প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ-৮ম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারী ২০১৭, রবি.সানি-জমা.আউ ১৪৩৮ হিজরী, মাঘ-ফাল্গুন ১৪২৩বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

৬. আযানের দুআয় : ওয়ারযুকনা শাফাআতাহু

কেউ কেউ আযানের দুআর মধ্যে আরেকটি বাক্য সংযোজন করে বলেন : এবং আমাদেরকে তার শাফাআত রিযক দান করুন/প্রদান করুন। এ বাক্যটিও ভিত্তিহীন। কোনো সহীহ বা যয়ীফ সনদে আযানের দুআর মধ্যে এই বাক্যটি বর্ণিত হয় নি। আল্লাহর কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শাফাআতের রিযক লাভের জন্য দুআ করার মধ্যে কোনো দোষ নেই। তবে দুটি বিষয় এখানে লক্ষণীয়:

প্রথম : মাসনূন দুআর মধ্যে অতিরিক্ত কোনো শব্দ বা বাক্য সংযোজন বা পরিবর্তন হাদীস শরীফে নিষেধ করা হয়েছে এবং সাহাবীগণ এরূপ কর্মের প্রতিবাদ করতেন। এহইয়াউস সুনান গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। বস্তুত কখন কোন্ দুআ করলে আল্লাহ সবচেয়ে খুশি হন এবং মুমিনের সবচেযে বেশি লাভ হয় তা সবচেয়ে ভাল জানতেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। কাজেই তার শেখানো কোনো দুআর মধ্যে পরিবর্তন বা সংযোজনের অর্থ হলো তার দুআটিকে অসম্পূর্ণ বলে ধারণা করা বা মাসনূন দুআতে পরিপূর্ণ ফযীলত, বরকত বা কামালাত লাভ হলো না বলে কল্পনা করা। এতে সুন্নাতকে অপছন্দ করা হয় ও বিদআতের উৎপত্তি হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যে আমার সুন্নাতকে অপছন্দ করবে তার সাথে আমার সম্পর্ক নেই। (সে আমার উম্মাত নয়)।(বুখারী, আস-সহীহ ৫/১৯৪৯; মুসলিম, আস-সহীহ ২/১০২০, নং ১৪০১)

দ্বিতীয়: আযানের দুআয় শাফাআত প্রার্থনা সংযোজন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতিশ্রুতিতে অনাস্থা প্রমাণ করে। কারণ তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি তার শেখানো বাক্যে তার জন্য ওয়াসীলা প্রার্থনা করবে তার শাফাআত তার জন্য ওয়াজিব হবে। কাজেই মুমিন দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে মাসনূন দুআ পাঠ করে দৃঢ় আশা করবেন যে, তার জন্য শাফাআত পাওনা হলো।

৭. আযানের সময় কথা বলার ভয়াবহ পরিণতি!

আযানের সময় কথা বলার নিষেধাজ্ঞা বুঝাতে এ হাদীসটি বলা হয়: যে ব্যক্তি আযানের সময় কথা বলবে, তার ইমান বিনষ্ট হওয়ার ভয় আছে। আল্লামা সাগানী, আজলুনী প্রমুখ মুহাদ্দিস উল্লেখ করেছেন যে, বাক্যটি হাদীসের নামে বানানো ভিত্তিহীন জাল কথা। আযানের সময় কথা বলা যাবে না মর্মে কোনো নির্দেশনা হাদীসে বর্ণিত হয় নি। (সাগানী, আল-মাউদূআত, পৃ. ৮০; আজলূনী, কাশফুল খাফা ২/২৯৫, ৩১৫)

