প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৭ম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৬, রবি আউঃ-রবি সানি ১৪৩৭ হিজরী, পৌষ-মাঘ ১৪২২ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুমহান মর্যাদার স্বাভাবিক দাবি যে, তার পরিবার পরিজন এবং সাথী-সহচরগণের মর্যাদা ও সম্মান হবে নবীগণের পরে বিশ্বের সকল যুগের সকল মানুষের ঊর্ধ্বে। কুরআন ও হাদীসে যদি তাদের বিষয়ে কোন প্রকার উল্লেখ নাও থাকত, তবুও তাদের মহোত্তম মর্যাদার বিষয় যে কোন বিবেকবান ও জ্ঞানী মানুষ খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারতেন।

এ স্বাভাবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা প্রদান করেছে এবং তাদের মহিমা, মর্যাদা ও সম্মান বর্ণনা করেছে কুরআন কারীমের অনেক আয়াত এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অগণিত বাণী। এ সকল আয়াত ও হাদীসের বিস্তারিত আলোচনার জন্য পৃথক পুস্তকের প্রয়োজন। এসবের সার কথা হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিজনগণকে এবং সাহাবীগণকে ভালবাসা ও সম্মান করা তাকে ভালবাসা ও সম্মান করার এবং ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কুরআন ও হাদীসের এসকল মহান বাণী, সহজ ও হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা অনেক মুর্খ ভক্তের হৃদয়কে তৃপ্ত করতে পারে নি। তৃপ্ত করতে পারে নি অতিভক্তির ভণ্ডামীতে লিপ্ত অগণিত মানুষকে। ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে আজগুবি ও অবাস্তব কথা বানিয়েছে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে। এভাবে তারা তার নামে মিথ্যা বলার জঘন্যতম পাপ করার সাথে সাথে ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক আবেদনকে কলুষিত করেছে। মুমিনের ঈমান ও জ্ঞানীর অনুভবকে অপবিত্র করেছে। নিচে এ জাতীয় বানোয়াট ও অনির্ভযোগ্য কিছু কথা উল্লেখ করছি।

১. পাক-পাঞ্জাতন

আহল বাইতের মধ্য থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আলী, ফাতিমা, হাসান ও হুসাইন (রা:)-কে একত্রিত করে পাঁচজনের একত্রিত বিশেষ মর্যাদা জ্ঞাপক অনেক বানোয়াট ও মিথ্যা কথা পাক-পাঞ্জাতনু নামে প্রচলিত আছে। পাক-পাঞ্জাতন বিষয়ক সকল কথা বানোয়াট ও জঘন্য মিথ্যা কথা।

আলী ও ফাতিমা-রদিয়াল্লাহু আনহুমা-কে কেন্দ্র করে মুর্খরা অনেক বানোয়াট, আজগুবি ও মিথ্যা কথা রটনা করেছে। যেমন: ফাতিমা (রা:) একদিন একটি পাখির গোশত খেতে চান। আলী (রা:) অনেক চেষ্টা করেও পাখিটি ধরতে পারেন না।…. জঘন্য মিথ্যা কথা।

২. বিষাদ সিন্ধু ও অন্যান্য প্রচলিত পুঁথি ও বই

বিষাদ সিন্ধু বইয়ের ৯৫% কথা মিথ্যা। বিষাদ সিন্ধু উপন্যাস। কোনো ইতিহাস বা ধর্মীয় পুস্তক নয়। উপন্যাস হিসেবে এর মূল্যায়ন হবে। কিন্তু দুঃখজনক কথা যে, সমাজের সাধারণ মানুসেরা এ ধরনের বইয়ের কথাগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। বিশেষত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জড়িয়ে যে সকল মিথ্যা কথা বলা হয়েছে সে বিষয়ে খুবই সতর্ক থাকা দরকার। মুআবিয়া (রা:)-কে ইয়াযীদ বিষয়ক ভবিষ্যদ্বাণী, মুহাম্মদ হানুফার বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী, হুসাইন (রা:)-এর গলায় বারংবার ছুরির আঘাতে ক্ষত না হওয়া.. তার হত্যাকারীর বেহেশতে নেওয়া ইত্যাদি সকল কথা বানোয়াট। মুহাম্মাদ হানুফা (মুহাম্মাদ ইবনু আলী, ইবনুল হানাফিয়্যাহ) বিষয়ক, ইয়াযিদের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ, তার পাহাড়ের মধ্যে আবদ্ধ থাকা ইত্যাদি কথা সবই মিথ্যা।

এখানে আরো উল্লেখ্য যে, বিষাদ সিন্ধু জাতীয় পুস্তকাদি, পুঁথি সাহিত্য ও খায়রুল হাশর জাতীয় পুস্তকগুলোই আমাদের সমাজে মিথ্যা ও জাল হাদীস প্রচারের অন্যতম কারণ। এর পাশাপাশি রয়েছে বার চাঁদের ফযীলত\’, নেক আমল\’, মকছুদুল মুমিনীন, \’নেয়ামুল কোরান\’, নাফেউল খালায়েক; জাতীয় পুস্তক। সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রয়োজনীয় ইসলামী শিক্ষা প্রসারে এ সকল পুঁথি-পুস্তকের অবদান অনস্বীকার্য। এ সকল পুস্তকের সম্মানিত লেখকগণ তাদের যুগের ও সময়ের সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে সাধ্যমত দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এরূপ কল্যাণময় খিদমতের পাশাপাশি জাল হাদীস, ভিত্তিহীন কথাবার্তা, বিভিন্ন প্রকারের কুসংস্কার ও ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা প্রসারেও এগুলো অবদান রেখেছে। মহান আল্লাহ তাদের খিদমাত কবুল করুন এবং ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করুন।

এক সময় বাংলার যোগ্য আলিমগণ বাংলাভাষায় পুস্তকাদি রচনা দূষণীয় বলে গণ্য করতেন। এ ধ্বংসাত্মক বিভ্রান্তিই সমাজে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য আলিমদের রচিত ভুলভ্রান্তিপূর্ণ পুস্তক প্রচলনের সুযোগ করে দেয়।

৩. ফাতিমা (রা:)-এর শরীর টেপার জন্য বাঁদী চাওয়া!

