প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১১ম সংখ্যা, মে ২০১৬, রজব-শাবান ১৪৩৭ হিজরী, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

প্রকৃতিকভাবেই কিছু বিষয় সব মানুষ একমত হয়ে থাকে। সবাই এগুলো ভালোবাসে বা এগুলো পেলে খুশি হয়। আবার কিছু জিনিস এমন আছে যেগুলো অপছন্দ করার ব্যাপারে সবাই একমত। কেউ এগুলো পছন্দ করে না। আবার কিছু কিছু বিষয় এমন রয়েছে যেগুলোর ব্যাপারে মানুষের রুচিতে পার্থক্য দেখা যায়। কেউ কেউ তা পছন্দ করলেও অন্য কারো কারো কাছে তা বিরক্তিকর মনে হয়।
হাসিঝরা মুখ সবাই পছন্দ করে। মলিন বা রাশভারী চেহারা কেউ পছন্দ করে না। কিন্তু হাস্য রসিকতা? কেউ খুব পছন্দ করলেও অনেকের কাছে তা বিরক্তির কারণ বলে মনে হতে পারে। অনেক লোক এমন আছেন, যারা অন্যদের সাথে মিলেমিশে চলতে ভালোবাসেন। আবার অনেক লোক আছেন আত্মকেন্দ্রিক। তারা একা থাকতে পছন্দ করেন। কেউ ভালবাসে আড্ডা, কথাবার্তা ও গল্পগুজব ডুবে থাকতে আবার কেউ ভালবাসে নিজেকে নিয়েই মগ্ন থাকতে।
স্বভাবের এ ভিন্নতার কারণে প্রত্যেকেই সাধারণত এমন ব্যক্তির সঙ্গে চলতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করে, যার আচরণ তার স্বভাবের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। বস্তুতঃ মন ও রুচির মিল না হলে একসাথে শান্তিতে বসবাস করা যায় না। কথিত আছে, জনৈক ব্যক্তি একদিন একটি বাজপাখি ও একটি কাকের পাশপাশি উড়তে দেখলো। পাখির রাজা বাজকে একটা কাকের সাথে উড়তে দেখে লোকটি বেশ অবাক হলো। সে মনে মনে ভাবল, এদের মধ্যে নিশ্চয় কোনো বিষয়ে মিল আছে বলেই এরা একত্র হতে পেরেছে। সে পাখি দুটির প্রতি লক্ষ্য রাখতে লাগল। একসময় পাখি দুটি উড়তে উড়তে ক্লান্ত হয়ে মাটিতে নেমে এলো। লোকটি কাছে গিয়ে দেখলো, পাখি দুটি ল্যাঙড়া।
এজন্য প্রত্যেকের রুচি ও মেজাজ বুঝে আচরণ করা উচিত। মনে করুন, কারো পিতা নীরবতা ভালোবাসেন, বেশি কথাবার্তা তার ভাল লাগে না। তাহলে বাবার সঙ্গে কথা বলার সময় বিষয়টির প্রতি ছেলের খেয়াল রাখা উচিত। তাহলে বাবা সন্তুষ্ট হবেন। সে কাছে আসলে বাবা খুশি হবেন।
স্ত্রী যদি বুঝতে পারে, তার স্বামী রসিকতা পছন্দ করেন তাহলে সে তার সঙ্গে রসিকতা করতে পারে। নতুবা তা থেকে বিরত থাকবে। সহকর্মী, প্রতিবেশী তথা সবার ক্ষেত্রে রুচি ও স্বভাব বুঝে আচরণ করার এ কৌশল অবলম্বন করা দরকার। সব মানুষের স্বভাব ও রুচি, পছন্দ ও অপছন্দ এক নয়। মানুষের স্বভাব ও রুচির ভিন্নতার কোনো সীমারেখা নেই।
এক বৃদ্ধ ভদ্রমহিলার কথা আমি জানি। তিনি আমার এক বন্ধুর মা। ছেলেদের মধ্যে একজনকে তিনি খুব ভালবাসতেন। তার খুব বেশি প্রশংসা করতেন। এ ছেলে দেখা করতে আসলে বা তার সাথে কথা বললে তিনি খুব খুশি হতেন। অন্য ছেলেরাও মায়ের সঙ্গে সদাচরণ করত। তবু বৃদ্ধা তার ঐ ছেলের প্রতি বেশি অনুরাগী ছিল।
আমি এর তাৎপর্য ও রহস্যটা উদঘাটন করতে উদ্যোগী হলাম। একদিন আমার বন্ধুটির কাছে এ সম্পর্কে জানতে চাইলাম। সে আমাকে বললো, আসল কারণ হলো আমার ভাইয়েরা মায়ের রুচি ও মেজাজ বোঝে না। তাই তাদের উপস্থিতি মায়ের কাছে বিরক্তিকর ও ভারী মনে হয়।
আমি একটু রসিকতা করে বললাম, আচ্ছা! তাহলে আপনিই কি কেবল আপনার মায়ের রুচি ও মেজাজ বুঝতে পেরেছেন!
