প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৬ষ্ঠ সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৬, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৭-৩৮ হিজরী, অগ্রহায়ন-পৌষ ১৪২৩বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

নাম উবাই, ডাকনাম আবুর মুনজির ও আবুত তুফাইল। (আল-আলাম)-১/৭৮; আল-ইসাবা-১/১৯) সায়্যিদুল কুররা, সায়্যিদুল আনসার প্রভৃতি তার লকব বা উপাধি। মদীনার খাযরাজ গোত্রের নাজ্জার শাখার সন্তান। পিতার নাম কা’ব ইবনকাউস, মাতার নাম সুহাইলা। তিনি বনী আদী ইবন নাজ্জারের কন্যা এবং প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু তালহা আল-আনসারীর ফুফু। সুতরাং উবাই, আবু তালহার ফুফাতো ভাই। উবাইর আবুল মুনজির কুনিয়াতটি খোদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দান করেন এবং দ্বিতীয় কুনিয়াতটি হযরত উমার (রা.) তার ছেলে তুফাইলের নাম অনুসারে আবুত তুফাইল রাখেন। তার জন্মের সঠিক সন-তারিখ জানা যায় না।

হযরত উবাইয়ের প্রথম জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। তবে হযরত আনাস ইবন মালকের বর্ণনায় এতটুকু জানা যায় যে, ইসলাম-পূর্ব জীবনে তিনি মদ পানে আসক্ত ছিলেন। হযরত আবু তালহার মদ পানের আড্ডার তিনি ছিলেন একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তাকে মদীনার অন্যতম ইয়াহুদী ধর্মগুরু বলে গণ্য করা হতো। প্রাচীন আসমানী কিতাব সমূহেও তার জ্ঞান ছিল। সে যুগে লেখা-পড়ার তেমন প্রচলন ছিল না তা সত্ত্বেও তিনি লিখতে পড়তে জানতেন। এ কারণে ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করেন এবং কুরআনের অন্যতম লেখকে পরিণত হন। (আল-আ’লাম-১/৭৮)

মদীনায় ইয়াহুদীদের যথেষ্ট ধর্মীয় প্রভাব ছিল। ইসলাম-পূর্ব জীবনে তিনি তাওরাতসহ অন্যান্য যে সকল ধর্মীয় গ্রন্থ পড়েছিলেন, মূলতঃ সেই জ্ঞানই তাকে ইসলামের দিকে টেনে আনে। যে সকল মদীনাবাসী মক্কায় গিয়ে সর্বশেষ আকাবায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে বাই’য়াত করেন তিনিও তাদের একজন। আর এখান থেকেই তার ইসলামী জীবনের সূচনা। (আল-ইসাবা-১/১৯)

হিজরাতের পর হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশারা মুবাশ্শারার অন্যতম সদস্য হযরত সাঈদ ইবন যায়িদের সাথে উবাইয়ের মুওয়াখাত বা ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৫০৫) বালাজুরীর মতে, তালহা ইবন উবাইদুল্লাহর সাথে তার ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। (আনসাবুল আশরাফ-১/২৭১)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমনের পর হযরত আবু আইউব আল-আনসারীর বাড়িতে অতিথি হন। তবে একটি বর্ণনা মতে, তার বাহন উটনীটি উবাই ইবন কাবের বাড়িতে থাকে। (আনসাবুল আশরাফ-১/২৬৭)

হযরত উবাই বদর থেকে নিয়ে তায়িফ অভিযান পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় যত যুদ্ধ হয়েছে তার প্রত্যেকটিতে যোগদান করেন। (আল-ইসাবা-১/১৯; আল-আ’লাম-১/৭৮) কুরাইশরা বদরে পরাজিত হয়ে মক্কায় ফিরে প্রতিশোধ নেওয়ার তোড়জোড় শুরু করে দেয়। উহুদ যুদ্ধের প্রাক্কালে মক্কায় অবস্থানকারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা হযরত আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব গোপনে বনী গিফার গোত্রের এক লোকের মাধ্যমে একটি পত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পাঠান। সেই পত্রে তিনি কুরাইশদের সকল গতিবিধি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবহিত করেন। লোকটি মদীনার উপকণ্ঠে কুবায় পত্রখানি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট হস্তান্তর করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পত্রখানা সেখানে উবাই ইবন কা’বের দ্বারা পাঠ করিয়ে শোনেন এবং পত্রের বিষয় গোপন রাখার নির্দেশ দেন। (আসাবুল আশরাফ-১/৩১৪)

এই উহুদ যুদ্ধে শত্রু পক্ষের নিক্ষিপ্ত তীরের আঘাতে তিনি আহত হন। হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার চিকিৎসার জন্য একজন চিকিৎসক পাঠান। চিকিৎসক তার রগ কেটে সেই স্থানে সেঁক দেয়।

উহুদ যুদ্ধের শেষে হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহত-নিহতদের খোঁজ-খবর নেওয়ার নির্দেশ দিলেন। এক পর্যায়ে তিনি বললেনঃ তোমাদের কেউ একজন সা’দ ইবন রাবী’র খোঁজ নাও তো। একজন আনসারী সাহাবী তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় শহীদদের লাশের স্তূপ থেকে খুঁজে বের কলেন। কোন কোন বর্ণনা মতে এই আনসারী সাহাবী হরেন উবাই ইবন কা’ব। (হায়াতুস সাহাবা-২/৯৫)

