প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১০ম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৬, জমা.সানী-রজব ১৪৩৭ হিজরী, চৈত্র-বৈশাখ ১৪২২ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
৪. ওলীগণ আল্লাহর সুবাস
প্রচলিত একটি পুস্তকে লিখিত হয়েছে: আল-আউলিয়াও রায়হানুল্লাহ – আল হাদীস। অর্থ আউলিয়া আল্লাহর সুবাস। (খাজা নিযামুদ্দিন আউলিয়া (রাহ), রাহাতুল মুহিব্বীন, শেষ প্রচ্ছদ।)
কথাটি কোনো কোনো বুজুর্গ বলেছেন, হাদীস হিসেবে এটি জাল। ওলীগণকে আল্লাহর সুবাস বলায় কোনো অসুবিধা নেই। আল্লাহর রিযককে আল্লাহর সুবাস বলা হয়েছে, সন্তানকেও আল্লাহর সুবাস বলা হয়েছে। (তাবারী, তাফসীর ২৭/১২৩; হাকীম তিরমিযী, নাওয়াদিরুল উসূল ২/৫৯; ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৮/৬২১।)
কিন্তু এ কথাটিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে বলতে হলে সহীহ সনদে তা বর্ণিত হতে হবে। কিন্তু এ কথাটির কোনো জাল সনদও নেই।
৫. ওলীগণ আল্লাহর জুব্বার অন্তরালে
প্রচলিত একটি পুস্তকে লিখিত হয়েছে: ইন্না আউলিয়াই তাহ্তো কাবাই লা ইয়ারিফুহুম গাইরী ইল্লা আউলিয়াই। -হাদীসে কুদসী। অর্থ: নিশ্চয়ই আমার বন্ধুগণ আমার জুব্বার অন্তরালে অবস্থান করেন, আমি ভিন্ন তাঁদের পরিচিতি সম্বন্ধে কেহই অবগত নহে, আমার আউলিয়াগণ ব্যতীত। (জুরজানী, আলী ইবনু মুহাম্মাদ (৮১৬হি), তারীফাত, পৃ. ২৯৫; মুনাবী, মুহাম্মাদ আব্দুর রাঊফ (১০৩১ হি); তাআরীফ, পৃ. ৬৭৬; মোল্লা আলী কারী, মিরকাত (শামিলা) ১৫/২৫৬।)
৬. ওলীদের খাস জান্নাত: শুধুই দীদার
আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে যে, আল্লাহর খাস ওলীগণ জান্নাতের নেয়ামতের জন্য ইবাদত করেন না, বরং শুধুই মহব্বত বা দীদারের জন্য। এ অবস্থাকে সর্বোচ্চ অবস্থা বলে মনে করা হয়। এ মর্মে একটি জাল হাদীস: আল্লাহর এমন একটি জান্নাত আছে যেখানে হুর, অট্টালিকা, মধু এবং দুগ্ধ নেই। (বরং শুধু দীদারে ইলাহী-মাওলার দর্শন)। কথাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, সনদবিহীন একটি জাল কথা। (সিররুল আসরার, পৃ. ১৯-২০)
৭. ওলী-আল্লাহদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাত সবই হারাম!
উপরের অর্থেই আরেকটি বানোয়াট কথা:
আখিরাত-ওয়ালাদের জন্য দুনিয়া হারাম আর দুনিয়া-ওয়ালাদের জন্য আখিরাত হারাম। আর আল্লাহ-ওয়ালাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই হারাম। (অর্থাৎ উভয়কে হারাম না করে আল্লাহওয়ালা হওয়া যায় না)
দাইলামী (৫০৯ হি) ফিরদাউস -এ হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। তাঁর পুত্র আবূ মানসূর দাইলামী (৫৫৮ হি) তার মুসনাদুল ফিরদাউস গ্রন্থে এর একটি সনদ উল্লেখ করেছেন। সনদের অধিকাংশ রাবীই একেবারে অজ্ঞাত পরিচয়। অন্যরা দুর্বল। এজন্য হাদীসটিকে জাল বলে গণ্য করা হয়েছে। (দাইলামী, আল-ফিরদাউস ২/২৩০; আজলূনী, কাশফুল খাফা ১/৪৯৩; আলবানী, যায়ীফাহ ১/১০৫-১০৬)
