প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৮ম সংখ্যা,ফেব্রুয়ারী ২০১৬,রবি.সানি-জমা.আউ ১৪৩৭ হিজরী,মাঘ-ফাল্গুন ১৪২২ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

কুরআনুল কারীম মাপে কম দেয়াকে মারাত্মক অন্যায় সাব্যস্ত করে যথাযথ মাপ দেয়ার জন্য গুরুত্ব সহকারে হুকুম করেছে। কুরআনুল কারীম এই হুকুম একবার দিয়ে ক্ষ্যান্ত হয়নি, বরং বারবার বিভিন্ন আঙ্গিকে এবং বিভিন্ন রকম উপস্থাপনার কৌশলে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বর্ণনা করা হয়েছে। নিচের আয়াতগুলো লক্ষ্য করলে এ বিষয়টিই পরিষ্কার হয় :
ওজন ও মাপ পূর্ণ কর, ন্যায় সহকারে। (সূরা আনআাম : আয়াত ১৫২)
অতএব তোমরা মাপ ও ওজন পূর্ণ কর এবং মানুষকে তাদের দ্র্রব্যাদি কম দেবে না।
(সূরা আরাফ : আয়াত ৮৫)
আর পরিমাপে ও ওজনে কম দেবে না। (সূরা হুদ : আয়াত ৮৪)
ন্যায়নিার সাথে ঠিকভাবে পরিমাপ কর ও ওজন দাও। (সূরা হুদ : আয়াত ৮৫)
মেপে দেয়ার সময় পূর্ণ মেপে দেবে এবং সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন করবে। (সূরা বনী ইসরাঈল : আয়াত ৩৫)
মাপ পূর্ণ কর এবং যারা পরিমাপে কম দেয় তাদের অন্তর্ভূক্ত হবে না। সোজা দাঁড়িপাল্লায় ওজন কর। (সূরা শুআরা : আয়াত ১৮১-১৮২)
তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন মাপদণ্ড, যাতে তোমরা সীমালঙ্ঘন না কর মাপদণ্ডে। তোমরা ন্যায্য ওজন কায়েম কর এবং ওজনে কম দেবে না। (সূরা আর-রহমান : আয়াত ৭-৯)
পবিত্র কুরআন স্পষ্ট ভাষায় এবং অতীব গুরুত্ব সহকারে বার বার সঠিক মাপের প্রতি জোর দিয়েছে। এতে অনুমিত হয় যে, মাপে কম দেয়া কুরআনের দৃষ্টিতে ওইসব মৌলিক ব্যাধির অন্যতম, যেগুলো সামাজিক দুর্নীতির মূল শিকড় এবং যেগুলোকে দূর করার জন্য নবীগণ পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছেন।

প্রশ্ন হল, মাপে কম দেয়ার অর্থ যে ব্যক্তি নিক্তি কিংবা দাঁড়িপাল্লা হাতে নিয়ে কোন জিনিস মেপে বিক্রি করার সময় মাপে ফাঁকি দিল শুধু কি তাই? মাপে কম দেয়ার সরাসরি অর্থ যে তাই তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু যে আঙ্গিক ও যে ধারায় পবিত্র কুরআন এই অন্যায় কাজের উল্লেখ করেছে তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, এই দুর্নীতি শুধু মাপে কম দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এমন প্রতিটি পদক্ষেপই এর অন্তর্ভুক্ত, যার দ্বারা এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির যে কোন ধরনের হক নষ্ট করে কিংবা ন্যায়সঙ্গতভাবে তার হক পরিপূর্ণ পরিশোধ না করে।
মূলত পবিত্র কুরআন নিক্তি শব্দটি ন্যায়বিচার এবং হক আদায়ের একটি প্রতীক (Symbol) স্বরূপ ব্যবহার করেছে। আর এ কারণেই সূরা শূরা এবং সূরা হাদীদ -এর মধ্যে নিক্তি এবং আসমানী কিতাবকে এক সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা শূরায় ইরশাদ হচ্ছে :