খন্দক যুদ্ধের প্রাক্কালে মক্কার কুরাইশ নেতা আবু সুফইয়ান, আবু ইসামা আল জাশামীর মারফত একটি চিঠি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পাঠান। সেই চিঠিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাইয়ের দ্বারা পাঠ করান। (আনসাবুল আশরাফ-১/৩৭০) তেমনিভাবে হিজরী ২য় সনের রজব মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ আল-আসাদীর নেতৃত্বে একটি বাহিনী নাখলা অভিমুখে পাঠান। যাত্রাকালে তিনি আবদুল্লাহর হাতে একটি সীলকৃত চিঠি দিয়ে বলেনঃ দুই রাত একাধারে চলার পর চিঠিটি খুলে পাঠ করবে এবং এর নির্দেশ মত কাজ করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই চিঠিটি উবাইয়ের দ্বারা লেখান। (আনসাবুল আশরাফ-১/৩৭১)

হিজরী ৯ম সনে যাকাত ফরজ হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে যাকাত আদায়কারী নিয়োগ করেন। তিনি উবাইকে বালী, আজরা এবং বনী সাদ গোত্রে যাকাত আদায়কারী হিসেবে পাঠান। তিনি অত্যন্ত দ্বীনদারী ও সততার সাথে এই দায়িত্ব পালন করেন। একবার এক জনবসতিতে গেলেন যাকাত আদায় করতে। নিয়ম অনুযায়ী এক ব্যক্তি তার সকল গবাদিপশু উবাইয়ের সামনে হাজির করে, যাতে তিনি যেটা ইচ্ছা গ্রহণ করতে পারেন। উবাই উটের পাল থেকে দুই বছরের একটি বাচ্চা গ্রহণ করেন। যাকাত দানকারী বললেনঃ এতটুকু বাচ্চা নিয়ে কি হবে? এতো দুধও দেয় না, আরোহনেরও উপযোগী নয়। আপনি যদি নিতে চান এই মোটা তাজা উটনীটি নিন। উবাই বললেনঃ আমার দ্বারা সম্ভব নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশের বিপরীত আমি কিছুই করতে পারি না। মদীনা তো এখান থেকে খুব বেশি দূর না, তুমি আমার সাথে চলো, বিষয়টি আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানাই। তিনি যা বলবেন, আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করবো। লোকটি রাজী হলো।

সে তার উটনী নিয়ে উবাইয়ের সাথে মদীনায় উপস্থিত হলো। তাদের কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এই যদি তোমার ইচ্ছা হয় তাহলে উটনী দাও, গ্রহণ করা হবে। আল্লাহ তোমাকে এর প্রতিদান দিবেন। লোকটি সন্তুষ্টচিত্তে উটনীটি দান করে বাড়ি ফিরে গেল। (মুসনাদ-৫/১৪২, কানযুল ’উম্মাল-৩/৩০৯, হায়াতুস সাহাবা-১/১৫১)

হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পর হযরত আবু বক্কার (রা.) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময় পবিত্র কুরআনের সংগ্রহ ও সংকলনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু হয়। সাহাবা-ই-কিরামের যে দলটির ওপর এই দায়িত্ব অর্পিত হয়, উবাই ছিলেন তাদের নেতা। তিনি কুরআনের শব্দাবলী উচ্চারণ করতেন, আর অন্যরা লিখতেন। এই দলটির সকলেই ছিলেন উঁচু স্তরের আলিম। এই কারণে মাঝে মধ্যে কোন কোন আয়াত সম্পর্কে তাদের মধ্যে আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক হতো। যখন সূরা আত-তাওবার ১২৭ নং আয়াতটি লেখা হয় তখন দলের অন্য সদস্যরা বললেন, এই আয়াতটি সর্বশেষ নাযিল হয়েছে। হযরত উবাই বললেনঃ না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরে আরও দু’টি আয়াত আমাকে শিখিয়েছিলেন। সূরা আত-তাওবার ১২৮ নং আয়াতটি সর্বশেষ নাযিল হয়েছে। (মুসনাদ-৫/১৩৪)

হযরত আবু বকরের (রা.) ইনতিকালের পর হযরত ’উমার (রা.) তার স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি তার খিলাফতকালে অসংখ্য জনকল্যাণ ও সংস্কারমূলক কাজের প্রবর্তন করেন। মজলিসে শূরা তার মধ্যে একটি। বিশিষ্ট মুহাজির ও আনসার ব্যক্তিবৃন্দের সমন্বয়ে এই মজলিস গঠিত হয়। খাযরাজ গোত্রের প্রতিনিধি হিসেবে উবাই এই মজলিসের সদস্য ছিলেন। (কানযুল উম্মাল-৩/১৩)

হযরত উমারের খিলাফতকালের গোটা সময়টা তিনি মদীনায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে কাটান। বেশির ভাগ সময় অধ্যয়ন ও শিক্ষাদানে ব্যয় করেন। যখন মজলিসে শূরার অধিবেশন বসতো বা কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপস্থিত হতো খলিফা উমার (রা.) তার যুক্তি ও পরামর্শ গ্রহণ করতেন।

