প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৩য় সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৬, জিলকদ-জিলহজ ১৪৩৭ হিজরী, ভাদ্র-আশ্বিন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
[চলমান]
যদিও হযরত মুয়াজের আমীর হওয়ার যোগ্যতার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্ণ আস্থা ছিল, তবুও তাকে ইয়ামনে পাঠানোর পূর্বে একটি পরীক্ষা নেওয়া উচিত মনে করলেন। তিনি মুয়াজকে ডেকে প্রশ্ন করলেনঃ
আচ্ছা, তুমি ফায়সালা করবে কিভাবে?
কুরআনের দ্বারা।
আল্লাহর রাসূলের সুন্নাতের দ্বারা ফায়সালা করবো।
যদি এমন কোন বিষয়ের সম্মুখীন হও যার সমাধান কুরআন অথবা সুন্নাতে পাচ্ছ না, তখন কি করবে?
আমি নিজেই ইজতিহাদ করে ফায়সালা করবো।
হযরত মুয়াজ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। তার জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তু হয়ে বললেনঃ সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাঁর রাসূলের রাসূলকে (দূত) এমন জিনিসের তাওফীক বা ক্ষমতা দান করেছেন যা তার রাসূলের পছন্দ। (আল-ইসতীয়াব; আল-ইসাবার পার্শ্বটকিা-৪/৪৫৮, তাবাকাত-২/১৪৭-১৪৮)
মুয়াজের পরীক্ষা শেষ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়ামানবাসীদের উদ্দেশ্যে একটি পত্র লেখেন। তাতে হযরত মুয়াজের স্থান ও মর্যাদা স্প হয়ে উঠেছে। (আল-আলাম-৮/১৬৬) তিনি লেখেনঃ ইন্নি বায়াস্ত্ব লাকুম খায়রা আহলী– আমি আমার সর্বোত্তম আহল বা পরিজনকে তোমাদের নিকট পাঠালাম। তিনি আরও লিখলেন, তোমরা মুয়াজ ও অন্য লোকদের সাথে ভালো ব্যবহার করবে। সাদাকা ও জিযিয়ার অর্থ তার নিকট জমা করবে। আমি মুয়াজ ইবন জাবালকে ইয়ামনে বসবাসরত সকলের ওপর আমীর নিয়োগ করছি। তাকে সন্তু রাখবে এবং এমন যেন না হয় যে সে তোমাদের ওপর অসন্তু হয়েছে।
সফরের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে হযরত মুয়াজ গেলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে। সেখানে আরও লোক ছিল। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কিছুদূর এগিয়ে দিয়ে বিদায় নেন। মুয়াজ উটের ওপর সাওয়ার ছিলেন, আর তার পাশে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পায়ে হেঁটে চলছিলেন।
দুই জনের মধ্যে কিছু কথাবার্তাও হচ্ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন মুয়াজ তোমার দায়িত্ব অনেক। কেউ কিছু হাদিয়া দিলে তুমি তা গ্রহণ করবে। আমি তোমাকে তা গ্রহণের অনুমতি দিচ্ছি। বিদায়ের পূর্ব মুহূর্তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন সম্ভবত তোমার সাথে আমার আর দেখা হবে না। এরপর তুমি মদীনায় ফিরে আমার স্থলে আমার কবর ও মসজিদ যিয়ারত করবো। সাথে সাথে মুয়াজ কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কেঁদো না। কান্না শয়তানী কাজ। যাও আল্লাহ তোমাকে সব রকম বিপদ-আপদ থেকে হিফাজত করুন। একথা বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুয়াজকে ছেড়ে দেন। মুয়াজ অত্যন্ত ব্যথা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মদীনার দিকে তাকিয়ে বলেনঃ মুত্তাকীরাই (খোদাভীরু) আমার নিকটতম মানুষ- তা তারা যে কেউ হোক না কেন এবং যেখানেই থাকুক না কেন। (হায়াতুস সাহাবা-২/৩৩৬)
হযরত মুয়াজ ইয়ামনে মাত্র দুই বছর ছিলেন। হিজরী নবম সনে আমীরের দায়িত্ব নিয়ে ইয়ামনে যান এবং হিজরী একাদশ সনে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে স্বেচ্ছায় মদীনায় ফিরে আসেন।
হযরত মুয়াজ ইয়ামন যাওয়ার কিছুদিন পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইনতিকাল করেন এবং হযরত আবু বকর (রা.) খলীফা হন। তিনি আমীরে হজের দায়িত্ব দিয়ে উমারকে মক্কায় পাঠালেন। এদিকে হযরত মুয়াজও হজের উদ্দেশ্যে ইয়ামন থেকে সরসারি তার লাটবহর সহ মক্কায় পৌঁছেন। মিনায় দুইজনের সাক্ষাৎ, কুশল বিনিময় ও কোলাকুলি হলো। মুয়াজের সাথে তার অনেকগুলো দাস ও লাটবহর দেখে উমার জিজ্ঞেস করলেনঃ
আবু আবদির রহমান, এসব কি?