এ হাদীসে বলা হয়েছে যে, (১) আখিরাত-ওয়ালাদের জন্য দুনিয়া হারাম এবং (২) আল্লাহ-ওয়ালাদের জন্য দুনিয়া আখিরাত উভয়ই হারাম। এ কথা দুটি কুরআন কারীম ও অগণিত সহীহ হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক। মহান আল্লাহ ঠিক এর বিপরীত কথা বলেছেন। তিনি তাঁর প্রিয়তম রাসূল ও শ্রেতম আল্লাহ-ওয়ালা সাহাবীগণসহ সকল আল্লাহওয়ালা ও আখিরাত-ওয়ালাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সৌন্দর্য ও আনন্দ হারা করেন নি বলে ঘোষণা করেছেন: আপনি বলুন: আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যে সৌন্দর্য ও পবিত্র আনন্দ ও মজার বস্তুগুলো বের (উদ্ভাবন) করেছেন তা হারাম বা নিষিদ্ধ করলো কে? আপনি বলুন: সেগুলো মুমিনদের জন্য পার্থিব জীবনে এবং কিয়ামতে শুধুমাত্র তাদের জন্যই। (সূরা (৭) আরাফ: ৩১-৩২ আয়াত।)
এরূপ একটি জাল কথা: ঐ ব্যক্তি আমার প্রিয়তম যে আমাকেই চায় শাস্তির ভয়ে কিংবা পুরস্কারের আশায় নহে।… তাহা অপেক্ষা অপরাধী কে, যে দোজখের ভয়ে কিংবা বেহেশতের আশায় আমাকে অর্চ্চনা করে…।(আলহাজ্জ খান বাহাদুর আহছানউল্লা (ই. ফা. বা. ২য় সংস্কারণ ২০১১) পৃা ৬৯।)
কুরআনে আল্লাহওয়ালা ও আখেরাত ওয়ালাদিগকে দুনিয়া ও আখিরাতের নেয়ামত প্রার্থনা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা এভাবে দোয়া করতেন। আর আখিরাতের নেয়ামত তো আল্লাহওয়ালা ও আখেরাতওয়ালাদের মূল কাম্য। আল্লাহওয়ালা হতে হলে, জান্নাতের নিয়ামতের আশা আকাঙ্খা বর্জন করতে হবে, এ ধারণাটি কুরআন ও হাদীসের সুষ্পষ্ট বিরোধী। কোনো কোনো নেককার মানুষের মনে এরূপ ধারণা আসতে পারে। তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণ সর্বদা জান্নাতের নিয়ামত চেয়েছেন, সাহাবীগণকে বিভিন্ন নিয়ামতের সুসংবাদ দিয়েছেন। সর্বোপরি মহান আল্লাহ কুরআন কারীমে সর্বোচ্চ মর্যাদার নবী-ওলীগণ এবং সাধারণ ওলীগণ সকলের জন্য জান্নাতের নিয়ামতের বর্ণনা দিয়েছেন।
৮. শরীয়ত, তরীকত, মারিফত ও হাকীকত
এগুলো সমাজে প্রচলিত অতি পরিচিত চারটি পরিভাষা। কুরআন-হাদীসে শরীয়ত শব্দটিই ব্যবহৃত হয়েছে। ইসলামের চারটি পর্যায় বা স্তর অর্থে তরীকত, মারেফত ও হাকীকত পরিভাষাগুলো কুরআন বা হাদীসে কোথাও ব্যবহৃত হয় নি। কখনোই কোনো সাহাবী, তাবিয়ী, প্রসিদ্ধ চার ইমাম বা অন্য কেউ ইসলামের চারটি স্তর বা পর্যায় হিসেবে এ পরিভাষাগুলি ব্যবহার করেন নি। প্রথমে শীয়াগণ এগুলি উদ্ভাবন ও ব্যবহার করেন। পরে সুন্নী সরল সূফীগণের মধ্যে পরিভাষাগুলি প্রসার লাভ করে। বিশেষত, ইসলামের প্রথম তিন শতাব্দীর পর মিসর, ইয়ামান, ইরান, ইরাক, বাগদাদ ও মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র শীয়াগণের রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিতি হয়। এ সময়ে শীয়া আকীদার অনেক কিছুই সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আর এ সুযোগে জালিয়াতগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে হাদীস বানিয়ে বলেছে:
শরীয়ত একটি বৃক্ষ, তরীকত তার শাখা-প্রশাখা, মারিফত তার পাতা এবং হাকীকত তার ফল। (সিররুল আসরার, পৃ. ৩৩)
মিথ্যাচারিদের আল্লাহ লাঞ্চিত করুন।
তাদের বানানো আরেকটি কথা:
শরীয়ত আমার কথাবার্তা, তরীকত আমার কাজকর্ম, হাকীকত আমার অবস্থা এবং মারিফাত মূলধন। (আজলূনী, কাশফুল খাফা ২/৬।)
আরবী মারিফাত শব্দটি আরাফা ক্রিয়াপদ থেকে গৃহীত। এর অর্থ কোনো ইন্দ্রিয় দিয়ে কোনো কিছু অবগত হওয়া বা পরিচয় লাভ করা। এভাবে মূলত ইন্দ্রিয়-লব্ধ জ্ঞান বা পরিচয়কে মারিফাত বলা হয়। তবে সাধারণত মারিফাত বলতে জ্ঞান , পরিচয় বা শিক্ষা (knowledge, education) বুঝানো হয়।
শরীয়ত, তরীকত, হাকীকাত ও মারিফাত এ পর্যায়ক্রমিক ধারায় মারিফাত-কে শরীয়তের উপরে স্থান দেওয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে কুরআন-সুন্নাহ সুস্পষ্টভাবেই মারিফাতকে শরীয়তের নিম্নের স্থান দিয়েছে। জ্ঞান অর্থে মারিফাত ঈমান অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আল্লাহর মারিফাত বা আল্লাহর পরিচয় লাভ মানুষকে তাঁর প্রতি ঈমান বা বিশ্বাসের দিকে ধাবিত করে। তবে কুরআন-হাদীসে মূলত ইলম এবং ফিকহ -এর প্রশংসা করা হয়েছে, মারিফাত -এর কোনো বিশেষ প্রশংসা করা হয়নি। মারিফাত ঈমানের পথে পরিচালিত করলে তা প্রশংসনীয়। উপরন্তু কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মারিফাত অর্জনের পরেও মানুষ কুফর বা অবিশ্বাসে লিপ্ত হয়। কুরআনে একাধিক স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইহূদী-খৃষ্টানদের অনেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাঁর দীন সম্পর্কে পরিপূর্ণ মারিফাত অর্জনের পরেও কুফারী করত। (সূরা (২) বাকারা: ১৪৬; সূরা (৬) আনআম: ২০ আয়াত) অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন : অতঃপর যখন তাদের নিকট তা (কুরআন) আগমন করল, তারা তার মারিফাত অর্জনের (প্রকৃত পরিচয় জানার) পরেও কুফরী করল। (সূরা (২) বাকারা: ৮৯ আয়াত)
আল্লাহর নিয়ামতের মারিফাত (প্রকৃত পরিচয়) তারা লাভ করে অতঃপর তারা তা অস্বীকার করে এবং তাদের অধিকাংশই কাফির। (সূরা (১৬) নাহল: ৮৩ আয়াত)
কুরআন-সুন্নাহ মুমিনদেরকে মারিফাত অর্জনের নির্দেশ দেয় নি, বরং ইলম অর্জনের নির্দেশ দিয়েছে; কারণ মারিফাত তো ঈমান অর্জনের পূর্বের অবস্থা। কিন্তু শীয়াগণ মারিফাতকে ঈমান, ইসলাম ও শরীয়ত থেকে পৃথক উচ্চপর্যায়ের বিষয় বলে প্রচার করেন এবং মারিফাতকে তত্ত্বজ্ঞান বা গোপন বা পৃথক কোনো জ্ঞান বলে প্রচার করেন। এ সকল বিভ্রান্তির অপনোদনে ইমাম আবূ হানীফা (রাহ)-এর বক্তব্য প্রণিধানযোগ : মহান আল্লাহর প্রকৃত মারিফাত আমরা লাভ করেছি, তিনি যেভাবে তাঁর কিতাবে তাঁর নিজের বর্ণনা দিয়েছেন সেভাবে তাঁর সকল বিশেষণ সহকারে।… মুমিনগণ সকলেই সমান মারিফাতের বিষয়ে, এবং ইয়াকীন, তাওয়াক্কুল, মহাব্বাত, রিযা (সন্তুষ্টি), খাওফ (ভয়) রাজা (আশা) এবং এ সকল বিষয়ের ঈমান-এর ক্ষেত্রে। তাদের মর্যাদার কমবেশি হয় মূল ঈমান বা বিশ্বাসের অতিরিক্ত যা কিছু আছে তার সবকিছুতে। (ইমাম আবু হানীফা, আল-ফিকহুল আকবার মোল্লা আলী কারীর ব্যাখ্যা-সহ) পৃ. ১৫১-১৫৭)