(গ) পাঁচ ওয়াক্ত সালাত বিষয়ক

১. সালাতের ৫ প্রকার ফযীলত ও ১৫ প্রকার শাস্তি

কুরআন-হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, ৫ ওয়াক্ত ফরয সালাত যথাসময়ে আদায় কর মুমিনের সর্বপ্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ দায়িত্ব। সালাতই মুমিনের পরিচয় এবং ঈমান ও কুফরীর মধ্যে পার্থক্য। সালাত পরিত্যাগকারী ‘কাফিরদের দলভুক্ত’ বলে গণ্য হবে। কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম সালাতেরই হিসাব গ্রহণ করা হবে। এভাবে অগণিত সহীহ হাদীস থেকে আমরা ফরয সালাতের গুরুত্ব ও সালাতে অবহেলার ভয়াবহ পরিণতি জানতে পারি।
কিন্তু সাধারণ মানুষদের অবাক করার জন্য জালিয়াতগণ এ বিষয়ে আরো অনেক হাদীস বানিয়ে সমাজে প্রচার করেছে। দুঃখজনক বিষয় হলো, সমাজে প্রচলিত অনেক গ্রন্থেই কুরআনের আয়াত ও সহীহ হাদীসের পরিবর্তে এ সকল বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কথাগুলো লেখা হয়েছে। আমাদের দেশে বিভিন্ন প্রকারের ক্যালেন্ডার, পোস্টার ইত্যাদিতেও এ সকল বানোয়াট কথাগুলো লিখে প্রচার করা হয়। এ বিষয়ে একটি দীর্ঘ জাল হাদীস আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত। এ জাল হাদীসটির সার সংক্ষেপ নিম্নরূপ:

যে ব্যক্তি যথারীতি ও গুরুত্ব সহকারে নামায আদায় করবে আল্লাহ পাক তাকে পাঁচ প্রকারে সম্মানিত করবেন: রুজী রোজগার ও জীবনের সংকীর্ণতা হতে তাকে মুক্ত করবেন, তার উপর হতে কবরের আযাব উঠিয়ে দিবেন, কিয়ামতের দিন তার আমলনামা ডান হাতে দান করবেন, সে ব্যক্তি পুলসিরাতের উপর দিয়ে বিদ্যুতের মত পার হয়ে যাবে এবং বিনা হিসাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি নামাযের ব্যাপারে অলসতা করে তাকে পনের প্রকারের শাস্তি দেওয়া হয়। তন্মধ্যে পাঁচ প্রকার দুনিয়াতে, তিন প্রকার মৃত্যুর সময় তিন প্রকার কবরে এবং তিন প্রকার কবর হতে বের হওয়ার পর। এ পনের বা চৌদ্দ প্রকারের শাস্তির বিবরণ প্রায় সকল প্রচারিত নামায শিক্ষা, আমলিয়াত ইত্যাদি বইয়ে পাওয়া যায়। এজন্য এ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কথাগুলো লিখে বইয়ের কলেবর বাড়াচ্ছি না।

এ দীর্ঘ হাদীসটি পুরোটিই ভিত্তিহীন ও জাল। কোনো হাদীসগ্রন্থে এ হাদীসটি পাওয়া যায় না। পরবর্তী যুগের কোনো কোনো আলিম তাদের ওয়ায নসীহত মূলক গ্রন্থে অন্য সকল প্রচলিত কথার সাথে এই কথাগুলোতেও হাদীস হিসাবে উল্লেখ করেছেন। হাদীসের ইমামগণ সুস্পষ্টরূপে উল্লেখ করেছে তাও তারা উল্লেখ করেছেন। ইমাম যাহাবী, ইবনু হাজার আসকালানী, সয়ূতী, ইবনু আররাক প্রমুখ মুহাদ্দিস এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। (যাহাবী, মীযানুল ই’তিদাল ৬/২৬৪; ইবনু হাজার, মীযানুল ইতিদাল ৫/২৯৫; সুয়ূতী, যাইলুল লাআলী, পৃ. ৯৯; ইবনু আররাক, তানযীহ ২/১১৩-১১৪।)

