প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৫ম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৬, মুহাররম-সফর ১৪৩৭-৩৮ হিজরী, কার্তিক-অগ্রহায়ন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
ইসলামিক সাম্রাজ্য থেকে একেবারে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। কিভাবে সম্ভব হলো ?
উনবিংশ শতাব্দীর গোঁড়ার দিকের তুরস্কের বিবর্তন হচ্ছে মুসলিম ইতিহাসের সবচাইতে বিভ্রান্তিকর সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিবর্তন। খুব কম সময়ের ভেতর ইসলামি ইতিবৃত্ত একরকম ছিনিয়ে নিয়েই অটোমান সম্রাজ্যের পতন ঘটানো হয় এবং এই সম্রাজ্যে তুর্কী নামের একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই পরিবর্তন আজও গোটা মুসলিম বিশ্ব অনুভব করে। বিশেষভাবে আদর্শিক বিভক্তিতে আক্রান্ত তুরস্ক নিজেও অনুভব করে।
তুরস্কের সমাজ সরকারে এই বিশাল পরিবর্তন কার কারণে? মুস্তফা কামাল, আতাতুর্ক নামেই যিনি বেশী পরিচিত তাকেই মূল কারণ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ১৯২০ থেকে ১৯৩০ সালের ভেতর তার নেতৃত্বে ধর্মহীন তুরস্কের গোঁড়াপত্তন হয় এবং ইসলাম তুরস্কের সমাজে পশ্চাদপদ হয়ে পড়ে।
আতাতুর্কের উত্থান
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত মারাত্মক ভুলের দিকে মোড় নিল। এই সাম্রাজ্যের এক নায়কতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত ২৩ এবং যার নেতৃত্বে ছিল তিন পাশা। তারা একদম একতরফাভাবে ব্রিটিশ ফ্রেঞ্চ এবং রাশিয়ানদের বিপক্ষে গিয়ে জার্মানদের হয়ে যুদ্ধ শুরু করল। এর ফলে অটোমান সাম্রাজ্যে দক্ষিণ দিক দিয়ে ব্রিটিশ, পূর্ব থেকে রাশিয়ান এবং পশ্চিম দিক থেকে গ্রিসদের আক্রমণের শিকার হলো।
১৯১৮ তে যখন যুদ্ধ থেমে গেল, সম্রাজ্যটিকে বিজয়ী জোটগুলো বিভক্ত করে নিজেদের অধিকারে নিয়ে নিল, শুধুমাত্র স্থানীয় অধিবাসীদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আন্তেলিয়ান পার্বত্যঞ্চলই থেকে গেল।
এদিকে মধ্যে আন্তেলিয়াতে তখন মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক জাতীয় বীর হবার প্রতীক্ষায় বেড়ে উঠছিলেন। একজন অটোমান সেনা কর্মকর্তা হিসেবে বিভিন্ন যুদ্ধে তিনি অসাধারণ নেতৃত্বের পরিচয় দেন। গলিপলির যুদ্ধ এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ সংঘাতের রাজধানী ইস্তামবুলকে লক্ষ্য করে ব্রিটিশ আক্রমণকে প্রতিহত করে অটোমানরা পিছু হটিয়ে দিতে পেরেছিল। লড়াই শেষ হবার পর কামাল তার লক্ষ্য পরিস্কার করেন। তার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হয়ে পড়ে তুরস্কের জনগণের ভেতর র্তুকী জাতীয়তাবাদকে ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। বহু জাতিগত এভাবে বিভক্ত অটোমান সম্রাজ্যের মত না, বরং কামালের উদ্দেশ্য ছিল তুর্কী পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে একটি মনোলিথিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা।
মুস্তাফা কামাল তুর্কী জাতীয়তাবাদের গুরুত্ব তার দৃষ্টিতে এভাবে ব্যাখ্যা করেন,