আল্লাহই সত্য সহ কিতাব ও ইনসাফের মানদণ্ড নাযিল করেছেন। (সূরা শূরা : আয়াত ১৭)
এ বিষয়টি সূরা হাদীদে অধিকতর স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে: এবং আমি তাঁদের (পয়গম্বরদের) সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও নিক্তি, যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিা করে। (সূরা হাদীদ : আয়াত ২৫)
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কোন পয়গম্বর এমন কোন নিক্তি নিয়ে আসেননি যার দ্বারা পণ্য মাপা যায়। সুতরাং এ স্থলে নিক্তি শব্দের পরিষ্কার অর্থ ন্যায়বিচার ও হক আদায়ের প্রতিকী নিক্তি। কিতাবের সঙ্গে একত্রিত করে নিক্তি উল্লেখ করে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, আসমানী কিতাব মতাদর্শ ও চেতনা নির্মাণ করে, আর পয়গম্বরের কথা ও কাজ মানুষের সামনে এমন সঠিক পরিমাপ তুলে ধরে, যা হক ও বাতিলের মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা অঙ্কন করে। যার আলোকে হকের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব করা যায়।
এ থেকে এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, মাপে কম দেয়া শব্দটির অর্থ ব্যাপক। এর মধ্যে সব ধরনের অধিকার হরণ শামিল রয়েছে। যখনই কোন ব্যক্তি অপর ব্যক্তির অধিকার যথাযথভাবে আদায় করল না, সেই মাপে কম দেয়ার অপরাধে লিপ্ত হল। তার এই কাজটি ঠিক ওই পরিমাণ ঘৃণ্য এবং তিরষ্কারের যোগ্য, যে পরিমাণ মাপে পণ্য কমদাতা ঘৃণার পাত্র ও তিরষ্কারের যোগ্য। মাপে পণ্য কম দেয়া সবাই নিকৃষ্টতা ও হীনমন্যতার চিহ্ন মনে করে। এ কারণে পরিমাপ সংক্রান্ত পবিত্র কুরআনের যতগুলো বাণী উপরে উল্লেখ করা হয়েছে, এর দ্বারা এমন সবাইকেই সম্বোধন করা হয়েছে, যার দায়িত্বে অন্যের অধিকার রয়েছে।
স্বামীর জন্য এই নির্দেশের অর্থ এই যে, স্ত্রীর অধিকার যথাযথভাবে আদায় কর, আর স্ত্রীর জন্য এর অর্থ এই যে, স্বামীর অধিকার পরিপূর্ণভাবে আদায় কর। সরকারের জন্য এর অর্থ এই যে, জনসাধারণের হক পরিপূর্ণরূপে আদায় কর। আর জনসাধারণের জন্য এর আবেদন এই যে, সরকারের হক এবং সরকারের অধিকার যথাযথ ও ঠিকভাবে আদায় কর। কর্মচারীর জন্য এই বাণীর নির্দেশ এই যে, কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তোমাকে যে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে এবং যার বিনিময়ে তোমাকে বেতন বা পারিশ্রমিক দেয়া হচ্ছে তা যথাযথ ন্যায়নীতির সাথে আদায় কর। আর কর্তৃপক্ষের জন্য এর মধ্যে এই নির্দেশনা রয়েছে যে, কর্মচারীর এমন সব অধিকার পরিপূর্ণরূপে পরিশোধ কর, যার বিনিময়ে তার শ্রম দ্বারা তুমি উপকৃত হচ্ছ। মোটকথা পৃথিবীর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এমন কোন দিক নেই যার জন্য পবিত্র কুরআনের এসব আয়াতের মধ্যে সঠিক দিকনির্দেশনা নেই।