এখানে অনুবাদের বিকৃতি ও মিথ্যার একটি নমুনা উল্লেখ করছি। প্রচলিত একটি পুস্তকে লিখিত হয়েছে: হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে: একদিন বিবি ফাতেমা (রা:) হযরত মোহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসিয়া আরজ করিলেন, হে পিতা! আমাকে সমস্ত দিনই আটা পিষায় ও গৃহ কার্যে নিযুক্ত থাকিতে হয়। তাই আমার শরীরটা বেদনা ও দরদযুক্ত হইয়া যায়। অতএব আমাকে একটি বাঁদী ক্রয় করিয়া দিন যাতে সে আমার শরীরটা টিপিয়ে দিতে ও গৃহ কার্যে আমাকে সাহায্য করিতে পারে। তদুত্তরে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, হে মাতা! স্ত্রী লোকের পক্ষে আপন স্বামীর ও পরিজন পোষণের জন্য আটা পিষা, গৃহ কার্যে আঞ্জাম করার ন্যায় পুণ্য কাজ আর কিছুই নাই। কিন্তু বাঁদী বা চাকরানীর সাহায্য লইলে ততদূর ছোওয়াবের ভাগী হইতে পরিবে না। অতএব আমার উপদেশ মনিয়া সর্বদা নিম্নলিখিত দোয়া পাঠ করিতে থাক, নিশ্চয়ই তোমার শরীরের বেদনা দূর হইয়া যাইবে এবং শরীর সর্বদা সুস্থ ও সবল থাকিবে। আর অতিরিক্ত ছওয়াবও পাইবে। তখন হইতে বিবি ফাতেমা তাহাই করিতেন। দোয়া: একটি সহীহ হাদীসের মনগড়া অনুবাদ করে এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে অনেক মিথ্যা ও মনগড়া কথা বলা হয়েছে। উপরন্তু ফাতিমা (রা:) এর জন্য অবমাননাকর কথাবার্তা বলা হয়েছে। মূল হাদীসটি বুখারী, মুসলিম ও অন্য সকল মুহাদ্দিস কাছাকাছি শব্দে সংকলন করেছেন: হাদীসটি নিম্নরূপ:

আলী (রা:) বলেন, যাঁতা চালানোর কারণে তার হাতে কী কষ্ট হয় তা জানাতে ফাতিমা (রা:) নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গমন করেন। ফাতিমা শুনেছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কিছু যুদ্ধবন্দী দাস-দাসী এসেছে। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাড়িতে যেয়ে তাকে পান নি। তখন তিনি আয়েশা (রা:)-কে বিষয়টি জানান। যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে আসেন তখন আয়েশা বিষয়টি তাকে জানান। আলী বলেন, আমরা রাতে বিছানায় শুয়ে পড়ার পরে তিনি আমাদের কাছে আগমন করলেন। তখন আমরা উঠতে গেলাম। তিনি বললেন, তোমরা তোমাদের জায়গাতেই থাক। তিনি এসে আমার ও ফাতিমার মধ্যখানে বসলেন। এমনকি আমি আমার পেটের উপর তার পদযুগলের শীতলতা অনুভব করলাম। তিনি আমাদেরকে বললেন, তোমরা যা চাচ্ছ তার চেয়েও উত্তম বিষয় কি তোমাদের শিখিয়ে দেব না? তোমরা যখন তোমাদের বিছানায় শুয়ে পড়বে তখন ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদু লিল্লাহ ও ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পাঠ করবে। এ আমলটি তোমাদের জন্য দাসীর চেয়েও উত্তম। আলী (রা:) বলেন, এরপর আমি কখনোই এ আমলটি ত্যাগ করি নি। (মো. গোলাম রহমান, কাজী মাওলানা, মকছুদোল মোমেনীন, পৃ. ৫৫-৫৬)

এ হলো মূল ঘটনা, যা বুখারী ও মুসলিমসহ সকল মুহাদ্দিস বিভিন্ন সহীহ সনদে সংকলিত করেছেন। অথচ উপরের অনুবাদে সব কিছু বিকৃত করা হয়েছে এবং অনেক মিথ্যা কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে বলা হয়েছে। (সহীহ বুখারী ৩/১১৩৩, ৩/১৩৫৮, ৫/২০৫১, ৫/২৩২৯, নং-২৯৪৫, ৩৫০২, ৫৯৫৯, সহীহ মুসলিম ৪/২০৯১, নং-২৭২৭, ফাতহুল বারী ১১/১২০।)

