প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৮ম সংখ্যা,ফেব্রুয়ারী ২০১৬,রবি.সানি-জমা.আউ ১৪৩৭ হিজরী,মাঘ-ফাল্গুন ১৪২২ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

আমাদের সমাজে এমন অনেক কুপ্রথা প্রচলিত রয়েছে যেগুলোর অপকারিতা ও অবৈধতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সবাই নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও তা বন্ধ করা বা তা থেকে বিরত তাকার কোন সুপ্রয়াস দেখা যায় না। বিয়ের অনুানে নাচ-গানের আসর করা এমনি ধরণের একটি রেওয়াজ। এই অবাঞ্ছিত রীতি সমাজদেহের যেসব অপকার সাধন করে সেসবের প্রতি লক্ষ্য করলে সর্বপ্রথমেই যে বিষয়টির প্রতি নজর পড়ে তা হচ্ছে যেনা-ব্যভিচারের ব্যাপক প্রসার। বিয়ের অনুানে উপস্থিত পুরুষ লোকেরা পরনারীর প্রতি দৃষ্টিপাত করে চোখের ব্যভিচার করে, তাদের কণ্ঠস্বর শ্রবণ করে কানের ব্যভিচার করে, তাদের সাথে কথাবার্তা বলে জিহ্বার ব্যভিচার করে, তাদের প্রতি হৃদয়ে দুর্বলতা অনুভব করে মানসিক ব্যভিচার করে, বেহায়া নারীর দেহে হাত লাগিয়ে হাতের ব্যভিচার করে। হাদীস শরীফে এ বক্তব্যের সুস্পষ্ট সমর্থন পাওয়া যায়। বুখারী শরীফের এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মেরাজ রজনীতে আমি একস্থানে গিয়ে দেখলাম অগণিত নগন্ন নর-নারী একটা গুহার ভিতরে যন্ত্রণাময় আযাবে লিপ্ত রয়েছে। চুলার ন্যায় প্রবেশদ্বার সংকীর্ণ ও অভ্যন্তরভাগ প্রশস্ত এ গুহায় আগুন জ্বলছিল দাউ দাউ করে। আগুনের লেলিহান শিখার সাথে সাথে লোকগুলিও একবার উপরে একবার নীচে উঠানামা করছিল। তাদের অপরাধ সম্পর্কে জানতে চাইলে জিবরাঈল (আ.) বললেন, এরা দুনিয়াতে ব্যভিচার করেছে। বায়হাকীতে বর্ণিত অন্য এক হাদীসে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কুদৃষ্টি নিক্ষেপকারীর ওপর খোদার অভিশাপ। আর যার প্রতি কুদৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হয় সে যখন নিক্ষেপকারীর প্রতি আকৃষ্ট হয় তখন তার ওপরও খোদার অভিশাপ।

অন্য এক হাদীসে আছে, যে কেউ কারো প্রতি কুদৃষ্টি দেবে, কিয়ামতে তার চোখে গলিত সীসা ঢালা হবে।

দ্বিতীয়তঃ নাচ-গানের আসরে উপরোক্ত গোনাহসমূহ প্রকাশ্যে সংঘটিত হয়ে থাকে। যেকোন গুনাহ গোপনে করার চেয়ে প্রকাশ্যে করা অধিকতর দূষণীয়। তিরমিযী শরীফের এক হাদীসে আছে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের পূর্বাভাসের বর্ণনায় বলেছেন, যখন গান-বাজনাকারীদের প্রকাশ্য বিচরণ শুরু হয়ে যাবে, তখন বুঝতে হবে লু হওয়া, ভূমিকম্প ভূমিধস, আকৃতির বিকৃতি, শিলাবৃষ্টি ইত্যাদির মত কিয়ামতের অন্যান্য বড় বড় আলামতসমূহও ছিড়ে যাওয়া তসবীহ থেকে দানা পতনের ন্যায় একের পর এক সংঘটিত হতে থাকবে। প্রকৃত প্রস্তাবে, এই হাদীসে কিয়ামতের পূর্বে গান-বাজনার ব্যাপক প্রসারের ভবিষ্যদ্বাণী করে বেপরোয়া সঙ্গীতানুরাগীদেরকে এসব সঙ্গীতানুানে যোগদানের কঠোর পরিণতি থেকে সতর্ক করা হচ্ছে। ইবনে মাজাহতে আছে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখনই কোন জাতি প্রকাশ্য বেহায়াপনা ও জঘন্য পাপে লিপ্ত হয়ে পড়েছে তখনই তাদের মধ্যে এমন ধরণের মহামারি ছড়িয়ে পড়েছে তখনই তাদের মধ্যে এমন ধরণের মহামারি ছড়িয়ে পড়ে যা ইতোপূর্বে কোন জাতিতে আসেনি। সঙ্গীতানুানে যোগদান করার চেয়ে অধিক বেহায়াপনা আর কি আছে? আর বিশ্বে নিত্য-নতুন যেসব রোগের উদ্ভব ঘটে চলেছে তা যে আমাদের জঘন্য পাপেরই ফলশ্রুতি- এতে তো কোনই সন্দেহ নেই।