শাইখুল হাদীস আল্লামা মুহাম্মাদ যাকারিয়া কান্ধলভী (রাহ.) তার ফাযায়েলে নামায গ্রন্থে এ জাল হাদীসটি আরবী ইবারত-সহ পুরোপুরি উল্লেখ করেছেন। তিনি হাদীসটি উল্লেখ করার আগে বলেছেন, কেউ কেউ বলেছেন এ কথাটি নাকি হাদীসে আছে….। হাদীসটি উল্লেখ করার পরে তিনি সংক্ষেপে বলেছেন যে, ইমাম যাহাবী, ইমাম সুয়ূতী প্রমুখ মুহাদ্দিস হাদীসটি জাল ও বাতিল হাদীস বলে উল্লেখ করেছেন। এর সনদের জালিয়াতদের পরিচয়ও তারা তুলে ধরেছেন। (হযরত মাওলানা যাকারিয়া কান্ধলভী, ফায়ায়েলে আমল, পৃ. ১০৪-১০৮।)

এভাবে আল্লামা যাকারিয়া (রাহ.) হাদীসটির জালিয়াতির বিষয়টি উল্লেখ করে তার আমানত আদায় করেছেন। কিন্তু অনুবাদে এ আমানত রক্ষা করা হয় নি। আল্লামা যাকারিয়া (রাহ.)এর এ আলোচনা অনুবাদে উল্লেখ করা হয়নি। অনুবাদের শুরুতে বলা হয়েছে: এক হাদীসে বর্ণিত হইয়াছে…। শেষে শুধুমাত্র লেখা হয়েছে যাওয়াজির ইবন হাজার মাক্কী (রাহ.)। এতে সাধারণ পাঠক একে নির্ভরযোগ্য হাদীস বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা বলেই বিশ্বাস করছেন। অথচ মুহাদ্দিসগণ একমত যে, কোনো জাল হাদীসকে জাল বলে উল্লেখ না করে হাদীস বলে বর্ণনা করা কঠিন হারাম। মহান আল্লাহ আমাদেরকে হেফাযত করুন।

২. সালাত মুমিনদের মিরাজ

একটি অতি প্রচলিত ভিত্তিহীন সনদহীন জাল হাদীস নামায মুমিনদের মিরাজ। (মুফতী হাবীব ছামদানী, বার চান্দের ফযীলত, পৃ. ১২৩)
এখানে লক্ষণীয় যে, এ অর্থের কাছাকাছি অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে। মুমিন সালাতের মধ্যে আল্লাহর সবচেয়ে নৈকট্য লাভ করেন, সালাতে দাঁড়ালে আল্লাহ মুমিনের দিকে তাকিয়ে থাকেন… ইত্যাদি সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু এগুলোর পরিবর্তে অনেকে এ ভিত্তিহীন কথাটিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে বলে তার নামে মিথ্যা বলার অপরাধে অপরাধী হয়ে যান।

৩. ৮০ হুকবা ১ হুকবা শাস্তি

মাজালিসুল আবরার নামক কেতাবে বর্ণিত আছে, হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরমাইয়াছেন, যেই লোক সময়মত নামায পড়িল না, নামাযের ওয়াক্ত শেষ হইবার পরে কাযা পড়িল, সেই লোকও জাহান্নামে ৮০ হুকবা শাস্তি ভোগ করিবে। ৮০ বছরে এক হুকবা আর ৩৬০ দিন এক ওয়াক্ত নামায না পড়িবার জন্য দোজখের আগুনে জ্বলিতে হইবে। আর আখেরাতের দিন হইবে দুনিয়ার এক সহস্র বছরের তুল্য। এই হিসাবে এক ওয়াক্ত নামায তরককারীকে দুই কোটি অষ্টাশি লক্ষ বছর জাহান্নামের আগুনে শাস্তি ভোগ করিতে হইবে।’ (মুফতী হাববি ছামদানী, বার চান্দের ফযীলত, পৃ. ১৩১)

শাইখুল হাদীস আল্লামা যাকারিয়া কান্ধালভী (রাহ.) এ হাদীসটিকে তার ফাযায়েলে নামায গ্রন্থে নিম্নরূপে উদ্ধৃত করেছেন: যে ব্যক্তি ওয়াক্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত সালাত আদায় করল না, এবং এরপর সে কাযা করল, তাকে জাহান্নামে এক হুকবা শাস্তি প্রদান করা হবে। এক হুকবা ৮০ বছর এবং এক বছর ৩৬০ দিন এবং প্রত্যেক দিনের পরিমাণ এক হাজার বছরের সমান। হাদীসটি উদ্ধৃত করে তিনি বলেন:

মাজালিসুল আবরার নামক গ্রন্থে এভাবে লিখা হয়েছে। আমার বক্তব্য হলো, আমার নিকটে যত হাদীসের পুস্তক রয়েছে সেগুলোর কোনো পুস্তকেই আমি এ হাদীসটি দেখতে পাই নি।…. (শাইখুল হাদীস যাকারিয়া কান্ধালভী, ফাযায়েলে নামায, পৃ. ৫৭-৫৮)

আর তার মতে একজন মুহাদ্দিস যে হাদীস কোনো হাদীসের গ্রন্থে খুঁজে পান নি সে হাদীসের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। বস্তুত, হাদীসটি ভিত্তিহীন ও সনদহীন একটি বানোয়াট কথামাত্র। কোথাও কোনো প্রকার সহীহ, যয়ীফ বা বানোয়াট সনদেও এ কথাটি সংকলিত হয় নি। জনশ্রুতির উপর নির্ভর করে শেষ যুগের কোনো কোনো আলিম তা নিজ গ্রন্থে সনদবিহীনভাবে সংকলন করেছেন।

এখানে উল্লেখ্য যে, এ কথাটি যে কোনো হাদীসের গ্রন্থে নেই এবং মাজালিসুল আবরার-এর লেখক সনদবিহীনভাবে তা উল্লেখ করেছেন, তা জানা সত্ত্বেও অনেক ভাল আলিম ওয়াযে-আলোচনায় এবং লিখনিতে এ হাদীস ও অনুরূপ অনেক জাল ও দুর্বল হাদীস উল্লেখ করেন। মানুষের হেদায়েতের আগ্রহেই তারা তা করেন। মনে হয়, তারা চিন্তা করেন, কুরআন কারীমের হাজার হাজার আয়াত এবং প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থসমূহে সংকলিত হাজার হাজার সহীহ হাদীস মানুষদের হেদায়াত করতে আর সক্ষম নয়। কাজেই এগুলোর পাশাপাশি কিছু দুর্বল (!) হাদীসও আমাদের না বলে উপায় নেই!! অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, জাল বলে সন্দেহকৃত হাদীস উল্লেখ করাও হাদীস জালিয়াতির মতই কঠিনতম পাপ। আমরা কি অন্যের হেদায়তের আগ্রহে নিজেদের জন্য জাহান্নাম ক্রয় করব?

৪. জামাআতে সালাত আদায়ে নবীগণের সাথে হজ

জামাআতে সালাত আদায় করা মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব। কুরআনে মুমিনগণকে একত্রে সালাত আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অগণিত সহীহ হাদীসে জামাআতে সালাত আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জামাআত ছেড়ে একা সালাত আদায়কারীকে মুনাফিক বলা হয়েছে। আযান শোনার পরেও যে ব্যক্তি অসুস্থতা বা ভয়ের ওযর ছাড়া জামাআতে না এসে একা সালাত আদায় করবে তার সালাত কবুল হবে না বলে সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে।

জামাতে সালাত আদায়ের বিধান সম্পর্কে ফিকহী পরিভাষাগত মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন সুনআতে মুয়াক্কাদা, কেউ বলেছেন ওয়াজিব ও কেউ বলেছেন ফরয। এ মতভেদ একান্তই পরিভাষাগত। কারণ সকলেই একমত যে, পুরুষের জন্য ওযর ছাড়া ফরয সালাত একা আদায় করলে কঠিন গোনাহ হবে। সালাত হবে কি না সে বিষয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে।
এ সকল সহীহ হাদীসের পাশাপাশি জালিয়াতগণ। এ বিষয়ে অনেক জাল হাদীস তৈরি করেছে। আর এ বিষয়েও সহীহ হাদীসগুলো বাদ দিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব জাল হাদীসই বই পুস্তকে লেখা হয় ও ওয়াযে বলা হয়। সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে যে, ইশা ও ফজরের সালাত জামাতে আদায় করলে সারারাত্র তাহাজ্জুদের সালাত আদায়ের সাওয়াব হবে, ফজরের সালাত জামাতে আদায় করলে আল্লাহর দায়িত্বে থাকা যাবে… ইত্যাদি। কিন্তু এ সকল সামান্য সাওয়াবের কথায় মন না ভরায় জালিয়াতগন বানিয়েছে:

যে ব্যক্তি ফজরের সালাত জামাআতে আদায় করল সে যেন আদম (আ.) এর সাথে ৭০ বার হজ করল..। এভাবে প্রত্যেক ওয়াক্তের সাথে একজন নবীকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে…। (সুয়ুতী, যাইলুল লাআলী, পৃ. ৮৩; সাগানী, আল-মাউদুআত পৃ. ৪২; পাটনী, তাযকিরা, পৃ. ৩৯, ১০৬; শাওকানী, আল-ফাওয়াইদ ১/৫৫)

অনুরূপ বানোয়াট কথার মধ্যে রয়েছে: যে ব্যক্তি ফজর ও ইশার সালাত জামাতে আদায় করল, সে যেন আদমের (আ.) পিছনে সালাত আদায় করল…। এভাবে এক এক সালাতের জন্য এক এক নবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে…। (অধ্যাপিকা কামরুন নেসা দুলাল, নেক কানুন, পৃ. ১০২-১০৩)

৫. মুত্তাকী আলিমের পিছনে সালাত নবীর পিছনে সালাত

জামাআতে সালাত আদায়ের কারণে সাওয়াব বৃদ্ধির কথা সহীহ হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি। বিভিন্ন হাদীসে কুরআনের তিলাওয়াত ও জ্ঞানে পারদর্শী, হাদীসের জ্ঞানে পারদর্শী, হিজরত ও অন্যান্য নেক আমলে অগ্রবর্তী ব্যক্তিগণকে ইমামতি প্রদানের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে ইমামের তাকওয়া বা ইলমের কারণে মুক্তাদিগণের সাওয়াব বা বরকত বেশি হবে, এরূপ অর্থে কোনো সহীহ হাদীস বর্ণিত হয় নি। এ অর্থে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে সবই অত্যন্ত যয়ীফ অথবা বানোয়াট। এইরূপ একটি ভিত্তিহীন কথা:

যে ব্যক্তি কোনো মুত্তাকি আলিমের পিছনে সালাত আদায় করল, সে যেন একজন নবীর পিছনে সালাত আদায় করল।
ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হেদায়া-র প্রণেতা আল্লামা আলী ইবনু আবী বাকর মারগীনানী (৫৯২ হি) জনশ্রুতির উপর নির্ভর করে এ কথাটিকে হাদীস হিসাবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু মুহাদ্দিসগণ অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হয়েছে যে, এ কথাটি কোনো হাদীস নয়। কোনো সহীহ বা যয়ীফ সনদে তা কোনো গ্রন্থে সংকলিত হয় নি। এজন্য আল্লামা যাইলায়ী, ইরাকী, ইবনু হাজার, সুয়ূতী, সাখাবী, তাহির, পাটনী, মোল্লা আলী কারী, আজলুনী প্রমুখ মুহাদ্দিস এ কথাটিকে জাল হাদীস হিসাবে তালিকাভুক্ত করেছেন। (মারগীনানী, হেদায়া ১/৫৭; যাইলায়ী,নাসবুর রাইয়াহ ২/২৬; ইবনু হাজার, আদ-দিরাইয়া ১/১৬৮; সাখাবী, আল-মাকাসিদ, পৃ. ৩১১; মোল্লা আলী কারী, আল-মাসনু, পৃ. ১৫২; আল-আসরার, পৃ. ১৪৭, ২৩৫, আজলুনী, কাশফুল খাফা ২/৩৭, ১২২, ৩৩৭; তাহির পানী, তাযকিরাতুল মাউদু’আত, পৃ. ৪০; শাওকানী, আল-ফাওয়াইদ ১/৫৫)