হযরত উমরের (রা.) খিলাফতকালের পুরা সময়টা তিনি ইফতার পদে আসীন ছিলেন। এছাড়া অন্য কোন পদ তিনি লাভ করেননি। একবার উমারকে (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, আপনি আমাকে কোন এক স্থানের ওয়ালী (শাসক) নিযুক্ত করেন না কেন? ’উমার (রা.) বললেনঃ আমি আপনার দ্বীনকে দুনিয়ার দ্বারা কলুষিত হতে দেখতে চাই না। (কানযুল উম্মাল-৩/১২৩) হযরত উমার (রা.) যখন তারাবীহর নামায জামায়াতের সাথে আদায়ের প্রচলন করেন তখন উবাইকে ইমাম মনোনীত করেন। (বুখারীঃ কিতাবু সালাতিত তারাবীহ) উমার যেমন তাকে সম্মান করতেন তেমনি ভয়ও করতেন। তার কাছে ফাতওয়া চাইতেন।

খলিফা উমারের (রা.) বাইতুল মাকদাস সফরে উবাই তার সফরসঙ্গী ছিলেন। খলিফার ঐতিহাসিক জাবিয়া ভাষণের সময় উপস্থিত ছিলেন। বাইতুল মাকদাসের অধিবাসীদের সাথে হযরত উমার (রা.) যে সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করেন তার লেখক ছিলেন হযরত উবাই। (আল-আ’লাম-১/৭৮; সিফাতুস সাফওয়া-১/১৮৮)

উমারের পর হযরত উসমানের (রা.) সময় খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলে কুরআন মজীদের তিলাওয়াত ও উচ্চারণে বিভিন্নতা ছড়িয়ে পড়ে। খলিফা উসমান (রা.) শঙ্কিত হয়ে পড়লেন। তিনি এই বিভিন্নতা দূর করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। তিনি শ্রেষ্ঠ ক্বারীদের ডেকে পৃথকভাবে তাদের তিলাওয়াত শুনলেন। উবাই ইবন কা’ব, ’আবদুল্লাহ ইবন ’আব্বাস এবং মু’য়াজ ইবন জাবাল-প্রত্যেকেরই উচ্চারণে কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করলেন। অতঃপর তিনি বললেন, সকল মুসলমানকে একই উচ্চারণের কুরআনের ওপর ঐক্যবদ্ধ করতে চাই।

সেই সময় কুরাইশ ও আনসারদের মধ্যে ১২ ব্যক্তি সম্পূর্ণ কুরআনে দক্ষ ছিলেন। খলিফা উসমান এই ১২ জনের ওপর এই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন। আর এই পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব দান করেন উবাই ইবন কাবকে। তিনি শব্দাবলী উচ্চারণ করতেন, যায়িদ ইবন সাবিত লিখতেন। আজ পৃথিবীতে যে কুরআন বিদ্যমান তা মূলতঃ হযরত উবাইয়ের পাঠের অনুলিপি। (কানযুল উম্মাল-১/২৮২, ২৮৩)

হযরত উবাইয়ের মৃত্যু সন নিয়ে বিস্তর মতভেদ আছে। সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে হযরত উসমানের (রা.) খিলাফতকালে হিজরী ৩৯ সনের এক জুম’আর দিনে তিনি ইনতিকাল করেন। হযরত উসমান তার জানাযার নামায পড়ান এবং মদীনায় দাফন করা হয়। হাইসাম ইবন আদী ও অন্যদের মতে তিনি হিজরী ১৯ সনে মদীনায় মারা যান। আর ওয়াকিদী, মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ প্রমুখের মতে তার মৃত্যু হয় হিজরী ২২ সনে। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৭; শাজারাতুজ জাহাব-১/৩১) তবে বিভিন্ন বর্ণনা মাধ্যমে খলিফা উসমানের খিলাফতকালে বিভিন্ন কর্মকান্ডে তার শরীক হওয়ার কথা জানা যায়। অতএব হিজরী ৩৯ সনে তার মৃত্যুর মতটি সঠিক বলে মনে হয়।

হযরত উবাইয়ের সন্তানদের সঠিক সংখ্যা জানা যায় না। তবে যে সকল সন্তানদের নাম জানা যায় তারা হলেনঃ ১. তুফাইল, ২. মুহাম্মাদ, ৩. রাবী, ৪. উম্মু উমার। প্রথমোক্ত দুইজন হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় জন্মগ্রহণ করেন। তার স্ত্রীর ডাকনাম উম্মু তুফাইল। তিনি সাহাবিয়্যা ছিলেন। হাদীস বর্ণনাকারী মহিলা সাহাবীদের নামের তালিকায় তার নামটিও দেখা যায়।