সে হেসে বললো, হ্যাঁ, আমি এর রহস্যটা তোমাকে বলছি। আমার আম্মাও অন্যান্য বৃদ্ধাদের মত মেয়েলি বিষয়ে কথা বলতে ও শুনতে পছন্দ করেন। যেমন মনে করেন, আমাদের পাড়ার কোনো মেয়ের বিয়ে হলো? তার স্বামী কেমন? অমুকের কয় সন্তান? তাদের মধ্যে বড় কে? তাদের প্রথম সন্তানের নাম কী? কার তালাক হলো? সে এখন কোথায় থাকে? এ জাতীয় আরো অনেক কথা যেগুলো আমরা অপ্রয়োজনীয় মনে করলেও আম্মা বারবার বলে ও শুনে আনন্দ পান। তার কাছে এসব বিষয়ের সংবাদ ও তথ্য অনেক দামী। কারণ এগুলো তো আমরা বই পত্র, অডিও সিডি বা ইন্টারনেট কোথাও পাব না!
আমি মায়ের কাছে গেলে এসব প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলি। মা খুশি হয়ে আমার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেন যেমন এসব তথ্য তিনিই প্রথম আমাকে সরবরাহ করেছেন। গল্প করতে করতে মা খুশিতে আটখানা হয়ে যান। তার মনের কথাগুলো আমার কাছে উজাড় করে দেন। আমিও একজন ভাল শ্রোতার অভিনয় করি। কিন্তু আমার ভাইয়েরা এসব মেয়েলি আলোচনা শুনতে বিব্রত বোধ করে। তারা মায়ের সঙ্গে এমন সব বিষয় নিয়ে কথা বলে যা তার ভাল লাগে না। তাই মা তাদের সাথে কথা বলতে পছন্দ করেন না। এজন্য মা আমাকে পেলে খুশী হন। এটাই হলো গুপ্ত রহস্য।
আপনিও যদি কারো পছন্দ ও অপছন্দের বিষয়গুলো জেনে নিতে পারেন এবং তার স্বভাব ও রুচিবোধ বুঝতে পারেন তাহলে আপনার জন্য তার মন জয় করা একদম সহজ হয়ে যাবে। মানুষের সঙ্গে রাসূলের আচরণ নিয়ে কেউ চিন্তা করলে সহজেই বুঝতে পারবে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেকের রুচি ও প্রকৃতি জেনে তার সঙ্গে সেভাবে আচরণ করতেন। এমনকি স্ত্রীগণের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রেও তা লক্ষ্য রাখতেন।
আয়িশা (রা) একটু চঞ্চল স্বভাবের ছিলেন। এ জন্য রাসূল তার সঙ্গে একটু বেশি রসিকতা করতেন। এক সফরে আয়েশা (রা) রাসূলের সঙ্গে ছিলেন। ফেরার পথে কাফেলা যখন মদিনার কাছা-কাছি পৌঁছল , রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্যান্য সাহাবীদের বললেন, তোমরা আগে চলে যাও। রাসূলের আদেশে সবাই আগে চলে গেল। রাসূলের সাথে শুধু আয়েশা (রা) থেকে গেলেন। তিনি ছিলেন অল্পবয়সী এক প্রাণচঞ্চল কিশোরী। রাসূল মজা করার জন্য বললেন, আয়েশা! চলো, আমরা দৌঁড়ের প্রতিযোগিতায় নামি! আয়েশা (রা) সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে দৌঁড়াতে শুরু করলেন। একপর্যায়ে তিনি রাসূলকে পেছনে ফেলে সামনে চলে গেলেন।
অনেক দিন পরের কথা । এক সফরে তিনি রাসূলের সঙ্গী হলেন। তখন আয়েশা (রা) এর বয়স কিছু বেড়েছে। শরীরও যথেষ্ট ভারী হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবারও সঙ্গীদের বললেন, তোমরা আগে চলে যাও।
সবাই সামনে চলে গেল। রাসূল আয়েশাকে বললেন, এসো, আজ আবার তোমার সঙ্গে দৌঁড় প্রতিযোগিতা হবে! সেদিনের মতো আজও আয়েশা দৌঁড়াল। কিন্তু আজ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশাকে পেছনে ফেলে আগে চলে গেলেন। এরপর রসিকতা করে তার দুই কাঁধের মাঝে হাত রেখে বললেন, আয়েশা! এটা সেদিনের বিনিময়।