৪. আবু বাকর (রা:)-এর খেজুর পাতা পরিধান

প্রচলিত একটি পুস্তক থেকে একটি ভিত্তিহীন কাহিনী উদ্ধৃত করছি: ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিবার পূর্বে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:) একজন বড় ধনাঢ্য লোক ছিলেন। যেদিন হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে আসিয়া ইসলামে দিক্ষীত হইলেন সেদিন হইতেই তাহার যাবতীয় ধন সম্পত্তি আল্লাহর রাস্তায় খরচ করিতে লাগিলেন।… একদিন পরনের কাপড়ের অভাবে মসজিদে নামায পড়িতে যাইতে কিঞ্চিত দেরী হইয়াছিল। দেখিয়া হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, হে আবু বকর (রা:), আমি জীবিত থাকিতেই ইসলামের প্রতি আপনাদের এত অবহেলা হইতেছে, আমার অভাবে আরও কত কি হয় বলা যায় না।… তিনি বলিলেন, হুজুর আমার অবহেলার কিছুই নহে। বাস্তবিক আমার পরনে কাপড় ছিল না, সেই হেতু আমি ছোট এক খানা কাপড়ের সহিত বালিশের কাপড় ছিঁড়িয়া খেজুর পাতা ও কাঁটা দ্বারা সেলাই করতঃ ধুইয়া ও শুকাইয়া পরিয়া আসিতে এত গৌণ হইয়াছে…। ইহার কিছুক্ষণ পরে জীব্রাইল সম্পূর্ণ খেজুর পাতার পোশাক পরিয়া হযরতের সম্মুখে হাজির হইলেন…। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, …আজকে খেজুর পাতার পোশাক দেখিতেছি কেন? তদুত্তরে জিব্রাইল বলিলেন, হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:) খেজুর পত্রের সেলাই করা কাপড়ে নামায পড়িতে আসিয়াছিলেন। তখন আল্লাহ তায়ালা সমস্ত ফেরেশতাকে ডাকিয়া বলিলেন, দেখ হে ফেরেশতাগণ, আবু বকর আমার সন্তোষ লাভের জন্য কতইনা কষ্ট স্বীকার করিতেছেন। অতএব তোমরা যদি আজ আমার সন্তোষ চাও তবে এখনই আবু বকরের সম্মানার্থে সকলেই খেজুর পত্রের পোশাক পরিধান কর। নচেৎ আজই আমার দপ্তর থেকে সমস্ত ফেরেশতার নাম কাটিয়া দিব। এই কঠোর বাক্য শুনিয়া আমরা সকলেই তাহার সম্মানার্থে খেজুর পত্রের পোশাক পরিধান করিতে বাধ্য হইয়াছি? (মো. গোলাম রহমান, মকছুদোল মোমেনীন, ১৪৯-১৫১।)

৫. আবু বাকরের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা উমার বুঝতেন না

জালিয়াতদের বানানো একটি কথা: উমার (রা:) বলেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আবু বাকরের (রা:) সাথে কথা বলতেন, তখন আমি তাদের মাঝে অনারব হাবশীর মত হয়ে যেতাম, যে কিছুই বুঝে না।

জালিয়াত দাজ্জালরা বলতে চায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বাকর (রা:) এর সাথে এমন মারেফতী ভাষায় (!) কথা বলতেন যে, উমারও (রা:) তাদের কথা বুঝতে পারতেন না। মুহাদ্দিসগণ একমত যে এ কথাটি সনদ বিহীন ভিত্তিহীন একটি মিথ্যা কথা। (ইবনুল কাইয়িম, আল-মানার, পৃ. ১১৫; সুযুতী, যাইলুল লাআলী, পৃ. ২০; ইবনু আবরাক, তানযীহ ১/৪০৭; মোল্লা কারী, আল-আসরাব, পৃ. ৩৪২; তাহির পাটনী, তাযকিরা, পৃ. ৯৩; শাওকানী, আল-কাওয়াইদ ২/৪২৩।)

৬. উমার (রা:) কর্তৃক নিজ পুত্র আবু শাহমাকে দোররা মারা

প্রচলিত আছে যে, উমার (রা:) তার নিজ পুত্র আবু শাহমাকে ব্যভিচারের অপরাধে ১০০ বেত্রাঘাত করেন। এতে পুত্রের মৃত্যু হয়। এ ব্যভিচার উদঘাটন, স্বীকারোক্তি, শাস্তি, পিতা-পুত্রের কথাবার্তা ইত্যাদি নিয়ে লম্বা চওড়া কাহিনী বলা হয়, যা শুনলে সাধারণ শ্রোতাগণের চোখে পানি আসে। মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এগুলো ভিত্তিহীন মিথ্যা গল্প। ইবনুল জাওযী বলেন, সাধারণ শ্রোতাদেরকে কাঁদানোর জন্য জাহিল ওয়ায়িযগণ এগুলো বানিয়েছে। (ইবনুল জাওযী, আল-মাউদুআত ২/৪৪২।)

