প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৪র্থ সংখ্যা,অক্টোবর ২০১৭, জিলহজ-মুহাররম ১৪৩৯ হিজরী,আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

১২৩. তীর-তলোয়ার এবং অশ্বের যুগ পূনঃ প্রত্যাবর্তন

পূর্বোক্ত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, “মুসলিম বাহিনী ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে বিশ্রামে থাকবে, হঠাৎ মহা বিপদের ধ্বনি ভেসে আসবে-“দাজ্জাল তোমাদের স্ত্রী-সন্তানদের ধাওয়া করছে। শুনা মাত্রই সকল সম্পদ মাটিতে ফেলে দিয়ে মুসলিম বাহিনী স্বদেশ অভিমুখে প্রত্যাবর্তন করবে।
পরিস্থিতি যাচাই করতে দশজন অশ্বোরোহীকে তারা অগ্রে প্রেরণ করবে। নবীজী বলেন- “আমি ঐ দশজনকে তাদের নাম, পিতার নাম এমনকি অশ্বের ধরন সহ চিনি। তারা-ই সে কালের সর্ব শ্রেষ্ঠ অশ্বোরোহী।”

১২৪. আহলাছ, সচ্ছলতা এবং অন্ধকার ফিতনা

১. ভয়াবহ তিনটি ফিতনা- মুসলমানদেরকে প্রায় গ্রাস করবে বলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করে গেছেন। আব্দুল্লাহ বিন উমর (রাঃ) বলেন- “আমরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দরবারে বসা ছিলাম। নবীজী অধিক হারে ফিতনাসমূহের বিবরণ শুনাচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে আহলাছের ফিতনার কথা বলেন। এক ব্যক্তি বলেন- হে আল্লাহর রাসূল! আহলাছের ফিতনা কি? নবীজী বললেন- পলায়ন আর যুদ্ধ-বিগ্রহের ফিতনা। অতঃপর সচ্ছলতার ফিতনা, যার ধূম্র আমার পরিবারস্থ দাবীকারী ব্যক্তির পদনিচ থেকে সৃষ্টি হবে। মনে মনে ভাববে, সে আমার খুব কাছের। অবশ্যই নয়। শুধু খোদাভীরুগণ-ই আমার বন্ধু। অতঃপর পাঁজরের হাড় যেমন নিতম্বের দিকে ঝুকে পড়ে, তেমনি সবাই একজন ব্যক্তির দিকে ঝুঁকে পড়বে (নেতা হিসেবে মেনে নেবে)। এরপর অন্ধকার ফিতনা। ফিতনাটি প্রতিটি মুসলমানের গালে চপেটাঘাত করবে। যখনি বলা হবে- শেষ, তখনি আরো বেড়ে যাবে। সে কালে সকালে ব্যক্তি মুমিন থাকবে আর বিকালে কাফের হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত মানুষ দু-দলে বিভক্ত হয়ে যাবে ঃ (১) ঈমানের দল, যাতে কোন কপটতা থাকবে না। (২) নিফাকের দল, যেখানে কোন ঈমান থাকবে না। এরকম ঘটতে দেখলে ঐ দিন বা পরের দিন দাজ্জাল প্রকাশের অপেক্ষা কর।” (আবু দাউদ)

২. উটের পিঠে কাষ্ঠের নিচে যে চাদর নিচের দিকে ঝুলিয়ে দেয়া হয় সব সময় তা উটের পিঠে দেয়া থাকে। ঠিক তেমনি ফিতনাটিও সদা মানুষের সাথে লেগে থাকবে। কখনো বিচ্ছিন্ন হবে না।

৩. সচ্ছলতার ফিতনা বলতে এখানে ধনৈশ্বর্যের আধিক্য উদ্দেশ্য। প্রাচুর্যের মোহে পড়ে মানুষ নানান অপরাধে লিপ্ত হয়ে যাবে। হারাম কাজে সম্পদ ব্যয় করবে।

৪. ধূম্র (ধোঁয়া) বলতে এখানে ফিতনার সূচনা উদ্দেশ্য। ধূম্র যেমন আগুন থেকে বের হয়ে উপরে উঠতে থাকে, ফিতনাটিও তেমন প্রকাশ হয়ে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকবে!!

৫. নিতম্বের সাথে তুলনা করার অর্থ হচ্ছে- পাঁজরের হাড় যেমন ভারী নিতম্বকে সামলাতে পারে না। তেমনি বিরোধের পর মানুষ এমন একজনকে নেতা হিসেবে মেনে নেবে, স্বল্প-জ্ঞানসম্পন্ন হওয়ায় যার মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী থাকবে না। বিচারব্যবস্থা পরিচালনার যোগ্যতা থাকবে না।

৬. অন্ধকার ফিতনাটি সবার গালে চপেটাঘাত করবে। অর্থাৎ ফিতনার প্রতিক্রিয়া সবার ঘরে পৌঁছে যাবে।
মনে হচ্ছে ফিতনাটি এখন পর্যন্ত অপ্রকাশিত। (আল্লাহই ভাল জানেন) আল্লাহ আমাদেরকে সকল প্রকার বিপদাপদ থেকে রক্ষা করুন।

