প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ-৭ম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৭, রবি আউঃ-রবি সানী ১৪৩৮ হিজরী, পৌষ-মাঘ ১৪২৩বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

একচল্লিশ. বর শ্বশুরালয়ে গেলে শ্যালিকারা তার জুতা লুকিয়ে রেখে টাকা আদায় করে। একে তো চুরি তার উপর আবার পুরস্কার। ঢং করে কারো জিনিস লুকানো হাদীস শরীফে নিষেধ করা হয়েছে। গায়র মুহাররম পুরুষের সাথে হাসি-তামাশা করে মন-খোলা সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্পুর্ন শরীয়তবিরোধী কাজ। তামাশার পুরস্কার প্রদানকে অত্যাবশ্যক মনে করা শরীয়তী বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কোন কোন অঞ্চলে জুতা চুরির রেওয়াজ না থাকলেও পুরস্কার গ্রহণের কুপ্রথাটি বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে। চৌথীর নামে শহরাঞ্চলে রং নিয়ে খেলার যে প্রথা প্রচলিত রয়েছে তা আরো নিন্দনীয়। এক অবর্ণনীয় নির্লজ্জতা এ খেলায় দৃষ্টিগোচর হয়। যে সকল স্বামী তাদের স্ত্রীদেরকে এ খেলা থেকে বিরত রাখতে সচেষ্ট না হন তারা কি ভদ্রজন হতে পারে? উপরন্তু, এ খেলায় কাফেরদের অনুকরণ করার গোনাহ বলাই বাহুল্য।

বিয়াল্লিশ. দুচার দিন পর বরপক্ষ আবার বধূকে শ্বশুরালয়ে নিয়ে যান। এ যাত্রা বহুড়া বলে পরিচিতি। চৌথীতে পালিত সকল কুসংস্কার এ বহুড়ায়ও পালন করা হয়। চৌথীর বর্ণনায় তা আলোচিত হয়েছে।

তেতাল্লিশ. মুহাররম ও শবে-বরাতের সময় নববধূর পিত্রালয়ে অবস্থান করা অপরিহার্য মনে করা হয়। সম্ভবতঃ মুহাররম ও শবে-বরাতকে অকল্যাণকর ধারণা করেই এ রুসূমের প্রবর্তন হয়েছে। (নাউযুবিল্লাহ) অতএব, এ সময় স্বামীগৃহে অবস্থান কুলক্ষুণে। আক্বিদা-বিশ্বাসের বিকৃতি কোন্ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে লক্ষ্য করেছেন?

চুয়াল্লিশ. ঈদের সময় মেয়ের বাড়িতে চাউল, আটা, ময়দা ইত্যাদি পাঠানোর রেওয়াজ রয়েছে। সাথে সাথে বর-কনেকে কাপড়-চোপড়ও দেওয়া হয়ে থাকে। এ কাজকে এতই জরুরি মনে করা হয় যে সুদে ঋণ নিয়ে হলেও তা করতেই হবে। শরীয়তের সীমালঙ্ঘন আর কাকে বলব !

পঁয়তাল্লিশ. এতদ্দেশীয় হিন্দুদের অনুকরণে কোন কোন স্থানে বরের হাতে রঙিন কাগজ বেঁধে দেওয়া হয়। বিজাতীয় অনুকরণের দোষে একাজ নিষিদ্ধ।

ছেচল্লিশ. কোন কোন অঞ্চলে বিয়ের অনুষ্ঠানে আতশবাজী করার রেওয়াজ প্রচলিত আছে। হাদীসে আতশবাজীকে নির্ভেজাল অপব্যয় ও হারাম বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

সাতচল্লিশ. দেশি-বিদেশি বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়ার কথা হাদীসে বর্ণিত আছে।