ইতিহাসে পাওয়া যায়, উমারের পুত্র আবদুর রাহমান আবু শাহমা মিশরের সেনাবাহিনীতে যুদ্ধরত ছিলেন। একদিন তিনি নাবীয বা খেজুর ভিজিয়ে তৈরি করা শরবত পান করেন। কিন্তু এ খেজুরের শরবতে মাদকতা এসে গিয়েছিল, ফলে আবু শাহমার মধ্যে মাতলামি আসে। তিনি মিশরের প্রশাসক আমর ইবনুল আস (রা:)Ñএর কাছে আগমন করে বলেন, আমি মাদক দ্রব্য পান করেছি, কাজেই আমাকে আপনি মাদক পানের শারীয়াহ নির্ধারিত শাস্তি (বেত্রাঘাত) প্রদান করুন। আমর (রা:) তাকে গৃহাভ্যন্তরে বেত্রাঘাত করেন। উমার (রা:) তা জানতে পেরে আমরকে (রা:) তিরস্কার করেন এবং বলেন, সাধারণ মুসলিম নাগরিককে যেভাবে জনসমক্ষে শাস্তি প্রদান করা হয়, আমার পুত্রকেও সেভাবে শাস্তি প্রদান করা উচিত ছিল। আবু শাহমা মদীনা ফিরে গেলে তিনি নিজে পুনরায় তাকে শাস্তি প্রদান করেন। এর কিছুদিন পরে আবু শাহমা ইন্তেকাল করেন। (ইবনুল জাওযী, আল-দাউদুআত ২/৪৩৮-৪৪৩; ইবনু হাজার, আল-ইসাবা ৪/৩৩৯, ৫/৪৪; সুযূতী, আল-লাআলী ২/১৯৪-১৯৮; ইবনু আররাক, তানযীহ ২/২২০। )

৭. উমার (রা:)-এর ইসলাম গ্রহণের দিনে কাবাঘরে আযান শুরু

প্রচলিত আছে যে, উমার (রা:) যেদিন ইসলাম গ্রহণ করেন, সে দিন থেকে কাবাঘরে প্রথম আযান শুরু হয়। কথাটি ভুল। উমার (রা:) হিজরতের ৫ বছর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। আর আযানের প্রচলন হয় হিজরতের পরে মদীনায়। উমারের (রা:) ইসলাম গ্রহণের সময় এবং পরবর্তী প্রায় ৬ বছর যাবৎ আযানের কোনো প্রচলন ছিল না। তবে উমারের (রা:) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মক্কায় মুসলিমগণ কাবা ঘরের পাশে নামায আদায় করতে পারতেন না। মক্কার কাফিরগণ তাতে বাধা দিত। উমারের (রা:) ইসলাম গ্রহণের পরে তিনি কাফিরদের বাধা প্রতিহত করে নিজে কাবার পাশে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করেন এবং তার সাথে অন্যান্য মুসলিমও সেখানে নামায আদায় করেন। (ইবনু হিশাম, আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ ১/৩৬৯।)

এ তথ্যটি কিভাবে ক্রমান্বয়ে বিকৃত হয়েছে তার একটি নমুনা দেখুন। খাজা নিজামউদ্দীন আউলিয়ার (রাহ.) নামে প্রচরিত রাহাতিল কুলূব গ্রন্থে রয়েছে তার মুর্শিদ ফরীদ উদ্দীন গঞ্জে শক্কর (রহ.) বলেন, যতদিন পর্যন্ত হযরত আমিরুল মোমেনীন হযরত ওমর ফারুক (রা:) ঈমান আনলেন সে দিন তিনিই তলোয়ার মুক্ত করে দাঁড়িয়ে হযরত বেলাল (রা:)-কে বললেন, কাবা ঘরের মেম্বারে উঠে আজান দাও। হযরত বেলাল তার নির্দেশ মতো কাজ করলেন। (হযরত খাজা নিজামউদ্দীন আউলিয়া, রাহাতিল কুলূব, পৃ. ৭১ (১২ মজলিস।)

আমরা জানি যে, এ কথাগুলো সঠিক নয়। উমার (রা:)-এর ইসলাম গ্রহণের আগে বা পরে কখনোই মক্কায় গুহায়, গহ্বরে বা কাবাঘরে কোথাও আযান দেয়া হয়নি। এ ছাড়া কাবা ঘরের কোনো মিম্বার ছিল না। আমরা দেখেছি যে, এ পুস্তকটি সম্ভবত খাজা নিযামউদ্দীনের নামে জাল করে লেখা। অথবা সরলতার কারণে তারা যা শুনেছেন সহজেই বিশ্বাস করে নিয়েছিলেন।

৮. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইলমের শহর ও আলী (রা:) তার দরজা

আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত হাদীস: আমি জ্ঞানের শহর এবং আলী তার দরজা।
এ হাদীসটিকে অভিজ্ঞ মুহাদ্দিসগণ বানোয়াট বলে উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ হাদীসটিকে মিথ্যা না বলে যয়ীফ বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম তিরমিযী এ অর্থে একটি হাদীস বর্ণনা করে নিজেই হাদীসটি দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন। (তিরমিযী, আল-সুনান ৫/৫৯৬।) ইমাম বুখারী, আবু হাতিম, ইয়াহইয়া বিন সায়ীদ, যাহাবী প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীসটিকে ভিত্তিহীন মিথ্যা বলে উল্লেখ করেছেন।১০ (১০ ইবনুল জাওযী, আল-মাউদুআত ১/২৬১-২৬৫; সুযূতী, আল-লাআলী ১/৩২৮-৩৩৬; মোল্লা আলী কারী, আল-আসবার, ৭১-৭২, পৃ. নং-২৫১, সাখাবী, আল-মাকাসিদ, পৃ. ১১৪-১১৬, যারকানী, মুখতাসারুল মাকাসিদ পৃ. ৬৯।)