উপরন্তু পবিত্র কুরআন নিজেই আরো অগ্রসর হয়ে এ কথাও স্পষ্ট বলেছে যে, মাপে কম দেয়ার ঘৃণ্যতম পন্থা হল- নিজের জন্য এক রকম মাপ আর অন্যের জন্য অন্যরকম মাপ নির্ধারণ করা। অর্থাৎ অন্যকে দেয়ার সময় তো মাপে কম দেয় কিন্তু নিজের অধিকার আদায়ের সময় সামান্য পরিমাণ ছাড় দিতে রাজি নয়। এই শ্রেণির লোকদের জন্য কুরআন অত্যন্ত কঠোরভাবে এই ধমকি দিয়েছে :
যারা মাপে কম দেয়, তাদের জন্য দুর্ভোগ। যারা লোকদের কাছ থেকে যখন মেপে নেয়, তখন পূর্ণমাত্রায় নেয় এবং যখন লোকদেরকে মেপে দেয় কিংবা ওজন করে দেয় তখন কম করে দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে তারা পুনরুত্থিত হবে? সেই মহা দিবসে যেদিন মানুষ দাঁড়াবে বিশ্ব পালনকর্তার সামনে। (সূরা মুতাফফিফীন : আয়াত ১-৬)
এখানে যদিও মাপে কম দেয়া শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে কিন্তু এর ব্যাপক অর্থের মধ্যে সব ধরনের অধিকার হরণ করাই শামিল রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) এই আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন : পরিপূর্ণ মাপ দেয়া আর মাপে কম দেয়া প্রত্যেক কাজেই হতে পারে।
তাই এই আয়াতে মৌলিকভাবে এসব লোকের নিন্দা করা হয়েছে, যারা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই রকম মানদন্ড গ্রহণ করেছে। যাদের নেয়ার মাপ এক রকম, আর দেয়ার মাপ অন্য রকম। যারা নিজেদের লাভ আদায়ের সময় অত্যন্ত সচেতন ও হিসেবী, কিন্তু অন্যের হক দেয়ার ক্ষেত্রে বড়ই কৃপণ ও হীনমনের অধিকারী। যারা ন্যায়বিচারকে বলি দিয়ে রাত দিন নিজেদের ধন-সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি করছে, তারা এদিকে মোটেও ভ্রƒক্ষেপ করে না যে, আল্লাহ তাআলার সম্মুখে উপস্থিতির সময় সম্পদের এই বাহ্যিক বৃদ্ধি কি পরিমাণ লাঞ্ছনা, অবমাননা ও শাস্তির কারণ হবে?
আফসোস! আজ আমরা অধিকার ও কর্তব্য পরিমাপ করতে আল্লাহ প্রদত্ত নিক্তিকে গ্রহণ করে জীবনের প্রায় প্রতিটি শাখায় নিজেদের মনগড়া দুরকম মাপ গ্রহণ করেছি এবং নিজেদেরকে পবিত্র কুরআনের মারাত্মক এই ধমকির যোগ্য করেছি।
কোন মালিক যদি শ্রমিক দ্বারা তার স্বেচ্ছা সম্মতি ছাড়া নির্ধারিত সময়ের অধিক কাজ নেয় এবং অতিরিক্ত পরিশ্রমের জন্য তাকে পৃথক পারিশ্রমিক না দেয়, তাহলে সে এই দুরকম মাপ অবলম্বনের কারণে কুরআনের এই ধমকীর শামিল হবে এবং শ্রমিক থেকে অতিরিক্ত যে শ্রম সে নিয়েছে তা তার জন্য হারাম হবে।