এগুলো আমার। আমি অর্জন করেছি।
কিভাবে অর্জন করলে?
লোকেরা আমাকে হাদিয়া দিয়েছে।
তুমি আবু বকরকে এসব কথা জানাবে এবং সবকিছুই তার হাতে তুলে দেবে। যদি তিনি তোমাকে কিছু দান করেন, তুমি তা গ্রহণ করবে।
আমি তোমার কথা মানবো না। মানুষ আমাকে দান করেছে, আর আমি তা আবু বকরের হাতে তুলে দেব?
হযরত উমার (রা.) মদীনায় ফিরে খলীফাকে পরামর্শ দিলেন, মুয়াজের জীবন ধারণের মত কিছু অর্থ তাকে দিয়ে অবশি সবকিছু বাইতুল মালে জমা করা হোক। আবু বকর জবাব দিলেনঃ তাকে আমীর নিয়োগ করেন খোদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সে যদি নিজেই জমা দিতে ইচ্ছা করে এবং আমার কাছে নিয়ে আসে, আমি গ্রহণ করবো। অন্যথায় এক কপর্দকও গ্রহণ করবো না। হযরত উমার খলিফার জবাব পেয়ে আবার মুয়াজের কাছে যান এবং পুনরায় তাকে জমা দেওয়ার তাকিদ দেন। এবার মুয়াজ বলেন আমাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়ামনে শুধু এই জন্য পাঠান যে, আমি যেন সেখানে থেকে নিজের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারি। আমি কিছুই দেব না। হযরত উমার নীরবে উঠে চলে আসলেন। তবে তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন।
হযরত মুয়াজ তো উমারকে ফিরিয়ে দিলেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত অদৃশ্য সাহায্যে তিনি উমারের সাথে একমত পোষণ করেন। মুয়াজ রাতে ঘুমিয়ে গেলেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে সোজা উমারের নিকট গিয়ে বললেনঃ আপনার কথা মানা ছাড়া আমার আর উপায় নেই। রাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমাকে জাহান্নামের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আর আপনি আমাকে টেনে ধরে রেখেছেন। অন্য একটি বর্ণনা মতে মুয়াজ পানিতে ডুবে যাচ্ছেন এবং উমার তাকে উদ্ধার করছেন। তারপর মুয়াজ সকল দাস-দাসী সঙ্গে করে খলীফা আবু বকরের নিকট হাজির হন এবং পুরো ঘটনা বর্ণনার পর বলেন, আমার কাছে যা কিছু আছে সবই এনে হাজির করছি। আবু বকর (রা.) বললেনঃ আমি তোমার নিকট থেকে কিছুই গ্রহণ করবো না, সবই তোমাকে হিবা বা দান করলাম। কারণ, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি; আশা করা যায় আল্লাহ তোমার ক্ষতি পূরণ করে দেবেন। অন্য একটি বর্ণনা মতে আবু বকর তার নিকট থেকে কিছু সম্পদ গ্রহণ করে তার অবশি ঋণ পরিশোধ করেন এবং বাকী সম্পদ সবই তাকে দান করেন। হযরত উমার তখন মুয়াজকে লক্ষ্য করে বলেনঃ এখন সবই তোমার কাছে রাখ। এখন তুমি অনুমতি প্রাপ্ত।
হযরত মুয়াজ দাসদের সঙ্গে করে বাড়ি ফিরলেন। তাদের সাথে জামায়াতে নামায আদায় করলেন। সালাম ফিরিয়ে তাদের জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা কার জন্য নামায আদায় করলে? তারা বললোঃ আল্লাহর জন্য। মুয়াজ বললেনঃ তাহলে তোমরা মুক্ত, তোমরা তারই জন্য। (তাবাকাত-৩/৫৮৬-৫৮৮, হায়াতুস সাহাবা-১৫২-১৫৪)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুয়াজকে ইয়ামনে পাঠালেন। একদিকে তিনি ইয়ামনের গভর্নর, অন্যদিকে সেখানকার তাবলীগ ও দ্বীনী তালীমের দায়িত্বশীলও। বিচারের দায়িত্ব ছাড়াও দ্বীনী দায়িত্বও পালন করতেন। তিনি লোকদের কুরআন শিক্ষা দিতেন, ইসলামী বিধি-বিধানের প্রশিক্ষণ দিতেন।
তিনি ইয়ামনে থাকাকালীন একবার হাওলান গোত্রের এক মহিলা তার নিকট এলো। তার ছিল বারোটি ছেলে। তবে সবচেয়ে ছোট ছেলেটিও তখন শ্মশ্রু মণ্ডিত। এর দ্বারাই অনুমান করা যায় মহিলার বয়স কত হতে পারে। স্বামীকে একা বাড়িতে রেখে বারোটি ছেলের সকলকে সঙ্গে করে সে এসেছে। দুই ছেলে তার দুইটি বাহু ধরে চলতে সাহায্য করেছে। মহিলা মুয়াজকে প্রশ্ন করলো
আপনাকে কে পাঠিয়েছে?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
আপনি তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্বাচিত প্রতিনিধি? আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে চাই।
করুন।
স্ত্রীর ওপর স্বামীর হক বা অধিকার কতটুকু?