তৃতীয়তঃ যাদের এ সমস্ত আসরে যোগ দিতে উদ্বৃদ্ধ করা হয়ে থাকে তাদের সবার একত্রে যেই পরিমাণ পাপ হবে, অনুানের উদ্যোক্তারও সেই পরিমান পাপ হবে। বরং তার অনুসরণে অন্য যেসব লোক এ ধরণের পাপানুানের আয়োজন করবে তাদের পাপেও সে অংশীদার হবে। এমন কি তার মৃত্যুর পর যতদিন পর্যন্ত এ প্রথা চালু থাকবে ততদিন পর্যন্ত তার আমলনামায় পাপবৃদ্ধির ধারাও অব্যাহত থাকবে। সহীহ মুসলিম শরীফে উল্লিখিত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, “সৎপথে আহ্বানকারী তাঁর অনুসারীদের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে অথচ অনুসারীদের সওয়াব হ্রাসপ্রাপ্ত হবে না। পক্ষান্তরে মন্দ পথে আহ্বানকারী তার অনুসারীদের সমপরিমাণ পাপের ভাগী হবে, কিন্তু তাদের পাপ হ্রাস করা হবে না।\”

চতুর্থতঃ বিয়ের অনুানে অনুপস্থিত দূর-দূরান্তে অবস্থানকারী আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবকে চিঠি-পত্রের মাধ্যমে এ সমস্ত অপকীর্তির সংবাদ দান করাও মস্তবড় পাপ। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “সব পাপই ক্ষমার যোগ্য, তবে যারা প্রকাশ্যে পাপ করে তাদের কথা ভিন্ন।\” এ ক্ষেত্রেও আল্লাহ্ কর্তৃক গোপনীয়তা রক্ষার যথেষ্ট আশা থাকা সত্ত্বেও নিজেই নিজের গোপন পাপের প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে জঘন্য অপরাধ করা হয়। বলাবাহুল্য, ইদানিং বিয়ের দাওয়াতপত্রে গানের আসরে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানোও একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে।

পঞ্চমতঃ এসব আসরে এমন বাদ্যযন্ত্রসমূহ ব্যবহার করা হয় যেগুলির সৃষ্টিই পাপ। গোনাহ ছাড়া অন্য কাজে এগুলো ব্যবহার করা হয় না। মুসনাদে আহমদে বর্ণিত আছে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার প্রভু আমাকে তবলা ও বাঁশির উচ্ছেদ সাধন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। স্বয়ং রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেই বস্তু উচ্ছেদ করতে আদিষ্ট হয়েছেন, সেই বস্তুকে ব্যবহারকারীর পাপের কি গতি হবে, ভেবে দেখেছেন?

ষষ্ঠতঃ আসরে যোগাদানকারীদের নামায তো বিনষ্ট হলোই উপরন্তু তাদের গানের শব্দে পাড়া-প্রতিবেশির নামাযেও ব্যাঘাত ঘটে থাকে। গানের আওয়াজে অনেকেরই সময়মত ঘুম না হওয়ায় নামায কাযা হয়ে থাকে। নামায নষ্ট হওয়ার পাপের বোঝা গানের উদ্দোক্তার ঘাড়েই বর্তাবে এতে সন্দেহ নেই। হাদীসে প্রতিটি নামায ত্যাগের পরিণামে দোযখের আযাবের ভয় প্রদর্শন করা হয়েছে। কাজেই অগণিত লোকের নামায নষ্ট করার জন্য দায়ী ব্যক্তির শাস্তির পরিমাণ না ভয়াবহ!

