প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১০ম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৬, জমা.সানী-রজব ১৪৩৭ হিজরী, চৈত্র-বৈশাখ ১৪২২ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
আবু মাসউদ ডাক নাম, আর এ নামেই তিনি ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। আসল নাম উকবা এবং পিতার নাম আমর ইবন সালাব। সর্বশেষ হাইয়াতে আকাবায় যোগ দিয়ে সেখানেই ইসলাম গ্রহণ করেন। ওয়াকিদী বলেন আবু মাসউদ আকাবায় অংশগ্রহণ করেন, তবে বদরে অনুস্থিত ছিলেন। মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক বলেন আকাবায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনি। (আনসাবুল আশরাফ-১/২৪৫; সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪৫৯; উসুদুল গাবা-৫/২৯৬) সীরাতের কোন কোন গ্রন্থে আবু মাসউদ আল-আনসারী নামে উল্লেখিত ব্যক্তি, আর এই আবু মাসউদ আল-বদরী মূলতঃ একই ব্যক্তি। ইবনুল আসীর তার উসুদুল গাবা গ্রন্থে (৫/২৯৬) এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।
উহুদ এবং উহুদ পরবর্তী কাফিরদের বিরুদ্ধে পরিচলিত সকল যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে যোগ দেন। তবে তার বদর যুদ্ধে যোগদানের ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদর অনেক মতভেদ আছে। অধিকাংশের মতে, তিনি বদরে যোগ দেন এবং এ কারণেই তাকে বদরী বলা হয়। ইমাম বুখারী খুব দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, তিনি বদরে যোগ দিয়েছেন। আর এর স্বপক্ষে তিনি তার সহীহ গ্রন্থে দলিল হিসেবে একাধিক হাদীস উপস্থাপন করেছেন। যেমন, বাশীর ইবন আবী মাসউদ বর্ণিত একটি হাদীস। তাতে এসেছে: মুগীরা আসরের নামায দেরী করে পড়লে আবু মাসউদ উকবা ইবন আমর তার প্রতিবাদ করেন। এ আবু মাসউদ হচ্ছে যায়িদ ইবন হাসানের নানা তিনি এবং বদরে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আবু উতবা, ইবন সালাম এবং মুসলিম আল-কুনা গ্রন্থে তার বদরে যোগদানের কথা বলেছেন। ইবনুল বারকী বলেন ইবন ইসহাক তাকে বদরীদের মধ্যে উল্লেখ করেননি। তাবায়ানী বলেনঃ কুফাবাসীরা দাবি করেন, তিনি বদরে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু মদীনাবাসীরা তাকে বদরীদের মধ্যে উল্লেখ করেন না। ইবন সাদ আল-ওয়াকিদী থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন আবু মাসউদ যে বদরে যোগ দেননি, এ ব্যাপারে আমাদের সংগী-সাথীদের মধ্যে কোন মতভেদ নেই। তিনি বদরে বসবাস করেছিলেন, এ কারণে তাকে বদরী বলা হয়। (আল-ইসাবা-২/৪৯০, ৪৯১; সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪৫৯; উসুদুল গাবা-৫/২৯৬)।
নবুওয়াতের যুগ ও প্রথম তিন খলীফার সময় পর্যন্ত আবু মাসউদ মদীনায় ছিলেন। জীবনের কোন এক পর্যায়ে কিছু দিনের জন্য বদরের পানির ধারে বসবাস করেছিলেন। হযরত আলীর খিলাফতকালে মদীনা ছেড়ে কুফায় চলে যান এবং সেখানে বাড়ি তৈরি করে বসবাস করেন। (আল-ইসাবা-৪/২৫২; আনসাবুল আশরাফ-১/২৪৫)
হযরত আলী (রা.) ও হযরত মুয়াবিয়ার (রা.) মধ্যে বিরোধের সময় আবু মাসউদের ভূমিকার বিষয়ে পরস্পর বিরোধী বর্ণনা দেখা যায়। একটি বর্ণনা মতে, তিনি ছিলেন হযরত মুয়াবিয়ার (রা.) ঘনিজনদের একজন। হযরত মুয়াবিয়া (রা.) যখন সিফ্ফীন যুদ্ধে যান তখন তাকে কুফায় নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যান। তার না ফেরা পর্যন্ত আবু মাসউদ কুফার আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। (আল-ইসাবা-২/৪৯১) পক্ষান্তরে অন্য একটি বর্ণনা মতে, তিনি ছিলেন হযরত আলী (রা.) সহচর। আলীর (রা.) সময়ে তিনি কুফায় যান এবং আলী (রা.) সিফফীনে যাওয়ার সময় তাকে কুফার আমীরের দায়িত্ব দিয়ে যান। (আনসাবুল আশরাফ-১/২৪৫; আল০আলাম-৪/২৪১) শেষের বর্ণনাটিই সঠিক। কারণ সিফফীন যুদ্ধের সময় কুফা ছিল হযরত আলীর (রা.) অধীনে, মুয়াবিয়ার (রা.) অধীনে নয়।
হযরত আবু মাসউদের মৃত্যুর সন ও স্থান সম্পর্কে মতভেদ আছে। কেউ কেউ বলেছেন, সিফফীন যুদ্ধের পর তিনি কুফা থেকে জন্মভূমি মদীনায় ফিরে আসেন এবং সেখানে মারা যান। আবার অনেকে বলেছেন, তার মৃত্যু হয় কুফায়। (আল-ইসাবা-২/৪৯১; আল-আলাম-৪/২৪১)।