৬. আলিমের পিছনে সালাত ৪৪৪০ গুণ সাওয়াব

এই জাতীয় আরেকটি বানোয়াট কথা হলো,
আলিমের পিছনে সালাতে ৪৪৪০ গুণ সাওয়াব। (মোল্লা আলী কারী, আল-মাসনু, পৃ. ১৫২; আল-আসরার, পৃ. ১৪৭)

৭. পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের রাক’আত সংখ্যার কারণ

পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের রাক’আত সংখ্যা ১৭ হলো কেন, ফজর ২ রাক’আত, যুহর ৪ রাক’আত, আসর ৪ রাক’আত মাগরিব ৩ রাক’আত ও ইশা ৪ রাক’আত হলো কেন, বিত্র ৩ রাক’আত হলো কেন, ইত্যাদি বিষয়ে প্রচলিত সকল কথাই ভিত্তিহীন। অনুরূপভাবে বিভিন্ন ওয়াক্তের সালাতকে বিভিন্ন নবীর আদায় করা বা প্রতিষ্ঠিত বলে যে সকল গল্প বলা হয় সবই ভিত্তিহীন। এ জাতীয় অনেক ভিত্তিহীন কথা আমাদের সমাজে প্রচলিত। এখানে একটি গল্প উল্লেখ করছি।

আমাদের দেশে অতি প্রসিদ্ধ কোনো কোনো পুস্তকে লেখা হয়েছে: বেতের নামায ওয়াজিব হইবার কারণ এই যে, এরশাদুত্বালেবীন কিতাবে লিখিত আছে হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেরাজশরীফে যাইবার সময়ে যখন বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত তাশরীফ নিয়াছিলেন তখন সমস্ত পয়গম্বরের রুহু মোবারক হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাক্ষাত ও আশীর্বাদের জন্য আসিলে জিব্রাইল (আ.) এর আদেশানুযায়ী হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইমাম হইয়া এক রাকাত নামায পড়িলেন। তার পর মিকাইল (আ.) ৭০ হাজার ফেরেশতা লইয়া হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মোলাকাত ও দোয়ার প্রত্যাশী হইলে জিব্রাইল (আ.)-এর দোওয়ার প্রত্যাশী হইলে জিব্রাইল (আ.)-এর হুকুম অনুযায়ী আবার হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাদিগকে মুক্তাদি করিয়া এক রাকাত নামাজ পড়লেন। অতঃপর আজরাঈল (আ.) বলিলেন, হে প্রিয় পয়গম্বর আপনি ইহাদিগকে সঙ্গে করিয়া দোয়া কুনুত পাঠ করান। হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাই করিলেন। সুতরাং ঐ তিন রাকাত নামাযই আমাদের উপর ওয়াজিব হইয়াছে এবং বেতের নামাযে দোওয়া কুনুত পড়াও ওয়াজেব হইয়াছে। (মাও, গোলাম রহমান, মকছুদোল মো’মেনীন, পৃ. ১৯২-১৯৩)

কোনো কোনো জালিয়াত ঘুরিয়ে বলেছে যে, তিনি মি’রাজের রাত্রিতে মূসা (আ.) এর জন্য এক রাক’আত, তার নিজের জন্য আরেক রাক’আত এবং শেষে আল্লাহর নির্দেশে তৃতীয় রাক’আত সালাত আদায় করেন।… (অধ্যাপিকা কামরুন নেসা দুলাল, নেক কানুন, পৃ. ১১৫)

৮. উমরী কাযা

সালাত মুমিনের জীবনের এমন একটি ফরয ইবাদত যার কোনো বিকল্প নেই বা কাফফারা নেই। যতক্ষণ হুশ বা চেতনা থাকবে সালাত আদায় করতেই হবে। দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে, দৌড়িয়ে, হেঁটে, ইশারায় বা যেভাবে সম্ভব সালাত আদায় করতে হবে। চেতনা রহিত হলে সালাত মাফ হয়ে যাবে।