৯. আলী (রা:) কে দরবেশী খিরকা প্রদান

প্রচলিত একটি গল্পে বলা হয়েছে; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিরাজ থেকে ফিরে আসার পরে নিজের সাহাবা (রা:)-দেরকে ডেকে এরশাদ করলেন যে, আমার দরবেশী খিরকা ঐ ব্যক্তিকে প্রদান করবো যে আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারবে… আবু বাকর (রা:)-কে বললেন, যদি আমি তোমাকেই এ দরবেশী খিরকা দান করি তাহলে তুমি এর হক কিভাবে আদায় করবে?….. এভাবে উমার (রা:) কে জিজ্ঞাসা করলেন… উসমান (রা:)-কে জিজ্ঞাসা করলেন..। এরপর আলী (রা:)-কে প্রশ্ন করলেন। আলী (রা:) উত্তরে বলেন, আমি আল্লাহর বান্দাদের গোপনীয়তা রক্ষা করব। তখন তিনি আলীকেই খিরকা প্রদান করেন…. ইত্যাদি। পুরো কাহিনীটিই ভিত্তিহীন বানোয়াট। (হযরত খাজা নিজামউদ্দীন আউলিয়া, রাহাতিল কুলুব, পৃ. ৮-৯।)

১০. আলীকে ডাক, বিপদে তোমাকে সাহায্য করবে।

মোল্লা কারী বলেন, শিয়াদের বানানো একটি ঘৃণ্য জাল ও মিথ্যা কথা: আলীকে ডাক, সে আশ্চর্য কর্মাদি প্রকাশ করে, তাকে তুমি বিপদে আপদে তোমার সহায়ক পাবে। হে মুহাম্মাদ, আপনার নযুয়তের ওসীলায়। হে আলী, আপনার বেলায়েতের ওসীলায়। (মোল্লা আলী কারী, আল-আসরার, পৃ. ২৬৫-২৬৬; আজলুনী, কাশফুল খাফা ২/৪৮৯।)

বস্তুত, আমাদের সমাজে প্রচলিত সকল কুসংস্কার, শিরক ও বিদআতের উৎস হচ্ছে শিয়া মতবাদ ও শিয়া সম্প্রদায়। কুরআন কারীম ও সুস্পষ্ট সুন্নাতকে পরিত্যাগ করে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশের ১২ বা ৭ ইমামের নামে ভক্তিতে বাড়াবাড়ি করেন। ফলে এসকল নেককার মানুষের নামে বিভিন্ন প্রকার মিথ্যা ও ঈমান বিধ্বংসী কথা তাদের মধ্যে প্রচার ও প্রতিষ্ঠিত করা ইসলামের শত্রদের পক্ষে সহজ হয়ে যায়। তাদের হৃদয়গুলো কুরআন কারীম ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের বাঁধন থেকে মুক্ত হয়ে গিয়েছে। হৃদয়ের মণিকোঠায় বলেছেন আলী ও তার বংশের ইমামগণ। তাদের নামে জালিয়াতগণ যা বলেছে সবই তারা ভক্তিভরে মেনে নিয়েছেন এবং এ মিথ্যাগুলোর ভিত্তিতে কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশনার বিকৃত ব্যাখ্যা করেছেন।

এ সম্প্রদায়ের কঠিনতম অপরাধগুলির অন্যতম হলো, এরা আলী (রা:) ও তার বংশের ইমামদেরকে ঈশ্বর বানিয়েছে। তাদের মধ্যে ঈশ্বরত্ব বা ঐশ্বরিক শক্তি কল্পনা করেছে। এ কথাটি তাদের মধ্যে প্রচলিত একটি শিরক। যেখানে কুরআন ও সুন্নাহ বারংবার শেখাচ্ছে সকল বিপদে আপদে শুধুমাত্র মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার, সেখানে এরা বানিয়েছে আলীর কাছে সাহায্য চাওয়ার কথা। বিপদে আপদে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে অলৌকিক সাহায্য প্রার্থনা করাই হলো সকল শিরকের মূল। এ বিষয়ে আমি রাহে বেলায়াত নামক পুস্তকে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

এ জঘন্য মিথ্যা কথাটির ভিত্তিতে শিয়াগণ একটি দোয়া বানিয়েছে, যা দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সমাজে অনেক সুন্নি মুসলিমের মধ্যেও প্রচলিত। এ শিরক-পূর্ণ দোয়াটি প্রচলিত একটি পুস্তক থেকে উদ্ধৃত করছি: দোয়ায়ে নাদে আলী। তাহাজ্জুদ নামাজের পর আগে পরে দরূদ শরীফ পড়ে এ দোয়া যত বেশি পারা যায় পড়ে দোয়া করিলে মনের বাসনা পূর্ণ হয় ও কঠিন বিপদ দূর হয়ে থাক্ েবিছমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। নাদে আলিয়ান মাজহারাল আজায়েবে তাজেদহু আউনাল্লাকা ফিন্নওয়ায়েবে ওয়াকুল্লি হাম্মিন ওয়া গাম্মিন সাইয়ানজালি বি-আজমা-তিকা ইয়া আল্লাহ বিনুবুওয়াতিকা ইয়া মুহাম্মাদ বি-বিলায়াতিকা ইয়া আল,ি ইয়া আলী, ইয়া আলী,লা ফাতা ইল্লা আলী, লা সাইফা ইয়া জুল ফাক্কারে, নাছরুম মিনাল্লিাহি ওয়া ফাতহুন কারীর, ওয়া বাশশিরিল মুমেনীন, ফাল্লাহু খাইরুন হাফিজাও ওয়া হুয়া আরহামার রাহিমিন। (মো. বসির উদ্দীন আহমাদ, নেক আমল, পৃ. ১৮৬।)

শিয়াদের রচিত এ দোয়াটি নিরেট শিরক। অথচ তা আমাদের ধার্মিক মানুষদের মধ্যে প্রচলিত। কোনো সরল প্রাণ বুযুর্গ হয়তো দোয়াটি শুনে অর্থ না জেনে বা অসাবধানতা বশত তা আমল করেছিলেন। এখন আপনি যতই বলুন একথা শিরক, একথা শিয়াদের বানানো, সকল মুহাদ্দিস এ বিষয়ে একমত… ইত্যাদি, আপনার কোনো কথাই বাজারে ঠাঁই পাবে না। একটি কথাতেই সব নষ্ট হয়ে যাবে; অমুক বুযুর্গ তা পালন করেছেন, তিনি কি কিছুই বুঝেন নি???

