প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ-৮ম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারী ২০১৭, রবি.সানি-জমা.আউ ১৪৩৮ হিজরী, মাঘ-ফাল্গুন ১৪২৩বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

৭১। পিতামাতার আদব, সম্মান ও আনুগত্যের গুরুত্ব

মুফাসসীর ইমাম কুরতুবী বলেন : এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার আদব, সম্মান এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করাকে নিজের এবাদতের সাথে একত্রিত করে ফরয করেছেন। যেমন, সূরা লুকমানে নিজের শোকরের সাথে পিতা-মাতার শোকরকে একত্রিত করে অপরিহার্য করেছে। বলা হয়েছে: আনিশকুর লি অলিওয়ালিদাইকা
অর্থাৎ আমার শোকর এবং পিতা-মাতার শোকর। এতে প্রমাণীত হয় যে, আল্লাহ তাআলার এবাদতের পর পিতা-মাতার আনুগত্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং আল্লাহ তাআলার প্রতি কতৃজ্ঞ হওয়ার ন্যায় পিতা-মাতার পতি কৃতজ্ঞ হওয়াও ওয়াজিব। সহীহ বুখারীর একটি হাদীসও এর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। হাদীসে রয়েছে, কোন এক ব্যক্তি রসূলূল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে প্রশ্ন করলঃ আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় কাজ কোনটি? তিনি বললেন (মুস্তাহাব) সময় হলে নামায পড়া। সে আবার প্রশ্ন করল এরপর কোন কাজটি সর্বাধিক প্রিয়? তিনি বললেনঃ পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার। (কুরতুবী)

৭২। হাদীসের আলোকে পিতা-মাতার আনুগত্য ও সেবযত্নের ফযীলত

মুসনাদে আহমদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, মুস্তাদরাক হাকেমে বিশুদ্ধ সনদসহ হযরত আবুদ্দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, রসূলূল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন পিতা জান্নাতের মধ্যবর্তী দরজা। এখন তোমাদের ইচ্ছা, এর হেফাযত কর অথবা একে বিনষ্ট করে দাও। (মাযহারী)
(১) তিরমিযী ও মুস্তাদরাক হাকীমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমরের রেওয়ায়েতে বর্ণিত রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন পিতা জান্নাতের মধ্যবর্তী দরজা। এখন তোমাদের ইচ্ছা, এর হেফাযত কর অথবা একে বিনষ্ট করে দাও। (তাফসীর মাযহারী)
(২) তিরমিযী ও মুস্তাদরাক হাকীমে আবদুল্লাহ ইবনে ওমরের রেওয়ায়েতে বর্ণিত রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যে নিহিত।
(৩) হযরত আবু উমামার বাচনিক ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করল: সন্তানের উপর পিতা-মাতার হক কি? তিনি বলেনঃ তারা উভয়েই তোমার জান্নাত অথবা জাহান্নাম। উদ্দেশ্য এই যে, তাদের আনুগত্য ও সেবযত্ন জান্নাতে নিয়ে যায় এবং তাদের সাথে অসন্তুষ্টি জাহান্নামে পৌঁছে দেয়।
(৪) বায়হাকী শুয়াবুল-ঈমান গ্রন্থে এবং ইবনে আসাকির হযরত ইবনে আব্বাসের বাচনিক উদ্ধৃত করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে পিতা-মাতার আনুগত্য করে, তার জন্য জান্নাতের দু টি দরজা খোলা থাকবে। যদি পিতা-মাতার মধ্য থেকে একজনই ছিল, তবে জান্নাত অথবা জাহান্নামের এক দরজা খোলা থাকবে। একথা শুনে জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করল জাহান্নামের এই শাস্তিবাণী কি তখনও প্রযোজ্য যখন পিতা-মাতা এই ব্যক্তির প্রতি জুলুম করে? তিনি তিন বার বলেনঃ যদি পিতা-মাতা সন্তানের প্রতি জুলুম করে তবুও পিতা-মাতার অবাধ্যতার কারণে সন্তান জাহান্নামে যাবে। এর সারমর্ম এই যে, পিতা-মাতার কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকার সন্তানের নেই। তারা জুলুম করলে সন্তান সেবযত্ন ও আনুগত্যের হাত গুটিয়ে নিতে পারে না।
(৫) বায়হাকী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের বাচনিক উদ্ধৃত করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন যে সেবাযত্নকারী পুত্র পিতা-মাতার দিকে দয়া ও ভালবাসা সহকারে দৃষ্টিপাত করে, তার প্রত্যেক দৃষ্টির বিনিময়ে সে একটি কবুল হজের সওয়াব পায়। লোকেরা আরয করল সে যদি দিনে একশ বার এভাবে দৃষ্টিপাত করে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, একশ বার দৃষ্টিপাত করলেও প্রত্যেক দৃষ্টির বিনিময়ে এই সওয়াব পেতে থাকবে। সুবহানাল্লাহ। তার ভা-ারে কোন অভাব নেই।

