময় দ্বীনের বিধিবিধান এবং ইসলামের শিক্ষা-দীক্ষা একেবারে বেমালুম ভুলে যাই।

তেলাওয়াতে কুরআনের মাধ্যমে মজলিসের সূচনা

আমাদের সমাজে বেশ সুন্দর একটি প্রথা চালু রয়েছে। মুসলিম উম্মাহ তাদের সব কাজের সূচনা তেলওয়াতে কুরআনের মাধ্যমে করে থাকে। জাতীয় সংসদ অধিবেশনের শুরুতে, রাষ্ট্রীয় যে কোন অনুষ্ঠানের শুরুতে কিংবা ব্যবসায়িক যে কোন অনুষ্ঠানের শুরুতেই তেলাওয়াতে কুরআনের দ্বারা অনুষ্ঠানের সূচনা করা হয়। আলহামদুলিল্লাহ! সর্বপ্রথম আল্লাহর কালাম দ্বারা শুরু করা হয়, এর চেয়ে আর ভাল কাজ কী হতে পারে? কিন্তু দুঃখজনক হল, যখন আমরা তেলাওয়াত করি তখন তো এর আদব-ইহতেরামের প্রতি বেশ খেয়াল রাখার একটা কসরত চলে। কিন্তু কুরআনুল কারীমের তেলাওয়াত শেষ হলেই আমাদের কাজের তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। আর আমাদের পরবর্তী সব কাজেই আমরা কুরআনের কথা একেবারেই ভুলে যাই।

কুরআনুল কারীম আমাদের বিরুদ্ধে ফরিয়াদ করছে

বহুপূর্বে একজন কবি অতিবাহিত হয়েছেন। মাহির আল-কাদারী তার নাম। তিনি কুরআনুল কারীমের অভিযোগ সর্ম্পকে একটি কবিতা লিখেছেন। সেই কবিতায় তিনি কুরআনুল কারীমকে একজন অভিযোগকারী হিসেবে উত্থাপন করেছেন। তিনি তার কাব্যে এ সুরে অভিযোগ তুলেছেন :
সব সময় আমাকে তাকে সাজিয়ে রাখা হয়, সুগন্ধিযুক্ত স্থানে আমাকে সংরক্ষণ করা হয়, প্রতিটি মজলিসের সূচনায় আমার তেলাওয়াত করা হয়, আমার দ্বারা বরকত অর্জন করা হয়, মানুষের মাঝে ঝগড়া-বিবাদ হলে আমাকে হাতে নিয়ে কসম দেয়া হয়, আমার সঙ্গে এইসব আচরণ হয়, মুখে আমার মহব্বত এবং সম্মান-তাযীমের দাবিও করা হয়; কিন্তু যে বিধান মোতাবেক মানুষ পরিচালিত হচ্ছে, তারা যে জীবনপ্রণালী নিজেদের জন্য বেছে নিয়েছে, সে চিৎকার করে বলেছে- হে কুরআন (নাউযুবিল্লাহ)! তোমার নির্দেশনার প্রয়োজন আমার নেই।

ইসলামে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ কর

আমাদের সামনে ইতিমধ্যে যে কারী সাহেব তেলাওয়াত কুরআন করেছেন, তিনি স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ীই তেলাওয়াত করেছেন। এই তেলাওয়াতের একটি আয়াতে ইরশাদ হয়েছে :হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইসলামে পরিপূর্ণভাবে দাখিল হয়ে যাও। (সূরা বাকারা : আয়াত ২০৮)
এমনটি যেন না হয় যখন তোমরা মসজিদে অবস্থান করবে, তখন তোমরা মুসলমান হবে, বাজারে তোমরা মুসলমান থাকবে না, রাষ্ট্রীয় কার্যাবলীতে তোমরা মুসলমান থাকবে না; বরং সর্বক্ষেত্রেই তোমরা মুসলমান থাকবে।

মোটকথা আজকে আমাদের নির্দিষ্ট আলোচ্যসূচি হল- বর্তমান যুগে একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর দায়িত্বাবলী কী? এই আলোচ্য বিষয় সামনে রেখেই আমি আপনাদের সামনে কুরআনের একটি আয়াত তেলাওয়াত করেছি। তার আলোকেই বিস্তারিত কিছু কথা বলার ইচ্ছা পোষণ করছি। কিন্তু মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে বর্তমান যুগের একটি প্রারম্ভিক ধারণা সামনে থাকা জরুরি। বর্তমান অবস্থা প্রেক্ষাপট সামনে রেখে এই আয়াতের ব্যাখা বুঝার চেষ্টা হলে মনে হয় বিষয়টি দ্বারা বেশ উপকার নেয়া সম্ভব হবে ।

অর্থনৈতিক দুটি দৃষ্টিভঙ্গি

আমরা এবং আপনারা এমন এক যুগে অবস্থান করছি, যে যুগে এই কথা বলা এবং বোঝানো হচ্ছে যে, মানুষের জীবনের মৌলিক সমস্যা হল, অর্থনৈতিক সমস্যা। আর এরই ওপর ভিত্তি করে দুই অর্থব্যবস্থার ভেতর প্রথমে বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘাত এবং পরবর্তী পর্যায়ে কার্যক্ষেত্রে সংঘাতের সূচনা হয়। এর একটি হচ্ছে, পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা আর অপরটি হচ্ছে সাম্যবাদী অর্থব্যবস্থা। বিগত অর্ধ-শতাব্দী ধরে এই অর্থব্যবস্থার ভেতর ছিল তুমূল লড়াই। বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘাতের সঙ্গে সঙ্গে কার্যক্ষেত্রের সংঘাত ছিল বিশ্বজুড়ে এই দুই মতবাদকে কেন্দ্র করে। এই উভয় অর্থব্যবস্থার পেছনেই ছিল যৌক্তিক কিছু দৃষ্টিভঙ্গি। চুয়াত্তর বছর অতিবাহিত হওয়ার পর আমরা সচক্ষে সাম্যবাদী অর্থব্যবস্থার ধবংস প্রত্যক্ষ করতে পারলাম। দুনিয়ার মানুষ বুঝতে পারল সোশ্যালিজমের ঠাঁই আর এই দুনিয়ায় হবে না। এতদিন মানুষকে ধান্ধায় ফেলে কেবলমাত্র ফাঁকা বুলিই আওড়ানো হয়েছে। বিশ্ব বিপ্লবে সোশ্যালিজম একটি ব্যর্থ ইজম হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