সপ্তমতঃ প্রায়ই দেখা যায় একবার নাচ-গান উপভোগের অভ্যাস গড়ে উঠলে এসবের অপকারিতার কথা মন থেকে বের হয়ে যায়, গোনাহ করে মনে খারাপ লাগার পরিবর্তে উল্টো আরো আনন্দ অনুভূতি হয়ে থাকে, মানব মনের এ পর্যায় অত্যন্ত বিপজ্জনক। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুণ্য করে আনন্দিত হওয়া আর পাপ করে অনুতপ্ত হওয়াকে মুসলমানিত্বের নিদর্শন আখ্যা দিয়েছেন। সুতরাং, যে পাপ করে আনন্দিত হয় তাকে কোন পর্যায়ের ঈমানদার বলবেন? এ তো গেলো সঙ্গীতানুান উপভোগকারীদের অবস্থা, আর আসরের আয়োজকের কাঁধে তো সকল উপভোগকারীর সমপরিমাণ পাপ বর্তাবে।

অষ্টমতঃ অনেকে গায়িকাদের প্রেমে পড়ে স্বীয় ধন-সম্পদ, মান-সম্ভ্রম, ধর্ম সবকিছু বিসর্জন দিয়ে থাকে। এ অশুভ পরিণতির ক্ষেত্রেও উদ্যোক্তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকে। আর কৃত্রিম প্রেম এতই অনিষ্টকর যে তা মানুষকে নাস্কিকতার দ্বার প্রান্তে পৌঁছিয়ে দিতে পারে। মানুষের মন তো একটাই, এতে একটা প্রেমই ঘর বাঁধতে পারে। সৃষ্টির প্রেমে মজে গেলে স্রষ্টার প্রেম মনের অজান্তেই হ্রাস পেতে থাকে। একসময় সৃষ্টি-প্রেম যখন সারা হৃদয়-মন বেষ্টন করে ফেলে তখন স্রষ্টা-প্রেম আর মোটেও অবশিষ্ট থাকে না। এ পর্যায়েই তো নাস্তিকতার উদ্ভব ঘটে।

এ প্রসঙ্গে একটা উপদেশমূলক কাহিনী স্মরণ করা যেতে পারে। এক লোকের থাকার ঘরটা বাইরের দিক থেকে অনেকটা গোসলখানার মতোই দেখাতো। সে একদিন ঘরের বারান্দায় পায়চারী করছিল। এমন সময় এক যুবতী এসে তাকে জিজ্ঞেস করলো, শীতল পানির স্নানাগারে যাওয়ার পথটা কোনদিকে?” জবাবে লোকটি নিজের শোবার ঘরটিই দেখিয়ে দিল। যুবতী ভিতরে গেলে লোকটিও তার পিছনে পিছনে ঘরে ঢুকলো। ঘরে প্রবেশ করেই যুবতীটি লোকটির কুমতলব বুঝতে পারলো। তখন এ পাষণ্ডের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মেয়েটি একটা বুদ্ধি আটলো, সে আপাতঃদৃষ্টিতে বশ্যতা স্বীকার করে নিয়ে আনন্দ-ফূর্তি করার জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য-সামগ্রী সংগ্রহ করতে বললো। মেয়েটির পরামর্শ অনুযায়ী জিনিসপত্র কেনাকাটার জন্য লোকটি বেরিয়ে গেল। সেই সুযোগে মেয়েটি আত্মরক্ষার্থে পলায়ন করলো। ঘরে ফিরে যুবতীকে না পেয়ে লোকটি অনেক পেরেশান, সারাদিন অলিতে গলিতে তার অনুসন্ধান করলো, কিন্তু কোথাও মেয়েটির সন্ধান না পেয়ে শেষ পর্যন্ত লোকটি পাগল হয়ে গিয়েছিল। পাগল হয়ে সে সবসময় ঘুরতো আর বলতো- “হায় প্রভু! আমার একদিনের সহচরী শীতল পানির গোসলখানা অন্বেষণকারিণীর সন্ধান কোথায় পাবো?”