১১. আলী (রা:)-কে দাফন না করে উটের পিঠে ছেড়ে দেয়া

৪০ হিজরীর রামাদান মাসের ২৩ তারিখে আলী (রা:) তার খেলাফতের রাজধানী কুফায় এক গুপ্তঘাতক খারিজীর হাতে শাহাদাত বরণ করেন। তার জ্যেষ্ঠ্য পুত্র হাসান ইবনু আলী (রা:) তার জানাযার সালাতে ইমামতি করেন। জানাযা শেষে কুফাতেই তার বাড়ির অভ্যন্তরে তাকে দাফন করা হয়। কারণ ইমাম হাসান ও অন্যান্যরা ভয় পাচ্ছিলেন যে, সাধারণ গোরস্থানে তাকে দাফন করলে খারিজীগণ তার মৃতদেহকে চুরি করবে ও অপমানিত করবে। এ বিষয়টি প্রথম যুগের মুসলিমদের মধ্যে প্রসিদ্ধ ছিল।

পরবর্তীকালে শিয়াগণ এ বিষয়ে একটি বানোয়াট ও মিথ্যা গল্প প্রচার করেছে। গল্পটির সার সংক্ষেপ হলো, আলী (রা:)-কে দাফন না করে উটের পিঠের উপর ছেড়ে দেয়া হয়। উটটি হারিয়ে যায়।… পরবর্তীকালে নাজাফ-এ তার কবরের খোঁজ পাওয়া যায়।… ইত্যাদি।

এ সকল কাহিনী শুধু মিথ্যাই নয়, উপরন্তু তা আলী (রা:), হাসান (রা:), হুসাইন (রা:) ও আলীর পরিবারের সকলের জন্যই কঠিন অবমাননাকর। ইন্তিকালের পরে মৃত দেহ দাফন করা জীবিতদের উপর ফরয। এ ফরয দায়িত্বে অবহেলা করে তারা আমীরুল মুমিনীনের মৃত দেহ উটের পিঠে ছেড়ে দিবেন একথা একান্ত কাণ্ডজ্ঞানহীন মুর্খ ছাড়া কেউই বিশ্বাস করবে না। হাসান-হুসাইন (রা:) তো দূরের কথা, একজন অতি সাধারণ মানুষও তার পিতার মৃতদেহ এভাবে ছেড়ে দিতে রাজি হবে না। সেও চাইবে যে, তার পিতার কবরটি পরিচিত থাক, যেন সে ও তার বংশধরেরা তা যিয়ারত করতে পার…। কিন্তু সমস্যা হলো, কুরআন সুন্নাহকে পরিত্যাগ করে অতিভক্তির অন্ধকারে হৃদয়কে নিমজ্জিত করার পরে ইমমাগণের নামে যা কিছু বাতিল, শরীয়ত বিরুদ্ধ, বুদ্ধি ও বিবেক বিরুদ্ধ কথা বলা হয়েছে, সবই শিয়ারা বিভিন্ন ব্যাখ্যা করে বিশ্বাস করে নিয়েছে।

এ মিথ্যাচারের ভিত্তিতে নাজাফ শহরে একটি কবরকে শিয়াগণ আলীর কবর বলে বিশ্বাস ও প্রচার করেন। আলী (রা:)-এর শাহাদাতের পরে তিন শত বছর পর্যন্ত কেউ বলেন নি যে, আলীর কবর নাজাফে। প্রায় তিন শত বছর পরে বিভিন্ন জনশ্রতি ও কুসংস্কারের ভিত্তিতে এ কবরটি আলীর (রা:) কবর বলে পরিচিতি পেতে শুরু করে। কবরটির অবস্থা অবিকল বাবরী মসজিদের স্থলে রাম জন্ম-মন্দিরের কাহিনীর মত। সকল হিন্দু গবেষক ও ঐতিহাসিক একমত যে, অযোধ্যার বাবরী মসজিদের স্থানে কোনো দিনই রাম-মন্দির ছিল না। কিন্তু এ মিথ্যা কথাটি উগ্রপন্থী হিন্দুদের প্রচারে এখন প্রায় স্বতঃসিদ্ধ সত্যে পরিণত হয়েছে। হয়তো এক সময় এখানে রাম-মন্দির নির্মিত হবে। ভারতের কোটি কোটি মানুষ বিশ্বাস করবে যে, এখানেই রামের জন্ম হয়েছিল। যেমন ভাবে কোটি কোটি শিয়া বিশ্বাস করে যে নাজাফের এ কবরটি আলীর কবর। এজন্য তারা নাজাফ শহরকে বলে নাজাফ আল-আশরাফ। মক্কা শরীফ, মদীনা শরীফ ও নাজাফ আশরাফ। অর্থাৎ পবিত্র মক্কা, পবিত্র মদীনা ও মহা পবিত্র নাজাক!!! (ইবনু তাইমিয়া, মাজভূউ ফাতওয়া ২৭/৪৪৬; ইবনু কাসীর, আল-দিায়া ৭/৩৩০; মোল্লা কারী, আল-আসবার, পৃ. ২৮০।)

