প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ-৭ম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৭, রবি আউঃ-রবি সানী ১৪৩৮ হিজরী, পৌষ-মাঘ ১৪২৩বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

বিভিন্ন পুস্তকে ওযুর প্রত্যেক অঙ্গ ধৌত করার সময় পাঠের জন্য বিশেষ দোয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হাত ধোয়ার দোয়া, কুল্লি করার দোয়া, নাক পরিষ্কার করার দোয়া…. ইত্যাদি। এ দোয়ার ভিত্তি যে হাদীসটির উপরে সে হাদীসটি বানোয়াট। ইমাম দারাকুতনী, ইমাম নাবানী, ইমাম সূয়ুতী, মোল্লা আলী কারী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস সকলেই হাদীসটিকে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। (নাবাবী, আল-আযকার, পৃ. ৫৭; ইবনুল কাইয়িম, আল-মানারুল মুনীফ, পৃ. ১২০; ইবনু আররাক, তানযীহ ২/৭০-৭১; আলী কারী, আল-আসরারুল মারফুআ, পৃ. ৩৪৫; শাওকানী, আল-ফাওয়াইদ ১/৩০)

৯. ওযুর সময়ে কথা না বলা

ওযুর সময়ে কথা বলা যাবে না, বা কথা বললে কোনোরূপ অন্যায় হবে এ মর্মে কোনো হাদীস নির্ভরযোগ্য বা গ্রহণযোগ্য সনদে বর্ণিত হয়নি। এ বিষয়ে যা কিছু বলা হয় তা কোনো কোনো আলিমের কথা মাত্র।

১০. ওযুর পরে সূরা কাদ্র পাঠ করা

সহীহ হাদীসে ওযুর পরে পাঠ করার জন্য একাধিক দোয়ার উল্লেখ করা হয়েছে। রাহে বেলায়াত গ্রন্থে আমি দোয়াগুলো সনদ সহ আলোচনা করেছি। আমাদের দেশে অনেক পুস্তকে এ সকল সহীহ দোয়ার বদলে কিছু বানোয়াট কথা লেখা হয়েছে। কোনো কোনো গ্রন্থে লেখা আছে; অজু করিবার পর সূরা ক্বদর পাঠ করিলে সিদ্দীকের দরজা হাছিল হইবে। (হাদীছ) (মাও. গোলাম রহমান, মকছুদোল মো’মেনীন, পৃ. ১৩২-১৩৩) আলীর প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওসীয়ত’ নামক জাল হাদীসটিতে এরূপ কিছু কথার উল্লেখ আছে। ওসীয়তটির বিষয়ে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

(খ) মসজিদ ও আযান বিষয়ক

১. মসজিদে দুনিয়াবী কথাবার্তা

মসজিদ তৈরির উদ্দেশ্য সালাত আদায়, আল্লাহর যিকির, দীনের আলোচনা ইত্যাদি। মসজিদের বিষয়ে রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: এগুলো শুধু আল্লাহর যিকর, সালাত ও কুরআন তিলাওয়াতের জন্য। (মুসলিম, আল-সহীহ ১/২৩৬)
মসজিদের মধ্যে ক্রয়-বিক্রয় করতে এবং হারানো বা পলাতক কিছু খোঁজ করতে, উচ্চস্বরে কথা বলতে বা চিৎকার করতে হাদীসে নিষেধ করা হয়েছে। (বুখারী, আস-সহীহ ১/১৭৯; মুসলিম, আস-সহীহ ১/৩৯৭; কিরসিয/মি আন-সুনান ৩/৬১০: ইবনু খুযাইমা, আস-সহীহ ২/২৭৪; হাকিম, আল-মুসতাদরাক ২/৬৫; বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা ২/৪৪৭।) এছাড়া সাধারণ জাগতিক কথাবার্তা বলার কোনো সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা কোনো সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয় নি। সাহাবীগণ মসজিদের মধ্যেই কবিতা পাঠ করতেন, জাহিলী যুগের গল্প-কাহিনী আলোচনা করতেন। জাবির (রা.) বলেন: রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে স্থানে ফজরের সালাত আদায় করতেন সেখানে সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে থাকতেন। সূর্যোদয়ের পরে তিনি উঠতেন। তার বসা অবস্থায় সাহাবীগণ কথাবার্তা বলতেন, জাহেলী যুগের কথা আলোচনা করতেন, কবিতা পাঠ করতেন এবং হাসতেন। আর তিনি শুধু মুচকি হাসতেন। (সহী মুসলিম ১/৪৬৩, নং-৬৭০, নাসাঈ, আল-সুনানুল কুবরা ১/৪০৪, ৬৫১)