হযরত উবাইয়ের দৈহিক গঠন ছিল মধ্যম আকৃতির হালকা-পাতলা ধরনের। গায়ের রং ছিল উজ্জ্বল গৌর বর্ণের। বার্ধক্যে মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু খিযাব লাগাতেন না। (আল-ইসাবা-১/১৯; আল-আ’লাম-১/৭৮; তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৭) স্বভাব ছিল একটু সৌখিন প্রকৃতির। বাড়িতে গদীর ওপর বসতেন। ঘরের দেওয়ালে আয়না লাগিয়েছিলেন এবং সেইদিকে মুখ করে নিয়মিত চিরুনী করতেন। একটু রুক্ষ প্রকৃতির ছিলেন। সাধারণতঃ স্বভাববিরোধী কোন কথা শুনলেই রেগে যেতেন। হযরত ’উমারের স্বভাবও ছিল একই রকম। এই কারণে মাঝে মাঝে তাদের দুইজনের মধ্যে ঝগড়া হয়ে যেত। বিভিন্ন বর্ণনায় এমন বহু ঝগড়ার কথা জানা যায়।

একবার হযরত উবাই এক ব্যক্তিকে একটি আয়াত শেখালেন। হযরত উমার (রা.) লোকটির মুখে আয়াতটির পাঠ শুনে জিজ্ঞেস করেন, তুমি এ পাঠ কার কাছে শিখেছ? লোকটি উবাইয়ের নাম বললে হযরত উমার লোকটিকে সঙ্গে করে উবাইয়ের বাড়িতে উপস্থিত হন এবং আয়াতটি সম্পর্কে জানতে চান। ’উবাই বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ থেকে এভাবেই শিখেছি। হযরত ’উমার আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য আবার জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ থেকে শিখেছেন ? উবাই বললেনঃ হ্যাঁ। হযরত উমার (রা.) প্রশ্নটির পুনরাবৃত্তি করেন। এবার উবাই ক্ষেপে যান। তিনি বলেনঃ আল্লাহর কসম! আল্লাহ তা’য়ালা এই আয়াতটি জিবরীলের (আ.) মাধ্যমে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তকরণে নাযিল করেন। এই ব্যাপারে খাত্তাব ও তার ছেলের সাথে পরামর্শ করার প্রয়োজন বোধ করেননি। এ কথা শুনে হযরত ’উমার (রা.) কানে হাত দিয়ে তাকবীর পড়তে পড়তে তার ঘর থেকে বেরিয়ে যান। (কানযুল উম্মাল-১/২৮৭)

হযরত হাসান থেকে বর্ণিত! উবাই ইবন কাবের একটি আয়াতের তিলাওয়াতের সাথে ’উমার ইবন খাত্তাব দ্বিমত পোষণ করলেন। উবাই তাকে বললেনঃ আপনি যখন বাকীর বাজারে কেনা-বেচা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন আমি তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে আয়াতটি শুনেছি। উমার বললেনঃ সত্যি কথা বলেছেন। কে সত্য বলে আমি শুধু তাই পরীক্ষা করতে চেয়েছি। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছেঃ উবাই সূরা আল-মায়িদার ১০৭ নং আয়াতটি তিলাওয়াত করলে উমার বললেনঃ মিথ্যা বলছেন। উবাই বললেনঃ আপনি অধিকতর মিথ্যাবাদী। এক ব্যক্তি বললোঃ আপনি আমীরুল মুমিনীনকে মিথ্যাবাদী বললেন? উবাই বললেনঃ আমি আমীরুল মুমিনীনকে তোমার থেকে বেশি সম্মান করি; কিন্তু তাকে আমি কিতাবুল্লাহর তাসদীক বা প্রত্যায়নের ব্যাপারে মিথ্যাবাদী বলেছি। অর্থাৎ কিতাবুল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশের ব্যাপারে আমি তাকে সত্যবাদী বলে স্বীকার করিনি। (কানযুল ’উমার-১/২৮৫; হায়াতুস সাহাবা-১/৭৪)

হযরত আবু দারদা (রা.) একবার শামের অধিবাসীদের বিরাট একটি দলকে কুরআন শিখানোর জন্য মদীনায় নিয়ে আসেন। তারা হযরত উবাইয়ের নিকট কুরআন শিখেন। একদিন তাদের একজন হযরত উমারের সামনে কুরআন পাঠ করেন। ’উমার তার ভুল ধরেন। লোকটি বলে, আমাকে তো উবাই এভাবে শিখিয়েছেন। উমার তার সঙ্গে একজন লোক দিয়ে বলেনঃ যাও, উবাইকে ডেকে নিয়ে এসো। তারা উবাইয়ের বাড়িতে গিয়ে দেখেন তিনি উটকে খাবার দিচ্ছেন। তারা বললেনঃ আমীরুল মুমিনীন আপনাকে ডেকেছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কী কাজে? তারা ঘটনাটি খুলে বললো। তিনি তাদের ওপর ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে বললেনঃ তোমরা কি ক্ষ্যান্ত দিবে না? রাগের চোটে সেই উটের খাবার হাতে নিয়েই ’উমারের কাছে ছুটে যান। উমার তার ও যায়িদ ইবন সাবিতের নিকট থেকে আয়াতটি শোনেন। দুইজনের পাঠে কিছু তারতম্য ছিল। হযরত ’উমার যায়িদের পাঠ সমর্থন করেন। এতে উবাই ক্ষেপে গিয়ে বলেনঃ আল্লাহর কসম! ’উমার! আপনার ভালো জানা আছে, আমি যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট অন্দরে থাকতাম আর আপনারা তখন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। আজ আমার সাথে এমন আচরণ করছেন। আল্লাহর কসম! আপনি যদি বলেন, আমি ঘরেই বসে থাকবো। আমরণ কারও সাথে কথা বলবো না, কাউকে কুরআনও শিখাবো না। ’উমার বললেনঃ এমন করবেন না। আল্লাহ আপনাকে যে ইলম দান করেছেন, আপনি অতি আগ্রহের সাথে তা শিখাতে থাকুন। (কানযুল উম্মাল-১/২৮৫)