যথাসম্ভব আল্লাহকে ভয় করে তার আনুগত্য করবে।
আল্লাহর কসম, আপনি একটু ঠিক ঠিক বলবেন।
আপনি এতটুকুতে সন্তু নন?
ছেলেদের বাবা বৃদ্ধ হয়েছে, আমি তার হক কিভাবে আদায় করবো?
আপনি তার দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারেন না। যদি কু রোগে তার দেহ পঁচে ফেটে যায়, রক্ত ও পুঁজ ঝরতে থাকে, আর আপনি তাতে মুখ লাগিয়ে চুষে নেন, তবুও তার হক পুরোপুরি আদায় হবে না। (মুসনাদ-৫/২৩৯, সীরাতু ইবন হিশা-২/৫৯০-৯১, সীয়ারে আনসার-২/১৬৬)
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোটা ইয়ামনকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেন; সানয়া, কিন্দাহ, হাদরামউত, জানাদ, খুবাইদা। ইয়ামনের রাজধানী ছিল জানাদ, আর এখানেই থাকতেন হযরত মুয়াজ। তিনিই জানাদের জামে মসজিদটির নির্মাতা। (শাজারাতুজ জাহাব-১/৩০) অবশি চারটি স্থানে নিম্নলিখিত ব্যক্তিবর্গ শাসক নিযুক্ত হন
সানয়া-হযরত খালিদ ইবন সাঈদ, কিন্দাহ-হযরত মুহাজির ইবন আবী উমাইয়া, হাদরামাউত-হযরত যিয়াদ ইবন লাবীদ এবং খুবাইদ ও উপকূলীয় এলাকায়-হযরত আবু মূসা আল-আশয়ারী (রা.)। উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গ নিজ নিজ এলাকায় সাদাকা, জিযিয়া ইত্যাদি আদায় করে হযরত মুয়াজের নিকট পাঠিয়ে দিতেন। রাজকোষের পূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন হযরত মুয়াজ। (শাজারাতুজ জাহাব-১/৩০)
হযরত মুয়াজ বিভিন্ন সময়ে তার অধীনস্থ শাসকদের এলাকাসমূহ ঘুরে ঘুরে তাদের বিচার ও সিদ্ধান্তসমূহ দেখাশুনা করতেন। প্রয়োজনবোধে তিনি নিজেও মুকাদ্দামার শুনানী করতেন। একবার হযরত আবু মূসার অঞ্চলে গিয়ে এভাবে একটি মুকাদ্দামার ফায়সালা করেন। এসব সফরে তিনি তাঁবুতেও অবস্থান করতেন। আবু মূসার এখানেও তার জন্য একটি তাঁবু নির্মাণ করা হয়। তিনি ও আবু মূসা দুইজনই পাশাপাশি তাঁবুতে অবস্থান করেন। (বুখারী-২/৬৩৩)
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মুয়াজকে ইয়ামনে পাঠান তখন তাকে একটি লিখিত নির্দেশনামা দান করেন। তাতে গনীমাত, খুমুস, সাদাকাত, জিযিয়াসহ বিভিন্ন বিধানের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। হযরত মুয়াজ সব সময় তারই আলোকে কাজ করতেন।
একবার এক ব্যক্তি একপাল গরু নিয়ে এলো। গরুগুলো সংখ্যায় ছিল তিরিশটি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে না জেনে কিছুই গ্রহণ করবো না। কারণ এ ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে কিছুই বলেননি। এ দ্বারা বুঝা যায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওয়ালীগণ দুনিয়ার অন্যান্য শাসকদের মত অত্যাচারী ছিলেন না। রক্ষক ও রক্ষিতের মাঝে যে সম্পর্ক ইসলাম ঘোষণা করেছিল, তারা সব সময় তা স্মরণে রাখতেন। আর রক্ষকের ওপর শরীয়াত যেসব দায়িত্ব অর্পণ করেছে তারা তা কঠোরভাবে অনুসরণ করতেন।
বিচার ও সিদ্ধান্তের সময়ও জনগণের অধিকার যাতে খর্ব না হয় সেদিকে সজাগ দৃি রাখতেন। তাদের আদালত সমূহে সর্বদা সত্য ও সততার বিজয় ছিল। এক ইয়াহুদী মারা গেল। একমাত্র ভাই রেখে গেল উত্তরাধিকারী। সেও ইসলাম গ্রহণ করেছিল। বিষয়টি হযরত মুয়াজের আদালতে উত্থাপিত হলো। তিনি ভাইকে উত্তরাধিকার দান করেন। (মুসনাদ-৫/২৩০)