সোশ্যালিজমের অস্তিত্বের প্রেক্ষাপট

সোশ্যালিজমের অস্তিত্ব কোন প্রেক্ষাপটে ছিল, এর অস্তিত্ব লাভের কারণই বা কী ছিল? যারা বিশ্বের বিভিন্ন অর্থব্যবস্থার ওপর চোখ বুলিয়ে থাকবেন, তাদের জানা থাকার কথা যে, সোশ্যালিজম মূলত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ারই একটি বহিঃপ্রকাশ মাত্র। পুঁজিতন্ত্রে ধনী-গরীবের যে বিশাল ব্যবধানের দেয়াল-প্রাচীর গড়ে ওঠেছে, এতে সম্পদ বন্টন নীতিতে যে অন্যায়-অবিচারের আশ্রয় নেয়া হয়েছে, এই অন্যায় নীতির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেই সোশ্যালিজমের আর্বিভাব। পুঁজিবাদী নীতিতে ব্যক্তি স্বাধীনতা এত ব্যাপক ও বিস্তৃত যে, সে যেভাবে ইচ্ছা সম্পদ অর্জনের অধিকার রাখে। এক্ষেত্রে তার কোন বাধা-প্রতিবন্ধকতা নেই। স্বাধীন অর্থব্যবস্থা এবং স্বাধীন বাণিজ্যব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গি লালনের সুবাদে এক্ষেত্রে তাকে দেয়া হয়েছে অবাধ সুযোগ-সুবিধা। আর এই অবাধ সুযোগ-সুবিধার ফলেই সম্পদ বণ্টন নীতি হয়ে যায় একটি ভারসাম্যহীন নীতি। এতে করে ধনী-গরীবের মাঝে দাঁড়িয়ে যায় ব্যবধানের বিশাল প্রাচীর। গরীবের অধিকার হয় সম্পূর্ণ খর্ব। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে সোশ্যালিজমের জন্ম। সোশ্যালিজমের মূল থিওরী ছিল, ব্যক্তি স্বাধীনতা বলতে কিছু নেই। সরকারী বিধিমালার আওতায় তাবৎ অর্থব্যবস্থা পরিচালিত হবে।

পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার ক্ষতিকর দিক

এ কথা ঠিক যে, অর্থব্যবস্থা পরিচালনায় সোশ্যালিজমের সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হিসেবে প্রমানিত হয়েছে। কিন্তু পুঁজিবাদের যেসব খারাপ দিকের কারণে সোশ্যালিজমের আগমন, বর্তমানে কি পুঁজিবাদের ওইসব খারাপ দিকগুলো লোপ পেয়ে গেছে? যেসব অন্যায় নীতি পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় বিদ্যমান ছিল তার কি কোন সন্তোষজনক সমাধান বের হয়ে এসেছে?

এই প্রশ্নের উত্তর হলো না সূচক। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় যেসব খারাপ দিক ছিল তা পুরোমাত্রায় এখনো বিদ্যমান। তার কোন সমাধানই এখনো বের হয়ে আসেনি।

সর্বাধিক উপার্জনকারী শ্রেষ্ঠ-গোষ্ঠী

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, যেদিন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে তছনছ হয়ে যায়, আমেরিকার টাইম ম্যাগাজিন এরপরই তাদের একটি সংখ্যায় এই খবরটি এবং তার পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণে বলে যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে তছনছ হয়ে গেছে। সোশ্যালিজমের প্রেতাত্মা দুনিয়া থেকে উধাও হয়ে গেছে। ঠিক টাইম ম্যাগাজিনের ওই সংখ্যাতেই দুনিয়া কাঁপানো আরও একটি সংবাদ পরিবেশিত হয়। ওই সংবাদ পর্যালোচনার শিরোনাম ছিল বর্তমান সময়ে আমেরিকার জীবনব্যবস্থায় নিজ পেশায় বেশি উপার্জনকারী ব্যক্তি কে?

সংবাদের ভাষ্যে বলা হয়েছিল যে, আমাদের সমাজজীবনে সবচেয়ে বেশি উপার্জনকারী ব্যক্তিরা হলেন যারা মডেল গার্লস পেশায় নিয়োজিত। তারাই সমাজে সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত উপার্জনকারী।

সংবাদ ভাষ্যে আরো বলা হয়েছিল যে, কোন কোন মডেল গার্লসের অবস্থা তো এমন, যারা এক দিনেই এই পেশায় ২৫ মিলিয়ন ডলার উপার্জন করে থাকেন। এদের চেয়ে বেশি উপার্জন অন্য কোন পেশায় দেখা যায় না । ২৫ মিলিয়ন ডলার দৈনিক একজন মডেল গার্লসকে যে দেয়া হচ্ছে, কে তাদের এই ডলার প্রদান করেছেন? কার পকেট থেকে এত বিপুল অর্থ তাদের দেয়া হচ্ছে? একথা স্পষ্ট যে এই ডলার বিনিয়োগ আমেরিকার অর্থলগ্নিকারীরাই করে যাচ্ছেন।