কোনো বিশেষ কারণে একান্ত বাধ্য হয়ে দুই এক ওয়াক্ত সালাত ছুটে গেলে কাযা করতে হবে। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে অনেক ওয়াক্তের সালাতের কাযা করার কোনোরূপ বিধান হাদীস শরীফে দেয়া হয় নি। কারণ, কোনো মুসলিম সালাত পরিত্যাগ করতে পারে না।

পরবর্তী যুগের মুসলিম ফকীহগণ এ বিষয়ে মতভেদ করেছেন। কেউ বলেছেন, ইচ্চাকৃতভাবে এক ওয়াক্ত সালাত ত্যাগ করলে সে ব্যক্তি কাফির বা অমুসলিমে পরিণত হবে। কেউ বলেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি সালাতের গুরুত্ব পুরোপুরি স্বীকার করেন, কিন্তু অসলতা হেতু সালাত ত্যাগ করেছেন, তিনি কাফিরের মত কঠিন পাপী বলে গণ্য হবেন, কিন্তু কাফির বা অমুসলিম বলে গণ্য হবেন না। আর যদি কেউ মনে করেন যে, ৫ ওয়াক্ত সালাত নিয়মিত আদায় না করেও তিনি নামাযী মুসলমানদের মতই মুসলমান, তাহলে সে ব্যক্তি সালাতের গুরুত্ব অস্বীকার করার কারণে প্রকৃত কাফির বলে গণ্য হবেন।
সর্বাবস্থায় সকলেই একমত যে, ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘ সময়ের সালাত পরিত্যাগ করলে পরে সে সালাতের কাযা করার বিষয়ে হাদীসে কোনোরূপ বিধান দেয়া হয় নি। তবে জালিয়াতগণ এ বিষয়ে কিছু জাল হাদীস তৈরি করেছে। এছাড়া সমাজে কিছু প্রচলিত ভিত্তিহীন কথাবার্তাও এ বিষয়ে প্রচলিত আছে। দু’টি ক্ষেত্রে তা ঘটেছে। প্রথমত, উমরী কাযা ও দ্বিতীয়ত, কাফফারা বা এস্কাত। এ বিষয়ে জালিয়াতদের বানানো একটি হাদীস:

এক ব্যক্তি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি সালাত পরিত্যাগ করেছি। তিনি বলেন, তুমি যা পরিত্যাগ করেছ তা কাযা কর। লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আমি কিভাবে তা কাযা করব? তিনি বলেন, প্রত্যেক ওয়াক্তের সালাতের সাথে অনুরূপ সালাত আদায় কর। সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আগে, না পরে? তিনি বলেন, না, বরং আগে।

মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এ হাদীসটি জাল, ভিত্তিহীন ও বাতিল। (জুরকানী, আর-আবাতীল ২/৫০; ইবনুল জাওয,ি আল-মাওদু’আত ২/২৬; সুয়ুতী, আল-লাআলী ২/২৪; ইবনু আররাক, তানযীহ ২/৮০; শাওকানী, আল-ফাওয়াইদ ১/৩৫) যদি কোনো মুসলিম দীর্ঘদিন সালাতে অবহেলার পরে অনুতপ্ত হয়ে নিয়মিত সালাত শুরু করেন, তখন তার প্রধান দায়িত্ব হবে বিগত দিনগুলোর পরিত্যক্ত সালাতের জন্য বেশি বেশি করে কাঁদাকাটি ও তাওবা করা। এর পাশাপাশি, অনেক ফকীহ বলেছেন যে, ঐ ব্যক্তি পরিত্যক্ত সালাতগুলো নির্ধারণ করে তা কাযা করবেন। এভাবে উমরী কাযা করার কোনো নির্ধারিত বিধান কুরআন বা হাদীসে নেই। এ হলো সাবধানতামূলক কর্ম। আশা করা যায় যে, তাওবা ও কাযার মাধ্যমে আল্লাহ তার অপরাধ ক্ষমা করবেন।