আমাদের দেশে প্রচলিত কয়েকটি জাল হাদীসে মসজিদের মধ্যে দুনিয়ার কথা বলার কঠিন নিন্দা করা হয়েছে। একটি জাল হাদীস নিম্নরূপ : যে ব্যক্তি মসজিদের মধ্যে দুনিয়াবী কথা বলবে, আল্লাহ তার চল্লিশ বছরের আমল বাতিল বা বরবাদ করে দিবেন।
আল্লামা সাগানী, তাহির পাটনী, মোল্লা আলী কারী, আজলূনী প্রমুখ মুহাদ্দিস একবাক্যে হাদীসটিকে জাল বলেছেন। মোল্লা কারী বলেন: এ কথাটি যেমন সনদগতভাবে বাতিল, তেমনি এর অর্থও বাতিল। (সাগানী, আল-মাউদূ’আত, পৃ. ৩৯; তাহির পাটনী, তাযকিরাতুল মাউদূ’আত, পৃ. ৩৬; মোল্লা কারী, আল-আসরার পৃ. ২২৭; আল-মাসনু, পৃ. ১৪৭; শাওকানী, আল-ফাওযাইদ ১/৪৪)

অনুরূপ আরেকটি জাল ও বানোয়াট কথা :
মসজিদে কথাবার্তা নেক আমল খায়, যেরূপ পশু ঘাস-খড় খায়।
একই অর্থে আরেকটি জাল ও ভিত্তিহীন কথা : মসজিদে কথাবার্তা নেক আমল খায়, যেরূপ আগুন কাঠ খায়।
কোনো কোনো প্রসিদ্ধ আলিম জনশ্রুতির উপর নির্ভর করে এ বাক্যটিকে হাদীস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লামা ইরাকী, ফাইরোয আবাদী, তাহির পাটনী, মোল্লা আলী কারী ও অন্যান্য সকল মুহাদ্দিস একম যে, এ বাকটি বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও সনদহীন একটি কথা যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামে বলা হয়েছে। (তাহির পাটনী, তাযকিরাতুল মাউদূ’আত, পৃ. ৩৬; মোল্লা আলী কারী, আল-আসরার, পৃ. ১১৩; আল-মাসনু, পৃ. ৬৩; শাওকানী, আল-ফায়াইদ ১/৪৪)

২. মসজিদে বাতি জ্বালানো ও ঝাড়– দেয়া

মসজিদ পরিষ্কার করা, ঝাড়– দেয়া, বাতি জ্বালানো ইত্যাদি সাধারণভাবে নেক কর্ম। কিন্তু অন্যান্য সকল বিষয়ের মত এ বিষয়েও বিশেষ পুরস্কারের নামে কিছু জাল হাদীস বানানো হয়েছে। মসজিদে বাতি জ্বালালে এত এত সাওয়াব, বা এত হাজার ফিরিশতা তার জন্য দোয়া করবে, এত হজ বা এত উমরার সাওয়াব মিলবে… ইত্যাদি সকল কথা বানোয়াট। (তাহির পাটনী, তাযকিরাতুল মাউদূ’আত, পৃ. ৩৭)