একই সংখ্যায় এই উভয় সংবাদ ভাষ্য পড়ে আমার পুলকিত হওয়ারই কারণ ছিল। কেননা একদিকে এই দাবি করে বগল পেটানো হচ্ছে যে, আমরা সোশ্যালিজমের মূর্তির কবর রচনা করেছি। কিন্তু যে কারণে সোশ্যালিজমের জন্ম, সেদিকে কারো চিন্তা-ফিকির আছে বলে মনে হয় না। আজ যদিও একদিকে সোশ্যালিজমের ভূত তাড়ানো সম্ভব হয়েছে, কিন্তু এর মূল কারণের প্রতিকারের কোন ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। এতে আগামীকাল অন্য কোন ভূত আমাদের ঘাড়ে সওয়ার হবে না, সে নিশ্চয়তা কে দেবে? সোশ্যালিজমের প্রথম প্রেতাত্মা তো আমাদের আহত করেই বিদায় নিয়েছে কিন্তু এরপর যা আসবে সে ক্ষতস্থানকে আরো বিক্ষত করবে তা বলারই অপেক্ষা রাখে না।

পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার মৌলিক ক্ষতিকর দিক

সঠিক কথা হল পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে এজন্য খারাপ বলা যাবে না যে, তাতে ব্যক্তি উপার্জনের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে এবং এজন্য খারাপ বলা যাবে না যে, তাতে ব্যক্তি মালিকানাকে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। বরং প্রকৃত অর্থে এতে খারাবীর মূল কারণ হচ্ছে এই অর্থব্যবস্থায় হালাল-হারামের কোন পার্থক্য নেই। জায়েয-নাজায়েযেরও কোন তারতম্য নেই। অথচ আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে যে ধর্ম এবং অর্থব্যবস্থা আমাদেরকে দিয়েছেন, তার মূল ভিত্তি হচ্ছে- মানুষ যদিও নিজের অর্থব্যবস্থা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে স্বাধীন, কিন্তু নিজের সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক বর্ণিত আহকাম ও বিধি-বিধানের পুরোপুরি অনুসারী।

সুতরাং তার ব্যবসা-বাণিজ্য, তার শিল্প-কারখানা এবং তার অর্থব্যবস্থা হালাল-হারাম নীতিমালার সঙ্গে অক্টোপাসের মত জড়িত। যতক্ষন পর্যন্ত হালাল-হারামের ওইসব নীতিমালাকে দৃষ্টির সামনে রেখে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অর্থব্যবস্থার রাজপথ সাজানো না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাতে ন্যায়নীতিহীন ব্যর্থ অসফল পথের দ্বার উন্মুক্ত থেকেই যাবে।

একজন আমেরিকান অফিসারের সঙ্গে সাক্ষাত

যে সময় ফেডারেল শরীয়ত কোর্ট কর্তৃক সুদ সংক্রান্ত প্রদত্ত রায়ের বিষয়টি সাধারণ জনগণের সামনে চলে আসল, ওই সময় পাকিস্তান সহ আমেরিকান দুতাবাসের অর্থবিষয়ক ইনচার্জ আমার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হলেন। তিনি ওই রায়টির বিষয়ে আমার কাছে বিস্তারিত জানতে চাইলেন।

ওই সময় সোশ্যালিজম পতনের তরতাজা খবরগুলোও বেশ জোরেসোরেই জনসম্মুখে হাজির হচ্ছিল। আলাপচারিতার শেষ পর্যায়ে আমি তার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলাম, আমি একটি বিষয় আপনার কাছে জানতে চাই, বিষয়টি হল- আজ আমেরিকার জয়জয়কার এবং বিজয় ডঙ্কা সর্বত্রই বেজে ওঠেছে। আমি তো নির্দ্বিধায় বলতে চাই, আপনারা বিশ্বব্যাপী এত বড় বিজয় ও সফলতা অর্জন করতে পেরেছেন যে, বর্তমানে সারা বিশ্বেই বলাবলি হচ্ছে যে, সমগ্র দুনিয়ার মাঝে এখন একমাত্র সুপার পাওয়ার হচ্ছে আমেরিকা। অন্য কোন সুপার পাওয়ারের অস্তিত্ব নেই। কিন্তু আমি আপনার কাছে এই বিষয়টি জানতে চাই যে, সোশ্যালিজমের এই ভরাডুবির পর আপনারা কি কখনো এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন যে, যে সমস্যাকে কেন্দ্র করে সোশ্যালিজমের জন্ম, বর্তমানে কি ওই সব সমস্যা বিরাজ করছে না? পুনরায় এখনো কি ওইসব সমস্যা নিয়ে গবেষণা করার প্রয়োজন নেই ?

কিন্তু তিক্ত হলেও সত্য যে, বর্তমান সময়ে কেউ দাঁড়িয়ে যদি একথা বলত যে, সোশ্যালিজমের ভরাডুবি হয়েছে ভাল কথা কিন্তু পুঁজিবাদের খারাপ দিকগুলোর সমাধান আমাদের কাছে আছে। আর তাহল আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক হালাল-হারামের নীতির ওপর ভিত্তি করে যে অর্থব্যবস্থা দেয়া হয়েছে। যদি এই অর্থব্যবস্থাকে মানদণ্ড বানিয়ে আর্থিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তবে মানবগোষ্ঠীর মুক্তি সম্ভব। অথচ এই দাবি নিয়ে দাঁড়ালেই আপনাদের পক্ষ থেকে মৌলবাদী বলে তিরস্কার করা হয়। যারা এই দাবি উত্থাপন করে তাদেরকে ফ্যান্ডামেন্টালিস্ট হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। এর বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা শুরু হয় বেশ জোরেশোরে। তাদেরকে বলা হয় যে, এরা যুগ ও সমাজের চাহিদা বুঝে না। আপনিই বলুন, আপনার ধারণায় কী তৃতীয় কোন বিষয়ের অস্তিত্ব সম্ভব নয় কি? আপনি এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে প্রস্তুত নন কেন?