অন্যদিকে খাদিজা (রা) এর সঙ্গে রাসূলের আচরণ ছিল অন্যরকম। কারণ, বয়সে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চেয়ে পনেরো বছরের বড় ছিলেন।
সাহাবীদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রেও তিনি তাদের স্বভাবের প্রতি লক্ষ্য রাখতেন। তাই তিনি আবূ হুরাইরা (রা)-এর সঙ্গে সে আচরণ করেন নি যে আচরণ খালিদ (রা) এর সঙ্গে করেছেন। আবূ বকর (রা) এর সঙ্গে যেরূপ ব্যবহার করেছেন, তালহা (রা) এর সঙ্গে সেরূপ ব্যবহার করতেন তাকে এমন অনেক কাজে সমর্থন করতেন, যা অন্য কারো ক্ষেত্রে করতেন না। এমন অনেক কিছু তার ওপর অর্পণ করতেন, যা অন্য কারো ওপর অর্পণ করতেন না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের নিয়ে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন। ইতোমধ্যে তিনি জানতে পারলেন, কোরাইশরাও অনেক লোকবল নিয়ে এগিয়ে আসছে। কিন্তু কোরাইশদের মধ্যে এমন কিছু লোকও আছে, যাদেরকে রণাঙ্গণে আসতে বাধ্য করা হয়েছে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেন, আমি জানতে পেরেছি, বনু হাশেম ও অন্যান্য গোত্রের কিছু কিছু লোক অনিচ্ছা সত্ত্বেও রণাঙ্গনে আসতে বাধ্য হয়েছে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। সুতরাং বনু হাশেমের কেউ তাদের সামনে পড়ে গেলে তাকে যেন হত্যা না করা হয়। আবূল বুখতারী বিন হিশামকে কেউ যদি দেখে তাহলে তাকে যেন হত্যা না করে। আব্বাস বিন আব্দুল মোত্তালিবকেও কেউ যেন হত্যা না করে। কেননা, সেও অনিচ্ছা সত্ত্বেও ময়দানে আসতে বাধ্য হয়েছে।
আব্বাস (রা) আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তিনি যেন কোরাশইদের সঙ্গে থেকে তাদের বিভিন্ন কার্যক্রম ও সিদ্ধান্তসমূহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবগত করাতে পারেন এ কারণে বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন। এ জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি গোপন রাখতে চাচ্ছিলেন। আবার কোনো মুসলমান যেন তাকে হত্যা না করে সে বিষয়টিও নিশ্চিত করলেন।
বদর যুদ্ধ মুসলমান ও কাফের কোরাইশদের মধ্যে সংঘটিত প্রথম যুদ্ধ। মুসলমানরা ছিল অপ্রস্তুত। দ্বীনের জন্য মুসলমানরা হাতিয়ার নিয়ে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে নিজের পিতা, পুত্র কিংবা কোনো আত্মীয়ের বিরুদ্ধে। এ চরম মূহূর্তে রাসূল বিশেষ কিছু লোককে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন।
ওতবা বিন রাবিয়া ছিল কোরাইশদের অন্যতম নেতা ও বদর যুদ্ধের কাফের বাহিনীর অন্যতম সেনানায়ক। তার পুত্র হোযায়ফা বিন ওতবা মুসলমান। আবূ হোযায়ফা (রা) হঠাৎ বলে ফেললেন, আমরা আমাদের পিতা, পুত্র ও ভাইদেরকে হত্যা করব আর আব্বাসকে ছেড়ে দেব! আমার সামনে যদি সে পড়ে তাহলে তাকে আমি ছাড়ব না।
তার একথাগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কানে গেল।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দিকে তাকালেন। তার চারপাশে তিনশত বীরযোদ্ধা। কিন্তু রাসূলের দৃষ্টি বিশেষভাবে ওমরের ওপর পড়ল। তিনি অন্য কারো দিকে না তাকিয়ে বললেন, আবূ হাফস! আল্লাহর রাসূলের চাচার চেহারায় তরবারি দ্বারা আঘাত করা হবে?