স্বভাবগতভাবেই হযরত উবাই ছিলেন একটু স্বাধীনচেতা ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন। একবার হযরত ইবন আব্বাস (রা.) মদীনার একটি গলি দিয়ে কুরআনের একটি আয়াত তিলাওয়াত করতে করতে যাচ্ছেন। এমন সময় তিনি শুনতে পেলে, পিছন থেকে কেউ যেন তাকে ডাকছে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখেন , উমার। কাছে এসে ইবন ’আব্বাসকে বললেনঃ তুমি আমার দাসকে সঙ্গে নিয়ে উবাই ইবন কাবের নিকট যাবে এবং তাকে জিজ্ঞেস করবে যে, তিনি কি অমুক আয়াতটি এভাবে পড়েছেন? ইবন আব্বাস উবাইয়ের গৃহে পৌঁছুলেন এবং পরপরই উমারও সেখানে হাজির হলেন। অনুমতি নিয়ে তারা ভিতরে প্রবেশ করলেন । উবাই তখন দেওয়ালের দিকে মুখ করে মাথার চুল ঠিক করছিলেন। উমারকে গদীর ওপর বসানো হলো। উবাইয়ের পিঠ ছিল উমারের দিকে এবং সেই অবস্থায়ই বসে থাকলেন, পিছনে তাকালেন না। কিছুক্ষণ পর বললেনঃ আমীরুল মুমিনীন, স্বাগত! আমার সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে না অন্য কোন প্রয়োজনে এসেছেন? উমার বললেনঃ একটি কাজে এসেছি। অতঃপর একটি আয়াত তিলাওয়াত করে বলেন এর উচ্চারণ তো খুব কঠিন। উবাই বললেনঃ আমি কুরআন তার নিকট থেকেই শিখেছি, যিনি জিবরীলের নিকট থেকে শিখেছিলেন। এ তো খুব সহজ ও কোমল। উমার বললেনঃ আমি সন্তুষ্ট হতে পারলাম না।

হযরত উমারের (রা.) খিলাফতকালে একবার একটি বাগিচা নিয়ে খলিফা ও উবাইয়ের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি হলো। উবাই কাঁদতে কাঁদতে অভিযোগ করলেন, আপনার খিলাফতকালে এমন কর্ম? উমার বললেনঃ আমি তো এমনটি চাইনি। মুসলমানদের মধ্যে যার কাছে ইচ্ছা, আপনি বিচার চাইতে পারেন। তাতে আমার কোন আপত্তি নেই। উবাই বিচারক মানলেন যায়িদ ইবন সাবিতকে (রা.)। উমার রাজী হলেন। হযরত যায়িদের এজলাসে মুকাদ্দামার শুনানীর দিন ধার্য হলো। নির্ধারিত দিনে খলিফাতুল মুসলিমীন এজলাসে হাজির হলেন। তিনি উবাইয়ের দাবি অস্বীকার করলেন এবং উবাইকে লক্ষ্য করে বললেনঃ আপনি ভুলে গেছেন, একটু চিন্তা করে মনে করার চেষ্টা করুন। উবাই বললেনঃ এখন আমার কিছুই স্মরণে আসছে না। তখন হযরত উমার ঘটনাটির পূর্ণ চিত্র উবাইয়ের সামনে তুলে ধরেন। বিচারক যায়িদ উবাইকে বললেনঃ আপনার কোন প্রমাণ আছে কি? তিনি বললেন, না। যায়িদ বললেনঃ তাহলে আপনি আমীরুল মুমিনীনকে কসম দিতে বাধ্য করবেন না। তখন হযরত ’উমার বললেনঃ আমার ওপর কসম অপরিহার্য হলে কসম দিতে আমার কোন আপত্তি নেই। (কানযুল উম্মাল-৩/১৮১-১৮৪; হায়াতুস সাহাবা-১/৯৪)

একবার একব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললো, অমুক তার পিতার স্ত্রীর (সৎমা) সাথে সহবাস করে। উবাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলে উঠলেনঃ আমি এমন ব্যক্তির গর্দান উড়িয়ে দিতাম। একথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটুু মৃদু হেসে বললেনঃ উবাই কতই না আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। তবে আমি তার চেয়েও বেশি আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী। আর আল্লাহ আমার চেয়েও বেশি আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী। (হায়াতুস সাহাবা-১/৬৩৮)
হযরত উবাই ইবন কাবের পবিত্র জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত জ্ঞান চর্চার জন্য নিবেদিত ছিল। মদীনার আনসার-মুহাজিরগণ যখন ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিকাজ নিয়ে দারুণ ব্যস্ত থাকতো, হযরত উবাই তখন মসজিদে নববীতে কুরআন-হাদীসের জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার পঠন-পাঠনে সময় অতিবাহিত করতেন। আনসারদের মধ্যে তার চেয়ে বড় কোন ‘আলিম’ কেউ ছিলেন না। আর কুরআন বুঝার দক্ষতা এবং হিফ্জ ও কিরআতে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে তার শ্রেষ্ঠত্ব ছিল সর্বজন স্বীকৃত। খোদ রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাঝে মাঝে তার নিকট থেকে কুরআন তিলাওয়াত শুনতেন।