তিনি গভীর আগ্রহ নিয়েই আমার কথাগুলো শুনেছিলেন। পরে তিনি বললেন, মূলত ব্যাপার হল, আমাদের মিডিয়া জগত। তারা নি:সন্দেহে ইসলামে শিক্ষা-দীক্ষাকে খুবই বিকৃত আকারে সমাজের সামনে তুলে ধরেছে। আমি একথা অকপটেই স্বীকার করছি। বাকী সুদের বিষয়ে আপনি পরিষ্কার ভাষায় যেভাবে আমার সামনে ধরলেন, এমন দীর্ঘ বিশ্লেষণ আজই প্রথম আপনার কাছে শুনতে পারলাম। আমি স্বীকার করি এই বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল আমাদের মিডিয়া জগত প্রোপাগান্ডা শুরু করে দেয়। এদের কর্মপন্থাটি ভাল কোন কর্মপন্থা বলে আমার কাছে মনে হয় না।

ইসলামের অর্থব্যবস্থা সবচেয়ে ইনসাফপূর্ণ

আমি আলোচনা করছিলাম ভিন্নধর্মীরা ইসলামী বিধি-বিধান এবং ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষা সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করে তবে তাদেরকে এক্ষেত্রে অপরাগই ভাবতে হবে। কারণ তারা ইসলামকে বুঝেই নাই, ইসলাম সর্ম্পকে তাদের কোন পড়াশোনাই নেই, ইসলামকে তারা বিশ্বাসই করে না। কিন্তু আপনি এবং আমি-আমরা তো নিজেদের মুসলমান বলে পরিচয় দেই। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলল্লাহ কালিমার বিশ্বাসী, এর উপর ঈমান এনেছি।

আমরা আমাদের মজলিস তেলাওয়াতে কুরআনের মাধ্যমে সূচনা করে থাকি। আমাদের কাছে এ বিষয়ে বৈধতার কোন সার্টিফিকেট নেই। আমরা ইসলামের এই বিশাল অংশ থেকে বে-খবর এবং গাফেল থাকি। আর না এই বিষয়টি বোঝার প্রচেষ্টা করছি যে, দ্বীন ইসলাম অর্থব্যবস্থার ক্ষেত্রে আমাদের কী শিক্ষা দিয়েছে? এই বিষয়টি অন্তরে প্রবেশ করে যে, যে সমাজব্যবস্থায় সোশ্যালিজম ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে, আর পুঁজিবাদের ক্ষতিকর দিকগুলো যেখানে ছিল সেখানেই রয়েছে। এমন এক সামাজিক অস্থির পরিস্থিতিতে যদি কোন বিধান মানবতার মুক্তির জন্য ন্যায়নুগ পথ প্রদর্শনে সক্ষম হয়, তাহলে তা একমাত্র এবং কেবলমাত্র মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনীত ধর্মের মাধ্যমে সম্ভব। অন্য কোন মতবাদে সম্ভব নয়। এই বিশ্বাসকে বদ্ধমূলভাবে পোষণ করে যদি তেলাওয়াতকৃত এই আয়াতে কারীমের ওপর চিন্তা-গবেষণা করা হয়, তাহলে এতে আপনাদের এবং আমার পথ প্রদর্শনে বিরাট ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

কারূন এবং তার ধন-সম্পদ

কারূনের সম্পদ সর্ম্পকে সূরা কাসাসের আয়াতে বিবরণ এসেছে। সেই আয়াতে কারূনকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে যে, কারূন হযরত মুসা (আ.)-এর যুগে প্রচুর সম্পদশালী এক ব্যক্তি ছিল। ইতিহাসে তার ধনভান্ডারের কথা বেশ খ্যাত ও প্রসিদ্ধ। তার সম্পদ এত প্রচুর ছিল যে, তার সম্পদের বিশালত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে : তার ধন-ভান্ডারের চাবিও এত বেশি ছিল যে, তা বহন করার জন্য মানুষের এক বিশাল জামাতের প্রয়োজন হত। (সূরা কাসাস : আয়াত ৭৬)

তৎকালীন সময়কার চাবিও বেশ ওজনদার হয়ে থাকত। আর ধন-ভান্ডার সংরক্ষণের স্থানও হত বিশাল বিস্তৃত। হযরত মুসা (আ.)-এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাকে যেসব উপদেশাবলী দিয়েছেন তা ওই আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে, যা আমি আপনাদের সামনে মজলিসের শুরুতে তেলাওয়াত করেছি। আয়াতটি যদিও সরাসরি কারূনকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, কিন্তু তার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা ওইসব ব্যক্তিকে সম্বোধন করেছেন যারা মালদার, সম্পদশালী।

কারূনের উদ্দেশ্য চার উপদেশ

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে সূরা কাসাসের ৭৭ আয়াতে ইরশাদ করেছেন: আয়াতে চারটি বাক্য উল্লেখিত হয়েছে।

প্রথম বাক্যে বলা হয়েছে : আল্লাহ তাআলা তোমাকে যা কিছু (সম্পদ) দান করেছেন তার মাধ্যমে পরকালে সফলতা এবং কামিয়াবী অর্জন কর।

দ্বিতীয় বাক্যে বলা হয়েছে : যে (এমনটি যেন না হয় যে আখেরাতের সফলতা অর্জন করতে গিয়ে পুরো সম্পদই খরচ করে ফেল এবং দুনিয়ায় নিজের কাছে কোন সম্পদ না রাখ, বরং) দুনিয়ার যে অংশ আল্লাহ তাআলা তোমার জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছেন তা যেন তুমি ভুলে না যাও। (তা নিজের কাছে রেখে দাও, তার হক আদায় কর।)

