প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৭ম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৬, রবি আউঃ-রবি সানি ১৪৩৭ হিজরী, পৌষ-মাঘ ১৪২২ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
সূরা নূরে মুমিন-মুমিনা সকলকেই দৃষ্টি সংযমের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দৃষ্টি সংযমের দুটি দিক রয়েছে। কিছু বিষয় দেখা হারাম বা নিষিদ্ধ। এরূপ বস্তু থেকে দৃষ্টিকে সর্বাবস্থায় সংযত রাখতে হবে। অন্য অনেক বস্তু আছে যা দেখা মূলত বৈধ। তবে মনের মধ্যে ওয়াসওয়াসা, খারাপ ধারণা বা খারাপ ইচ্ছা জাগলে সেগুলিও না দেখে দৃষ্টি সংযত করতে হবে।
উপরে হানাফী মাযহাবের ইমাম ও ফকীহগণের বক্তব্যে আমরা দেখেছি যে, দেহের যে অংশ আউরাত বা আবৃতব্য নয় তা উন্মুক্ত রাখা যেমন বৈধ, তেমনি অন্যের জন্য তা দেখাও বৈধ। তবে দৃষ্টিপাতের ফলে অবৈধ কামনার জন্ম হলে দৃষ্টিপাত না করে দৃষ্টি সংযম করতে হবে। এজন্যই তারা পুরুষের জন্য অনাত্মীয় বা দূরাত্মীয় মহিলার মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয়ের প্রতি দৃষ্টিপাতের অনুমতি দিয়েছেন এবং অবৈধ কামনার ভয় হলে দৃষ্টি সংযত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। অনুরূপভাবে তারা মহিলার জন্য পর-পুরুষের নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ বাদে বাকি দেহ অনাবৃতভাবে দেখা বৈধ বলে উল্লেখ করেছেন; তবে অবেধ কামনার ভয় হলে দৃষ্টি সংযত করতে বলেছেন।
নারীর ক্ষেত্রে ইমাম মুহাম্মাদ ইমাম আবু হানিফার মত বর্ণনা করে বলেছেন: একজন মহিলা বিবাহ-বৈধ এরূপ বেগানা পুরুষের মুখ, মাথা ও দেহের অন্যান্য অঙ্গ সব দেখতে পারবে, শুধু নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ বাদে; কারণ তা আউরাত বা আবৃতব্য গুপ্তাঙ্গ।… তবে যদি দৃষ্টিতে অবৈধ কামনা থাকে বা মহিলা ভয় পায় যে, তার দৃষ্টি অবৈধ কামনার সৃষ্টি করবে তবে আমি ভাল মনে করি যে, সে তার দৃষ্টি সংযত করবে।
আল্লামা কুদূরী বলেছেন, পুরুষ পুরুষের নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ বাদে বাকি দেহের সকল স্থান দেখতে পারবে। পুরুষ পুরুষের দেহের যে অংশ দেখতে পারে, নারীও পুরুষের দেহের সে অংশ দেখতে পারবে।
অন্যান্য সকল হানাফী ফকীহ এরূপই বলেছেন। তবে হাদীসের আলোকে এ বিষয়ে কিছু মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। তাবিয়ী ইবনু শিহাব যহরী বলেন, তাকে নব পত্নী উম্মু সালামার (রা:) খাদেম নাবহান বলেছেন, তাকে উম্মু সালামা (রা:) বলেছেন,