আটচল্লিশ. বর-কনেকে কোলে করে গাড়ি বা পাল্কী থেকে ঘরে তোলার রেওয়াজ চরম অভদ্রতা।

ঊনপঞ্চাশ. বিয়ের দিন-তারিখ নির্ধারণের বেলায় কোন কোন সময়কে অশুভ ধারণা করা হয়। সময় নির্ধারণ করতে গিয়ে এর প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য করা হয়, যেন তারা যাকে অশুভ মনে করেন আল্লাহ তাআলা তাকে মন্দ কাজের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। (নাউযুবিল্লাহ) আঠার বৎসর বয়সকে অশুভ ধারণা করা হয়। এ বিশ্বাস যেমন শরীয়ত বিরোধী তেমনি অযৌক্তিকও।

মোটকথা, উপরোক্ত কুপ্রথাগুলো অপব্যয়, অহংকার, সুনাম অর্জনের আকাক্সক্ষা, অনাবশ্যককে আবশ্যক করা, কাফেরদের অনুকরণ, সুদে ঋণ গ্রহণ, পর্দাহীনতা, শিরক, বিকৃত আক্বিদা-বিশ্বাস, নামায বা জামাত কাযা হওয়া, পাপ কাজে সহায়তা দান বারংবার পাপে লিপ্ত হওয়া এবং পাপ কাজকে প্রশংসা করা ইত্যাকার গোনাহে পরিপূর্ণ। কোরআন ও হাদীসে এই গোনাহসমূহের স্পষ্ট ভাষায় নিন্দাবাদ করা হয়েছে। নিম্নে তারই সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদান করা হলো।
আল্লাহ জাল্লা-শানুহু এরশাদ করেছেন, অপব্যয় করনা, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা অপব্যয়ীকে পছন্দ করেননা। অন্যত্র বলেছেন, অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই আর শয়তান প্রভুর অকৃতজ্ঞ। হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি অহমিকা প্রকাশক কাজ করবে, আল্লাহ তাআলা তার অহমিকার প্রতিফল দেবেন। আর যে শুনানোর উদ্দেশ্যে কোন কাজ করবে, আল্লাহ্ কিয়ামতে তাকে তার দোষ শুনিয়ে দেবেন।

হাদীসে আরো আছে, তোমরা নিজেদের নামাযে শয়তানের অংশ রেখো না যে, নামায শেষে ডানদিকে ফিরে বসাকে অত্যাবশ্যক মনে করো। এ হাদীস থেকে আমরা এ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি যে, মুস্তাহাব কাজকে অবশ্যকরণীয় হিসাবে পালন করা শয়তানের সন্তুষ্টির কারণ। তত্ত্বজ্ঞানী আলেমগণ বলেন, মুস্তাহাব কাজ সর্বদা করলেই যখন এই অবস্থা, তখন মুবাহ্ কাজ সর্বদা করলে তো আরো অধিক পাপ হবে। আমি জিজ্ঞাসা করি যে একই গোনাহর কাজ সব সময় করে তার কি পরিণতি?

হাদীসে আছে সুদদাতা ও সুদগ্রহীতাকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লানত করেছেন। ঋণ গ্রহণ সম্পর্কে হাদীসে যে সকল কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে তা সকলেই জানেন। অযথা ঋণ গ্রহণ থেকে বিরত থাকার জন্য সেই সকল সতর্কবাণীই যথেষ্ট। হাদীসে আছে, মালিকের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি ছাড়া কারো সম্পদ হালাল হবে না। এ থেকে বুঝা গেল, জোর করে দান গ্রহণ নাজায়েয। অন্য হাদীসে এসেছে, যে দেখে এবং যাকে দেখা হয় উভয়ই আল্লাহর লানতে পড়বে। এ দ্বারা বেপর্দা চলাফেরা করার দূষণীয়তা ও নিষিদ্ধতা প্রমাণিত হয়।