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর বক্তব্য থেকে দুটি বিষয় সুস্পষ্ট: (১) মারিফাত ঈমানেরই সহযাত্রী। আল্লাহর সত্যিকার মারিফাত লাভই ঈমানের পথে পরিচালিত করে; এজন্য সকল মুমিনই আল্লাহর হক্ক বা প্রকৃত মারিফাত লাভ করেছেন এবং এ বিষয়ে তাঁরা সকলেই সমমর্যাদার। (২) আল্লাহর মারিফাত গোপন কোনো তত্ত্বজ্ঞান নয় বা তা অর্জনের জন্য গোপন কোনো পথ নেই। মহান আল্লাহ তাঁর নিজের বিষয়ে ওহীর মাধ্যমে যা জানিয়েছেন তা অবগত হওয়াই তাঁর প্রকৃত ও পরিপূর্ণ মারিফাত।
৯. ছোট জিহাদ ও বড় জিহাদ
কথিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করে বলেন : আমরা ছোট জিহাদ থেকে বড় জিহাদের দিকে প্রত্যাবর্তন করলাম। … বড় জিহাদ হলো মনের সাথে জিহাদ বা নিজের প্রবৃত্তির সাথে সংগ্রাম ইবনু তাইমিয়া হাদীসটি ভিত্তিহীন ও বাতিল বলে গণ্য করেছেন। ইরাকী, সুয়ূতী প্রমুখ মুহাদ্দিস উল্লেখ করেছেন যে, হাদীসটি দুর্বল সনদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে। পক্ষান্তরে সহীহ সনদে কথাটি ইবরাহীম ইবনু আবী আবলা (১৫২ হি) নামক প্রসিদ্ধ তাবিয়ী থেকে তাঁর নিজের বক্তব্য হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। এজন্য ইবনু হাজার আসকালানী বলেছেন যে, হাদীসটি মূলত এ তাবিয়ীর বক্তব্য। অনেক সময় দুর্বল রাবীগণ সাহাবী বা তাবিয়ীর কথাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা হিসেবে বর্ণনা করেন। (তাহির পাটনী, তাযকিরাহ, পৃ. ১৯১; মোল্লা কারী, আল-আসরার, পৃ. ১২৭; আজলূনী, আশফুল খাফা ১/৫১১; দরবেশ হূত, আসনাল মাতালিব, পৃ. ১৫৩; আলবানী, যায়ীফাহ ৫/৪৭৮-৪৮১)
১০. প্রবৃত্তির জিহাদই কঠিনতম জিহাদ
আমাদের সমাজে এ অর্থে আরেকটি হাদীস প্রচলিত: সবচেয়ে কঠিন জিহাদ প্রবৃত্তির সাথে জিহাদ।
কথাটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা নয়। তাঁর কথা হিসেবে কোনো সনদেই তা বর্ণিত হয় নি। প্রসিদ্ধ তাবি-তাবিয়ী ইবরাহীম ইবনু আদহাম (১৬১ হি) থেকে তাঁর নিজের বক্তব্য হিসেবে বর্ণিত। (আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া ৮/১৮; বাইহাকী, কিতাবুয যুহদ ২/১৫২)
উল্লেখ্য যে, এ অর্থের কাছাকাছি সহীহ হাদীস রয়েছে। ফুদালাহ ইবনু উবাইদ (রা) বলেন, বিদায় হজ্জের ওয়াযের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : আর মুজাহিদ তো সে ব্যক্তি যে আল্লাহর জন্য/আল্লাহর আনুগত্যের জন্য নিজের প্রবৃত্তির সাথে জিহাদ করে। (তিরমিযী, আস-সুনান ৪/১৬৫; ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ ১১/২০৪; হাকিম, আল-মুসতাদরাক ১/৫৪; হাইসামী, মাওয়ারিদ ১/১২৭-১২৮; মাজমাউয যাওয়াইদ ৩/২৬৮)
দুঃখজনক যে, বিভিন্ন প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থে সংকলিত সহীহ হাদীস বাদ দিয়ে ভিত্তিহীন বানোয়াট কথাগুলো আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে বলি।
১১. আলিম বনাম আরিফ
আমরা একটু আগেই শরীয়ত-মারিফাত বিষয় জেনেছি। মারিফাত অর্জনকারীকে আরিফ এবং ইলম অর্জনকারীকে আলিম বলা হয়। আমরা দেখেছি যে, কুরআন ও হাদীসে মারিফাতের কোনো প্রশংসা করা হয় নি; বরং ইলমের প্রশংসা করা হয়েছে। মারিফাত অর্থ তত্ত্বজ্ঞান, গুপ্তজ্ঞান বা বিশেষজ্ঞান বুঝাতে, আরিফ বলতে তত্ত্বজ্ঞানী বুঝাতে, আলিম (ইলম অর্জনকারী) এবং আরিফ (মারিফাত অর্জনকারী)-এর মধ্যে পার্থক্য বুঝাতে বা আরিফের মর্যাদা বুঝাতে কুরআন ও হাদীসে কোনো কিছুই বলা হয় নি। এ বিষয়ে যা কিছু বলা হয় সবই বানোয়াট কথা। এরূপ একটি জাল হাদীস : আলিম নকশা অঙ্কিত করে এবং আরিফ (খোদাতত্ব জ্ঞানে জ্ঞানী) তা পরিষ্কার করে। (সিররুল আসরার, পৃ. ৪৯)