তিনি এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্য স্ত্রী মাইমুনা (রা:) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট ছিলেন। তিনি বলেন, আমরা তার নিকট থাকা অবস্থায় ইবনু উম্মি মাকতুম (রা:) আসলেন এবং তার ঘরে প্রবেশ করলেন। এ ঘটনা ঘটেছিল আমাদের হিজাব (পর্দার আড়াল থেকে কথাবার্তা ও লেনদেন) করার নির্দেশ নাযিল হওয়ার পরে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে বললেন, তোমরা দুজন তার থেকে আড়ালে চলে যাও। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, তিনি কি অন্ধ নন? তিনি তো আমাদেরকে দেখছেন না এবং চিনেনও না। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমরা দুজন কি অন্ধ? তোমরা কি তাকে দেখছ না।’ (তিরমিযী, আস-সুনান ৫/১০২, আবু দাউদ, আস-সুনান ৪/৬৩)
হাদীসটি উদ্ধৃত করে ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে সহীহ বলে উল্লেখ করেছেন। পক্ষান্তরে ইবনু আব্দুল বারর ও অন্যান্য কতিপয় মুহাদ্দিস হাদীসটির সনদের দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেছেন। কারণ হাদীসটির একমাত্র বর্ণনাকারী নাবহান নামক এ ব্যক্তি, যিনি নিজেকে উম্মু সালামার খাদিম বলে দাবি করেছেন। এ ব্যক্তির বিশ্বস্ততা মাজহুল বা অজ্ঞাত। সমসাময়িক বা ২য়-৩য় শতকের কোনো মুহাদ্দিস তার পরিচয় ও বিশ্বস্ততার পক্ষে বা বিপক্ষে কিছু বলেন নি। তার থেকে ইবনু শিহাব যুহরী ছাড়া অন্য কোনো মুহাদ্দিস হাদীস বর্ণনা করেছেন বলে জানা যায় না। ইবনু শিহাব এই নাবহান থেকে এ হাদীসটি এবং অন্য আরেকটি হাদীস বর্ণনা করেছেন, দুটির অন্য কোনো ভিত্তি পাওয়া যায় না। এরূপ যে সকল অজ্ঞাত পরিচয় রাবীর বিষয়ে কোনো মুহাদ্দিস আপত্তিকর কিছু বলেন নি, চতুর্থ হিজরী শতকের মুহাদ্দিস ইবনু হিব্বান বুসতী (৩৫৪হি) তাদেরকে গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করতেন। একমাত্র তিনিই এই নাবহান-কে নির্ভরযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন। ইবনু হাজার আসকালানী নাবহানকে মাকবুল হিসেবে গণ্য করেছেন। অর্থাৎ অন্যান্য বর্ণনার সমর্থনে তার বর্ণনা বিচার্য, তবে শুধু তার বর্ণিত হাদীস দুর্বল বলে গণ্য হবে। এ কারণে এ সনদটিকে দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছেন কোনো কোনো মুহাদ্দিস। তবে ইমাম নববী এ সকল মুহাদ্দিসের মত অগ্রাহ্য করে হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। (ইবনু আব্দুল বারব, আত-তামহীদ ১৯/১৫৫; নববী, শারহু সাহীহ মুসলিম ১০/৯৭)
এ হাদীসের আলোকে অনেক ফকীহ মত প্রকাশ করেছেন যে, পুরুষের দেহের প্রতি নারীর দৃষ্টিপাত বৈধ নয়। ইমাম শাফিয়ী থেকে অনুরূপ একটি মত বর্ণিত হয়েছে। ইমাম নববী ও শাফিয়ী মাযহাবের অন্য অনেক ফকীহ এ মতটি গ্রহণ করেছেন। (ইবনু হাজার আসকালানী, তাহযীবুত তাহযীব ১০/৩৭২; তাকরীবুত তাহযীব, পৃ. ৫৫৯; তালখীসুল হাবীর ৩/১৪৮; আলবানী, জিলবাব, পৃ. ৬৬। শাওকানী, নাইলুল আওতার ৬/২৪৮-২৯৪)