শিরকের অবৈধতা সম্পর্কে সবাই পূর্ণ অবহিত। হাদীসে আছে, নামায পরিত্যাগ করাকে সাহাবায়ে কেরাম (রা.) কুফরী কাজ বলে মনে করতেন। অপর এক হাদীসে আছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার প্রাণ যার হস্তগত সেই সত্তার শপথ, আমার ইচ্ছা হয় প্রথমে লাকড়ী সংগ্রহ করে নিয়ে নামাযের আযান দেওয়াই, অতঃপর যারা জামাতে আসবে না তাদের ঘড়-বাড়ি জ্বালিয়ে দেই। এ হাদীসে জামাতে শামিল না হওয়াকে তীব্রভাবে তিরস্কার করা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন, পাপ ও অন্যায় কাজে তোমরা একে অন্যকে সহায়তা করো না। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, তুমি যদি সৎকাজ করে আনন্দিত হও এবং মন্দ কাজ করে দুঃখিত হও, তাহলে বুঝবে তুমি সাচ্চা ঈমানদার। এ থেকে বুঝা গেল, গোনাহর কাজকে শোভনীয় ও ভদ্রতা মনে করা এবং বারংবার তা করতে থাকা ঈমান বিলুপ্তির পরিচায়ক। এ ধরনের অজ্ঞতাপ্রসূত কুপ্রথা সম্পর্কে হাদীসে কড়া ভাষায় তিরস্কার বাণী উচ্চারিত হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তিন ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার বিরাগ ভাজন হবে। যে ইসলাম গ্রহণ করার পরও জাহেলিয়াতের কুপ্রথাসমূহ পালন করতে আগ্রহী, সে ঐ তিন ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত। এ সম্পর্কিত আরো অসংখ্য হাদীস রয়েছে। কুপ্রথা পালনের দূষণীয়তা সকলের কাছেই পরিষ্কার বিধায় সেগুলোর উল্লেখ এ স্থলে নি¯প্রয়োজন। অতএব, মুসলমানদের কর্তব্যবোধ, ঈমান ও বিবেকের দাবী হচ্ছে, শাস্ত্রীয় ও যৌক্তিক বিবেচনায় এ সকল কুসংস্কার দূষণীয় প্রমাণিত হওয়ার পর পূর্ণ সাহস নিয়ে তা পরিহার করা এবং নাম-বদনামের প্রতি ভ্রক্ষেপ না করা। শত অভিজ্ঞতা থেকে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, আল্লাহর আনুগত্যে সম্মান ও খ্যাতি বৃদ্ধি পায়।

এ কুসংস্কারসমূহের মূলোৎপাটন দুটি পদ্ধতিতে সম্ভব। প্রথমত, গোটা সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে জোর প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরোপের মাধ্যমে দ্বিতীয়ত, সমাজের কুসংস্কার-প্রীতিকে উপেক্ষা করে প্রত্যেকে ব্যক্তিগত ভাবে তা পরিহার করে। এভাবে একজনের দেখাদেখি অন্যান্যরাও তা পরিহার করতে সাহসী ও অনুপ্রাণিত হবে। অল্প দিনের গোটা সমাজে এর আবশ্যক প্রভাব পরিলক্ষিত হবে। এ মহৎ কাজের উদ্যোক্তা মৃত্যুর পরও অনবরত সওয়াব পেতে থাকবে। কেউ কেউ বলেন, যার সামর্থ্য আছে সে করবে আর যার সামর্থ্য নেই সে করবে না। তাদের জবাবে বলবো, সামর্থ্যবানদের পক্ষেও গুনাহের কাজ করা জায়েয নয়। কুসংস্কার পালন অবৈধ প্রমাণিত হবার পর সামর্থ্য-অসামর্থের কোন প্রশ্নই উত্থাপিত হতে পারে না। তাছাড়া, ধনীরা করলে তো তাদের পাড়া-প্রতিবেশী গবীর পারে না। তাছাড়া, ধনীরা করলে তো তাদের পাড়া-প্রতিবেশী গরীব লোকেরাও ইজ্জতের ভয়ে অন্ততঃ তাকে জরুরি মনে করবে। কাজেই সচ্ছলতা-অসচ্ছলতার প্রশ্ন বাদ দিয়ে সবাই একযোগে কুপ্রথা পরিত্যাগ করাটাই জরুরি মনে হয়।