হযরত মুয়াজ ছিলেন জীবনের প্রথম থেকে অতি বুদ্ধিমান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমনের পর তিনি তার সঙ্গ অবলম্বন করেন। অল্প কিছু দিনের মধ্যে ফায়েজে নববীর বরকতে ইসলামী শিক্ষার সর্বোচ্চ মডেলের রূপ লাভ করেন এবং বিশি সাহাবীদের মধ্যে পরিগণিত হন।
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এত মুহাব্বত করতেন যে, অধিকাংশ সময় তাকে নিজের বাহনের পিছনে বসার সুযোগ দিয়ে নানা রকম ইলম ও মারেফাত শিক্ষা দিতেন। একবারে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাহনের পিছনে বসেছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডাকলেনঃ মুয়াজ। তিনি জবাব দিলেনঃ লাব্বাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ ও সাদাইকা-হাজির ইয়া রাসূলুল্লাহ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার ডাকলেনঃ মুয়াজ। তিনিও অত্যন্ত আদব ও শ্রদ্ধার সাথে জবাব দিলেন। এভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার ডাকলেন, আর মুয়াজও প্রতিবার সাড়া দিলেন। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ যেব্যক্তি আন্তরিকভাবে কালিমা-ই-তাওহীদ পাঠ করে আল্লাহ তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম করে দেন। মুয়াজ আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি মানুষের কাছে এই সুসংবাদ কি পৌঁছে দেব? তিনি বললেনঃ না। কারণ, মানুষ আমল ছেড়ে দেবে। (বুখারী-১/২৪)
হযরত মুয়াজ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে খচ্চরের ওপর সাওয়ার ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাবুক দিয়ে খচ্চরের পিঠে মৃদু আঘাত করে বলেন ঃ তুমি কি জান বান্দার ওপর আল্লাহর হক কি? মুয়াজ বললেন আল্লাহ ও তার রাসূলই ভালো জানেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন ঃ বান্দা তার ইবাদাত করবে এবং শিরক থেকে বিরত থাকবে। কিছুদূর যাওয়ার পর আবার জিজ্ঞেস করলেন ঃ আচ্ছা বলতে পার, আল্লাহর নিকট বান্দার হক বা অধিকার কি? মুয়াজ বললেন এ ব্যাপারে তো আল্লাহ ও তার রাসূলই বেশি জানেন। বললেনঃ তিনি তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। (মুসনাদ-৫/২৩৮)
এভাবে হযরত মুয়াজ সর্বদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্নেহ ও আদর লাভে ধন্য হয়েছেন। উঠতে বসতে সর্বক্ষণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট শিক্ষার সুযোগ লাভ করেছেন। একবার তো দরযায় অপেক্ষমান দেখতে পেয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে একটি জিনিস শিখিয়ে দিলেন। আর একবার বললেন আমি কি তোমাকে জান্নাতের দরযার কথা বলে দেবো? বললেনঃ হাঁ। ইরশাদ হলঃ লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ পাঠ করবে। (মুসনাদ-৫/২৩৮)