তৃতীয় বাক্যে বলা হয়েছে : যেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা তোমার উপর (এই সম্পদ দিয়ে) দয়া করেছেন, একইভাবে তুমিও অন্যের সঙ্গে দয়া এবং সদাচরণ কর।

চতুর্থ বাক্যে বলা হয়েছে : নিজের এই সম্পদ গরমে যমীনের উপর ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি কর না।(অর্থাৎ দুনিয়ার বুকে ফেতনা-ফেসাদ সৃষ্টি করার চেষ্টা কর না।)

এই আয়াতে কারূনকে উপরিউক্ত চারটি উপদেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু সামান্য চিন্তা করলেই দেখা যায় যে, এই চারটি হেদায়াত একজস শিল্পপতির জন্য, একজন ব্যবসায়ীর জন্য এবং একজন এমন মুসলমানের জন্য যাকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার বুকে কিছু সম্পদ দান করেছেন, তার জন্য একটি আমলী বিধান এই আয়াতটি।

প্রথম উপদেশ : পরকালের সফলতার চিন্তা

সর্বপ্রথম উপদেশ একথা বলা হয়েছে যে, তোমাদের এবং অমুসলিমদের মাঝে পার্থক্য হল এই যে, অমুসলিম যারা আল্লাহর উপর ঈমান রাখে না, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হল – সম্পদ যা আমার অর্জিত হয়েছে, তার সবটাই আমার বুদ্ধিমত্তা এবং শক্তি ও চেষ্টা-প্রচেষ্টার ফসল। আমি আমার মেহনতের মাধ্যমে, নিজের যোগ্যতার মাধ্যমে এবং নিজের চেষ্টা-প্রচেষ্টার মাধ্যমে এসব কামাই করেছি।

সুতরাং অন্য কারো কোন ধরণের শরীকানা ছাড়াই এর মালিক একমাত্র আমি নিজেই। কারো আমার সম্পদে দখলদারিত্বের কোন ধরণের সুযোগ নেই। কারণ এই সম্পদ আমার। এই মাল আমার। আমি নিজ বাহুবলে তা কামাই করেছি। নিজের যোগ্যতা বলেই কামাই করেছি। যেহেতু এই সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে আমি স্বাধীন; সুতরাং তা খরচের ক্ষেত্রেও আমি সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন। অন্য কারো আমার অধিকারে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই।

হযরত শোয়াইব (আ.)-এর জাতি এবং পুঁজিবাদী চিন্তাধারা

হযরত শোয়াইব (আ.) -এর গোত্র হযরত শোয়াইব (আ.) -এর উদ্দেশ্য বলেছিল : আপনি আমাদের মাপার ক্ষেত্রে এবং ওজনের ক্ষেত্রে কম দিতে বারণ করেছেন, আমাদের ন্যায়ানুগভাবে কাজ করার পরামর্শ দিচ্ছেন, হালাল-হারাম তারতম্য করার উপদেশ দিচ্ছেন, শুনে রাখুন! আপনি আমাদের আর্থিক ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাখেন না। আপনি যদি নামায পড়তেই চান তাহলে নিজ ঘরে বসেই আদায় করে নিন। আপনার নামায কি আপনাকে এই নির্দেশ দেয় যে, আমরা ওইসব মাবুদদের ইবাদত ছেড়ে দেই, যাদের ইবাদত আমাদের পূর্ব পুরুষেরা করে এসেছেন। কিংবা আমাদের সম্পদ আমরা যেনতেনভাবে খরচ করে ফেলি। (সূরা হুদ : আয়াত ৮৭)

প্রকৃত অর্থে এটিই পুঁজিবাদী চিন্তাধারা যে, এই মাল আমার, এই সম্পদ আমার, এর উপর আমার ক্ষমতা প্রয়োগ হবে, ব্যয়ের অধিকার আমার। আমি আমার ইচ্ছানুযায়ী তার ব্যয় করব। যেভাবে মনে চায় কামাই করব। হযরত শোয়াইব (আ.)-এর জাতির চিন্তাধারা ছিল এমনই। তাদের এই চিন্তাধারা সঠিক ছিল না বলেই আল্লার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যে সম্পদ তোমার কাছে আছে তা একেবারে তোমাদের নয়।

কেননা আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন : আসমান এবং যমীনে যা কিছু আছে, তার মালিকানা আল্লাহ তাআলার। (সূরা নিসা : আয়াত ১৩১).

অবশ্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ওই সম্পদ তোমাদের দান করেছেন। এই জন্য তিনি বলেছেন: অর্থাৎ যে সম্পদ আল্লাহ তোমাকে দিয়েছেন তার মাধ্যমে পরকাল তালাশ কর। আল্লাহ তাআলা একথা বলেনি : নিজের সম্পদ দ্বারা আখেরাত তালাশ কর।