৭৩। পিতা-মাতার হক নষ্ট করার শাস্তি দুনিয়াতেও পাওয়া যায়

(৬) বায়হাকী শুয়াবুল-ঈমানে আবু বকর (রা.) বাচনিক বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ সমস্ত গোনাহের শাস্তির ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা যেগুলো ইচ্ছা করেন কেয়ামত পর্যন্ত পিছিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু পিতা-মাতার হক নষ্ট করার এবং তাদের প্রতি অবাধ্য আচরণ করা এর ব্যতিক্রম। এর শাস্তি পরকালের পূর্বে ইহকালেও দেয়া হয়। (এ সবগুলো রেওয়ায়েত তফসীরে-মাযহারী থেকে উদ্ধৃত হয়েছে।)
কোন কোন বিষয়ে পিতা-মাতার আনুগত্য ওয়াজিব এবং কোন কোন বিষয়ে বিরুদ্ধাচরণের অবকাশ আছেঃ এ ব্যাপারে আলিম ও ফিকাহবিদগণ একমত যে, পিতা-মাতার আনুগত্য শুধু বৈধ কাজে ওয়াজিব। অবৈধ ও গোনাহর কাজে আনুগত্য ওয়াজিব তো নয়ই: বরং জায়েযও নয়। হাদীসে বলা হয়েছে ,সৃষ্টিকর্তার নাফরমানীর কাজে কোন সৃষ্ট-জীবের আনুগত্য জায়েয নয়।