এমনিভাবে কোন শ্রমিক বা কর্মচারী যদি তার ডিউটির জন্য নির্ধারিত সময়ে দায়িত্ব পালন না করে কাজে ফাঁকি দেয় কিংবা ডিউটির সময় নিজের ব্যক্তিগত কাজ করে কিন্তু বেতন পুরোপুরিই উসূল করে নেয়, তাহলে সেও পবিত্র কুরআনের এই ধমকীর যোগ্য হবে। ডিউটির সময় ব্যক্তিগত কাজ করে যে পরিমাণ বেতন গ্রহণ করেছে তা তার জন্য হারাম হবে। এমনকি একজন কর্মচারীর জন্য ডিউটির সময় ডিউটি সংক্রান্ত কাজ থাকতে কোন প্রকার নফল ইবাদত করা যেন নফল নামায, কুরআন তেলাওয়াত ইত্যাদিও জায়েয নেই। সে সময় সাধ্যানুযায়ী এবং নীতিপূর্ণভাবে স্বীয় কর্তব্য পালন করাই তার দায়িত্ব।
এ প্রসঙ্গে এ কথাও উল্লেখ করা যথার্থ হবে যে, এ ব্যাপারেও আমাদের সমাজে একদিকে বাড়াবাড়ি এবং অপর দিকে ত্র“টি-বিচ্যুতি দেখতে পাওয়া যায়। অনেক কর্মচারী ডিউটির সময় নফল ইবাদত করতে আরম্ভ করে অথচ তার কাজ পড়ে থাকে। অপর দিকে অনেক কর্তৃপক্ষ কর্মচারীদেরকে পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায পড়ারও সুযোগ দেয় না। অথচ ফরয নামায আদায় করা সর্বাবস্থায় জরুরি। কর্মচারীদের জন্য নামাযের ব্যবস্থা করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। এ কথা ঠিক যে, কর্মচারী আট ঘণ্টা ডিউটি পালন করতে বাধ্য কিন্তু প্রাকৃতিক প্রয়োজন পুরা করা এ থেকে স্বাভাবিকভাবেই বাদ পড়ে যায়। ফরয নামায আদায় করা ঠিক অতটুকুই জরুরি যতটুকু জরুরি মানুষের প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ করা। সুতরাং নামায আদায়ের সময়গুলোও ডিউটি থেকে স্বভাবতই বাদ পড়বে। তবে কর্মচারীর দায়িত্ব হল স্বাভাবিক নিয়মে (সুন্নাতসহ) ফরয নামায আদায় করে ক্ষ্যান্ত হওয়া। জরুরি কাজ ছাড়া সময় ব্যয় না করা এবঙ অন্য কোন নফল ইবাদতে লিপ্ত না হওয়া।
এ বিষয়টি তো প্রসঙ্গক্রমে এসেছে। আমি বলছিলাম এই যে, আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে দেখা উচিত যে, আমরা আমাদের হক পরিপূর্ণ উসূল করে অন্যের হক পরিশোধ করতে ত্র“টি করছি কি না? আমরা নিজেদের এবং অন্যদের জন্য পৃথক মানদণ্ড বানিয়েছি কি না? আমরা অন্যের থেকে এমন কোন বস্তুও দাবি তো করছি না, যা তার স্থলে আমি হলে তাকে দেয়ার জন্য প্রস্তুত হতাম না।
যতদিন আমাদের অন্তরে এ চেতনা জাগ্রত না হবে এবং আমাদের মধ্যে পবিত্র কুরআনের এই ধমকীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ভীতি জন্ম না নেবে ততদিন পর্যন্ত অধিকার হরণ এবং দুর্নীতি হ্রাস পাবে না, যা আমাদের জীবনকে সর্বনাশ করে দিচ্ছে এবং যার কারণে সব মানুষ ভীতি, হতাশা, অস্থিরতা ও অশান্তির শিকার। কারণ যখন সমাজে অধিকার হরণের বাজার উন্মুক্ত থাকবে, তখন তার চূড়ান্ত ফলাফল (Net Result) সবার অশান্তি ছাড়া অন্য কিছু হবে না। এক ব্যক্তি দশ ব্যক্তির হক নষ্ট করলে অন্য দশজন তার হক নষ্ট করবে। ফলে শেষ বিজয় হবে শয়তানের।