৩. আযানের সময় বৃদ্ধাঙ্গুলি চোখে বুলানো

আমাদের দেশে অনেক ধার্মিক মুসলিম আযানের সময় আশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ বাক্যটি শুনলে দুই হাতের আঙুলে চুমু খেয়ে তা দিয়ে চোখ মুছেন। এ মর্মে একটি বানোয়াট ও মিথ্যা হাদীসকে সত্য মনে করেই তারা এ কাজ করেন। এ বানোয়াট হাদীসটি বিভিন্ন ভাবে প্রচারিত। এক বর্ণনায় বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি আযানের এ বাক্যটি শুনে নিজে মুখে বলবে:
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বান্দা ও রাসূল, আমি পরিতৃপ্ত হয়েছি আল্লাহকে প্রভু হিসাবে, ইসলামকে দীন হিসাবে ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নবী হিসাবে গ্রহণ করে, আর এ কথা বলার সাথে দুহাতের শাহাদত আঙ্গুলের ভিতরের দিক দিয়ে তার দু’চক্ষু মুছবে তার জন্য শাফায়াত পাওনা হবে।
কেউ কেউ বলেন: আযানের এ বাক্যটি শুনলে মুখে বলবে: মারহাবা! আমার প্রিয়তম ও আমার চোখের শান্তি মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল্লাহকে এরপর তার বৃদ্ধাঙ্গুলিদ্বয়কে চুমু খাবে এবং উভয়কে তার দু চোখের উপর রাখবে। যদি কেউ এরূপ করে তবে কখনো তার চোখ উঠবে না বা চোখের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হবে না।

এ জাতীয় সকল কথাই বানোয়াট। কেউ কেউ এ সকল কথা আবু বাকর (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। মোল্লা আলী কারী বলেন, আবু বাকর (রা.) থেকে বর্ণনা প্রমাণিত হলে তা আমল করার জন্য যথেষ্ট হবে। তবে হাদীসটি আবু বাকর (রা.) থেকেও প্রমাণিত নয়। ইমাম সাখাবী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস তা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। মোল্লা আলী কারীর বক্তব্যের টীকায় বর্তমান যুগের অন্যতম হানাফী ফকীহ, মুহাদ্দিস ও সুফী আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ লিকেছেন, তার উস্তাদ ও প্রখ্যাত হানাফী ফকীহ ও মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ যাহিদ কাওসারীর গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, মোল্লা আলী কারী এ বিষয়ে ইমাম সাখাবীল বিস্তারিত আলোচনা জানতে পারেন নি। ফলে তার মনে দ্বিধা ছিল। প্রকৃত বিষয় হলো, আবু বাকর (রা.) বা অন্য কোনো সূত্রে হাদসিটির কোনো প্রকার নির্ভরযোগ্য বর্ণনা পাওয়া যায় নি। মুহাদ্দিসগণ একমত হয়েছেন যে, এ বিষয়ক সকল বর্ণনা বানোয়াট। (দেখুন; ইমামসাখাবী, আল-মাকাসিদ, পৃ: ৩৮৩-৩৮৪, নং ১০২১, মোল্লা আলী কারী, আল-আসরার, পৃ: ২১০, নং ৮২৯, আল-মাসনু’য় পৃ: ১৩৮, নং ৩০০, যারকানী, মুখতাসারুল মাকাসিদ, পৃ: ১৭৪, নং ৯৪০, আল-আজলুন,ি কাশফুল খাফা ২/২০৬; শাওকানী, আল-কফাওয়াইদ ১/৩৯)

এখানে তিনটি বিষয় লক্ষ্যণীয়:
(১) রোগমুক্তি, সুস্থতা ইত্যাদির জন্য বিভিন্ন আমল অনেক সময় অভিজ্ঞতার আলোকে গ্রহণ করা হয়। এজন্য এ প্রকারের আমল করে ফল পাওয়ার অর্থ এটাই নয় যে, এগুলো হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। কেউ রোগমুক্তির উদ্দেশ্যে কোনো শরীয়ত সম্মত আমল করতে পারেন। তবে বিশুদ্ধ সনদ ছাড়া এরূপ আমল-কে হাদীস বলা যায় না।