৭৪। পিতা-মাতার সেবা-যত্ন ও সদ্ব্যবহারের জন্য মুসলমান হওয়া জরুরি নয়

ইমাম কুরতুবী এ বিষয়টির সমর্থনে বুখারী থেকে হযরত আসমার (রা.) একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। হযরত আসমা (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করেনঃ আমার জননী মুশরিকা। তিনি আমার সাথে দেখা করতে আসেন। তাকে আদর-আপ্যায়ন করা জায়েয হবে কি? তিনি বললেন অর্থাৎ, তোমার জননীকে আদর-আপ্যায়ন কর।
কাফের পিতা-মাতা সম্পর্কে স্বয়ং কোরআন পাক বলেন যার পিতা-মাতা কাফের এবং তাকেও কাফের হওয়ার আদেশ করে এ ব্যাপারে তাদের আদেশ পালন করা জায়েয নয়, কিন্তু দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাব বজায় রেখে চলতে হবে। বলাবাহুল্য, আয়াতে মারূফ বলে তাদের সাথে আদর-আপ্যায়নমূলক ব্যবহার বোঝানো হয়েছে।
মাসআলাঃ– যে পর্যন্ত জিহাদ ফরযে আইন না হয়ে যায়, ফরযে কেফায়ার স্তরে থাকে, সে পর্যন্ত পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়া সন্তানের জন্য জিহাদে যোগদান করা জায়েয নয়। সহীহ বুখারীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমরের (রা.) বাচনিক বর্ণিত রয়েছে, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জিহাদের অনুমতি নেয়ার জন্য উপস্থিত হয়। তিনি জিজ্ঞেস করেন: তোমার পিতা-মাতা জীবিত আছেন কি? সে বলল: জ্বী হ্যাঁ, জীবিত আছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন
তাহলে তুমি পিতা-মাতার সেবাযত্নে আত্মনিয়োগ করেই জিহাদ কর। অর্থাৎ, তাদের সেবাযত্নের মাধ্যমেই তুমি জিহাদের সওয়াব পেয়ে যাবে। অন্য রেওয়ায়েতে এর সাথে একথাও উল্লেখিত রয়েছে যে, লোকটি বলল : আমি পিতা-মাতাকে ক্রন্দনরত অবস্থায় ছেড়ে এসেছি। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন যাও, তাদের হাসাও; যেমন কাঁদিয়েছো। অর্থাৎ তাদেরকে গিয়ে বলঃ এখন আমি আপনাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জিহাদে যাব না। (তাফসীর কুরতুবী)
মাসআলা — এ রেওয়ায়েত থেকে জানা গেল যে, কোন কাজ ফরযে-আইন না হলে এবং ফরযে কেফায়ার স্তরে থাকলে সন্তানের জন্য পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়া সে কাজ করা জায়েয নয়। দ্বীনী শিক্ষা অর্জন করা এবং তবলীগের কাজে সফর করাও এর অন্তর্ভুক্ত। ফরয পরিমাণ দ্বীনী জ্ঞান যার অর্জিত আছে, সে যদি বড় আলিম হওয়ার জন্য সফর করে কিংবা তবলীগ ও দাওয়াতের কাজে সফর করে, তবে পিতা-মাতার অনুমতি ব্যতীত তা জায়েয নয়।
মাসআলা– পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার যে নির্দেশ কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, পিতা-মাতার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু বান্ধবের সাথে সদ্ব্যবহার করাও এর অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ করে পিতা-মাতার মৃত্যুর পর।
সহীহ বুখারীতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমরের (রা.) বাচনিক বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন পিতার সাথে সদ্ব্যবহার এই যে, তার মৃত্যুর পর তার বন্ধুদের সাথেও সদ্ব্যবহার করতে হবে। হযরত আবু উসায়দ বদরী (রা.) বর্ণনা করেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বসেছিলাম, ইতিমধ্যে এক আনসার এসে প্রশ্ন করল ইয়া রাসূলুল্লাল! পিতা-মাতার এন্তেকালের পরও তাদের কোন হক আমার যিম্মায় আছে কি? তিনি বললেন হ্যাঁ তাদের জন্য দোয়া ও এস্তেগফার করা, তারা কারো সাথে কোন অঙ্গীকার করে থাকলে তাপূরণ করা, তাদের বন্ধুবর্গের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা এবং তাদের এমন আত্মীয়দের সাথে আত্মীয়তা বজায় রাখা, যাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক শুধু তাদেরই মাধ্যমে। পিতা-মাতার এসব হক তাদের মৃত্যুর পরও তোমার যিম্মায় অবশিষ্ট রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অভ্যাস ছিল যে, হযরত খাদীজার (রা.) ওফাতের পর তিনি তার বান্ধবীদের কাছে উপঢৌকন প্রেরণ করতেন। এতে তার উদ্দেশ্য ছিল হযরত খাদীজার (রা.) হক আদায় করা।

