প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৪র্থ সংখ্যা,অক্টোবর ২০১৬, জিলহজ-মুহাররম ১৪৩৭-৩৮ হিজরী,আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

মসজিদকে পথ হিসেবে ব্যবহার করা নিষেধ

আব্দুল্লাহ্ বিন্ উমর (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : তোমরা নামায ও যিকির ছাড়া মসজিদকে পথ হিসেবে ব্যবহার করো না। (আস৪্-সিল্সিলাতুস্ -স্বাহীহাহ্, হাদীস ১০০১)
মসজিদে দেরিতে এসেও মানুষের ঘাড় টপকিয়ে ইমামের নিকটবর্তী হওয়া :

আব্দুল্লাহ্ বিন্ বুসর (রা) থেকে বর্নিত তিনি বলেন:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবা দিচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় জনৈক ব্যক্তি মানুষের ঘাড় টপকিয়ে তাঁর দিকে অগ্রসর হচ্ছে দেখে তিনি তাকে বললেনঃ বসো। তুমি এমনিতেই মসজিদে দেরি করে এসেছো। আবারো মানুষকে ক দিচ্ছো। (ইব্নু খুযাইমাহ্, হাদীস ১৮১১)

দ্রুতগতিতে মসজিদে আসা নিষেধ

আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :
যখন নামাযের ইকামত দেয়া হয় তখন তোমরা দ্রুত গতিতে মসজিদে আসবে না। বরং ধীর পদে তোমরা নামাযে আসবে এবং শান্ত চিত্তে মসজিদে উপস্থিত হবে। অতঃপর তোমরা ইমামের সাথে যতটুকু নামায পাবে তা পড়বে। আর যতটুকু ছুটে গিয়েছে তা আদায় করে নিবে। (বুখারী, হাদীস ৯০৮ মুসলিম, হাদীস ৬০২)

এক বছর না হতেই কোনো মালিককে যাকাত দিতে বাধ্য করা নিষেধ

আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি তিনি বলেন কোন মালে যাকাত আসবে না যতক্ষণ না তার উপর পুরাপুরিভাবে একটি বছর অতিবাহিত হয়।

কারোর সর্বোত্তম বস্তুটি যাকাত হিসেবে নেয়া নিষেধ

আব্দুল্লাহ্ বিন্ আব্বাস্ (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুআয (রা) কে ইয়েমেন অভিমুখে পাঠাচ্ছিলেন তখন তিনি তাঁকে বলেন :
তুমি আহ্লে কিতাব তথা ইহুদি-খ্রিষ্টানদের কাছে যাচ্ছো। তাই তাদের জন্য তোমার সর্ব প্রথম দাওয়াত। যখন তারা আল্লাহ্ তাআলাকে ভালোভাবে চিনে ফেলবে তখন তাদেরকে বলবে: আল্লাহ্ তাআলা তোমাদের উপর দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টায় শুধুমাত্র পাঁচ বেলা নামায ফরয করেছেন। যখন তারা তা আমলে পরিণত করে তখন তাদেরকে বলবে: আল্লাহ্ তাআলা তাদের সম্পদের উপর যাকাত ফরয করে দিয়েছেন যা তাদের মধ্যকার ফকিরদের উপর বণ্টন করা হবে। তারা এ ব্যাপারে তোমার আনুগত্য করলে তুমি তাদের থেকে যাকাত নিবে। তবে মানুষের সর্বোত্তম সম্পদটুকু যাকাত হিসেবে গ্রহণ করা থেকে তুমি অবশ্যই বিরত থাকবে। (বুখারী, হাদীস ১৪৫৮ মুসলিম, হাদীস ১৯)

তবে কেউ স্বেচ্ছায় নিজের সর্বোত্তম সম্পদটুকু আল্লাহ্ তাআলার পথে সাদাকা করলে সে অবশ্যইসমূহ কল্যাণের নাগাল পাবে।
আল্লাহ্ তাআলা বলেন : তোমরা কখনোই কল্যাণের নাগাল পাবে না যতক্ষণ না তোমরা নিজের পছন্দনীয় বস্তু সাদাকা করো। তোমরা যা কিছুই আল্লাহ্ তাআলার পথে ব্যয় করো তা সবই তিনি ভালোভাবে জানেন। (আলি ইমরান : ৯২)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিবারবর্গ কারোর যাকাত গ্রহণ করা