(২) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মহব্বত করা ইমানের অংশ ও অত্যন্ত বড় নেককর্ম। যদি কেউ এ জাল হাদীসটির জালিয়াতি অবগত না হওয়ার কারণে এর উপর আমল করেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর নাম শুনে হৃদয়ে মহব্বত ও ভালবাসা নিয়ে এভাবে আঙুলে চুমু খান, তবে তিনি এ জাল হাদীসে বর্ণিত সাওয়াব না পেলেও, মূল মহব্বতের সাওয়াব পাবেন, ইনশা আল্লাহ। তবে জেনেশুনে জাল হাদীসের উপর আমল করা জায়েয নয়।

(৩) এ জাল হাদীসের পরিবর্তে মুমিন একটি সহীহ হাদীসের উপর আমল করতে পারেন। দু হাতের আঙ্গুল দিয়ে চোখ মুছার বিষয়টি বানোয়াট হলেও উপরের বাক্যগুলো মুখে বলার বিষয়ে অত্যন্ত বিশুদ্ধ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যদি কেউ মুআযযিনকে শুনে বলে:
এবং আমিও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি একক, তার কোন শরীক নেই। এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বান্দা ও রাসূল। আমি তুষ্ট ও সন্তুষ্ট আছি আল্লাহকে প্রভু হিসেবে, ইসলামকে দীন হিসেবে এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নবী হিসেবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি কেউ এভাবে উপরের বাক্যগুলো বলে, তবে তার সকল গোনাহ ক্ষমা করা হবে।(মুসলিম ১/২৯০, নং ৩৮৬, ইবনু খুযাইমাহ ১/২২০, ইবনু হিব্বান ৪/৫৯১)

৪. আযানের জাওয়াবে সাদাকতা ও বারিরতা

ফজরের আযানে আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাউম’
শুনলে উত্তরে বলা হয়: সাদাকতা ও বারিরতা (বারারতা) এ কথাটি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট।
বুখারী ও মুসলিম বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: মুয়াযযিনকে যখন আযান দিতে শুনবে তখন মুয়াযযিন যা যা বলবে তোমরা তাই বলবে। (বুখারী ১/২২১, মুসলিম ১/২৮৮)
অন্য হাদীসে আবু হুরাইরা (রা.) বলেছেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ছিলাম। তখন বিলাল দাঁড়িয়ে আযান দিলেন। বিলাল আযান শেষ করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: এ ব্যক্তি (মুয়াযযিন) যা বলল, তা যদি কেউ দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে বলে তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (হাদীসটি হাসান। সহীহ ইবনু হিব্বান ৪/৫৫৩, মুসতাদরাক হাকিম ১/৩২১ মুসনাদ আহমাদ ২/৩৫২, নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা ১/৫১০, ৬/১৪৬, সহীহুত তারগীব ১/১৭৭)

উপরের হাদীসদ্বয় থেকে বুঝা যায় যে, মুয়াযযিন যা বলবেন, আযান শ্রবণকারী তাই বলবেন। কোনো ব্যতিক্রম বলতে বলা হয়নি। তবে মুসলিম সংকলিত অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রম শিক্ষা দিয়েছেন, তা হলো, মুয়াযযিন হাইয়া আলাস সালাহ ও হাইয়া আলাল ফালাহ বললে, শ্রোতা লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ বলবেন। এ হাদীসে তিনি বলেছেন: এভাবে যে ব্যক্তি মুয়াযযিনের সাথে সাথে আযানের বাক্যগুলো অন্তর থেকে বলবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (সহীহ মুসলিম ১/২৮৯, নং ৩৮৫)

তাহলে, উপরের দুটি বাক্য ছাড়া বাকি সকল বাক্য মুয়াযযিন যেভাবে বলবেন, জওয়াব দানকারীও ঠিক সেভাবেই বলবেন। আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাওম বাক্যটিও এর ব্যতিক্রম নয়। এর জওয়াবেও এ বাক্যটিই বলতে হবে। এ বাক্যটির জন্য ব্যতিক্রম কিছু বলতে হবে তা কোনো হাদীসে বলা হয় নি। এজন মোল্লা আলী কারী সাদাকতা ওয়া বারিরতা’ বাক্যটিকে জাল হাদীসের তালিকাভুক্ত করে বলেছেন: শাফিয়ী মাযহাবের লোকেরা এ বাকটি বলা মুস্তাহাব বলেছেন, তবে হাদীসে এর কোন অস্তিত্ব নেই। (দেখুন: মোল্লা আলী কারী, আল আসরারুল মারফুয়া, ১৪৬ পৃ.)