ইসলামী জ্ঞান ছাড়া প্রাচীন আসমানী কিতাবের জ্ঞানেও ছিল তার সমান দক্ষতা। তাওরাত ও ইনজীলে আলিম ছিলেন। অতীতের আসমানী গ্রন্থসমূহে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে যে সকল ভবিষ্যদ্বাণী ও সুসংবাদ ছিল সে বিষয়ে তিনি ছিলেন একজন বিশেষজ্ঞ। তার এই পা-িত্যের কারণে হযরত ফারুকে আজম তাকে খুবই সমীহ ও সম্মান করতেন। এমন কি তিনি নিজেই বিভিন্ন মাসয়ালার সমাধান জানার জন্য সময়-অসময়ে তার গৃহে যেতেন।

ইসলামের ইতিহাসে গভীর জ্ঞান ও অসাধারণ মনীষার জন্য হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) হিবরুল উম্মাত নামে খ্যাত। তিনিও হযরত উবাইয়ের হালকা-ই-দারসে উপস্থিত হওয়াকে গৌরবজনক বলে মনে করতেন। তার এই ফজীলাত ও মর্যাদা ছিল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে অর্জিত জ্ঞানের কারনেই। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে এত বেশি পরিমাণ জ্ঞান অর্জন করেছিলেন যে, অন্য কারও নিকট জ্ঞানের জন্য যাওয়ার প্রয়োজন তার ছিল না। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে একমাত্র আবু বকর (রা.) ছাড়া তার সমকক্ষ আর কেউ ছিলেন না।

হযরত উবাই (রা.) বিভিন্ন শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। তবে বিশেষভাবে কুরআন, তাফসীর, শানে নুযুল, নাসিখ-মানসুখ, হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্রে ছিলেন ইমাম ও মুজতাহিদ। একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা বলতো কুরআনের শ্রেষ্ঠতম আয়াত কোনটি? বললেনঃ আয়াতুল কুরসী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দারুণ খুশী হলেন এবং বললেন উবাই, এই ইলম তোমাকে খুশী করুক।

উপরোক্ত ঘটনা দ্বারা বুঝা যায় তিনি কুরআনের আয়াত নিয়ে কতখানি চিন্তা-ভাবনা করতেন। একবার এক ব্যক্তি উবাইকে বললো, আমাকে কিছু নসীহত বা উপদেশ দান করুন। তিনি বললেনঃ কুরআনকে পথের দিশারী মানবে, তার বিধি-নিষেধ ও সিদ্ধান্ত সমূহের ওপর রাজী থাকবে। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের জন্য এই জিনিসটিই রেখে গেছেন। তাতে আছে তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তীদের কথা এবং যা কিছু তোমাদের পরে হবে, সব কিছুই। (তাজকিরাতুল হুফফাজ-১/১৭; আয়াতুস সাহাবা-৩/৫১৮)

উল্লেখিত মতামত দ্বারা উবাই মূলতঃ এই কথাগুলোই প্রকাশ করেছেনঃ
১. কুরআন ইসলামের পূর্ণ জীবন বিদান।
২. কুরআন মুসলমানদের সর্বোত্তম জীবন বিধান।
৩. কুরআনের সকল কাহিনী ও বর্ণনা শিক্ষা ও উপদেশমূলক।
৪. এতে সকল জাতি-গোষ্ঠীর মোটামুটি আলোচনা এসেছে।

কোন ব্যক্তি যদি এইভাবে কুরআনকে দেখে তাহলে তার জ্ঞানের পরিধি যে কত বিস্তৃত, গভীর ও সূক্ষ্ম হয় তা সহজেই অনুমান করা যায়।

ইসলাম গ্রহণের পর থেকেই হযরত উবাই কুরআনের সাথে অস্বাভাবিক প্রীতির সম্পর্ক গড় তোলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমনের পর অহী লেখার সর্বপ্রথম গৌরব তিনিই অর্জন করেন। (আল-ইসাবা-১/১৭) তখন থেকেই তার মধ্যে কুরআন হিফ্জ করার প্রবণতা দেখা দেয়। যতটুকু কুরআন অবতীর্ণ হতো তিনি হিফ্জ করে ফেলতেন। এভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় সমগ্র কুরআন হিফ্জ শেষ করেন। আনসারদের যে পাঁচ ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় সম্পূর্ণ কুরআন হিফ্জ করেন তাদের মধ্যে উবাইয়ের স্থান ছিল সর্বোচ্চ। (আয়াতুস সাহাবা-৩/১৯৫) মদীনার খাযরাজ গোত্রের লোকেরা গর্ব করে বলতোঃ আমাদের গোত্রের চার ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় সমগ্র কুরআন সংগ্রহ করেনি। তাদের অন্যতম হলেন উবাই ইবন কা’বা (হায়াতুস সাহাবা-১/১৯৫)