আরবদের ধর্ম ইসলাম গ্রহণের আগেও তুরস্ক জাতি হিসেবে অসাধারণ ছিল। আরবদের ধর্ম গ্রহণের পরে এই ধর্ম তুর্কী জাতীয় মৈত্রীতে স্থঘল এবং জাতীয় উদ্দিপনায় অসাড়তা আনা ছাড়া আরব, পর্সিয়, মিশরীয়দের সাথে মিলিত হয়ে একক জাতি গঠনের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারে নি। এটা খুবই স্বাভাবিক হল দুনিয়ার সমস্ত জাতিকে টেনে এনে আরবদের অভ্যন্তরণীয় রাজনীতির মধ্যে ফেলে দেয়া।
ইসলামের ইতিহাস সংক্রান্ত মুস্তফা কামালের তির্যক (কিছুটা একপট, মোটামুটি ভুল) দর্শন তার জাতীয়তাবাদী কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। নিজের তুর্কী পরিচয়কে নির্ভরযোগ্য দফা হিসেবে ব্যবহার করে তিনি সাবেক অটোমান অফিসারদের ১৯২০ সালের শুরুতে সংঘটিত তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধ তার নির্দেশের আওতায় ঐক্যবদ্ধ করেন এবং ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ এবং গ্রীকদের কাছ থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে দখল হওয়া নিজেদের তুর্কী ভূমি ফিরিয়ে আনেন। ১৯২২ সালের ভেতর কামাল তুরস্ককে পুরোপুরিভাবে বিদেশীদের দখলমুক্ত করেন। এই সুযোগ আঙ্কারায় গ্রান্ড ন্যাশনাল গঠনের কাজে লাগান। তুরস্কের আধুনিক প্রজাতন্ত্র গঠনের কাজে লাগান। তুরস্কের নির্বাচিত সরকার ছিলেন একজন প্রেসিডেন্ট। এক্ষেত্রে নিরপেক্ষ পছন্দ ছিল মুস্তফা কামাল, স্বাধীনতা যুদ্ধের মহানায়ক; যিনি আতাতুর্ক শিরোনামটি ধারণ করেন, যার অর্থ তুরস্কের পিতা।
অটোমান সাম্রাজ্য এবং খিলাফতের বিলুপ্তি
একদম প্রথম দিকে মনে হচ্ছিল নতুন তুর্কি সরকার হয়ত অটোমান সালতানাতের ধারাবাহিকতায় ইসলামের আরেক ধারকের ভূমিকাতেই অবর্তীণ হয়েছে। এ সময় প্রণীত একটি নতুন সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয় এবং বলা হয় যে, প্রতিটি আইন ইসলামিক আইন, বিশেষভাবে সমন্বয়ে গঠিত একটি প্যানেল দ্বারা অনুমোদিত হবে যাতে কোন আইন শরিয়তের সাথে সাংঘর্ষিক না হবার বিষয়টি নিশ্চিত হয়।
কিন্তু যতদিন ইস্তামবুলে অটোমান সুলতানের অধীনে আরেকটি প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার রয়েছে, ততদিন এই নতুন সরকার নিজের মত করে কাজ করে যেতে পারছিল না। আঙ্কারায় এভাবে ইস্তামবুলের দুই সরকারই তুরস্কের সার্বভৌম ক্ষমতা নিজেদের বলে দাবী করছিল এবং তাদের লক্ষ্যও এক ছিল না। মুস্তফা কামাল ১২৯৯ সাল থেকে শুরু হয়ে চলমান অটোমান সাম্রাজ্যের বিলোপ ঘটিয়ে ১৯২২ সালের ১লা নভেম্বর এর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে সমস্যার সমাধান করে ফেলেন। কিন্তু তিনি একদম সঙ্গে সঙ্গেই খিলাফতকে বিলুপ্ত করে ফেলেননি। বরং এর অস্তিত্বকে বিদ্যমান রাখার অনুমতি প্রদান করেন এবং অটোমান খলিফাকে কোন সরকারী ক্ষমতা ছাড়া শুধুমাত্র একটি প্রতীকী কাঠামো হিসেবেই বহাল রাখেন।
এই পদক্ষেপ তুর্কি জনগণের কাছে পছন্দণীয় হবে না এটা বুঝতে পেরে আতাতুর্ক নিজের কাজকে ন্যায্যতা দিতে থাকেন এভাবে যে, তিনি আসলে চিরায়ত ইসলামিক সরকার ব্যবস্থাতে ফিরে যাচ্ছেন। ৯ম থেকে ১৫ শতাব্দী পর্যন্ত অধিকাংশ আবাসিয়া খলিফাই মূলত ক্ষমতাহীন ছিল। প্রকৃত কর্তৃত্ব ছিল উজির আর সেনাপতিদের হাতে। আতাতুর্ক ক্ষমতাহীন খিলাফত সৃষ্টির পক্ষে এই উদাহরণ ব্যবহার করতে থাকেন।
নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাতের পর থেকে আবু বকর (রা:) কে মুসলিম বিশ্বের প্রথম নেতা হিসেবে নির্বাচিত করার মাধ্যমে খিলাফতের যে ধারা সূচীত হয়েছিল তার বিরুদ্ধে আতাতুর্কের এসমস্ত কার্যকলাপ তুরস্কের বাইরে অবস্থানরত মুসলমানদের কাছে স্পষ্ট আঘাত হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছিল। বিশেষ করে ভারতে বসবাসরত মুসলিমরা কড়া প্রতিবাদ জানায় এবং আন্দোলনের সূত্রপাত করে। তারা বিপদাপন্ন খিলাফত রক্ষায় তুর্কী সরকার অথবা বহি বিশ্বের সাহায্য দাবী করে।
বাইরের মুসলিমদের খিলাফতের জন্য এই সমর্থন প্রকাশকে কামাল আতাতুর্ক তুরস্কের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বহিঃবিশ্বের হস্তক্ষেপ হিসেবে উদ্বৃত্ত করেন এবং ১৯৪০ সালের ৩রা মার্চ আতাতুর্ক খিলাফতকেই বিলুপ্ত ঘোষণা করে এবং অটোমান পরিবারের অবশিষ্ট সকল সদস্যদের নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়।
ইসলামের ওপর আঘাত
আতাতুর্কের ইসলামের ওপর এ ধরনের আক্রমণ শুধুমাত্র সরকারী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল তা নয় বরং তুর্কীদের প্রাত্যহিক জীবনযাপন ও আতাতুর্কের ধর্মহীন নীতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল।
১. ইসলামী আদতে পাগড়ি বা টুপি পরা নিষিদ্ধ হয় এবং পশ্চিমা অনুকরণে হ্যাট পরিধান করতে বলা হয়।
২. হিজাবকে হাস্যকর বস্তু হিসেবে আখ্যায়িত করে সরকারী ভবনগুলোতে হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়।
৩. ইসলামিক ভিত্তি করে তৈরি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু করা হয়।
৪. ১৯৩২ সালে আরবিতে আযান দেয়া বেআইনি ঘোষণা করে দেশটির সকল মসজিদে বাধ্যতামূলক তুর্কি ভাষায় আযানের প্রচলন করা হয়।
৫. শুক্রবারের পরিবর্তে পশ্চিমা অনুকরণে শনি ও রবিবারকে সপ্তাহিক ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়।
এ ধরনের যাবতীয় পরিবর্তনের পরে, গ্রান্ড ন্যাশনাল এসেম্বলি ১৯৮ সালে হেঁয়ালি ছেড়ে দিয়ে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে সংবিধান থেকে মুছে ফেলে এবং আতার্তুক ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শ প্রতিস্থাপন করে।
ভাষা সংস্কার
আতাতুর্ক খুব ভাল করে বুঝতে পেরেছিলেন যে যদি তুর্কি জনগণ একযোগে প্রতিবাদ করতে শুরু করে তাহলে তার সমস্ত সংস্কার একদম বৃথা হয়ে যাবে। তুর্কিদের ইসলামের সঙ্গে বিজরিত ইতিহাস ছিল নতুন ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকী। নবম শতাব্দী থেকেই তুর্কিদের ইতিহাস ইসলামের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। নতুন প্রজন্ম যাতে ইতিহাস থেকে বহু দূরে অবস্থান করে সে জন্য আতাতুর্ক তুরস্কের অতীতকে দুস্পাঠ্য করে ফেলার প্রকল্প হাতে নিলেন।
