প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৩য় সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৬, জিলকদ-জিলহজ ১৪৩৭ হিজরী, ভাদ্র-আশ্বিন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

ড. খোন্দকার আ ন ম আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.)

৩৪. বাতিনী ইলম গুপ্ত রহস্য আল্লাহ ইচ্ছামত নিক্ষেপ করেন।
এ জাতীয় আরেকটি জাল ও বাতিল কথা হলো :
বাতিনের ইল্ম আল্লাহর গুপ্ত রহস্যগুলোর একটি এবং আল্লাহর বিধানাবলির একটি। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার অন্তরে চান তা নিক্ষেপ করেন।
এ বাতিল কথাটি কেউ কেউ অন্যভাবে বলেছেন: বাতিনের ইল্ম আমার গুপ্ত রহস্যসমূহের একটি, আমি আমার বান্দাদের অন্তরে স্থাপন করি। আর আমি ছাড়া কেউ তা জানে না।(সিররুল আসরার, পৃ. ২৩)
হাদীসটির একটি সনদ আছে। সনদটি অজ্ঞাত পরিচয় রাবীগনের সমষ্টি। আল্লামা যাহাবী, সুয়ূতী, ইবুন আররাক প্রমুখ হাদীসটিকে জাল বলে উল্লেখ করেছেন। তবে মজার ব্যাপার হলো, আল্লামা সুয়ূতী নিজের হাদীসটিকে জাল হিসাবে চিহ্নিত করে তার যাইলুল লাআলী গ্রন্থে সংকলন করেছেন। কিন্তু তিনি তাঁর আল-জামিউস সাগীর গ্রন্থে হাদীসটি যয়ীফ হিসেবে উল্লেখ করেছেন অথচ তিনি দাবি করেছেন যে, জামি সাগীর পুস্তকে তিনি কোনো জাল হাদীস উল্লেখ করবেন না। এ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, সকল প্রাজ্ঞ আলেমেরই ভুল হতে পারে এবং কারো কথাই নির্বিচারে গ্রহণ করা যায় না। (দাইলামী, আল-ফিরদাউস ৩/৪২; ইবনুল জাওযী, আল-ইলালুল মুতানাহিয়া ১/৮৩; সুয়ূতী, যাইলুল লাআলী, পৃ. ৪৪; আল-জামি আস-সাগীর ২/১৬০; ইবনু র্আরাক, তানযীহ ১/২৮০; আলবানী, যায়ীফুল জামি, পৃ. ৫৪৫; যায়ীফাহ ৩/৩৭১)

৩৫. মানুষই আল্লাহর গুপ্ত রহস্য
একটি জাল হাদীসে কুদসী -তে বলা হয়েছে:
মানুষ আমার গুপ্ত রহস্য এবং আমি মানুষের গুপ্ত রহস্য।
কথাটি একেবারেই ভিত্তিহীন, সনদবিহীন বানোয়াট কথা। (সিররুল আসরার, পৃ. ২৩, ৩১)

৩৬. বাতিনী ইলম লুক্কায়িত রহস্য শুধু আল্লাহওয়ালারাই জানেন
এ অর্থে আরেকটি অত্যন্ত দুর্বল, অনির্ভরযোগ্য বা জাল কথা : ইলমের মধ্যে এমন এক ইলম রয়েছে যা গোপনীয় বস্তুর মত। যে ইলম আল্লাহওয়ালা আলিমগণ ছাড়া কেউ জানে না। তাঁরা যখন তা উচ্চারণ করেন তখন আল্লাহর সম্পর্কে ধোকাগ্রস্ত ছাড়া কেউ তা অস্বীকার করে না।
দাইলামী ও অন্যান্যা আলিম এ হাদীসটি সংকলন করেছেন। তাঁরা তাঁদের সনদে নাসর ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু হারিস নামক এক অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির সূত্রে বলেছেন, এ ব্যক্তি বলেছেন, তাকে আব্দুস সালাম ইবনু সালিহ আবুস সালত হারাবী বলেছেন, সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা থেকে, ইবনু জুরাইজ থেকে, আতা থেকে, আবূ হুরাইরা থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন…।
হাদীসটির রাবী নাসর ইবনু মুহাম্মাদ অজ্ঞাত পরিচয়। তার উস্তাদ হিসাবে উল্লিখিত আব্দুস সালাম ইবনু সালিহ অত্যন্ত দুর্বল বর্ণনাকারী। কোনো কোনো মুহাদ্দিস তাকে ইচ্ছাকৃত মিথ্যাবাদী বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যান্য মুহাদ্দিস তাকে অনিচ্ছাকৃত মিথ্যাবাদী বলে উল্লেখ করেছেন। মিথ্যার প্রকারভেদ অনুচ্ছেদে আমরা তার বিষয়ে আলোচনা করেছি। একমাত্র এ মিথ্যাবাদী ছাড়া অন্য কারো সূত্রে এ হাদীসটি বর্ণিত হয় নি। (দাইলামী, আল-ফিরদাউস ১/২১০; আল-মুনযিরী, আত-তারগীব ১/৫৮-৫৯; ইরাকী, তাখরীজ এহইয়াউ উলূমিদ্দীন ১/৩২; আলবানী, যায়ীফাহ ২/২৬২)