৭৫। পিতা-মাতার আদবের প্রতি লক্ষ্য রাখা, বিশেষত : বার্ধক্যে

পিতা-মাতার সেবাযত্ন ও আনুগত্য পিতা-মাতার হওয়ার দিক দিয়ে কোন সময় ও বয়সের গ-িতে সীমাবদ্ধ নয়। সর্বাবস্থায় এবং সব বয়সেই পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা ওয়াজিব। কিন্তু ওয়াজেব ও ফরয কর্তব্যসমূহ পালনের ক্ষেত্রে স্বভাবতঃ সেসব অবস্থা প্রতিবন্ধক হয়, কর্তব্য পালন সহজ করার উদ্দেশে কুরআন পাক যেসব অবস্থায় বিভিন্ন ভঙ্গিতে চিন্তাধারার লালন-পালনও করে এবং এর জন্য অতিরিক্ত তাকিদও প্রদান করে। এটাই কুরআন পাকের সাধারণ নীতি।
বার্ধক্যে উপনীত হয়ে পিতা-মাতা সন্তানের সেবাযতের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে এবং তাদের জীবন সন্তানের দয়া ও কৃপার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তখন যদি সন্তানের পক্ষ থেকে সামান্যও বিমুখতা প্রকাশ পায়, উপসর্গসমূহ (দুর্বলতা ইত্যাদি) স্বভাবগতভাবে মানুষকে খিটখিটে করে দেয়।
তৃতীয়তঃ– বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে যখন বুদ্ধি-বিবেচনাও অকেজো হয়ে পড়ে, তখন পিতা-মাতার বাসনা এবং দাবীদাওয়াও এমনি ধরনের হয়ে যায়, যা পূর্ণ পিতা-মাতার মনোসন্তুষ্টি ও সুখ-শান্তি বিধানের আদেশ দেয়ার সাথে সাথে তোমার যতটুকু মুখাপেক্ষী, এক সময় তুমিও তদাপেক্ষা বেশি তাদের মুখাপেক্ষী ছিলে। তখন তারা যেমন নিজেদের আরাম-আয়েশ ও কামনা-বাসনা তোমার জন্য উৎসর্গ করেছিলেন এবং তোমার অবুঝ কথাবার্তাকে স্নেহ-মমতার আচরণ দ্বারা ঢেকে নিয়েছিলেন, তেমনি মুখাপেক্ষীতার এই দুঃসময়ে বিবেক ও সৌজন্যবোধের তাগিদ এই যে, তাদের পূর্ব ঋণ শোধ করা কর্তব্য। বাক্যে এদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। আলোচ্য আয়াতসমূহে পিতা-মাতার বাধ্যক্যে উপনীত হওয়ার সময় সম্পর্কিত কতিপয় আদেশ দান করা হয়েছে।
(এক) তাদেরকে উহ -ও বলবে না। এখানে উহ শব্দটি বলে এমন শব্দ বোঝানো হয়েছে, যদ্বারা বিরক্তি প্রকাশ পায়। এমনকি, তাদের কথা শুনে বিরক্তিবোধক দীর্ঘশ্বাস ছাড়াও এর অন্তর্ভুক্ত। হযরত আলী (রা.) বর্ণিত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : পীড়া দানের ক্ষেত্রে উহ বলার চাইতেও কম কোন স্তর থাকলে তাও অবশ্য উল্লেখ করা হত। মোটকথা, যে কথায় পিতা-মাতার সামান্য কষ্ট হয়, তাও নিষিদ্ধ।)
দ্বিতীয়, শব্দের অর্থ ধমক দেয়া। এটা যে কষ্টের কারণ তা বলাই বাহুল্য।
তৃতীয় আদেশ, অকুল লাহুমা, কওলান কারীমা প্রথমোক্ত দু টি আদেশ ছিল নেতিবাচক তাতে পিতা-মাতার সামান্যতম কষ্ট হতে পারে, এমন সব কাজেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তৃতীয় আদেশে ইতিবাচক ভঙ্গিতে পিতা-মাতার সাথে কথা বলার আদব শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে, তাদের সাথে সম্প্রীতি ও ভালবাসার সাথে নম্র স্বরে কথা বলতে হবে। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যিব বলেন: যেমন কোন গোলাম তার রূঢ় স্বভাবসম্পন্ন প্রভুর সাথে কথা বলে।