কেউ হয়তো ভাবতে পারেন, সমাজ থেকে এ সকল রীতি-প্রথা উচ্ছেদ করে ফেললে পারস্পরিক হৃদ্যতা ও সৌহার্দভাব বিনষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু হৃদ্যতা বজায় রাখার সুবিধার্থে গুনাহের কাজ করা কি জায়েয হবে? অবশ্যই না। তাছাড়া হৃদ্যতা বজায় রাখতে হলে যে প্রথার অনুসরণ করতেই হবে এমনতো নয়। রুসুম পালন না করেও বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের মাঝে পারস্পরিক আনাগোনা, খাওয়া-দাওয়া, লেনদেন ইত্যাদি স্বাভাবিক নিয়মে চলতে পারে। এসব ছাড়া হৃদ্যতা আর কাকে বলে? ঝগড়া-ফাসাদ, হিংসাবিদ্বেষ, অনুষ্ঠানের আয়োজনের দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধান করা ইত্যাদি না হলে বুদ্ধিপূর্ণ হৃদ্যতা প্রতীয়মান হয় না ?

বিয়ের প্রস্তাবনায় মৌখিক প্রতিজ্ঞাই যথেষ্ট। ঘটক, জামাজোড়া, নিশানী, শিরনী ইত্যাদির কোন প্রয়োজন নেই। একজন খাদেম আর একজন সঙ্গীসহ বরকে দাওয়াত দিয়েই তো বিয়ে পড়িয়ে দেওয়া যায়। বিরাট বরযাত্রী বাহিনী নিয়ে কনের বাড়িতে চড়াও না হয়ে বরং সামনে যে কয়জন আত্মীয়-স্বজনকে পাওয়া যায় তাদের বড়জোর সাথে রাখা চলে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জেহেয হিসাবে দান করা উচিত। তাও আবার ঢাক-ঢোল পিটিয়ে নয় বরং বিনা প্রচারেই বরের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে হবে। বর-কনের শ্বশুরালয়ে ও পিত্রালয়ে যেকোন সময় গমনাগমনে কোন ধরনের প্রথাগত বাধা-বিপত্তি নেই। ওয়ালিমা সুন্নত হলেও তাতে বিশুদ্ধ নিয়ত থাকা চাই। অযথা অপব্যয় ও অহংকার প্রকাশের দুর্বুদ্ধি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে হবে। যে সমস্ত অনুষ্ঠানে কুসংস্কার প্রথা পালন করা হবে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়, দ্বীনদারগণের যেসমস্ত অনুষ্ঠানের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করা উচিত।

উপসংহারে আরেকটি কুপ্রথার প্রতি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তাহলো, মোটা অংকের মোহরানা নির্ধারণের রসূম। এটা হাদীসের খেলাফ। হযরত উমর (রা.) বলেছেন, ‘বড় অংকের মোহর রেখো না। কেননা, তা যদি দুনিয়ার জীবনে সম্মান লাভ বা আল্লাহর ভীতির উপায় হতো তাহলে সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ বিবিকে বা নিজ কন্যাগণকে বার আওকিয়ার বেশি মোহর নির্ধারণ করে দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। তিরিমিযী শরীফ এ হাদীসখানা উদ্ধৃত হয়েছে।

কেউ কেউ বলেন, বর যাতে স্ত্রীকে তালাক না দেয় সেইজন্যই বেশি করে মোহর রাখা প্রয়োজন। এ অজুহাত সম্পূর্ণ অমূলক। যে ছাড়ার সে ছেড়েই দেবে, ছাড়লে কি হবে সেটা সে চিন্তা করেনা। আর যে ‘স্ত্রী মোহর দাবী করবে’ এই ভয়ে তালাক না দেয় সেতো স্ত্রীকে আরো বেশি যাতনা দেয়। তার হক্বও আদায় করে না, তালাক দিয়ে অন্যত্র বিয়ে বসতেও দেয় না। আসল কথা হচ্ছে, নিজেকে বিরাট প্রতিপত্তিশালী প্রতিপন্ন করার লক্ষ্যেই মোটা অংকের মোহর ধার্য করা হয়। অহংকার প্রকাশের উদ্দেশ্যে মুবাহ কাজ করাও হারাম, আর সুন্নতবিরোধী কাজ হলে তা কথাই নেই। পরিশোধ করার সামর্থ্য আছে কিনা সেদিকে লক্ষ্য রেখেই মোহর নির্ধারণ করতে হবে।