প্রকৃতপক্ষে, ১৯২০ সালে তুর্কিদের শিক্ষার হার খুবই কম ছিল। শিক্ষার হার বাড়ানোর অজুহাতে আতাতুর্ক আরবী বর্ণমালার পরিবর্তে ল্যাটিন হরফ চালু করলেন। নবম শতাব্দীতে ইসলামের প্রবেশের ফলে পার্সিয়ানদের মতই তুর্কি ভাষা লেখা হতো আরবী বর্ণে। যেহেতু তুর্কিদের লিখিত সকল বই পুস্তক আরবী ভাষায় লিখিত ছিল, তাই তারা কুরআন এবং ইসলামী গ্রন্থাবলী বা আইনকানুন স্বচ্ছন্দের সাথে পড়তে পারত। ইসলামের সাথে তুর্কিদের সংযোগকে কামাল আতাতুর্ক মারাত্মক হুমকী মনে করলেন। ল্যটিন অক্ষর প্রচলন ছাড়াও আতাতুর্ক আরবী ও ফার্সি শব্দগুলোর তুর্কি প্রতিশব্দ বের করার জন্য একটি কমিশন গঠন করলেন। তার জাতীয়তাবাদী এজেন্ডার সাথে সঙ্গতি রেখে আতাতুর্ক একদম বিশুদ্ধ তুর্কি ভাষা চাচ্ছিলেন। অটোমান যুগে অপ্রচলিত হয়ে যাওয়া পুরোনো তুর্কি শব্দগুলোকে তিনি ফিরিয়ে আনার আদেশ প্রদান করেন।
আতাতুর্ক এর দৃষ্টিকোণ থেকে ভাষা সংস্কার ব্যাপক আকারে সফল হয়েছিল। কয়েক দশকের মধ্যে, পুরাতন অটোমান তুর্কি ভাষা কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। তুর্কিদের নতুন প্রজন্মের সাথে পুরোনো প্রজন্মের সহজতা ও দৈনন্দিন কথোপকথন কঠিন হয়ে পড়ল। নতুন প্রজন্ম তুরস্কের ইতিহাস সম্বন্ধে অজ্ঞ হয়ে পড়ার কারণে আতাতুর্ক সরকার জাতীয়বাদের পক্ষে সহায়ক ইতিহাস ইচ্ছেমতো মুখে তুলে গিলিয়ে দিল।
ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্ক
তুর্কিদের দৈনন্দিন জীবনাচরণ থেকে ইসলামকে বাদ দিয়ে ফেলার পেছনে এসব সংস্কার অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। তাদের নিজেদের ঐতিহ্য, ভাষা, আর ধর্ম সংস্করণের ধর্মীয় মানসিকতার তুর্কিদের (যেমন সাইদ নুসরী) সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকা স্বত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে ধর্মহীন নীতি গ্রহণে প্রচন্ড চাপ অব্যাহত ছিল। ৮০ বছরের বেশি সময় ধরে তুর্কি সরকার কট্টর ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখে। যখনই কোন সরকার ইসলামী মূল্যবোধে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে, তখনই আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির রক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সামরিক বাহিনী দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৯৫০ সালে, আদনান মেনদেরেজ আরবী আযান ফিরিয়ে আনার নির্বাচনী ইশতিহার দিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। যদিও তিনি সফল হয়েছিলেন কিন্তু ১৯৬০ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যূত করা হয় এবং দ্রুত ট্রাইবুনাল গঠন করে পরিকল্পিত বিচারের পর তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। ১৯৯৬ সালে নাজমুদ্দীন এরবাকন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে প্রকাশ্যে নিজেকে ইসলামপন্থী ঘোষণা দেন। ফলে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের পুনরাবৃত্তি হয় এবং ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র এক বছরের মাথায় তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।
ইসলাম এবং আধুনিক তুরস্কের মধ্যকার সম্পর্ক একটি জটিল আকার ধারণ করে আছে। সমাজের একাংশ দৃঢ়ভাবে আতাতুর্কের নীতিকে সমর্থন করে এবং বিশ্বাস করে যে, রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলামের কোন ভূমিকা নেই। সমাজের বাকী অংশ ইসলাম ভিত্তিক একটি সরকার এবং সমাজের প্রত্যাশা করে।