চতুর্থ আদেশ : অখফিয লাহুমা জানায যুল্লি মিনার রহমতি।-এর সারমর্ম এই যে, তাদের সামনে নিজেকে অক্ষম ও হেয় করে পেশ করবে; যেমন গোলাম প্রভুর সামনে। জানাহ শব্দের অর্থ পাখা। শাব্দিক অর্থ হচ্ছে পিতা-মাতার জন্য নিজ নিজ পাখা নম্রতা সহকারে নত করে দেবে। শেষে মিনার রহমতি বলে প্রথমত: ব্যক্ত করা হয়েছে যে, পিতা-মাতার সাথে এই ব্যবহার যেন নিছক লোক দেখানো না হয়, বরং আন্তরিক মমতা ও সম্মানের ভিত্তিতে হওয়া কর্তব্য।
দ্বিতীয়তঃ এ দিকেও ইঙ্গিত হতে পারে যে, পিতা-মাতার সানে নম্র ও নত হয়ে পেশ হওয়া সত্যিকার ইয্যতের পটভূমি । কেননা, এরূপ করা বাস্তব অর্থে হেয় হওয়া নয়, বরং এর কারণ মহব্বত ও অনুকম্পা।
পঞ্চম আদেশ, এর সারমর্ম এই যে, পিতা-মাতার ষোল আনা সুখ-শান্তি বিধান মানুষের সাধ্যাতীত। কাজেই সাধ্যানুযায়ী চেষ্টার সাথে সাথে তাদের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করবে যে, তিনি যেন করুণাবশতঃ তাদের সব মুশকিল আসান করেন এবং কষ্ট দূর করেন। সর্বশেষ আদেশটি অত্যন্ত ব্যাপক ও বিস্তৃত। পিতা-মাতার মৃত্যুর পরও দোয়ার মাধ্যমে সর্বদা পিতা-মাতার খেদমত করা যায়।
মাসআলাঃ- পিতা-মাতার মুসলমান হলে তো তাদের জন্য রহমতের দোয়া করা যাবেই, কিন্তু মুসলমান না হলে তাদের জীবদ্দশায় এ দোয়া জায়েয হবে এবং নিয়ত থাকবে এই যে, তারা পার্থিব কষ্ট থেকে মুক্ত থাকুন এবং ঈমানের তওফীক লাভ করুন। মৃত্যুর পর তাদের জন্য রহমতের দোয়া করা জায়েয নয়।
পিতার আদব ও সম্মান সম্পর্কিত উল্লেখিত আদেশসমূহের কারণে সন্তানদের মনে এমন একটি আশঙ্কা দেখা দিতে পারে যে, পিতা-মাতার সাথে সদাসর্বদা থাকতে হবে তাঁদের এবং নিজেদের অবস্থাও সবসময় সমান যায় না। কোন সময় মুখ দিয়ে এমন কথাও বের হয়ে যেতে পারে, যা উপরোক্ত আদবের পরিপন্থী। এর জন্য জাহান্নামের শাস্তির কথা শোনানো হয়েছে। কাজেই গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা খুবই কঠিন হবে। আলোচ্য সর্বশেষ আয়াতে মনের এই সংকীর্ণতা দূর করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, বেআদবীর ইচ্ছা ব্যতিরেকে কোন সময় কোন পেরেশানী অথবা অসাবধানতার কারণে কোন কথা বের হয়ে গেলে এবং এজন্য তওবা করলে আল্লাহ তাআলা মনের অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবগত রয়েছেন যে, কথাটি বেআদবী অথবা কষ্টদানের জন্য বলা হয়নি। সুতরাং তিনি ক্ষমা করবেন। শব্দের অর্থ অর্থাৎ তওবাকারী। হাদীসে বাদ মাগরিব ছয় রাকআত এবং ইশরাকের নফল নামাযকে বলা হয়েছে। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, এই নামাযগুলো পড়ার তাওফীক তাদেরই হয়, যারা অর্থাৎ (তওবাকারী)।