হযরত উবাই পবিত্র কুরআনের প্রতিটি হরফ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র মুখ থেকে শুনে হিফ্জ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও অত্যধিক আগ্রহ দেখে তার শিক্ষার প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সীমাহীন শ্রদ্ধা ও ভীতির কারণে অনেক বিশিষ্ট সাহাবী অনেক সময় তার কাছে প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকতেন, কিন্তু উবাই নিঃসংকোচে যা ইচ্ছা তাই প্রশ্ন করতেন। তার এই আগ্রহের কারণে রাসূলও সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাঝে মাঝে প্রশ্ন করার আগেই তাকে অনেকে কথা বলে দিতেন। একবার তাকে বললেনঃ আমি তোমাকে এমন একটি সূরার কথা বলছি, তাওরাত ও ইনজীলে যার সমকক্ষ কোন কিছু নেই। এমন কি কুরআনেও এর মত দ্বিতীয়টি নেই। এতটুকু বলে তিনি অন্য কথায় চলে গেলেন। উবাই বলেন, আমার ধারণা ছিল তিনি বলে দিবেন, কিন্তু তা না বলে বাড়ি যাওয়ার জন্য উঠে পড়লেন। আমিও পিছনে পিছনে চললাম। এক সময় তিনি আমার হাত মুট করে ধরে কথা বলতে আরম্ভ করলেন এবং বাড়ির দরজা পর্যন্ত পৌঁছলেন। তখন আমি সেই সূরাটির নাম বলার জন্য আরজ করলাম। তিনি সূরাটির নাম আমাকে বলে দিলেন। (মুসনাদ-৫/১১৪)

একবার হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামায পড়ালেন এবং একটি আয়াত ভুলে বাদ পড়ে গেল। হযরত উবাই মাঝখানে নামাযে শরীক হন। নামায শেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্ন করলেন, তোমাদের কেউ কি আমার কিরাআতের প্রতি মনোযোগী ছিলে? লোকেরা কেউ কোন জবাব দিল না। তিনি আবার জানতে চাইলেন, উবাই ইবন কাব আছ কি? আর কেউ হয়তো এইদিকে মনোযোগী হবে না। (মুসনাদ-৫/১২৩, ১৪৪)

উপরোক্ত ঘটনা দ্বারা একথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, কোন বিষয় হযরত উবাইয়ের বোধগম্য না হলে অন্য সাহবীদের মত চুপ থাকতেন না, বরং বিষয়টি নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাতে আলোচনা করতেন এবং বুঝে আসার পরই উঠতেন। একবার মসজিদে নববীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাস’উদ (রা.) একটি আয়াত পাঠ করলেন। যেহেতু তিনি ছিলেন হুজায়ল গোত্রের লোক, এ কারণে তার উচ্চারণে একটু ভিন্নতা ছিল। হযরত উবাই তার পাঠ শুনে প্রশ্ন করেনঃ আপনি এই আয়াত কার কাছে শিখেছেন? আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আয়াতটির পাঠ এভাবে শিখেছি। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ বললেনঃ আমাকেও তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিখিয়েছেন। উবাই বলেন, সেই সময় আমার অন্তরে ভ্রান্ত ধারণার প্রবাহ বয়ে যেতে লাগলো। আমি ইবন মাস’উদকে সঙ্গে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে হাজির হয়ে আরজ করলামঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার ও তাঁর কুরআন পাঠে তারতম্য দেখা দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার পাঠ শুনলেন এবং বললেনঃ তুমি ঠিক পরেঢ়। তারপর ইবন মাস’উদের পাঠ শুনে বললেন তুমিও ঠিক পড়েছ। আমি হাত দিয়ে ইশারা করে বললামঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! দুইজনের পাঠই সঠিক হয় কি করে? এতক্ষণে হযরত উবাই ঘেমে একাকার হয়ে গেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অবস্থা দেখে তার বুকের ওপর হাত রেখে বললেনঃ হে আল্লাহ! উবায়ের সংশয় দূর করে দাও। পবিত্র হাতের স্পর্শে তার হৃদয়ে পূর্ণ প্রত্যয় নেমে আসে।

কিরায়াত শাস্ত্রে হযরত উবাই ছিলেন একজন বিশেষজ্ঞ। এই বিষয়ে তিনি এত পারদর্শী ছিলেন যে, স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রশংসা করেছেন। সাহাবা-ই-কিরামের মধ্যে কতিপয় ব্যক্তির বিশেষত্ব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সেইসব মহান ব্যক্তির একজন হযরত উবাই। তার সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন আকরাহুম উবাই- তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্বারী উবাই। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৬) মাসরূক থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ইবন মাসউদ, উবাই ইবন কা’ব, মু’য়াজ ইবন জাবাল ও সালিম মাওলা আবী হুজাযফা-এই চারজনের নিকট থেকে কুরআনের জ্ঞান অর্জন করবে। (আনসারুল আশরাফ-১/২৬৪)

হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইনতিকালের পর হযরত উমার (রা.), উবাই সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব বাণী অনেকবার মানুষকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেন। একবার মসজিদে নববীর মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলেন উবাই সবচেয়ে বড় ক্বারী। সিরিয়া সফরের সময় ‘জাবিয়া’ নামক স্থানের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি আর একবার বলেনঃ তোমাদের কেউ কুরআন শিখতে চাএল সে যেন উবাইয়ের কাছে আসে। (মুসনাদ-৫/১২৩, হায়াতুস সাহাবা-৩/২০১) হযরত ’উমার তাকে সায়্যিদুল মুসলিমীন নামে আখ্যায়িত করেছেন। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৫১৯; তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৭, আল-ইসাবা-১/১৯)

হযরত রাসূলৈ কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে উবাইকে কুরআন তিলাওয়াত করে শুনাতেন। যে বছর তিনি ইনতিকাল করেন সে বছরও উবাইকে কুরআন শোনান। আর একথাও বরেন যে, জিবরীল আমাকে বলেছেন, আমি যেন উবাইকে কুরআন শুনাই।

যখনই কুরআনের যে আয়াতটি বা সূরাটি নাযিল হতো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাইকে পাঠ করে শোনাতেন। শুধু তাই নয়, মুখস্ত করিয়ে দিতেন। যখন সূরা আল-বায়্যিনাহ নাযিল হয় তখন তিনি উবাএকি ডেকে বলেন, আল্লাহ তোমাকে কুরআন শিখানোর জন্য আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। উবাই জিজ্ঞেস করেনঃ আল্লাহ কি আমার নাম বলেছেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হ্যাঁ। উবাই তখন খুশীর আতিশয্যে কেঁদে ফেলেন। (আল-ইসাবা-১/১৯) আবদুর রহমান ইবন আবী আবযা নামক উবাইয়ের এক ছাত্র উস্তাদের এই ঘটনা অবগত হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ আবুল মুনজির! সম্ভবতঃ সেই সময় আপনি বিশেষ পুলক ও আনন্দ অনুভব করেছিলেন? উবাই বললেনঃ কেন করবো না? একথা বলে তিনি সূরা ইউনুসের ৫৮ নং আয়াতটি পাঠ করেন। (মুসনাদ-৪/১১৩) কিরায়াত শাস্ত্রে তার পারদর্শিতার কারণে বিশেষ এক ধরনের বিরায়াত সেকালে তার নামে চালু হয় এবং কিরায়াতে উবাই নামে পরিচিতি লাভ করে। বিশেষতঃ দিমাশ্কবাসীদের মধ্যে তা বেশি প্রচলিত ছিল।
হযরত উবাইয়ের জীবদ্দমায় তার কিরায়াত সারা মুসরিম বিশ্বে ব্যাপকভাবে গৃহীত হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা হয়নি। কারণ অনেক মানুসুখ (রহিত) আয়াত তার পাঠে বিদ্যমান ছিল। আর এ জন্য হযরত ’উমার (রা.) তার র্মযৃাদা উচ্চকণ্ঠে স্বীকার করা সত্ত্বেও বহুবার বহু ক্ষেত্রে উবাইয়ের সাথে কুরআন পাঠের ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তিনি বার বার বলেছেন, উবাই আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কুরআন জানেন। তা সত্ত্বেও কোন কোন ক্ষেত্রে আমাদেরকে তার সাথে দ্বিমত পোষণ করতে হয়েছে। তিনি দাবি করে থাকেন, সবকিছুই তিনি র নিকট থেকে শিখেছেন। তার দাবি অবশ্য সত্য। কিন্তু যখন দেখা যায় বহু আয়াত মানুসূখ (রহিত) হয়েছে অথচ তিনি তা জানেন না, তন তার কিরায়াতের ওপর আমরা কেমন করে অটল থাকতে পারি? (মুসনাদ-৫/১১৩)

তবে পরবর্তীকালে তিনি সংশোধন হয়ে যান। হযরত উসমানের খিলাফতকালে যখন কুরআন সংকলন করা হয় তখন মানসূখ আয়াতের প্রতি সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। তখন উবাইয়ের কিরায়াত সবৃজন স্বীকৃতি লাভ করে এবং সমগ্র মুসলিম খিলাফতে চালু হয়। (দ্রঃ সীয়ারে আনসার-১/১৬২-৬৩)

হযরত উবাই (রা.) মৃত্যুর সময় তার কিরায়াত শাস্ত্রে দুজিন যোগ্য উত্তরসূরী রেখে যান যারা বিম্ব মুসলিমের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তারা হলেনঃ হযরত আবু হুরারিা ও হযরত ¦দুল্লাহ ইবনৎ আব্বাস (রা.)। পরবর্তীকালে বিখ্যাত সাত ক্বারীর মধ্যে নাফে ইবন আবদুর রহমান ও আবু রূওয়াম মাদানীর সনদ আবু হুরারিার মাধ্যমে এবং আবদুল্লাহ ইবন কাসীর মাক্কীর সনদ আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসের মাধ্যমে হযরত উবাই ইবন কাবে গিয়ে মিলিত হয়েছে।

[চলমান]