একবার এক সফরে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গী ছিলেন। একদিন সকালে যখন সৈন্যরা লক্ষ্যস্থলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তখন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বসা। তিনি আবদার জানালেন ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে এমন কোন আমল শিখিয়ে দিন যা আমাকে জান্নাতে নিয়ে যায় এবং জাহান্নাম থেকে দূরে রাখে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি একটা কঠিন বিষয় জানতে চেয়েছ। তবে আল্লাহ যাকে তাওফিক বা সামর্থ দান করেন তার জন্য সহজ। শিরক করবে না, ইবাদাত করবে, নামায আদায় করবে, যাকাত দান করবে, রমজান মাসে সিয়াম পালন করবে এবং হজ আদায় করবে। তিনি আরও বলেন ঃ কল্যাণের কয়েকটি দ্বার আছে। আমি তোমাকে বলছি, শোন সাওম-যা ঢালের কাজ করে, সাদাকা-যা পাপের আগুনকে পানির মত নিভিয়ে দেয় এবং নামায রাতের বিভিন্ন অংশে আদায় করা হয়। এর পর তিনি নীচের আয়াতটি তিলাওয়াত করেন
তারা শয্যা ত্যাগ করে তাদের প্রতিপালককে ডাকে আশায় ও আশংকায় এবং আমি তাদেরকে যে রিযক দান করেছি তা থেকে তারা ব্যয় করেন। (সূরা সাজদা-১৬)
তিনি আরও বলেন, ইসলামের মাথা, খুঁটি ও চূড়ার কথা বলছি। মাথা ও খুঁটি হচ্ছে নামায এবং চূড়া হচ্ছে জিহাদ। তারপর বললেনঃ এইসব জিনিসের মূল হচ্ছে একটি মাত্র জিনিস। আর তা হলো জিহ্বা। তিনি নিজের জিহ্বা বের করে হাত দিয়ে স্পর্শ করে বলেন, একে নিয়ন্ত্রণে রাখবে। মুয়াজ প্রশ্ন করলেনঃ এই যে আমরা যা কিছু বলি, তার সব কিছুরই কি জবাবদিহি করতে হবে? বললেনঃ মুয়াজ! তোমার মার সর্বনাশ হোক। অনেকে শুধু এর জন্যই জাহান্নামে যাবে। (মুসনাদ-৫/২৩১০)
একবার তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুয়াজকে দশটি বিষয়ের অসীয়াত করলেন। ১. শিরক করবে না। তার জন্য কেউ যদি তোমাকে হত্যা করে অথবা আগুনে পুড়িয়েও মারে, তবুও না। ২. মাতা-পিতাকে ক দেবে না। তারা যদি তোমাকে তোমার সন্তান-সন্তুতি ও বিষয়-সম্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তবুও। ৩. ফরজ নামায ইচ্ছাকৃতভাবে কক্ষণও তরক করবে না। যে ইচ্ছাকৃতভাবে নামায তরক করে আল্লাহ তার জিম্মাদারী থেকে অব্যাহতি নিয়ে নেন। ৪. মদ পান করবে না। কারণ, এ কাজটি সকল অশ্লীলতার মূল। ৫. পাপ কর্মে লিপ্ত হবে না। পাপাচারে লিপ্ত ব্যক্তির ওপর আল্লাহর ক্রোধ বৈধ হয়ে যায়। ৬. জিহাদের ময়দান থেকে পালাবে না। যদি সকল সৈন্য রক্ত রঞ্জিত ও ধুলিমলিন হয়ে যায় এবং ব্যাপকভাবে মৃত্যুবরণ করে, তবুও না। ৭. মহামারি আকারে কোন রোগ-ব্যাধি দেখা দিলে অটল থাকবে। ৮. নিজের সন্তানদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে। ৯. তাদেরকে সর্বদা আদব ও শিাচার শিক্ষা দেবে। ১০. তাদেরকে খাওফে খোদা (আল্লাহর ভয়) শিক্ষা দেবে।
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার মুয়াজকে পাঁচটি জিনিসের তাকিদ দিয়ে বলেছিলেনঃ যে এই আমলগুলো করে আল্লাহ তার জামিন হয়ে যান। ১. অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া, ২. জানাযার সাথে চলা, ৩. জিহাদে বের হওয়া, ৪. শাসককে ভীতি প্রদর্শন অথবা সম্মান দেখানোর জন্য যাওয়া, ৫. ঘরে চুপচাপ বসে থাকা-যেখানে সে নিরাপদ থাকে এবং মানুষও তার থেকে নিরাপদ হয়ে যায়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নৈতিক শিক্ষা দেন এভাবেঃ মুয়াজ! একটি মন্দ কাজ করার পর একটি নেক কাজ কর। নেক কাজ মন্দ কাজটি বিলীন করে দেয়। আর মানুষের সামনে সর্বোত্তম নৈতিকতার দৃান্ত উপস্থাপন কর। (মুসনাদ-৫/২৩৮)