ওমর (রা) বলেন, সেদিনই প্রথম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে আবূ হাফস উপনামে সম্বোধন করলেন।
ওমর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইঙ্গিত বুঝতে পারলেন। তিনি জানতেন, তারা এখন যুদ্ধের ময়দানে। সেনাপতির সিদ্বান্তের বিরোধীতাকারীর সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে সামান্য শিথীলতারও কোনো সুযোগ নেই। সঙ্গে সঙ্গে ওমর একটি দৃঢ় সমাধানের পথ বেছে নিলেন। তিনি হুঙ্কার ছেড়ে বললেন, আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে অনুমতি দিন, আমি তরবারি দিয়ে ওর মাথা উড়িয়ে দিই।
আবু হুযায়ফা (রা) ভাল মানুষ ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বলতেন, সেদিন আমি যে কথা বলেছিলাম তার কারণে আমি আজও নিজেকে নিরাপদ মনে করি না। আর আমি ততদিন ভীত সন্ত্রস্ত থাকব যতদিন না শাহাদাত লাভের মাধ্যমে আমার এ অপরাধের কাফফারা হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা তার আশংকা দূর করেছেন। তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শাহাদাতবরণ করেন।
এ হলেন ওমর। রাসূল ভালভাবেই জানতেন, কোনো ধরনের কাজের দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করতে হবে। বিষয়টি রাজস্ব আদায় করা, বিবাদমান দুদলের মধ্যে মীমাংসা করা কিংবা কোনো অজ্ঞ ব্যক্তিকে শিক্ষা প্রদান করার মতো ছিল না; বরং এটি ছিল রণাঙ্গনের একটি কঠিন সিদ্ধান্তের বিষয়। এক্ষেত্রে প্রভাব ও দৃঢ়তার অধিকারী ব্যক্তির দরকার ছিল। এজন্য রাসূল ওমরকেই এ কাজের জন্য নির্বাচন করেছিলেন। পরামর্শ স্বরূপ তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম: আবূ হাফস! আল্লাহর রাসূলের চাচার চেহারায় তারবারি দ্বারা আঘাত করা হবে?
আরেকটি ঘটনা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। সামান্য প্রতিরোধের পর খায়বারের ইহুদিরা রাসূলের সঙ্গে সন্ধি করলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বারে প্রবেশ করলেন। রাসূল শর্ত দিলেন, ইহুদিদের কেউ কোনো সহায়-সম্পদ, সোনা-রূপা, ধন-দৌলত লুকাতে পারবে না। সবকিছু উপস্থিত করতে হবে। এ ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সিন্ধান্ত দেবেন তা সবাই নির্দ্বিধায় মেনে নেবে। তবে কেউ যদি কিছু লুকিয়ে রাখে তাহলে মুসলমানগণ সন্ধিচুক্তি মানতে বাধ্য নয়।
হুয়াই বিন আখতাব ইহুদিদের অন্যতম সরদার। নির্বাসিত হয়ে মদিনা থেকে খায়বারে আসার সময় সে ছাগলের চামড়া সেলাই করে থলে বানিয়ে তাতে স্বর্ণ রূপা ও অলঙ্কারাদি নিয়ে এসেছিল। এসব মাল রেখেই হুয়াই মারা যায়। কিন্তু ইহুদিরা সেগুলো লুকিয়ে রাখল। হুয়াই এর চাচাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, বনু নযীর থেকে হুয়াই যা নিয়ে এসেছিল তা কোথায়?