আব্দুল্-মুত্তালিব বিন্ রাবী’আহ্ বিন্ হারিস্ ও ফায্ল্ বিন্ আব্বাস বিন্ আব্দুল মুত্তালিব (রা) থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :
নিশ্চয়ই সাদাকা তথা যাকাত গ্রহণ করা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিবারবর্গের জন্য উচিৎ নয়। মূলতঃ তা হচ্ছে মানুষের ময়লা-আবর্জনা। (মুসলিম, হাদীস ১০৭২)

হারাম, অপবিত্র কিংবা অনোত্তম বস্তু আল্লাহ্ তাআলার পথে সাদাকা করা নিষেধ

আল্লাহ্ তাআলা বলেন :
হে ঈমানদারগণ! তোমরা যা উপার্জন করেছো এবং যা আমি তোমাদের জন্য জমিন থেকে উৎপন্ন করেছি তা থেকে শুধু পবিত্র ও উন্নত বস্তুই আল্লাহ্ তাআলার পথে সাদাকা করো। কোন অপবিত্র বা অনুন্নত বস্তু তাঁর পথে সাদাকা করো না যা তোমরা নিজেও গ্রহণ করবে না চোখ বন্ধ করা ছাড়া। জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তাআলা (এ জাতীয় সাদাকা থেকে) অমুখাপেক্ষী এবং সুপ্রশংসিত। (বাক্বারাহ্ : ২৬৭)

বারা বিন্ আযিব (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: উক্ত আয়াত আন্সারীদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। তাঁরা খেজুর কাটার সময় হলে কাঁচা-পাকা খেজুরের থোকাসমূহ মসজিদে নববীর দু পিলারের মাঝখানে রশি টাঙ্গিয়ে তাতে ঝুলিয়ে রাখতেন। এতে করে গরিব মুহাজিরগণ তা থেকে কিছু খেজুর আহার করে খাদ্যের কাজ সেরে নিতেন। একদা জনৈক আন্সারী সাহাবী নিম্ন মানের একটি খেজুর থোকা সে রশিতে টাঙ্গিয়ে রাখলেন। তখনই উক্ত আয়াত নাযিল হয়। (তিরমিযী, হাদীস ২৯৮৭ ইবনু মাজাহ্, হাদীস ১৮৪৯)

আব্দুল্লাহ্ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর পূর্বে যাকাত সংক্রান্ত লিখিত যে বিধান রেখে গেলেন তার মধ্যে এ কথাগুলোও ছিলো যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : সাদাকা তথা যাকাত হিসেবে কোন শীর্ণকায় পশু গ্রহণ করা যাবে না। না কোন ত্রটিময় পশু। (আবু দাউদ, হাদীস ১৫৬৮)

নিজে যা খায় না এমন কোন জিনিস কোন মিসকিনকে খেতে দেয়া নিষেধ

আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : তোমরা যা খাওনা মিসকিনদেরকে তা থেকে খেতে দিও না। (সহী হুল-জামি, হাদীস ৭৩৬৪)

পশুর সাদাকা গ্রহণকারী কোন এক নির্দি জায়গায় অবস্থান করে সাদাকার পশুগুলো নিয়ে আসতে বলা নিষেধ

আব্দুল্লাহ্ বিন্ আমর বিন্ আস্ব (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : সাদাকা গ্রহণকারী কোন এক নির্দি জায়গায় অবস্থান করে তার নিকট সাদাকার পশুগুলো নিয়ে আসতে বলা যাবে না। না সাদাকার পশুগুলো পূর্ব থেকেই ভিন্ন করে তার নিকট নিয়ে আসতে বলা হবে। বরং মানুষের সাদাকাগুলো তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়েই উসুল করতে হবে। (আবু দাউদ, হাদীস ১৫৯১)