এমনিভাবে লোকটির সারাটি জীবন ঐ যুবতীর বিরহে অস্বস্তিতে কেটেছে। এমনকি মৃত্যুর সময় উপস্থিত সবাই যখন কালিমা পড়ার জন্য তাকে উপদেশ দিত তখনও সে তার সেই জপই উচ্চারণ করতো। অবশেষে এ অবস্থায়ই তার মৃত্যু হয়েছিল। এ ধরণের মরণ থেকে আল্লাহ্ আমাদের সবাইকে রক্ষা করুন।

অন্য এক কাহিনীতে, এক ব্যক্তি তার প্রেমিকার বিরহ যাতনায় একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিল। কিছুদিন পরে বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যস্থতায় প্রেমিকাকে কাছে পাওয়ার আশা পেয়ে হঠাৎ বেশ সুস্থ হয়ে উঠে লোকটি। প্রেমিকাকে নিয়ে আসার দিনক্ষণ নির্ধারণের জন্য সে উদ্গ্রীব হয়ে পড়ে। এমন সময় এক বন্ধু বললো, তোমার প্রেমিকা তো আমার সাথেই তোমার কাছে আসার জন্য রওয়ানা হয়ে গিয়েছিলাম তবে পথিমধ্যে এসে সে বলতে লাগলো, আমি কলঙ্কিত হতে যাবো না। আমি তাকে অনেক করে বুঝাতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু সে আসতে রাজী হল না। একথা শুনে প্রেমিকের অবস্থা আগের থেকে আরো শোচনীয় হয়ে একেবারে মৃত্যু-দ্বারে উপনীত হলো। মুমূর্ষু অবস্থায় সে প্রেমিকার উদ্দেশ্যে বলতে লাগলো- “তোমার সন্তুষ্টি খোদার রহমত থেকেও শ্রেয়” (নাউযুবিল¬াহ)। একথা শুনে উপস্থিত একজন বললো, দুর্মুখ! খোদাকে ভয় কর, একি বলতে শুরু করেছিস। কিন্তু বললে কি হবে? যা হবার ছিল তাই হলো, উপদেশ দাতা লোকটি দরজার কাছে যেতে না যেতেই এই ব্যর্থ প্রেমিকের ইহলীলা সাঙ্গ হলো।

এখানে আরো একটা কাহিনীর অবতারণাবোধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না। জনৈক মিসরীয় একটি মসজিদে থাকতো। সবসময় আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকার ফলে তার চোখ মুখ থেকে যেন এক স্বর্গীয় আলোকচ্ছটা বিচ্ছুরিত হত। মসজিদের পাশেই এক খৃষ্টানের বাড়ী ছিল। একদিন ঐ ধার্মিক লোকটি আযান দেয়ার উদ্দেশ্যে মিনারে আরোহণ করলো। মিনার থেকে সে খৃষ্টানদের যুবতী মেয়েকে দেখে তার প্রতি প্রেমাসক্ত হয়ে গেল। আযান দেওয়ার কথা ভুলে গিয়ে সে তৎক্ষণাৎ নীচে নেমে এসে সোজা খৃষ্টানের ঘরে প্রবেশ করলো। ঘরে প্রবেশ করে সে তার অভিলাষ ব্যক্ত করলো। তার কথা শুনে খৃষ্টানের মেয়েটি বললো, তুমি তো মুসলমান আর আমি খৃষ্টান; স্বভাবতই আমার মা-বাবা তোমার কাছে আমাকে সমর্পণ করতে সম্মত হবে না। তবে তুমি যদি আমাদের ধর্ম গ্রহণ কর তাহলে তোমার মনোবাঞ্ছা পূরণ হতে পারে। লোকটি তৎক্ষণাৎ খৃষ্টান হয়ে গেল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, তাদের বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার আগে একদিন কোন এক কাজে লোকটি উপরে উঠেছিল এবং সেখান থেকে নীচে পড়ে সে মারা গেল। এইভাবে লোকটি দ্বীন-দুনিয়া উভয় কূল হারাল।

কৃত্রিম প্রেমের এতসব দুর্গতির কাহিনী শুনেও অনেকেই এ বিপদকে অত্যন্ত ছোট করে দেখেন। আর অনেকে তো একে মহাপ্রভুর নৈকট্য লাভের মোক্ষম উপায় ও অনিন্দ সুন্দরের সাক্ষাৎ দর্শনলাভ মনে করে থাকেন। (নাউযুবিল¬াহ) এ ধরণের মন-মানসিকতাকে স্পষ্ট ধর্মদ্রোহিতা ও যিন্দিকী ধ্যান-ধারণা ছাড়া আর কি বলা যায়? কখনো কখনো কোন কোন মহান বুযুর্গদের উক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে এসব অপকীর্তিকে আমাদের সমাজে চালিয়ে দেওয়ার পায়তারা চলতে দেখা যায়। আসলে এরা এসব উক্তির মর্ম উপলব্ধি করতে অক্ষম।