ধন-সম্পদ আল্লাহর দান

সুতরাং সর্বপ্রথম একথা বুঝে নিতে হবে যে, যা কিছু তোমার কাছে আছে, চাই তা নগদ টাকা হোক, চাই ব্যাংক-ব্যালেন্স হোক, চাই তা ব্যবসা বা শিল্প প্রতিষ্ঠান হোক, তার সবই আল্লাহরতাআলার দান। অবশ্য তা অর্জনে তোমার চেষ্টা-প্রচেষ্টাও বেশ কার্যকারী ছিল। কিন্তু তোমার এই চেষ্টা-প্রচেষ্টাই সম্পদ উপার্জনের মূল কারণ নয়। কেননা অসংখ্য মানুষ তো সম্পদ উপার্জনের জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ধন-সম্পদের কোন দেখা তারা পাচ্ছে না। আবার বহু মানুষ এমন রয়েছে , যাদের কাছে প্রচুর ধন-সম্পদ রয়েছে কিন্তু হাজারো মেহনত এবং হাজারো চেষ্টা-প্রচেষ্টার পর তারা আর সম্পদ বাড়াতে পারছে না। এই ধন-সম্পদ আল্লাহ তাআলার দান।সুতরাং এই চিন্তাধারাকে একেবারেই ধুয়ে মুছে ফেলতে হবে যে, ধন-সম্পদ তোমার। বরং এই ধন-সম্পদ আল্লাহ তাআলার। আল্লাহ তাআলাই তাঁর দয়া অনুগ্রহে তোমাকে এই সম্পদ দান করেছেন। এই আয়াতে একটি উপদেশ তো ছিল এই।

মুসলিম ও অমুসলিমের মাঝে পার্থক্য তিনটি

মুসলমান এবং অমুসলমানের মাঝে তিনটি পার্থক্য রয়েছে। যথা-

এক. প্রথম পার্থক্য হল মুসলমান নিজের সম্পদকে আল্লাহ তাআলার দান মনে করে। আর অমুসলিম নিজের সম্পদকে আল্লাহ তালার দান মনে করে না, বরং নিজের শক্তির বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করে।

দুই. দ্বিতীয় পার্থক্য হল- মুসলমান সম্পদ উপার্জন ও খরচ করার ক্ষেত্রে এমন পন্থা অবলম্বন করে, যাতে কোন কাজ আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টি ও তাঁর হুকুমের খেলাফ না হয়। আর তার সম্পদকে আখেরাতের সফলতার ভিত্তিতে খরচ করে। মোটকথা নিয়ত শুদ্ধ হলে দুনিয়াও দ্বীন হয়ে যেতে পারে। যেমন সম্পদ উপার্জনের সময় হালাল-হারামের প্রতি যত্নশীল হওয়ার নিয়ত করলে এ সম্পদই আখেরাতের সফলতার কারণ হতে পারে।

তিন. তৃতীয় পার্থক্য হল- একজন মুসলমান পানাহার করে এবং উপার্জনও করে। আর অমুসলমান পানাহার করে ও উপার্জন করে, কিন্তু তার অন্তরে আল্লাহ তাআলার স্মরণ থাকে না এবং তাঁর আহকামেরও কোন খেয়াল থাকে না। আর মুসলমানের অন্তরে তা থাকে। এই জন্যই মুসলমানের দুনিয়া দ্বীন হয়ে যায়। পক্ষান্তরে অমুসলিমের দুনিয়া দুনিয়াই থাকে।

ব্যবসায়ীরা দুই প্রকার

এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন : একজন সত্যবাদী ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবীদের, সিদ্দীকের ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে। (সুনানে তিরমিযী : হাদীস নং ১১৩০; সুনানে দারেমী : হাদীস নং ২৪২৭)

কিন্তু যদি ব্যবসার মাঝে সহীহ নিয়ত না থাকে এবং হালাল-হারামের ব্যাপারে চিন্তুা-ফিকির না থাকে, তাহলে এমন ব্যবসায়ী সর্ম্পকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন : এ শ্রেণীর ব্যবসায়ীরা কিয়ামতের দিন অকৃতজ্ঞ, নাফরমান, গোনাহগার ও ফাসেক অবস্থায় ওঠবে। তবে যে প্রকার ব্যবসায়ী তাকওয়া অর্জন করেছে, সহীহ নিয়তে, সহীহ পন্থায় ব্যবসা করেছে এবং সত্য কথা বলেছে তারা ছাড়া। (সুনানে তিরমিযী : হাদীস নং ১১৩১; সুনানে ইবনে মাজাহ : হাদীস নং ২১৩৭; সুনানে দারেমী : হাদীস নং ২৪২৬)

অর্থাৎ যদি এই তিন শর্ত পাওয়া যায়, তাহলে ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবীদের, সিদ্দীকদের ও শহীদদের কাতারে শামিল হবে।
মোটকথা প্রথম স্তর হল নিয়তকে দুরস্ত করা। দ্বিতীয় স্তর হল ব্যবসার মাঝে হালাল-হারামের পার্থক্য করা। যদি এটা না হয় তাহলে তাকে মসজিদ পর্যন্ত মুসলমান সাব্যস্ত করা হবে। কিন্তু যখন সে মসজিদ থেকে বের হবে তখন এই দ্বিতীয় স্তরের মুসলিম ও অমুসলিমের মাঝে কোন পার্থক্য নেই। কেননা অমুসলিম সুদ ও জুয়ার কাজকর্ম করে, মুসলমানও করে। সুতরাং কোন মুসলিম ব্যবসায়ীর মাঝে উল্লেখিত বিষয়গুলো থাকলে দ্বিতীয় হাদীসের মাঝে যে তিরস্কার কথা বলা হয়েছে সে তার অন্তর্ভুক্ত হবে। আর যদি উল্লেখিত বিষয়গুলো না থাকে তাহলে প্রথম হাদীসে যে সুসংবাদের কথা বলা হয়েছে সে তার উপযুক্ত হবে।

দ্বিতীয় উপদেশ : দুনিয়ার প্রয়োজনের চিন্তা

প্রথম উপদেশ কারণে কারো মনে এ ধারণা হতে পারে যে, ইসলাম আমাদের জন্য ব্যবসার দরজাই বন্ধ করে দিয়েছে। আর বলেছে, শুধু আখেরাতের চিন্তা করবে, দুনিয়ার চিন্তা করবে না এবং দুনিয়ার মাঝে নিজ প্রয়োজনাদির চিন্তা করবে না। তাদের এ ধারণা দূর করার জন্য কুরআনুল কারীমে সূরা কাসাসের ৭৭ নং আয়াতে দ্বিতীয় হেদায়েত বর্ণনা করা হয়েছে : অর্থাৎ ইসলামের বক্তব্য এটা নয় যে তোমরা দুনিয়াকে সর্ম্পূণভাবে ছেড়ে দেবে। বরং দুনিয়ার যে অংশ রয়েছে তাকে তোমরা ভুলে যাবে না। জায়েজ ও হালাল পদ্ধতিতে দুনিয়া উপার্জনের চেষ্টা করবে।

