প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১০ম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৬, জমা.সানী-রজব ১৪৩৭ হিজরী, চৈত্র-বৈশাখ ১৪২২ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
১. ক্রোধ বা রাগ সুন্দর আচরণ ও সচ্চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে একটি বিরাট অন্তরায়। ক্রোধ মানুষের হিতাহিত জ্ঞানকে তিরোহিত করে দেয়। ক্রোধ মানুষকে পাপাচার ও অনাচারে লিপ্ত করে। ক্রোধ বা রাগকে অবদমিত করে সহনশীলতা ও কোমলতা অবলম্বন করতে পারা আদর্শবান মানুষের একটি বিশেষ গুণ। কুরআন ও হাদীসে ক্রোধ বা রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং সহনশীলতা, ধৈর্য ও কোমলতার নীতি অবলম্বন করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
২. কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে :
وَالْكٰظِمِيْنَ الْغَيْظَ وَالْعٰفِيْنَ عَنِ النَّاسِ
তাদের (মুমিনদের) বৈশিষ্ট হল তাঁরা ক্রোধকে হজম করে এবং লোকদের সাথে ক্ষমার নীতি অবলম্বন করে।” (সূরা আলে ইমরান: ১৩৪ আয়াত)
৩. আল্লাহতায়ালা মুত্তাকী লোকদের প্রশংসা করে ইরশাদ করেন
وَ اِذَا مَا غَضِبُوْا هُمْ يَغْفِرُوْنَ
এবং যখন তারা ক্রোধান্বিত হয় তখন তারা মাফ করে দেয়। (সূরা আশ শুরা: ৩৭ আয়াত)
৪. রাগ করো না : হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললো: আমায় কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেন : রাগ করো না। লোকটি (একে যথেষ্ট মনে না করে) কথাটির কয়েকবার পুনারবৃত্তি করল। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার শুধু বললেন : রাগ করো না। (বুখারী)
৫. ক্রোধান্বিত না হলে জান্নাত : আবূ দারদা (রাঃ) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন, আমাকে এমন একটি কর্ম শিখিয়ে দিন যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। তিনি বলেন- তুমি ক্রোধান্বিত হবে না, তাহলেই জান্নাত তোমার প্রাপ্য হবে। (হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৮/৭০)
৬. রাগ ঈমান নষ্ট করে দেয় : অকারণে বা অযথা রাগ করলে ঈমান নষ্ট হয়ে যায়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : রাগ মানুষের ঈমানকে নষ্ট করে দেয়। যেমনিভাবে তিক্ত ফল মধুকে নষ্ট করে দেয়।(বায়হাকী)
৭. ক্রোধ নিয়ন্ত্রণকারী প্রকৃত বীর : ক্রোধের সময় ধৈর্য ধারণ করা ঈমানের অন্যতম দিক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : যে অপরকে মল্লযুদ্ধে পরাজিত করতে পারে সেই প্রকৃত বীর নয়, প্রকৃত বীর যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রিত রাখতে পারে। (বুখারী, আস-সহীহ ৫/২২৬৭; মুসলিম, আস-সহীহ ৪/২০১৪)
৮. ক্রোধ নিয়ন্ত্রণকারীর মর্যাদা : ইবনু উমার (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করবে আল্লাহ তার মর্যাদা রক্ষা করবেন ও দোষত্রুটি গোপন রাখবেন। বিরক্তি ও ক্রোধে উত্তেজিত অবস্থায় যদি কেউ রাগ প্রকাশের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা সম্বরণ করে, তবে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার হৃদয়কে পরিতৃপ্তি ও সন্তুষ্টি দ্বারা পূর্ণ করবেন। (হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৮/১৯১; আলবানী সহীহুল জামি ১/৯৭)
৯. জান্নাতের হুর : হযরত মুয়ায (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি ক্রোধ পূর্ণ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করে নেয় (অর্থাৎ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যার উপর ক্রোধ তাকে কোনো রকম শাস্তি না দেয়), আল্লাহতায়ালা কিয়ামতের দিন তাকে সমস্ত মাখলুকের সামনে ডাকবেন এবং অধিকার দিবেন যে, জান্নাতের হুরদের মধ্যে যে হুরকে ইচ্ছা পছন্দ করে নেয়। (আবু দাউদ)
১০. আযাবকে ফিরিয়ে রাখবেন : হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজের জবানকে বিরত রাখে, আল্লাহতায়ালা তার দোষত্রুটি গোপন রাখেন। যে নিজের ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণে রাখে, আল্লাহপাক কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি হতে নিজের আযাবকে ফিরিয়ে রাখবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার নিকট ওজর পেশ করে অর্থাৎ ক্ষমা চায়, আল্লাহ তার ওজর কবুল করে নেন। (বায়াহাকী, শুয়াবুল ঈমান)
১১. ক্রোধ দমন সর্বোত্তম : হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : বান্দা এমন কোনো কিছু পান করে না যা আল্লাহতায়ালার নিকট ক্রোধ পান করা (নিয়ন্ত্রণ করা) অপেক্ষা বেশি উত্তম; যা শুধু আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য সে পান করে থাকে। (মুসনাদে আহমাদ)
১২. যার কারনে ক্রোধের উদ্রেক হয়েছে তাকে ক্ষমা করা : ক্রোধের সময় আত্মনিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি যার কারণে ক্রোধের উদ্রেক হয়েছে বা যে কষ্ট দিয়েছে তাকে ক্ষমা করতে ও তার সাথে উত্তম আচরণ করতে বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কুরআন ও হাদীসে। বিশেষত যাকে শাস্তি দেওয়া সম্ভব সেইরূপ ব্যক্তিকে ক্ষমা করা অতীব প্রয়োজন।