কামালের অজানা অধ্যায়
যে কামাল পাশা ক্ষমতার শীর্ষ আসনে বসে ইসলাম ও মুসলমান এবং ইসলামী সংস্কৃতি ধ্বংসের উদ্যোগ নেয় তার স্বভাব-ব্যবহারের অনেক কিছুই প্রচারের আড়ালে রয়ে গেছে। প্রথমত তার জন্মবিভ্রান্তি। কোনো কোনো জীবনীকার প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, ইহুদী বংশোদ্ভূত তার বাবার অনৈতিক অপকর্মের সন্তান তিনি। জীবনভর মুস্তফা কামাল অশ্লীলতার প্রতি আসক্ত ছিলেন। তাঁর নিজের ঘরে ত্রিশজন যুবতী ছিল, যাদেরকে তিনি কন্যা বলে ডাকতেন এবং তাদের জন্য অর্থ বরাদ্দ রেখেছিলেন। এ মেয়েরা তার ব্যক্তিগত পার্টিতে সারারাত নৃত্য ও মদপানে তাকে সঙ্গ দিতো। তিনি তার পুরুষ সেবাদাসদেরকে মহিলাদের পোষাক পরতে বাধ্য করতেন এবং তাদের সাথে মদপান করে নাচের আসরে নিজেও নাচতেন। একবার আযানে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিলেন তিনি এবং সাথে সাথে সেই মিনার ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দেন। যেখান থেকে আযানের সুর ভেসে আসছিল।
সারাটা জীবন এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও নিয়ন্ত্রণহীন পাপাচারে ডুবে থাকার পর জীবনের শেষ দিনগুলোতে মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক নিজের পরিণতি নিয়ে ভীতসন্ত্রস্ত থাকতেন এবং তার চারপাশে সার্বক্ষণিক অভিজ্ঞ চিকিৎসক রাখতেন। এত আয়োজনের পরও অদ্ভূত রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তিান লিভারে আক্রান্ত একটি রোগের পরিণতিতে তার পেট থেকে ইনজেকশনের মাধ্যমে সব পানি বের করতে হয়েছিল। তাতেও মুক্তি মেলেনি তার। মৃত্যুর আগের দিনগুলোতে সারা শরীরজুড়ে অদৃশ্য পোকার আক্রমণে তিনি অস্থির হয়ে পড়েন। চুলকানিতে তার গোটা শরীরের রঙ বদলে গিয়েছিল। কাপড় খুলে তিনি প্রায় উলঙ্গ হয়ে শুয়ে থাকতেন। শেষ পর্যন্ত এ রোগে তার চেহারায়ও ছড়িয়ে পড়ে। পরে দেখা যায়, এক ধরনের অতি ক্ষুদ্র লাল পিপঁড়া তাকে কামড়ে অতিষ্ঠ করে তুলছিল, যেগুলো আসল আবাস সুদূর চীনের বনে-জঙ্গলে।
প্রায় দুবছর অসহনীয় যন্ত্রণায় ভুগে ১৩৫৮ হিজরীতে ১৬ ই শাবান তথা ১৯৩৮ সালের নভেম্বর মাসের ১০ তারিখে তার মৃত্যু হয়েছিল। মৃত্যুর পর তার জানাযা নিয়ে বিভক্তি দেখা দেয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জানাযর বিপক্ষে এবং সেনাপ্রধান জানাযার পক্ষে অবস্থান নেয়। অবশেষে শরফুদ্দীন আফেন্দী নামের এক ভন্ড তার জানাযা পড়ান। যিনি নিজেও ছিল নিন্দিত এবং ঘৃণিত। অবাক বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, মৃত্যুর পর তুরস্কের শাসনকার্য পরিচালনার জন্য মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক যাকে মনোনীত করে রেখেছিলেন, তিনি ছিলেন তৎকালে তুরস্কে নিযুক্ত ইংল্যান্ডের দূত। এর মাধ্যমেই নিজের প্রভুদের কাছে তার দাসত্ব ও আনুগত্যের শেষ নজির রেখে গেলেন এ কুখ্যাত শাসক।
নৈতিকতা ও ইসলামের এত বড় জঘন্য অপরাধীর নামে আমাদের রাজধানী ঢাকায় সড়কের নামরকণ করা হয়েছে, লজ্জা ও বিবেচনা কোথায় ছিল কর্তাদের।