তার মৃত্যুর সন সম্পর্কেও মতভেদ আছে। হিজরী ৪১ ও ৪২ দুটি তার মৃত্যু সন বলে কথিত হয়েছে। আবার অনেকে বলেছেন, হযরত মুয়াবিয়ার (রা.) খিলাফতের শেষ দিকে হিজরী ৬০ সনে তার মৃত্যু হয়। (উসুদুল গাবা-৫/২৯৬) তবে এটা ঠিক যে হযরত মুগীরা ইবন শুবার (রা.) কুফার শাসনের সময় তিনি জীবিত ছিলেন। নিশ্চিতভাবে তা ছিল হিজরী ৪০ সনের পরে। (আল-ইসাবা-২/৪৯১)
হযরত আবু মাসউদের এক পুত্র ও এক কন্যার পরিচয় জানা যায়। পুত্রের নাম বাশীর এবং কন্যা ছিলেন হযরত ইমাম হাসানের (রা.) সহধর্মিনী। তারই গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন হযরত যায়িদ ইবন হাসান। বাশীরের জন্ম হয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় বা তার কিছু পরে।
হযরত আবু মাসউদ (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের প্রচার-প্রআরের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করেন। হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের তৃতীয় তবকা বা স্তরে তাকে গণ্য করা হয়। হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থে তার বর্ণিত ১০২ (একশো দুইটি) হাদীস পাওয়া যায়। (আল-আলাম-৪/২৪১) তাবেঈদের মধ্যে যারা তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাদের
খ্যতিমান কয়েকজনের নাম
বাশীর, আবদুল্লাহ ইবন ইয়যীদ খুতামী, আবু ওয়ায়িল, আলকামা, কায়স ইবন আবী হাতেম, আবদুর রহমান ইবন ইয়াযীদ নাখঈ, ইয়াযীদ ইবন শুরাইক, মুহাম্মাদ ইবন আবদিল্লাহ ইবন যায়িদ ইবন এবদি রাব্বিহি-আনসারী প্রমুখ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাচারের অনুসরণ এবং আমর বিল মারূফ ছিল তার চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ-নিষেধকে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে পালন করতেন। একবার তিনি তার এক দাসকে মারছেন। এমন সময় পিছন থেকে আওয়ায ভেসে এল আবু মাসউদ! একটু ভেবে দেখ। যে আল্লাহ তোমাকে তার ওপর ক্ষমতাবান করেছেন, তিনি তাকেও তোমার ওপর ক্ষমতাবান করতে পারতেন। আওয়াযটি ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবু মাসউদ ভীষণ প্রভাবিত হন। সেই মুহূর্তে তিনি শপথ করেন, আগামীতে কোন দিন আর কোন দাসের গায়ে হাত তুলবেন না। আর সেই দাসটিকে তিনি আযাদ (মুক্ত) করে দেন। (মুসনাদ-৫/২৭৩, ২৭৪)
আমর বিল মারূফের দায়িত্ব পালন থেকেও তিনি কখনো উদাসীন ছিলেন না। আর এ ব্যাপারে ছোট-বড় কারো পরোয়া করতেন না। হযরত মুগীরা ইবন শুবা (রা.) তখন কুফার আমীর। একদিন তিনি একটু দেরীতে আসরের নামায পড়ালেন। সাথে সাথে আবু মাসউদ প্রতিবাদ করলেন। তিনি বললেন ঃ আপনার জানা আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঁচ ওয়াক্ত নামায জিবরীলের বর্ণনা মতো সময়ে আদায় করতেন, আর বলতেনঃ এভাবেই আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (বুখারী-২/৫৭১)
তিনি নিজে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্নাতের হুবহু অনুসরণ করতেন। একদিন তিনি লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি জান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে নামায আদায় করতেন? তারপর তিনি নামায আদায় করে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। (মুসনাদ-৫/১২২)
নামাজের জামায়াতে গায়ে গা মিশিয়ে দাঁড়ানো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত। তিনি যখন দেখলেন, লোকেরা তা পুরোপুরি পালন করছে না, তখন বলতেনঃ এমনভাবে দাঁড়ানোর ফায়দা এ ছিলো যে, তারা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। এখন তোমরা দূরে দূরে দাঁড়াও, এ জন্যই তো বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে।
হযরত আবু মাসউদকে (রা.) মুফতী সাহাবীদের মধ্যে গণ্য করা হয় না। তবে তিনি মাঝে মধ্যে ফতোওয়া দিতেন। ইবন আবদিল বার তার জামিউলইলম গ্রন্থে (২/১৬৬) ইবন সীরীন থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন খলিফা উমার একবার আবু মাসউদকে বলেনঃ আমাকে কি অবহিত করা হয়নি যে, তুমি ফতোয়া দান করে থাক? ফতোয়ার উষ্ণতা তার জন্য ছেড়ে দাও যে তার শৈত্যের স্পর্শ লাভ করেছে। অর্থাৎ আমীরের জন্য। আর তুমি তো আমীর নও। (হায়াতুস সাহাবা-২/২৫৩)