নবমতঃ অনেক অপদার্থ তো এসব নাচ-গানকে সুনাম ও ভদ্রতার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে। বিয়ের অনুানে নাচ-গানের আসর না হওয়াটা তাদের কাছে রীতিমত অপমানকর ব্যাপার, এতে যে বিয়ের সকল আনন্দই মাটি হয়ে গেল। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, কেউ যখন পাপ করতে পেরে আত্মগর্ব লাভ করে, আর তা না করাকে অপমানকর মনে করে, তার কাছে পাপ কর্মটা একটা হালকা জিনিসই নয় বরং আনন্দের বস্তুতে পরিণত হয়। এ অবস্থাকে উলামায়ে কিরাম ঈমান হারানোর অন্যতম কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

দশমতঃ এসব গীতি অনুানে অর্থ সম্পদের সীমাহীন অপচয় হয়ে থাকে। অথচ কোরআন হাদীসে অপচয়কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন অপচয়কারী শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার প্রভুর অবাধ্য ও অকৃতজ্ঞ। যে স্বীয় অর্থ-সম্পদ গান-বাজনায় ব্যয় করলো সে তো আল্লাহর দেয়া অনুগ্রহকে নিতান্ত তুচ্ছ ভেবে এর নাশোকরী করলো।

একাদশতঃ গানের আসরে সংবাদ পেয়েও যারা উপস্থিত হতে পারেন নি তারা অনেক সময় পত্র মারফত আয়োজনকারীকে অভিনন্দন পাঠিয়ে থাকেন। এভাবে তারাও পাপের ভান্ডারে ভাগ বসান। আবু দাউদে বর্ণিত আছে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন পাপ কাজে সন্তোষ প্রকাশ করে, সে ঐ লিপ্ত ব্যক্তির সমপরিমাণ গোনাহে গোনাহগার হবে। এ ছাড়াও এসব সঙ্গীতানুানে আরো কত যে পাপের নির্লজ্জ মহড়া চলে – তার ইয়ত্তা নেই।

বিয়েতে গানের আসরের উদ্যোক্তারা গা বাঁচানোর চেষ্টায় অনেক সময় এ অজুহাত পেশ করে থাকেন যে, কনে পক্ষের বারংবার দাবীর মুখে আমার কিই-বা করার আছে, তারা কোনমতেই মানছে না, তাই বাধ্য হয়েই গানের আয়োজন করতে হল। তার কাছে আমার জিজ্ঞাসা, কনে পক্ষ যদি এমন দাবী জানায় যে, তোমার মা-বোনকে আসরে এসে নাচতে দিলে আমরা মেয়ে দেব নতুবা দেব না তাহলে তিনি কি করবেন? শুধু কি সুন্দরী কনে ঘরে তোলার প্রয়োজনে সকল অপমানকে সানন্দে বরণ করে নেবেন! নাকি অগ্নিশর্মা হয়ে কনে পক্ষকে এ ধরণের অশালীন দাবীর উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করতে উদ্যত হবেন? শরীয়তে নিষিদ্ধ বস্তুকে নিজের কাছে অপছন্দনীয় বিষয়ের অনুরূপ ঘৃণা করা প্রত্যেক মুসলমানের প্রধান কর্তব্য।

ব্যক্তিগত মর্যাদা ক্ষুন্ন হওয়ার আশংকা থাকলে যেমন বিয়ে হওয়া না হওয়ার পরওয়া করা হয় না, শরীয়তী বিধান লংঘিত হওয়ার আশংকা থাকলেও তেমনি স্বার্থ চিন্তা ত্যাগ করে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া উচিত -এ বিয়ে হোক আর না-ই হোক ইসলামের নির্দেশ অমান্য করে নৃত্য-গীতের আয়োজন করা যাবে না।

আমি বলতে চাই, এসব ব্যাপারে অন্যের পক্ষ থেকে বাধ্য-বাধকতা আরোপের অজুহাত অযৌক্তিক। তাছাড়া শরীয়তের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে কেউ যদি বিয়েতে নাচ-গানের ব্যবস্থা করে তাহলে সকল আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের কর্তব্য হবে তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা এবং তাকে একথা জানিয়ে দেওয়া উচিত যে, তুমি যখন আল্লাহর অসন্তুষ্টির পরওয়া করলে না, তখন আমরা কোন দুঃখে তোমার অসন্তুষ্টির পরওয়া করবো।