অন্য হাদীসে মহিলা সাহাবী ফাতিমা কিনতু কাইস (রা:) বলেন, (তার স্বামী) আবু আমর ইবনু হাফস প্রবাস থেকে তাকে চূড়ান্ত তালাক প্রদান করেন (তিন তালাকের সর্বশেষ তালাকটি প্রদান করেন)…তখন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে তাকে বিষয়টি জানান। তিনি তাকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, তুমি উম্মু শারীকের বাড়িতে যেয়ে ইদ্দত পালন করে। উম্মু শারীক একজন ধনাঢ্য আনসারী মহিলা ছিলেন। তিনি আল্লাহর রাস্তায় অনেক ব্যয় করতেন। তার বাড়িতে অনেক মেহমান আসতেন। ফাতিমা বলেন, আমি বললাম, আমি উম্মু শারীকের বাড়িতেই ইদ্দত পালন করব। তখন তিনি বললেন, না, তা করো না। কারণ উম্মু শারীকের বাড়িতে অনেক মেহমান আসেন। আমার সাহাবীগণ তার বাড়িতে মেহমান হিসেবে গমন করেন। আমি ভয় পাই যে, তোমার মাথার ওড়না পড়ে যাবে বা তোমার পায়ের নলা থেকে কাপড় উঠে যাবে, ফলে উপস্থিত মেহমানগণ তোমার দেহের কিছু অংশ দেখে ফেলবে, যা তুমি অপছন্দ কর। বরং তুমি তোমার গোত্রীয় চাচাতো ভাই আব্দুল্লাহ ইবনু উম্মি মাকতুমের বাড়িতে যেয়ে ইদ্দত পালন কর; কারণ সে অন্ধ মানুষ, তুমি তোমার পোশাক খুলে রাখতে পারবে। তুমি তোমার মাথার ওড়না খুলে রাখলে সে তোমাকে দেখবে না।… আমার ইদ্দত শেষ হলে আমি শুনলাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষ থেকে একজন সালাতের ঘোষনা দিচ্ছে.. সালাত শেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তামীম দারীর ইসলাম গ্রহণ ও দাজ্জালের ঘটনা বর্ণনা করেন….। (মুসলিম, আস-সহীহ ২/১১১৪-১১২০, ৪/২২৬১; আলবানী, জিলবাব, পৃ. ৬৬)
এ হাদীসের আলোকে ইমাম আবু হানীফা, তার অনুসারীগণ এবং মালিকী, শাফিয়ী ও হাম্বালী মাযহাবের অনেক ফকীহ ও অন্যান্য অনেক ফকীহ ও মুহাদ্দিস মত প্রকাশ করেছেন যে, মহিলার জন্য পুরুষের নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত স্থান ছাড়া দেহের বাকিঅংশ দেখা বৈধ। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফাতিমা বিনতু কাইসকে আব্দুল্লাহ ইবনু উম্মি মাকতুমের বাড়িতে ইদ্দত পালনের অনুমতি দিয়েছেন। স্বভাবতই বাড়ির মধ্যে ইবনু উম্মি মাকতুম আওরাত বা আবৃতব্য গুপ্তাঙ্গ ছাড়া অবশিষ্ট দেহ অনাবৃত অবস্থাতেই থাকতেন। বিশেষত, মুখ তো পুরুষেরা সর্বদায় অনাবৃত রাখেন। তিনি স্পষ্টতই বলেছেন, ফাতিমার মাথার ওড়না সরে গেলে আব্দুল্লাহ অন্ধ হওয়ার কারণে তা দেখবে না। ফাতিমা তো অন্ধ ছিলেন না, কাজেই তিনি আবদুল্লাহর মুখ, বা অনাবৃত মাথা, কাঁধ, পিঠ, বুক ইত্যাদি দেখবেন এটাই স্বাভাবিক। এগুলি দেখা অবৈধ হলে কখনোই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফাতিমাকে তার বাড়িতে ইদ্দত পালনের নির্দেশ দিতেন না। অসাবধানতায় মেহমানদের সামনে মাথার ওড়না সরে যাওয়ার সম্ভাবনার চেয়ে পুরুষের বাড়িতে অবস্থান করলে বারংবার তার অনাবৃত দেহ দেখার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এরূপ দর্শন থেকে আত্মরক্ষা করার চেয়ে বাড়িতে আগত মেহমানদের থেকে নিজেকে আড়াল রাখা অনেক বেশি সহজ ও স্বাভাবিক।