হুয়াই এর চাচা বললো, যুদ্ধ ও পারিবারিক ব্যয়ের খাতে খরচ হয়ে গেছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভেবে দেখলেন, হুয়াই বিপুল পরিমাণে সম্পদ এনেছিল। আর খায়বারে কোনো যুদ্ধবিগ্রহও হয় নি। এতো বিশাল ধনভান্ডার এতো তাড়াতাড়ি শেষ হওয়ার কথা না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, তোমরা মদিনা থেকে এসেছ বেশি দিন হয় নি। আর সম্পদ তো সামান্য পরিমাণে নয় যে এতো দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।
হুয়াই এর চাচা জবাব দিল, বিশ্বাস করুন, সব শেষ হয়ে গেছে। কিছুই নেই।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট বুঝে ফেললেন, লোকটি মিথ্যা বলছে। রাসূল সাহাবীদের দিক তাকালেন। বহুসংখ্যক সাহাবী সেখানে উপস্থিত। সবাই তার ইঙ্গিতর অপেক্ষায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুবাইর বিন আওয়ামকে নির্বাচন করলেন। বললেন, যুবাইর! বেটা এমনিতে কিছু বলবে না, একটু শাস্তির প্রয়োজন। যুবাইর (রা) সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে রুদ্র মূর্তি ধারণ করে এগিয়ে গেলেন।
যুবাইরের ভয়ানক রূপ দেখে ইহুদি ভয়ে কাঁপতে লাগল। সে বুঝতে পারল, সত্য না বলে উপায় নেই। অনন্যোপায় হয়ে সে বললো, হুয়াইকে প্রায়ই দেখতাম, ঐ ধ্বংসস্তুপের কাছে আসা যাওয়া করত। সাহাবীরা সেখানে তল্লাশি চালালেন। অবশেষে বেরিয়ে এলো হুয়াই এর গুপ্তধন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুবাইর (রা) কে এমন ক্ষেত্রেই ব্যবহার করতেন। ধনুক তার হাতেই সাজে যে এর সঠিক ব্যবহার জানে।
সাহাবায়ে কিরামও পারস্পারিক আচরণের ক্ষেত্রে এ নীতিরই অনুসরণ করে চলতেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত। রোগযন্ত্রণায় নামাযের ইমামতি করতে পারছেন না। এ অবস্থায় তিনি সাহাবীদের বললেন, তোমরা আবূ বকরকে নামাযের ইমামত করতে বল।
আবূ বকর (রা) তো ছিলেন অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের মানুষ, তাছাড়া তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একনি সঙ্গী, নবুওয়াত পূর্ব ও পরবর্তী উভয় যুগের পরম বন্ধু, নবী-পতœী আয়েশা সিদ্দীকা (রা)-এর পিতা । তাই রাসূলের রোগ যন্ত্রণা আবূ বরক সিদ্দীকের জন্য ছিল পাহাড়ের চেয়ে ভারী।
রাসূল যখন আবূ করব (রা) কে ইমামতি করার নির্দেশ পাঠালেন, তখন উপস্থিত সাহাবীদের কেউ কেউ বললেন, আবূ বকর তো কোমল স্বভাবের মানুষ। তিনি আপনার স্থানে দাঁড়ালে বিশেষ করে বর্তমান অবস্থায় আবেগ ও কান্নার ভারে নামায পড়াতে পারবেন না।
কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ আদেশের মাধ্যমে এ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করতে চাচ্ছিলেন যে, তার ইন্তেকালের পর খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার অধিক উপযুক্ত ব্যক্তি কে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাই আবার আদেশ করলেন, তোমরা আবূ বকরকে নামাযের ইমামতি করতে বল। অবশেষে আবূ বকর নামায পড়ালেন। স্বভাবগত কোমলতা থাকা সত্ত্বেও তিনি সঠিকভাবেই আপন দায়িত্ব পালন করলেন।
কোমল স্বভাবের হলেও আবূ বকর (রা) এর ব্যক্তিত্ব যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিল। তার কোমল স্বভাবের ভেতরে সবময়তো গর্জে ওঠার বিশেষ গুণ সুপ্ত ছিল। তার সারা জীবনের সহযাত্রী ওমর (রা) বিষয়টি বহুবার খেয়াল করেছেন।
ইতিহাসের পাতায় একটু নজর দিয়ে দেখুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইন্তেকালের পর মুহাজির ও আনসার সাহাবীগণ বনু সাঈদার আঙিনায় সমবেত হয়েছেন। এখন মুসলিম জাহানের খলিফা কে হবে তা নির্ধারণ করা হবে। ওমর রাযি আবূ বকর (রা) সহ সেখানে হাজির হলেন। ওমর (রা) বলেন, আমরা বনু সাইদার প্রাঙ্গনে উপস্থিত হই। সেখানে গিয়ে দেখি একজন আনসারী সাহাবী বক্তব্য দিচ্ছেন। তিনি বললেন, …….. আমরা আল্লাহ তাআলার দ্বীনের সাহায্যকারী দল ও ইসলামের অগ্রসেনা। আমাদের মুহাজির ভাইয়েরা! আপনারা হলেন আমাদের সাহায্যকারী দল। আপনাদের কেউ কেউ আমাদের শেকড় উপড়ে ফেলতে চায় এবং খেলাফতের দায়িত্ব ছিনিয়ে নিতে চায়।

(বাকী অংশ পরবর্তী সংখ্যায়)