১২. আমার সাহাবীগণ নক্ষত্রতুল্য

মুসলিম সমাজে অত্যন্ত প্রচলিত একটি হাদীসআমার সাহাবীগণ নক্ষত্রতুল্য, তাদের যে কাউকে অনুসরণ করলেই তোমরা সুপথ প্রাপ্ত হবে।

হাদীসটি আমাদের মধ্যে এত প্রসিদ্ধ যে, সাধারণ একজন মুসলিম স্বভাতই চিন্তা করেন যে, হাদীসটি বুখারী, মুসলিমসহ সিহাহ সিত্তা ও সকল হাদীগ্রন্থেই সংকলিত। অথচ প্রকৃত বিষয় হলো, সিহাহ সিত্তা তো দূরের কথা অন্য কোনো প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থে এ হাদীসটি নেই। যয়ীফ ও জালিয়াত রাবীগণের জীবনী গ্রন্থে, কয়েকটি ফিকহী গ্রন্থে ও অপ্রসিদ্ধ দুই একটি হাদীসের গ্রন্থে এ বাক্যটি এবং এ অর্থের একাধিক বাক্য একাধিক সনদে বর্ণিত হয়েছে। প্রত্যেক সনদেরই একাধিক রাবী জালিয়াত হিসেবে প্রসিদ্ধ অথবা অত্যন্ত দুর্বল এবং মিথ্যা বলায় অভিযুক্ত। এজন্য আবু বাকর বাযযার আহমাদ ইবনু আমর (২৯২ হি.), ইবনু হাযম যাহিরী আলী ইবনু আহমাদ (৪৫৬), যাহাবী মুহাম্মাদ ইবনু আহমাদ (৭৪৮ হি) ও অন্যান্য মুহাদ্দিস এ হাদীসটিকে জাল ও ভিত্তিহীন বলে গণ্য করেছেন। (আবাদ ইবনু হুমাইদ, আল-মুসনাদ, পৃ. ২৫০; ইবনু হাযম, আল-ইহকাম ৬/২৪৪; ইবনুল মুলাক্কিন (৮০৪ হি.), কুলাসাতুল বাদরিল মুনীর ১/২৫০; যাহাবী, মীযানুল তিদাল ২/১৪১-১৪২, ৩৭৯, ৮/৭৩; ইবনু হাজার, লিসানুল মীযান ২/১৩৭; সাখাবী, আল-হানাফী, শাবহুল আকীদাতিত তাহাবিরয়্যাহ পৃ. ৪৬৭-৪৭১; আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীসিস যাঈফাহ ১/১৪৪-১৫২, নং-৫৮-৬১।)

আশ্চর্যের বিষয় হলো, সাহাবীগণের মর্যাদা প্রমাণের জন্য আমরা এ ধরনের অনির্ভরযোগ্য হাদীসের উপর নিভর করি, অথচ কুরআনে অনেক স্থানে সুস্পষ্টভাবে তাদের মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে। তাদের মর্যাদার বিষয়ে অনেক সহীহ হাদীস প্রসিদ্ধ হাদীসের গ্রন্থসমূহে সংকলিত রয়েছে।

১৩. আমার আহলু বাইত নক্ষত্রতুল্য

উপরের হাদীসের ভাষাতেই আরেকটি হাদীস: আমার আহলু বাইত অর্থাৎ বাড়ির মানুষেরা বা বংশঘরেরা নক্ষত্রতুল্য, তাদের যে কাউকে অনুসরণ করলেই তোমরা সুপথপ্রাপ্ত হবে।

নুবাইত ইবনু শারীত (রা:) একজন সাহাবী ছিলেন। একাধিক তাবিয়ী তার থেকে হাদীস শিক্ষা ও বর্ণনা করেছেন। তারই এক অধস্তন পুরুষ আহমাদ ইবনু ইসহাক ইবনু ইবরাহীম ইবনু নুবাইত তৃতীয়-চতুর্থ হিজরী শতকে দাবি করেন যে, নুবাইতের লিখিত একটি পাণ্ডুলিপি তার নিকট আছে। তিনি দাবি করেন, তিনি তার পিতা-পিতামহের মাধ্যমে এ পাণ্ডুলিপিটি পেয়েছেন। এতে লিখিত হাদীসগুলোর একটি এ হাদীস। মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এ লোকটি একজন জঘন্য মিথ্যাবাদী ছিলেন। তিনি নিজে জালিয়াতি করে এ পাণ্ডুলিপিটি লিখে তার ঊর্ধ্বতন দাদার নামে চালান। এ হাদীসটি এবং পাণ্ডুলিপিটির সকল হাদীস জাল। (যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ১/২১৪; ইবনু হাজার, লিসানুল মীযান ১/১৩৬; সুয়ূতী, যাইলুল লাআলী, পৃ. ২০১; ইবনু আররাক, তানযীহ ১/৪১৯; তাহির পাটনী, তাযকিরা, পৃ. ৯৮; শওকানী, আল-ফাওয়াইদ ২/৪৮৯।)