সকল মুহাদ্দিস একমত যে, সনদের দিক থেকে দ্বিতীয় হাদীস অধিকতর শক্তিশালী ও ত্রটিমুক্ত। এজন্য অনেকে সনদের ভিত্তিতে প্রথম হাদীসটির পরিবর্তে দ্বিতীয় হাদীসটির উপর নির্ভর করেছেন। অন্য অনেকে হাদীস দুটির অর্থের মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা করেছেন।
হাদীসদ্বয়ের মধ্যে সমন্বয় করে ইমাম আবু দাউদ, আল্লামা ইবনু আব্দুল বারব, আল্লামা মুনযিরী, হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী প্রমুখ মুহাদ্দিস ও ফকীহ বলেন যে, অন্ধের থেকে নিজেদেরকে আড়াল করার এ নির্দেশ শুধু নবী-পতœগণের জন্য। কুরআন কারীমে আল্লাহ স্পষ্টতই উল্লেখ করেছেন যে, উম্মুল মুমিনীনগণ সাধারণ মহিলাদের সমতুল্য নন। (সূরা আহযাব, ৩২ আয়াত) এজন্য তাদের জন্য অতিরিক্ত ও বিশেষ পর্দার বিধান ছিল। পক্ষান্তরে অন্যান্য সকল মহিলার জন্য অন্ধের থেকে আড়াল হওয়ার বিধান প্রযোজ্য নয়। তারা পুরুষদের দৃষ্টি থেকে নিজেদের আউরাত আবৃত করবেন, তবে পুরুষদের আউরাত ছাড়া অন্য অঙ্গের প্রতি দৃষ্টিপাত তাদের জন্য অবৈধ নয়।
দৃষ্টি সংযমের বিষয়টি উভয় হাদীসের অনুপস্থিত। আমরা যদি মনে করি যে, ফাতিমা ৩/৪ মাস দৃষ্টি সংযত করে থাকবেন শর্তেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ইবনু উম্মি মাকতুমের বাড়িতে ইদ্দত পালন করতে নির্দেশ দেন; সেক্ষেত্রে প্রশ্ন থাকে, কিছু সময়ের জন্য দৃষ্টি সংযত করে উম্মুল মুমিনীদ্বয়কে তথায় অবস্থান করতে তিনি বাধা দিলেন কেন? এ থেকে বুঝা যায় যে, অতিরিক্ত ও বিশেষ পর্দার কারণেই তিনি উম্মুল মুমিনীনদ্বয়কে এ নির্দেশ দেন। এজন্যই আমরা দেখছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবনু উম্মি মাকতুম থেকে নিজেদেরকে আড়াল করতে উম্মুল মুমিনীনদ্বয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। আবার সেই ইবনু উম্মি মাকতুম দেখতে পায় না বলে তার সামনে নিজের মাথার ওড়না খোলার ও তার বাড়িতে উদ্দত পালনের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি ফাতিমা ইবনু কাইসকে। (আবু দাউদ, আস-সুনান ৪/৬৩; ইবনু আব্দুল বারর, আত-তামহীদ ১৯/১৫৪৬; ইবনু হাজার আসকালানী, তালখীসুল হাবীর ৩/১৪৮; ফাতহুল বারী ১২/৩৭; শাওকানী, নাইলুল আওতার ৬/২৪৮-২৪৯)
আল্লামা ইবনু হাজার আসকালানী বলেন, অন্ধের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা থাকে যে, অসাবধানতার কারণে বা অন্ধ হওয়ার কারণে অন্ধের দেহের অপছন্দনীয় কোনো অংশ হয়ত প্রকাশিত হয়ে যাবে, অথচ সে তা বুঝতে পারবে না। সম্ভবত এজন্য সাবধানতামূলকভাবে অন্ধের সামনে থেকে আড়ালে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম । এর দ্বারা প্রমাণিত হয় না যে, নারীর জন্য পুরুষের দিকে দৃষ্টিপাত করা সাধারণভাবে অবৈধ বা নিষিদ্ধ। (ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৯/৩৩৭; শাওকানী, নাইলুল আওতার ৬/২৪৯)
অন্য হাদীসে আয়েশা (রা:) বলেন,