১২৫. একটি মাত্র সিজদা সারা দুনিয়া অপেক্ষা উত্তম হবে

১. ঈসা বিন মারিয়াম (আঃ) -এর জমানায় বরকত-পূর্ণ পরিবেশ বিরাজিত হবে। সকল ফিতনার চির অবসন ঘটবে। সবদিক দিয়ে রহমত নাযিল হবে। মেঘমালা বৃষ্টি বর্ষণ করবে। জমিন তার ফসল-ভরা যৌবন প্রকাশ করবে। সাপ-বিচ্ছু থেকে বিষ উঠিয়ে নেয়া হবে। সে কালে একটি সিজদা সারা দুনিয়া অপেক্ষা উত্তম হবে।

২. আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত,নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- “ ঐ সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ নিহিত। অচিরেই ঈসা বিন মারিয়াম -ন্যায়বান শাসক রূপে তোমাদের মাঝে অবতরণ করবেন। ক্রোশকে ভেঙ্গে দেবেন। শুকর হত্যা করবেন। জিযয়া( ট্যাক্স)-র বিধান রহিত করবেন। তাঁর জমানায় চারিদিকে ধন-সম্পদের জয়-জয়কার হবে। একটি মাত্র সিজদা তখন সারা দুনিয়া অপেক্ষা উত্তম হবে।
অতঃপর আবু হুরাইরা (রাঃ) নিম্নোক্ত আয়াতটুকু পাঠ করলেনঃ “আর আহলে কিতাব (খৃষ্টান) দের মধ্যে যত শ্রেণী রয়েছে তারা ঈমান আনবে ঈসার উপর তাদের মৃত্যুর পূর্বে।” (সূরা নিসা-১৫৯)

৩. জিযয় (ট্যাক্স) বিধান রহিত করার তাৎপর্য হল-ঈসা (আঃ) -এর জমানায় অন্য সকল ধর্ম নিঃশেষ হয়ে যাবে। ইহুদীবাদ মুসলমানদের হাতে নিশ্চিহ্ন হবে। খৃষ্ট সম্প্রদায় ঈসা (আঃ)-এর উপর ঈমান এনে পূর্ণ মুসলমান হয়ে যাবে। বিধর্মী না থাকায় ট্যাক্স-এর বিধান নিস্ক্রিয় হয়ে পড়বে।

৪. ঈসা (আঃ) জমানায় নামায এবং অন্যান্য এবাদাতের দিকে মানুষের আগ্রহ বেড়ে যাবে, নও-মুসলিমরা পুরো উদ্যম আল্লাহর উপসানায় লিপ্ত হবে। কিয়ামাত সন্নিকটে জেনে কেউ কাউকে কষ্ট দেবে না। কেউ কারো অধিকার হরণ করবে না। নীরবে নিশ্চিন্তে প্রশান্ত মনে সবাই আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে প্রয়াসী হবে।

১২৬. অধিকাংশ মুসলমান হিজরত করে শামে চলে যাবে

১. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর যুগে -বর্তমান লেবানন, জর্ডান এবং অধিকৃত ফিলিস্তীন সমন্বিত রাষ্ট্রকে একবাক্যে- শাম বলা হত। শাম নবীদের ভুমি, শাম মুসলমানদের জন্য আভিজাতের কথা বর্ণিত হয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- “শাম-বাসী যখন বিনাশের সম্মুখীন হবে, তখন উম্মাতের জন্য কোন কল্যাণ বাকী থাকবে না। আমার উম্মাতের একদল লোক সর্বদাই বিজয়ী থাকবে, কিয়ামাত অবধি বিরুদ্ধবাদীরা তাদের কোন-ই ক্ষতি করতে পারবে না।” (তিরমিযী)

২. এ কারণেই নবীজী শামে বসবাসের ফযিলত বর্ণনা করেছেনঃ আবু দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- “বিশ্ব-যুদ্ধকালে মুসলমানদের শ্রেষ্ঠাংশ শামের দামেষ্ক শহরের আল -গুতা প্রান্তরে থাকবে।” (মুসনাদে আহমদ)

হাদিসে বিশ্বযুদ্ধ বলতে মুসলমান এবং খৃষ্টানদের বৃহৎ যুদ্ধ উদ্দেশ্য। বর্তমানে সিরিয়ার রাজধানী দামেষ্কের প্রসিদ্ধ একটি শহরের নাম হচ্ছে আল-গুতা।

৩. বিশ্বযুদ্ধটি ইমাম মাহদীর জমানায় বা তৎপর -বর্তী কালেও সংঘটিত হতে পারে। এক সাহাবী হিজরতের পরামর্শ চাইলে নবীজী শামের দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন।

৪. বাহয বিন হাকীম, তার পিতা-পিতামহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে কোন দিকে হিজরতের আদেশ দিবেন? নবীজী বললেন- ওই দিকে!! (হাত দিয়ে শামের দিকে ইশারা করলেন)”(তিরমিযী)

৫. কিয়ামাতের পূর্বমুহূর্তে অধিকাংশ মুসলমান হিজরত করে শামে চলে যাবে। আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- “এমন এক কাল আসবে,যখন সকল মু‘মিন-মুসলমান শামে গিয়ে মিলিত হবে।” (ইবনে আবি শাইবা)