মুমিনের উচিত আযানের আগেই ওযু করে মসজিদে যেয়ে নামাযের জন্য অপেক্ষা করা। এরূপ অপেক্ষা আল্লাহ্র নিকট অন্যতম জিহাদ ও অত্যন্ত বড় নেককর্ম। জামাআতে গমন করার সময় তাড়াহুড়ো না করা, ধীরে-সুস্থে যাওয়া, দৃষ্টিকে নামিয়ে রাখা, কণ্ঠকে নীচু রাখা এবং এদিক সেদিক অধিক তাকানো বর্জন করা কর্তব্য। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, সালাতের ইকামত হওয়ার পরেও যদি তোমরা মসজিদে যাও তাহলে মানসিক অস্থিরতা বা দৌড়াদৌড়ি করে মসজিদে যাবে না। শান্তভাবে ও ধীরে ধীরে যাবে। যতটুকু সালাত ইমামের সাথে পাবে তা আদায় করবে, বাকিটা পরে নিজে আদায় করবে। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, ঘর থেকে সালাতের জন্য বাহির হওয়ার সময় থেকেই মুসল্লী সালাতের মধ্যেই থাকেন এবং আল্লাহ্র কাছে তিনি সালাতরত বলে গণ্য হন। যদি কেউ মসজিদে যেয়ে দেখেন যে পুরো জামাআত শেষ হয়ে গিয়েছে তাহলেও তিনি জামাআতের সাওয়াব পাবেন। মসজিদে প্রবেশ করার পর আগের কাতারে জায়গা থাকা সত্ত্বেও পিছনের কাতারে দাঁড়ানো কঠিনভাবে নিষিদ্ধ ও গোনাহের কাজ। যথাসম্ভব ধীর স্থিরভাবে আগের কাতারে দাঁড়াতে হবে। এতে ইমাম এক রাকআত শেষ করে ফেললে কোনো ক্ষতি নেই। আমরা মসজিদে রাকআত গণনা করতে যাই না, সাওয়াব অর্জন করতে যাই। তাড়াহুড়ো করলে, পিছনের কাতারে দাঁড়ালে গোনাহ হবে। আর শান্তভাবে আগের কাতারে দাঁড়ালে সাওয়াব বেশি হবে।

প্রথম কাতারে সালাত আদায়ের জন্য রয়েছে বিশেষ সাওয়াব ও মর্যাদা। ইরবাদ (রা:) বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম কাতারের জন্য তিনবার করে ক্ষমতা প্রার্থনা করতেন এবং দ্বিতীয় কাতারের জন্য একবার। (ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/৩১৮; হাকিম, আল-মুসতাদরাক ১/৩৩৪, ৩৩৭; আলবানী, সহীহুত তারগীব ১৪/১১৮। হাদীসটি সহীহ) অন্য হাদীসে আবূ উমামা (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : প্রথম কাতারের জন্য আল্লাহ্ রহমত প্রদান করেন এবং ফিরিশতাগণ দোয়া করেন। (নাসাঈ, আস-সুনান ২/১৩; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/৩১৮; আলবানী, সহীহুত তারগীব ১/১১৮/। হাদীসটি সহীহ)

সামনের কাতারে স্থান রেখে পিছনের কাতারে দাঁড়ালে মুসল্লীকে শাস্তি পেতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : কিছু মানুষ নিয়মিত কাতারে পিছিয়ে পড়তে থাকবে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ্ তাদেরকে জাহান্নামের মধ্যে পিছিয়ে দিবেন। (আবূ দাউদ, আস-সুনান ১/১৮১; আলবানী, সহীহুত তারগীব ১/১২৩) জামাতে সালাতের কাতার সোজা করা, কাতারের মাঝে ফাঁক পূরণ করা, গায়ে গা লাগিয়ে ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : তোমরা তোমাদের কাতারগুলি সোজা কর, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াও, তোমাদের ভাইদের হাতে নরম হয়ে যাও, ইমামকে মধ্যস্থানে রেখে কাতার দাও এবং কাতারের মাঝে ফাঁক পূরণ কর। কারণ শয়তান মেশ শাবকের ন্যায় তোমাদের মধ্যে প্রবেশ করে। যে ব্যক্তি কাতার মিলিয়ে দেবে বা সংযুক্ত করবে আল্লাহ্ তাকে মিলিয়ে দেবেন। আর যে ব্যক্তি কাতার বিচ্ছিন্ন করবে বা ভাঙ্গবে আল্লাহ্ তাকে ভাঙ্গবেন। (আবূ দাউদ, আস-সুনান ১/১৮১; আলবানী, সহীহুত তারগীব ১/১২৩)

আনাস (রা:) বলেন, সালাতের ইকামত হয়ে যাওয়ার পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দিকে ফিরে বলেন, তোমরা তোমাদের কাতারগুলি সোজা কর, কারণ আমি আমার পিছন দিকেও তোমাদেরকে দেখতে পাই। তখন আমরা একে অপরের কাঁধের সাথে কাঁধ, পায়ের সাথে পা, হাঁটুর সাথে হাঁটু ও টাখনুর সাথে টাখনু লাগিয়ে দাঁড়াতাম। (বুখারী, আস-সহীহ ১/২৫৪; আবূ দাউদ, আস-সুনান ১.১৭৮) আল্লাহ্র কসম, তোমরা কাতারগুলি সোজা কর। নইলে আল্লাহ্ তোমাদের অন্তরের মধ্যে বৈপরীত্য ও বিরোধ সৃষ্টি করে দিবেন। (আবূ দাউদ, আস-সুনান ১/১৭৮, সহীহুত তারগীব ১/১২৩। হাদীসটি সহীহ)