৫. আযানের দোয়ার মধ্যে ওয়াদ দারাজাতার রাফীয়াহ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘যখন তোমরা মুয়াযযিনিকে আযান দিতে শুনবে, তখন সে এরূপ বলে তদ্রপ বলবে। এরপর আমার উপর সালাত পাঠ করবে; কারণ যে ব্যক্তি আমার উপর একবার সালাত পাঠ করবে, আল্লাহ তাকে দশবার সালাত (রহমত) প্রদান করবেন। এরপর আমার জন্য ওসীলা চাইবে; কারণ ওসীলা হলো জান্নাতের এমন একটি মর্যাদা যা আল্লাহর একজন মাত্র বান্দাই লাভ করবেন এবং আমি আশা করি আমিই হব সে বান্দা। যে ব্যক্তি আমার জন্য ওসীলা প্রার্থনা করবে, তার জন্য শাফায়াত প্রাপ্য হয়ে যাবে। (সহহি মুসলিম ১/২৮৮, নং ৩৮৪)

অন্যান্য হাদীসে তিনি ওসীলা প্রার্থনার নিম্নরূপ পদ্ধতি শিখিয়েছেন:
হে আল্লাহ, এই পরিপূর্ণ আহ্বান এবং আসন্ন সালাতের প্রতিপালক, আপনি প্রদান করুন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ওসীলা এবং মহামর্যাদা এবং তাকে উঠান সম্মানিত অবস্থানে, যা আপনি তাকে ওয়াদা করেছেন।’
তিনি বলেছেন, মুয়াযযিনের আযান শুনে যে ব্যক্তি উপরের বাক্যগুলো বলবে, তার জন্য কিয়ামতের দিন আমার শাফাআত পাওয়া হয়ে যাবে। (সহীহ বুখারী ১/২২২, নং ৫৮৯, ৪/১৭৪৯, নং ৪৪৪২)

ইমাম বুখারীসহ সকল মুহাদ্দিস এভাবেই দোয়াটি সংকলন করেছেন। আমাদের দেশে প্রচলিত আযানের দোয়ার মধ্যে দুটি বাক্য অতিরিক্ত রয়েছে, যা উপরের দোয়াটিতে নেই। প্রথম বাক্যটিতে : ওয়াল ফাদীলাতা)-র পরে (এবং সুউচ্চ মর্যাদা) বলা এবং দ্বিতীয় বাক্যটি দোয়ার শেষে (নিশ্চয় আপনি ওয়াদা ভঙ্গ করেন না) বলা। দ্বিতীয় বাক্যটি একটি দুর্বল সনদে বর্ণিত হয়েছে। (বাইহাকী, আলস-সুনানুল কুবরা ১/৪১০ (৬০৩-৬০৪) আর প্রথম বাক্যটি (ওয়াদ-দারাজাতার রাফীআহ) একেবারেই ভিত্তিহীন ও মিথ্যা হাদীস নির্ভর। ইবনু হাজার, সাখাবী, যারকানী, মোল্লা আলী কারী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস বলেছেন যে, এই বাক্যটি (ওযাদ-দারাজাতার রাফী’য়াহ) বানোয়াট।‘ (ইবনু হাজার, তালখীসুল হাবীর ১/২১১, সাখাবী, আল-মাকাসিদ, পৃ. ২২২-২২৩, যারকানী, মুখতাসারুল মাকাসিদ, পৃ. ১০৭, মোল্লা আলী কারী আল-মাসনূন পৃ. ৭০-৭১, আল-আসরার, পৃ. ১২২, মুবারাকপুরী, তুহফাতুল আহওয়াযী, পৃ ১/৫৩২)