আমি দেখেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে তার চাদর দিয়ে আমাকে পর্দা করছিলেন এবং আমি ইথিওপীয়-হাবশীদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, তারা মসজিদের মধ্যে তাদের সড়কি-বল্লম নিয়ে খেলা করছিল। অতঃপর যতক্ষণ না আমি নিজে ক্লান্ত হতাম ততক্ষণ তিনি আমার জন্য এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকতেন। কাজেই তোমরা অল্পবয়স্কা খেলাধুলা-প্রিয় মেয়ের মর্যাদা-গুরুত্ব অনুধাবন করবে। (বুখারী, আস-সহীহ ১/১৭৩, ৫/২০০৬; মুসলিম, আস-সহীহ ২/৬০৮-৬০৯)
এ হাদীসেও স্পষ্টত প্রমাণ করে যে, মহিলাদের জন্য পুরুষদের অনাবৃত মুখ ও দেহের দিকে দৃষ্টিপাত অবৈধ নয়। এ হাদীসে আয়েশা নিজেকে অল্পবয়স্কা বলে উল্লেখ করেছেন। এ থেকে কোনো কোনো মুহাদ্দিস মনে করেছেন যে, এ সময়ে তিনি অপ্রাপ্তবয়স্কা ছিলেন এবং তার উপর পর্দা ফরয ছিল না। কারণ তিনি ৯/১০ বছর বয়সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর সংসারে আগমন করেন। কিন্তু এখানে দুটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। প্রথমত, হাদীসে স্পষ্টতই বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে নিজের চাদর দিয়ে পর্দা করছিলেন। এতে বুঝা যায় যে, এ ঘটনাটি পর্দার বিধান নাযিলের পরে ঘটেছিল এবং এ সময়ে আয়েশার (রা:) উপর পর্দা ফরয ছিল। দ্বিতীয়ত, এ হাদীসের কোনো কোনো বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ ঘটনা ঘটেছিল ইথিওপীয়া বা হাবশা থেকে মুসলিম প্রতিনিধিদের আগমনের পরে। তারা ৭ম হিজরীতে ইথিওপীয়া থেকে মদিনা আগমন করেন। তখন আয়েশা (রা:)-এর বয়স ছিল ১৬ বছর এবং পর্দার বিধান এর অনেক আগেই নাযিল হয়েছিল। (ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৯/৩৩৬)
এখানে অন্য একটি মূলনীতি রয়েছে। দেহের যা দর্শন করা মূলতই নিষিদ্ধ তা আবৃত করা ফরয। আর যা অনাবৃত করা বৈধ তা মূলত দর্শন করা বৈধ। এজন্য ইমাম গাযালী, আল্লামা ইবনু হাজার আসকালানী প্রমুখ আলিম উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগ থেকে সর্বদা ও সর্বত্র মেয়েরা বাইরে যাচ্ছেন। মসজিদ, বাজার, ভ্রমণ ইত্যাদি বিভিন্ন প্রয়োজনে তাদের বাইরে বেরোন বৈধ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে তাদেরকে নিকাব ব্যবহার করে মুখ আবৃত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; যেন পুরুষেরা তাদের দেখতে না পায়। পক্ষান্তরে কখনোই কোনোভাবে মহিলাদের দৃষ্টি থেকে নিজেদেরকে আবৃত করতে পুরুষদেরকে নিকাব পরিধান করতে নির্দেশ দেওয়া হয় নি। এথেকে বুঝা যায় যে, নারী ও পুরুষের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। পুরুষের দেহের প্রতি দৃষ্টিপাত নিষিদ্ধ নয়। ইমাম গাযালী মহিলাদের জন্য পুরুষের আউরাত ছাড়া দেহের অন্যান্য অঙ্গ দর্শন করা বৈধ হওয়ার পক্ষে আরো অনেক যুক্তি পেশ করেছেন।
(পোশাক, পর্দা ও দেহসজ্জা ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর)