এই দুনিয়াটাই সবকিছু নয়

এখানে কুরআনুল কারীমের বর্ণনাভঙ্গি এবং এ বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, অর্থনীতিই মানুষের জীবনের সবকিছু নয়। তদপুরি কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা ও হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্থনীতির বিষয়টিকে মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে। কিন্তু তাই বলে অর্থনীতিই জীবনের সবকিছু নয়। একজন মুমিন এবং কাফেরের মাঝে এটাই বড় পার্থক্য যে, কাফের তার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত খাওয়া, উপার্জন ইত্যাদির ক্ষেত্রে অর্থনীতিকেই জীবনের সবকিছু মনে করে। এর বাহিরে তার কোন চিন্তা-চেতনা আসে না।

পক্ষান্তরে একজন মুসলমানকে কুরআন ও হাদীস এই শিক্ষা দেয় যে, ইসলাম নি:সন্দেহে অর্থনীতির প্রতি উৎসাহিত করে, কিন্তু অর্থনীতিই জীবনের উদ্দেশ্য নয়। তা এই জন্য যে, এ ক্ষণস্থায়ী জীবন কত দিনের তা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন। আজ বা কাল অর্থাৎ প্রতিটি মুহূর্তে তা শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান।

আর আজ পর্যন্ত কোন মানুষ এমন সৃষ্টি হয়নি যে, মৃত্যুকে অস্বীকার করেছে। বরং আল্লাহকে অস্বীকারকারী বিদ্যমান আছে, কিন্তু মৃত্যুকে অস্বীকারকারী নেই। সুতরাং তোমরা যদি মুসলমান হও তাহলে নি:সন্দেহে তোমাদের এই বিশ্বাস হবে যে, মৃত্যুর পর দ্বিতীয় এক জীবন শুরু হবে, যা চিরস্থায়ী; কখনো শেষ হবার নয়। আর আখেরাতের সফলতাই হল আসল সফলতা।

মানুষ কি একটি অর্থ-উপার্জক জন্তু?

যে ব্যক্তির সামান্য জ্ঞান রয়েছে তার জন্য এ বিষয়টি অনুধাবন করা উচিত যে, সে তার জীবনের চেষ্টা-মেহনতকে পার্থিব জগতের জন্য উদ্দেশ্য বানাবে না কি আখেরাতের জন্য বানানো উচিত? আর এ কথাতো সুস্পষ্ট যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহকামের উপর বিশ্বাস রাখে তার জীবনের মূল উদ্দেশ্য শুধু খানা-পিনা ও টাকা-পয়সা জমা করে পূর্ণ হবে না। যদি এমন হয় তাহলে মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর মাঝে কোন পার্থক্য থাকবে না।

আর মানুষের পরিচয় বর্ণনা ক্ষেত্রে বলা হয়, অর্থাৎ মানুষ অর্থ-উৎপাদক এক জন্তু । এ পরিচয়টি সঠিক নয়। কেননা যদি এমনই হয় যে, মানুষ শুধু অর্থ-উৎপাদক জন্তু তাহলে তো মানুষ আর গরু-গাধা ও কুকুরের মাঝে কোন পার্থক্য থাকে না। কারণ এদেরকে শুধুমাত্র খানা-পিনার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। এখন মানুষকেও যদি শুধু পানাহারের জন্য সৃষ্টি করা হয়, তাহলে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মাঝে কোন পার্থক্য থাকে না। আল্লাহ তাআলা সমস্ত প্রাণীর জন্যই রিযিকের দরজাকে খুলে রেখেছেন। কিন্তু মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে যে পার্থক্যটা তিনি বর্ণনা করেছেন তাহল মানুষকে আল্লাহ তাআলা আকল, বুদ্ধি দিয়েছেন। তার দ্বারা তাকে ভাবতে হবে যে, পার্থিব জীবন হল ক্ষণস্থায়ী আর আখেরাতের জীবন হল চিরস্থায়ী, যা কখনো শেষ হবার নয়। ফলে আখেরাতের জীবন পার্থিব জীবন থেকে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।

মোটকথা দ্বিতীয় বাক্যে আল্লাহ তাআলা বলে দিয়েছেন যে, তুমি দুনিয়াতে তোমার অংশের কথা ভুলে যেও না। কিন্তু স্মরণ রাখবে যে, আখেরাতের যিন্দেগী হল আসল উদ্দেশ্য!

