প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৭ম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৬, রবি আউঃ-রবি সানি ১৪৩৭ হিজরী, পৌষ-মাঘ ১৪২২ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
ইসলামের প্রকৃত রূপ যদি প্রচার করা যায় তাহলে গোটা বিশ্ব বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্ব এর প্রতি ঝাঁপিয়ে পড়ত। আমি পশ্চিমা জগতের মানুষ। এবং আমি আমার জনগণকে ভাল করে জানি। তারা তাদের বর্তমান ধর্ম নিয়ে খুবই ক্লান্ত। তারা ইসলামের মত একটা ধর্ম খুঁজে ফিরছে। -লর্ড হেডলি
লর্ড হেডলি ১৮৫৫ সালের জানুয়ারীতে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লন্ডনের ওয়েস্টমিনিষ্টার স্কুল ও ক্যামব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে লেখাপড়া করেন। ক্যামব্রিজে তিনি ছিলেন একজন সৌখিন মুষ্টিযোদ্ধা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে তিনি হেভী ও মধ্যম বক্সিং চ্যাম্পিয়ানশিপে জয়ী হয়েছিলেন। কলেজ ছাড়ার পর তিনি শিক্ষামূলক কাজে আত্মনিবেশ করেন। তিনি Salisbury and winchestet জার্নালের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এ জার্নালে তিনি দু’বছর দায়িত্ব পালন করেন। তারপর এমপি (সংসদ সদস্য) ফ্রেডারিক সিহার হান্টের সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘ সাত বছর। ১৮৭৭ সালে তিনি নর্থ মিনিস্টার ফুসিলিয়ার চতুর্থ ব্যাটেলিয়ানে সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন এবং পরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে কাজ করেন। ১৮৯২ সালে তিনি তার পেশা হিসেবে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংকে বেছে নেন। ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ভারতে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের তদারকি করেন। হেডলি ১৮৯৬ সালে বাড়মা-শ্রীনগর রাস্তাটির কাজ সমাপ্ত করেন। ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বক্সিংয়ের উপর তার অনেক প্রকাশনা রয়েছে। তিনি অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন, যেমন লন্ডন সোসাইটি অব ইঞ্জিনিয়ার্সের পক্ষ হতে মেডেল, রয়েল সোসাইটি অব আর্টস হতে সিলভার মেডেল, আয়ারল্যান্ড ইনস্টিটিউশন অব সিভিল ইঞ্জিনির্য়াস হতে সিলভার মেডেল ইত্যাদি। তিনি লন্ডনস্থ সোসাইটি অব ইঞ্জিনিয়ার্সের সভাপতি নিযুক্ত হন।
ইঞ্জিনিয়ার হলে কি হবে সাহিত্যের উপরও তার দখল ছিল অত্যন্ত বেশী। তিনি ইসলামের উপর কয়েকটি বই লিখেছিলেন। ১৯১৩ সালে ইসলাম গ্রহণের পর তিনি মুসলিম সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করার জন্য একটি ট্রাস্ট গঠন করেন। ট্রাস্টের অন্যান্য সদস্যরা হলেন, কে কামাল উদ্দিন, স্যার আব্বাস আলী বেগ ও ব্যারিষ্টার কে এন আহমদ।
লর্ড হেডলি ছিলেন একজন প্রোটেস্ট্যান্ট ক্যাথলিক। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি শেখ সাইফুর রহমার রহমাতউল্লাহ আল ফারুক মুসলিম নাম ধারণ করেন। ইসলামের প্রতি তার মনোনিবেশ বিভিন্ন দিক থেকে খুবই আকর্ষণীয়। লন্ডনে বৃটিশ মুসলিম সোসাইটির সভাপতি হিসেবে তিনি বহু বছর দায়িত্ব পালন করেন এবং মুসলমান ও ইসলামের অসাধারণ খেদমত করেন। সভাপতি থাকার সময় তিনি ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা ও ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষ্যে বহুবার বক্তব্য রেখেছেন। তার ইসলাম গ্রহণ ইউরোপ, আমেরিকা ও ইংল্যান্ডেই প্রশংসিত হয়নি, বরং মধ্যপ্রাচ্য এবং পাক ভারত উপমহাদেশেও প্রশংসিত হয়েছিল। মাওলানা আবুল কালাম আযাদের নির্দেশনায় ক্যালকাটার মুসলমানরা একটি সভায় লর্ড হেডলিকে অভিনন্দন জানান। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবার পূর্বে তারা (স্বামী-স্ত্রী) দীর্ঘদিনের পরিচিত ছিলেন। তার স্ত্রী মিসেস বারবারা ব্যাটিন একজন অস্ট্রেলিয়ান। তিনি অনেক বইয়ের লেখিকা এবং বহু সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিতা। বারবারা অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী মি হিউজেসের ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন এবং ধনী মহিলা হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। লর্ড হেডলি ১৯২৩ এবং ১৯২৭ সালে পবিত্র হজ্ব পালন করেন। ইসলাম গ্রহণের পরই তিনি মক্কা ও মদিনায় যাবার মনস্থ করেন। ১৯১৪ সালে তিনি মক্কা যাবার জন্য পারসিয়ার ষ্টীমার চধহফড় তে বুকিং দেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বয্দ্ধ শুরু হলে তিনি স্বদেশেই থেকে যান। তখন তিনি তার হজ্বে যাবার পরিকল্পনা বাতিল করেন এবং তারপর ১৯২৩ সালে হজ্ব সম্পন্ন করেন। হেডলি হচ্ছেন ইংল্যান্ডের প্রথম হাজী। মিশরে তিনি অসাধারণ অভ্যর্থনা পান এবং রাষ্ট্রীয় মেহমানের মর্যাদা লাভ করেন। সৌদি আরবেও তিনি বিরাট সম্বর্ধনা লাভ করেন। সৌদি আরবে অবস্থানকালে হেডলি রাজার রাষ্ট্রীয় মেহমান ছিলেন। রাজা জেদ্দা থেকে মক্কায় আসার জন্য হেডলির জন্য গাড়ী পাঠান এবং হজ্ব সমাপ্তের পর বিদায়ের সময় তাকে সমুদ্র বন্দরে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। রাজা তার ব্যক্তিগত ডাক্তারকে গাড়ী চালানোর জন্য নিযুক্ত করেন যাকে কোন দুর্ঘটনা ঘটলে সাথে সাথেই তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়। মরুভূমিতে হাজী হিসেবে থাকাকালে তার ক্যাম্পে খোঁজ নিয়ে রাজা জানতে পারলেন যে, হেডলির জন্য ক্যাম্পে বিছানার জোগাড় হয়নি। একথা শোনার সাথে সাথে বাদশাহ তার নিজের বিছানা তার জন্য পাঠিয়ে দেন এবং নিজে মাটিতে শোয়ার ব্যবস্থা করেন।
লর্ড হেডলি ইসলামের জন্য বহু কষ্ট স্বীকার করেছেন। তার জন্য অর্থও ব্যয় করেছেন প্রচুর। তার বয়স যখন ৭০ বছর তখন তিনি মিশর, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতে দীর্ঘ ভ্রমণে বের হন ইসলামের জন্য। ১৯২৭ সালের শেষ দিকে হেডলি ভারতে আসেন। লন্ডনে একটি মসজিদ নির্মাণ করার ইচ্ছা নিয়ে ভারতে আসেন অর্থ যোগাড়ের উদ্দেশ্য। তিনি ভেবেছিলেন লন্ডন শহরে তিনি কোন একটি জায়গা মূল্য ছাড়াই পাবেন। কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি। হেডলি হায়দরাবাদের নিজামের নিকট দুমাস অবস্থান করেন। নিজাম তাকে ৬০,০০০ পাউন্ডের একটি তহবিল দান করেন। তা দিয়ে লন্ডনে তিনি একটি অনিন্দ্য সুন্দর মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদটি হায়দরাবাদের নিজামের নামেই নামকরণ করেন। ১৯২৭ সালে ২৭ ডিসেম্বর দিল্লীতে অনুষ্ঠিত সর্ব ভারতীয় তাবলীগের সম্মেলনে লর্ড হেডলিকে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং তাকে সম্মেলনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করার জন্য সম্মানিত করা হয়।
লর্ড হেডলি ইসলাম সম্পর্কে দীর্ঘ কথাবার্তা বলেছেন। তিনি বলেন, ইসলামের প্রকৃত রূপ যদি প্রচার করা হয় তাহলে গোটা বিশ্ব বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্ব এর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ত। আমি পশ্চিমা জগতের মানুষ এবং আমি আমার জনগণকে জানি। তারা তাদের মধ্যকার বর্তমান ধর্ম নিয়ে খুব ক্লান্ত। তারা ইসলামের মত একটা ধর্ম খুঁজে ফিরছে। তাদের চিন্তা ভাবনার ধরণ ইসলামের মতই। পশ্চিমের একজন চিন্তাশীল মানুষকে যখন ইসলামের বিচিত্র বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হবে তখন সে চোখে চোখ রেখে তা শুনবে এবং সে বলবে যে, ইসলামের মত এরকমই একটা ধর্ম সে কল্পনা করছে। তাই আমাদের উচিত প্রচুর ইসলামী সাহিত্য সে সব জায়গায় পৌঁছে দেয়া। ইসলামের বিভিন্ন মৌলিক বিষয়ের উপর প্রচুর বই প্রকাশ করা প্রয়োজন। দিন এসেছে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে বিশ্বের মানুষের প্রচুর জানার।
লর্ড হেডলি ২২ জুন ১৯৩৫ সালে লন্ডনে মারা যান। তার মৃত্যুতে মুসলিম জগতই শুধু শোকাহত হয়নি, শোক ছড়িয়ে পড়ে ইংল্যান্ডে, আমেরিকা ও ইউরোপেও। তিনি ছিলেন এক আকর্ষণীয় চরিত্রের মানুষ। ভদ্র, নম্র, বিনয়ী হিসেবে তার প্রচুর খ্যাতি ছিল। আল্লাহ তাকে এক উচ্চমানের মূল্যবোধের মানুষ হিসেবে তুলে এনেছিলেন।