তিনি মুয়াজকে এক কথাও শিক্ষা দেনঃ মাজলুম বা অত্যাচারীতের বদ দুআ থেকে দূরে থাকবে। কারণ, সেই বদ দুআ ও আল্লাহর মাঝে কোন প্রতিবন্ধক থাকে না। (বুখারী)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাকে ইয়ামানের আমীর করে পাঠান তখন বলেছিলেনঃ মুয়াজ! ভোগ-বিলাসিতা থেকে দূরে থাকবে। কারণ, আল্লাহর বান্দা কক্ষণও আরামপ্রিয় ও বিলাসী হতে পারে না। (মুসনাদ-৫/২৪৩) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সামাজিক জীবনের শিক্ষা দিয়েছেন এভাবেঃ মানুষের নেকড়ে হচ্ছে শয়তান। নেকড়ে যেমন দলছুট বকরীকে ধরে নিয়ে যায় তেমনি শয়তানও এমন মানুষের ওপর প্রভুত্ব লাভ করে যে, জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে। সাবধান! সাবধান! কক্ষণও বিচ্ছিন্ন থাকবে না। সর্বদা জামায়াতের সাথে থাকবে। (মুসনাদ-৫/২৪৩)
ইসলামের তাবলীগ ও দাওয়াত সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেনঃ মুয়াজ! তুমি যদি কেবলমাত্র একজন মুশরিককেও মুসলমান বানাতে পার তাহলে সেটা হবে তোমার জন্য দুনিয়ার সবকিছু থেকে উত্তম কাজ। (মুসনাদ-৫/২৩৮)
এমন পবিত্র চিন্তা ও মহোত্তম শিক্ষা লাভ করেছিলেন হযরত মুয়াজ। একারণে মহান সাহাবী হযরত ইবন মাসউদ তাকে শুধু একজন ব্যক্তি নয় বরং একটি উম্মাতই মনে করতেন। তিনি বলেনঃ মুয়াজ ছিলেন সরল-সোজা একটি আল্লাহ অনুগত উম্মাত। তিনি কখনও মুশরিকদের কেউ ছিলেন না। ফারওয়া আল-আশাজঈ তাকে বললেন ঃ এমন কথা তো আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম (আ.) সম্পর্কেই বলেছেন। ইবন মাসউদ আবারও তার কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। ফারওয়া আল-আশজাঈ বলেনঃ আমি ইবন মাসউদকে তার কথার ওপর অটল থাকতে দেখে চুপ থাকলাম। তারপর তিনিই আমাকে প্রশ্ন করলেনঃ তুমি কি জান উম্মাত মানে কি, বা কানিত কাকে বলে? বললাম আল্লাহই ভালো জানেন। তিনি বললেন, উম্মাত হচ্ছে সেই ব্যক্তি যিনি মঙ্গলকে জানেন এবং যার ইকতিদা ও অনুসরণ করা যায়। আর কানিত বলে আল্লাহর অনুগত ব্যক্তিকে। এই অর্থে মুয়াজ ছিলো যথার্থই মঙ্গল বা কল্যাণের শিক্ষাদানকারী এবং আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুগত ব্যক্তি। (আল-ইসতীয়াব; আল-ইসাবা-৪/৩৬১, তাহজীবুল আসমা-২/১০০)
দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমারের (রা.) খিলাফতকালেই মজলিসে শূরা প্রকৃতপক্ষে পূর্ণরূপ লাভ করে। তবে প্রথম খলিফার যুগেই তার একটি কাঠামো তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ইবন সাদের বর্ণনা মতে হযরত আবুবকর (রা.) খিলাফতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যাদের সাথে পরামর্শ করতেন তাদের মধ্যে মুয়াজও ছিলেন। হযরত উমারের (রা.) খিলাফতকালে যখন মজলিসে শূরার নিয়মিত অধিবেশন বসতো তখনও মুয়াজ সদস্য ছিলেন। (কানযুল উম্মাল-১৩৪)