নিজের সাদাকা করা বস্তুটি পুনরায় খরিদ করা নিষেধ

আব্দুল্লাহ্ বিন্ উমর (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা উমর (রা) কে একটি ঘোড়া দিলে তিনি ঘোড়াটি জনৈক ব্যক্তিকে আল্লাহ্ তাআলার পথে যুদ্ধ করার জন্য সাদাকা করে দিলেন। একদা তিনি শুনলেন ঘোড়াটি বিক্রি করার জন্য তা বাজারে উপস্থিত করা হয়েছে। তখন তিনি তা কেনার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরামর্শ চাইলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন : তুমি তা খরিদ করো না এবং তোমার সাদাকায় পুনরায় ফিরে যেও না। (বুখারী, হাদীস ২৭৭৫ মুসলিম, হাদীস ১৬২১)

আগুন, পানি কিংবা ঘাস নিতে কাউকে বাধা দেয়া নিষেধ

আবু হুরাইরাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : তিনটি জিনিস নিয়ে যেতে কাউকে বাধা দেয়া যাবে না। সে জিনিসগুলো হচ্ছে পানি, ঘাস ও আগুন। (সহীহুল-জামি হাদীস ৩০৪৮)

কোন সুস্থ-সবল কিংবা ধনী ব্যক্তির অন্য কারোর সাদাকা খাওয়া নিষেধ

আব্দুল্লাহ্ বিন্ আমর (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : কোন ধনী ও সুস্থ-সবল ব্যক্তির জন্য সাদাকা খাওয়া জায়িয নয়। (আবু দাউদ, হাদীস ১৬৩৪ তিরমিযী, হাদীস ৬৫২)
তবে পাঁচ প্রকারের ধনীর জন্য সাদাকা খাওয়া জায়িয।

আত্বা (রহ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :
শুধুমাত্র পাঁচ ধরনের ধনীর জন্যই সাদাকা খাওয়া জায়িয। আল্লাহ্র পথে লড়াইকারী, সাদাকা উঠানোর কাজে নিযুক্ত সরকারী কর্মচারী, অন্যের জরিমানা বা দিয়াত বহনকারী, যে ধনী ব্যক্তি নিজ পয়সা দিয়েই সাদাকার বস্তু কিনে নিয়েছে, যে ধনী ব্যক্তির প্রতিবেশি গরিব এবং তাকেই কেউ কোন কিছু সাদাকা দিলে সে যদি তা ধনী ব্যক্তিকে হাদিয়া হিসেবে দেয়। (আবু দাউদ, হাদীস ১৬৩৫)

কোন কিছু সামান্য হলেও তা কাউকে সাদাকা করতে অবহেলা করা নিষেধ

আবু হুরাইরাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই বলতেন:
হে মুসলিম মহিলারা! কোন প্রতিবেশি তার প্রতিবেশিকে কোন কিছু তা যদিও অতি সামান্য হয় তুচ্ছ মনে করে দেয়া থেকে বিরত থাকবে না এমনকি তা ছাগলের খুরই বা হোক না কেন। (বুখারী, হাদীস ৬০১৭ মুসলিম, হাদীস ১০৩০)

উম্মু বুজাইদ (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! অনেক সময় গরিব লোক এসে আমার দরজায় ধন্না দেয়: অথচ আমার কাছে তখন দেয়ার মতো কিছুই থাকে না। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:

যদি ছাগলের একটি পোড়া খুরও পাও তাই তুমি তার হাতে তুলে দিবে। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তুমি ভিক্ষুককে ফিরিয়ে দিবে না। একটি খুর দিয়ে হলেও তাকে বিদায় দিবে। (তিরমিযী, হাদীস ৬৬৫ সহীহুত্ তারগীবি ওয়াত্ র্তাহীব, হাদীস ৮৮৪ আবু দাউদ, হাদীস ১৬৬৭)

আস্মা (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট গিয়ে তাঁকে বললাম। হে আল্লাহর নবী! আমার নিজস্ব কোন সম্পদ নেই। শুধু ততটুকুই যা আমাকে আমার স্বামী যুবাইর দিয়ে থাকে। আমি ততটুকু থেকেই যদি সামান্য কিছু অংশ কাউকে সাদাকা করে দেই তাতে কোন অসুবিধা আছে কি? তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :

যা পারো দান করতে থাকো। টাকা-পয়সা ধরে রেখো না, তা হলে আল্লাহ তাআলাও তাঁর নিয়ামতসমূহ ধরে রাখবেন। (বুখারী, হাদীস ১৪৩৪ মুসলিম, হাদীস ১০২৯)