৩৭. মিরাজের রাতে ত্রিশ হাজার বাতিনী ইলম গ্রহণ
আমরা আগেই বলেছি যে, বুজুর্গগণের নামে জাল গ্রন্থ রচনা বা তাদের গ্রন্থের মধ্যে জাল হাদীস ঢুকানো জালিয়াতগণের প্রিয় কর্ম। শাইখ আব্দুল কাদির জিলানী (রাহ)-এর নামে প্রচলিত সিররুল আসরার নামক পুস্তকে নিম্নরূপে লেখা হয়েছে: এ একান্ত গুপ্ত ত্রিশ হাজার এলম মেরাজ শরীফের রাতে আল্লাহ তাআলা হুজুর -এর কলব মোবারকে আমানত রাখেন। হুযুর তাঁর অত্যাধিক প্রিয় সাহাবা এবং আসহাবে সুফ্ফাগণ ব্যতীত অন্য কোনো সাধারণ লোকের কাছে সে পবিত্র আমানত ব্যক্ত করেন নি।… (সিররুল আসরার, পৃ. ৪৫)
যারা শাইখ আব্দুল কাদির (রাহ)-এর নামে এ জাল কথা প্রচার করেছে সে জালিয়াতগণকে আল্লাহ তাদের প্রাপ্য প্রদান করবেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নামে কী জঘন্য ডাহা মিথ্যা কথা! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন প্রিয় সাহাবী বা একজন সুফ্ফাবাসী থেকেও এইরূপ কোনো কথা সহীহ বা যয়ীফ সনদে বর্ণিত হয় নি।

৩৮. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর বিশেষ বাতিনী ইলম
জালিয়াতদের বানানো একটি কথা যা হাদীস বলে প্রচলিত: আল্লাহর সাথে আমার এমন একটি সময় আছে, যেখানে কোনো নৈকট্যপ্রাপ্ত ফিরিশতা বা প্রেরিত নবীর স্থান সংকুলান হয় না।
মুহাদ্দিসগণ একমত যে, কথাটি ভিত্তিহীন সনদহীন একটি জাল কথা, যদিও সুফিয়ায়ে কেরামের মধ্যে তা প্রচলন পেয়েছে। সূফী-দরবেশগণ সরল মনে যা শুনতেন তাই বিশ্বাস করতেন। ফলে জালিয়াতগণ তাদের মধ্যে জাল কথা ছড়াতে বেশি সক্ষম হতো। (সাখাবী, আল-মাকাসিদ, পৃ. ৩৫৮, মোল্লা কারী, আল-আসরার, পৃ. ১৯৭, যারকানী, মুখতাসারুল মাকাসিদ, পৃ. ১৬৪)

৩৯. আলিম বা তালিব ইলমের জন্য ৪০ দিন কবর আযাব মাফ
প্রচলিত একটি সনদবিহীন জাল হাদীস : কোনো আলিম বা তালিব ইলম কোনো গ্রাম দিয়ে গমন করলে মহান আল্লাহ ৪০ দিনের জন্য সে গ্রামের গোরস্থানের আযাব উঠিয়ে নেন।
কথাটি বানোয়াট ও মিথ্যা। (মোল্লা আলী কারী, আল-আসরার, পৃ: ৭৪, নং ২৬১, আল-মাসনূয়, : ৩৮, নং ৫৭)

৪০. আলিমের সাথে সাক্ষাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাত
প্রচলিত একটি জাল হাদীস : যে ব্যক্তি কোনো একজন আলিম/আলিমগণের সাথে সাক্ষাত করল, সে যেন আমার সাথেই সাক্ষাত করল, যে ব্যক্তি কোনো একজন আলিম/আলিমগণের সাথে মুসাফাহা করল, সে যেন আমার সাথেই মুসাফাহা করল, যে ব্যক্তি কোনো একজন আলিম/আলিমগণের মাজলিসে বসল, সে যেন আমার মাজলিসেই বসল। আর যে দুনিয়াতে আমার মাজলিসে বসেছে মহান আল্লাহ তাকে আগামীকাল (কিয়ামতের দিন) আমার সাথে জান্নাতে বসাবেন।
মুহাদ্দিসগণ একমত যে কথাটি জাল ও মিথ্যা। (সুয়ূতী, যাইলুল লাআলী, পৃ. ৩৫; ইবনু র্আরাক, তানযীহ ১/২৭২-২৭৩; মোল্লা কারী. আল-আসরার, পৃ. ২৩২)
এখানে উল্লেখ্য যে, কুরআন ও হাদীসে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে: (১) ইলম শিক্ষা করা, (২) নেককার মানুষদের সাহচর্যে থাকা এবং (৩) নেককার মানুষেদের আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসা ও তাঁদের সাথে দেখা সাক্ষাত করা। এ তিনটি ইবাদত মুমিনের নাজাতের অন্যতম উপকরণ। আলিমগণের সাহচর্য থেকেই এ তিনটি ইবাদত পালন করা যায়।
আলিমের নিজস্ব কোনো ফযীলত নেই। তাঁর ফযীলত নির্ভর করবে তিনি কুরআন ও হাদীস থেকে যতটুকু ইলম ও আমল গ্রহণ করবেন তার উপর। অর্থাৎ আলিমের ফযীলত দুটি: ইলম ও আমল। নেককার আলিমের সাহচর্যের গুরুত্ব তিনটি: নেককার মানুষের সাহচর্যের সাধারণ মর্যাদা, নেককার মানুষের মহব্বতের সাধারণ মর্যাদা ও ইলম শিক্ষার সুযোগ…। এছাড়া আলিমের পিছনে সালাত আদায়, মাজলিসে বসা, সাক্ষাত করা, মুসাফাহা করা ইত্যাদির বিশেষ ফযীলতে যা কিছু বলা হয় সবই ভিত্তিহীন ও জাল কথা।