তৃতীয় উপদেশ : সম্পদ কল্যাণকর কাজে খরচ কর

তৃতীয় উপদেশে বলা হয়েছিল : ধন-সম্পদ দান করে আল্লাহ তাআলা যেমনিভাবে তোমাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন, অনুরূপভাবে তোমরাও অন্যের উপর অনুগ্রহ কর ।

সুতরাং এ আয়াতে একদিকে যেমন হালাল-হারামের পার্থক্য এবং হারাম পন্থায় মাল উপার্জন না করার কথা বলা হয়েছে, অনুরূপ তোমার উপার্জিত হালাল সম্পদের একচ্ছত্র মালিকও তুমি নও বরং এর মাঝে অন্যের হক আছ। যাকাত, সদকা, দান-খয়রাত ইত্যাদির মাধ্যমে অন্যের উপর ইহসান করে সে হক আদায় কর।

চতুর্থ উপদেশ : দুনিয়ার বুকে ফাসাদে লিপ্ত হবে না

চতুর্থ বাক্যে এ উপদেশ দেয়া হয়েছিল : পৃথিবীতে ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করো না। অর্থাৎ অপরের হক আত্মসাৎ করবে না । অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ করবে না। বাজার-সঙ্কট সৃষ্টি করবে না।

যদি তোমরা এ চারটি হেদায়েতের উপর আমল কর অর্থাৎ (ব্যবসায়ীরা) তাহলে তোমাদের সম্পদ, তোমাদের পুঁজি এবং অর্থ-উৎপাদনের ক্ষেত্রে তোমাদের প্রচেষ্টা তোমাদের জন্য ফলপ্রসূ হবে এবং তোমরা নবীদের, সিদ্দীকদের ও শহীদদের সঙ্গে হাশর করতে পারবে। অর্থাৎ তাদের তালিকায় তোমরাও অন্তর্ভুক্ত হবে। আর যদি তোমরা এই হেদায়েতের উপর আমল না কর তাহলে সব চেষ্টাই ব্যর্থ হবে এবং আখেরাতে তার ফলাফল আযাব ও শাস্তির আকৃতিতে তোমাদের সামনে আসবে।

পৃথিবীর সামনে দৃষ্টান্ত পেশ করুন

মোটকথা বর্তমানে আমাদের মুসলিম ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হল, কুরআন মাজীদের এই চারটি হেদায়েতের প্রতি লক্ষ্য রেখে পৃথিবীর সামনে উদাহরণ পেশ করা। বিশ্বমঞ্চে সমাজতন্ত্রের পতন ঘটেছে, পুঁজিবাদও আহত হয়েছে। তাই ইসলামই একমাত্র ভরসা। সুতরাং এমন নমুনা পেশ করতে হবে, যার প্রতি অন্যের অনুরাগ সৃষ্টি হয়। আর যে ব্যক্তি এমন করবে সে এই যুগে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন পূর্ণ করবে।

একজন মানুষ কি সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তন নিয়ে আসতে সক্ষম ?

বর্তমানে এই প্রশ্ন উত্থাপন করা হয় যে, যতক্ষন পর্যন্ত প্রচলিত রীতিনীতি এবং সব মানুষ পরিবর্তন না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত একজন মানুষ কীভাবে সমাজব্যবস্থা পরিবর্তন করবে এবং একজন মানুষ কীভাবে এই চারটি হেদায়েতের উপর আমল করবে?

জেনে রাখুন, প্রচলিত রীতিনীতি ও সমাজব্যবস্থা উভয়টা একই বিষয়ের নাম। এখন যদি প্রত্যেক ব্যক্তি এই চিন্তা করে যে, যতক্ষণ সমাজ পরিবর্তন না হবে ততক্ষণ আমিও পরিবর্তন হব না, তাহলে কখনো সমাজব্যবস্থার মাঝে পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হবে না। আর পরিবর্তন সর্বদা এইভাবে এসেছে, যখন কোন আল্লাহর বান্দা নিজের জীবনে পরিবর্তন নিয়ে এসেছে, তখন তার এই পরিবর্তন দেখে অন্য আরেকজন পরিবর্তিত হয়েছে। এভাবে তৃতীয় আরেকজন নিজের জীবনে পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এইভাবে একেকজন পরিবর্তনের ফলে সমাজেও পরিবর্তন এসেছে। সুতরাং এই আপত্তি করা যে, আমি একা কিছুই করতে পারবো না। এহেন আপত্তি যুক্তিসঙ্গত নয়।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে পরিবর্তন নিয়ে এসেছেন ?

যখন রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন, ওই সময় সমাজব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক ও খারাপের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিল। তখন যদি রাসূল সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই চিন্তা করতেন যে, এত খারাপ সমাজব্যবস্থাকে কীভাকে আমি একা পরিবর্তন করব?

যদি এই চিন্তা করে বসে থাকতেন, তাহলে আজকে আমরা মুসলমান থাকতে পারতাম না। তিনি পৃথিবীবাসীর প্রচন্ড বিরোধিতার মোকাবেলা করে একটি নতুন রাস্তা বের করেছেন।

এই রাস্তা বের করতে গিয়ে তাঁকে অনেক কঠিন পরিস্থিতি মুখোমুখি হতে হয়েছে। অনেক কষ্ট-নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি ওইসব পরিস্থিতির মোকাবেলা করে নিজ নীতির উপর অটল থেকেছেন। আর তারই ফলাফল হল বর্তমান পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম নিচ্ছে এবং তাঁর অনুসরণ করছে। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি এই চিন্তুা করে বসে থাকতেন যে, যতক্ষণ সমাজ পরিবর্তন না হবে ততক্ষণ আমি একা কী করব? তাহলে এই অবস্থার সৃষ্টি হত না।

আগে নিজের ভেতর পরিবর্তন আনুন

আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মানুষের যিম্মাদারী তার নিজের উপরই ছেড়ে দিয়েছেন । ফলে প্রত্যেক মানুষের উপর ফরয হল, সে নিজে তার কর্মপদ্ধতিকে ঠিক করবে। কমপক্ষে যেন এই বিষয়ের আগ্রহ আমাদের অন্তরে সৃষ্টি হয়ে যায় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনোপায়, ব্যবসা ও শিল্পকার্যের ময়দানে কোন্ কোন্ আহকামের পাবন্দি করেছেন? আর ওই আহকামের উপর আমরা কীভাবে আমল করতে পারি।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ওই বিষয়গুলোর জ্ঞান অর্জন করে তার উপর আমল করার তাওফীক দান করুন এবং দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা দান করুন । আমীন!