১২. আল্লাহর স্বভাব গ্রহণ কর
সূফীগণের মধ্যে প্রচলিত একটি ভিত্তিহীন সনদবিহীন জাল হাদীস : তোমরা আল্লাহর আখলাক বা স্বভাব-আচরণ গ্রহণ কর। (মুনাবী, আত-তাআরীফ, পৃ. ৫৬৪; সিররুল আসরার, পৃ. ৫০)
১৩. একা হও আমার নিকটে পৌঁছবে
একা হও আমার কাছে পৌঁছাবে।
উপরের কথাগুলো সবই সনদহীন, ভিত্তিহীন বানোয়াট কথা। কোনো সহীহ, যয়ীফ বা মাউযূ সনদেও এ কথাগুলো বর্ণিত হয়নি।
১৪. সামা বা প্রেম-সঙ্গীত শ্রবণ কারো জন্য ফরয…
সামা (সেমা) অর্থ শ্রবণ। সাহাবী-তাবিয়ীগণের যুগে সামা বলতে কুরআন শ্রবণ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী ও বাণী শ্রবণকেই বোঝান হতো। এগুলোই তাঁদের মনে আল্লাহ-প্রেমের জোয়ার সৃষ্টি করত। কোনো মুসলিম কখনই আল্লাহর প্রেমের জন্য গান শুনতেন না। সমাজের অধার্মিক মানুষদের মধ্যে বিনোদন হিসাবে গানবাজনার প্রচলন ছিল, কিন্তু আলিমগণ তা হারাম জানতেন। ২/১ জন বিনোদন হিসাবে একে জায়েয বলেছেন: কিন্তু কখনই এসকল কর্ম আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম বলে গণ্য হয় নি।
ক্রমান্বয়ে সামা বলতে গান-বাজনা বুঝানো হতে থাকে। আর গানের আবেশে উদ্বেলিত হওয়া ও নাচানাচি করাকে ওয়াজেদ অর্থাৎ আবেগ, উত্তেজনা, উন্মত্ততা (passion, ardor) বলা হতো। এ সামা বা সঙ্গীত ও ওয়াজদ অর্থাৎ গানের আবেশে তন্ময় হয়ে নাচানাচি বা উন্মত্ততা ৫ম হিজরী শতাব্দী থেকে সুফী সাধকদের কর্মকাণ্ডের অন্যতম অংশ হয়ে যায়। সামা ব্যতিরেকে কোনো সূফী খানকা বা সূফী দরবার কল্পনা করা যেত না। হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালী (৫০৫ হি) ও অন্য কোনো কোনো আলিম সূফীগণের প্রতি ভক্তির কারণে এরূপ গান বাজনা ও নর্তন কুর্দনকে জায়েয, শরীয়ত-সঙ্গত ও বিদআতে হাসানা বলে দাবি করেছেন। (আবু হামিদ আল-গাযালী, এহউয়াউ উলূমিদ্দীন ২/২৯২-৩৩২)
এদিকে যখন সামা-সঙ্গীতের ব্যাপক প্রচলন হয়ে গেল নেককার মানুষদের মাঝে তখন জালিয়াতগণ তাদের মেধা খরচের একটি বড় ক্ষেত্র পেয়ে গেল। তারা সামা, ওয়াজদ ইত্যাদির পক্ষে বিভিন্ন হাদীস বানিয়ে প্রচার করে। যেমন বলা হয়েছে : হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন : সামা কারো জন্য ফরয, কারো জন্য সুন্নাত এবং কারো জন্য বিদআত। খাস লোকদের জন্য ফরয, প্রেমিকদের জন্য সুন্নাত এবং গাফিলদের জন্য বিদআত। (সিররুল আসরার, পৃ. ৮৮-৮৯)
এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে বানানো একটি ভিত্তিহীন মিথ্যা কথা, যা কোনো যয়ীফ বা জাল সনদেও বর্ণিত হয় নি। এছাড়া ইসলামী পরিভাষা বিষয়ে যার ন্যূনতম জ্ঞান আছে তিনি জানেন যে, ফরয, সুন্নাত, বিদআত ইত্যাদি পরিভাষার এরূপ ব্যবহার কখনোই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেন নি।
