প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১১ম সংখ্যা, মে ২০১৬, রজব-শাবান ১৪৩৭ হিজরী, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
২৯. সদাচারণকারী ব্যক্তির জন্য জাহান্নাম হারাম
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত । তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আামি কী তোমাদেরকে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে সুসংবাদ দেব না যে ব্যক্তি জাহান্নামের জন্য হারাম। আর জাহান্নাম তার জন্য হারাম। প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির জন্যই জাহান্নাম হারাম যে নিকটবর্তী , সহজ- সরল ও নরম প্রবৃত্তির। (ইমাম তিরমিযি হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।)
৩০. যে ব্যক্তি প্রতিবেশীর নিকট নিরাপদ নয় (অর্থাৎ কষ্ট দিবে) সে জান্নাতে যাবে না
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : যে ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদে নয় সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (ইমাম মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।)
৩১. মুসলমানের ক্ষতিকারীকে, তাকে বিপদে নিক্ষেপকারীকে আল্লাহ ক্ষতি করবেন এবং বিপদে ফেলবেন
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের ক্ষতি করবে, কষ্ট দেবে, আল্লাহ তাআলা তার ক্ষতি করবেন এবং যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে কষ্ট ও বিপদে ফেলবেন আল্লাহ তাকে বিপদে ফেলবেন। (ইমাম ইবনে মাজাহ ও তিরমিযী (র) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (র) বলেন, হাদিসটি গরীব)
৩২. মুমিনদের সাথে যে প্রতারণা করবে আল্লাহ তার ক্ষতি করবেন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ সেই ব্যক্তি অভিশপ্ত, যে কোন মুমিনের ক্ষতি সাধন করে অথবা কোন মুমিনের সাথে ধোকাবাজি করে। (ইমাম তিরমিযী হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (রা) বলেন হাদিসটি গরিব।)
৩৩. সৃষ্টির প্রতি ভাল ধারণা ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত
হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন ( আল্লাহ ও তার সৃষ্টিজীব সম্পর্কে) ভাল চিন্তা ও উত্তম ধারণা করাও উত্তম ইবাদাতের অন্তর্ভূক্ত। (ইমাম আহমদ ও আবু দাউদ (র) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)
৩৪. স্বামী-স্ত্রীর আচরণে সহনশীলতা
বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি নিজের স্ত্রীর দুর্ব্যবহারে অতি হয়ে হযরত ওমর (রাঃ) এর নিকট নালিশ করতে ও তার পরামর্শ নিতে এলো। এসে হযরত ওমরের (রাঃ) বাস ভবনের দরজায় দাঁড়ালেই শুনতে পেল তার স্ত্রী অত্যন্ত কর্কশ ভাষায় ও উচ্চস্বরে তাকে তিরস্কার করছে; আর হযরত ওমর নিরবে তা শুনছেন। লোকটি তৎক্ষণাৎ ফিরে যেতে উদ্যত হলো। সে ভাবলো, হযরত ওমরের মত কঠোর মেজাজের মানুষের যখন এই অবস্থা এবং তিনি খলিফা, তখন আমি আর কোথাকার কে? ঠিক এই সময়ে হযরত ওমর রা. বাইরে বেরিয়ে দেখলেন এক ব্যক্তি তার দরজা থেকে ফিরে যাচ্ছে। তিনি তাকে ডেকে ফেরালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী জন্য এসেছ? সে বললোঃ আমীরুল মুমিনীন , আমি আপনার কাছে এসেছিলাম নিজের স্ত্রীর বদমেজাজ ও কঠোর ব্যবহার সম্পর্কে নালিশ করতে। কিন্তু এসে নিজ কানে যা শুনতে পেলাম, তাতে মনে হলো আপনার স্ত্রীরও একই অবস্থা। তাই এই সান্ত্বনা নিয়ে ফিরে যাচ্ছিলাম যে, স্বয়ং আমীরুল মুমিনীনের যখন নিজের স্ত্রীর সাথে এরূপ অবস্থা, তখন আমি আর কোথাকার কে ? হযরত ওমর (রাঃ) বললেন : ওহে দ্বীনি ভাই, শোন। আমি আমার স্ত্রীর এরূপ আচরণ সহ্য করি দুটি কারণে-
প্রথমত : আমার কাছে তার অনেক অধিকার পাওনা আছে।
দ্বিতীয়ত : সে আমার খাবার রান্না করে, রুটি বানায়, অধিক কাপড়-চোপড় ধোয় এবং আমার সন্তানকে দুধ খাওয়ায়। অথচ এর কোনটি তার কাছে আমার প্রাপ্য নয় এবং সে এগুলো করতে বাধ্য নয়। এ সবের কারণে আমার মনে শান্তি বিরাজ করে এবং আমি হারাম উপার্জন থেকে রক্ষা পাই। এ কারণেই সহ্য করি। লোকটি বললো : হে আমীরুল মুমিনীন, আমার স্ত্রীও তদ্রুপ। হযরত ওমর (রাঃ) বললেন : তাহলে সহ্য করতে থাকে ভাই। দুনিয়ার জীবন তো অল্পকটা দিনের জন্য।
শিক্ষা : ইসলাম নারীর প্রতি কত উদর ও সহনশীল হওয়ার শিক্ষা দেয় তা এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়।
৩৫. পিতা-মাতাকে অসন্তুষ্ট করার পরিণতি
ইমাম তাবরানী ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মদীনায় আলকামা নামে এক যুবক বাস করতো। সে নিয়মিত নামায, রোযা ও সদকার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত- বন্দেগীর অতিশয় অধ্যবসায় সহকারে লিপ্ত থাকতো। একবার সে কঠিন রোগে আক্রান্ত হলে তার স্ত্রী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে খবর পাঠায় যে, আমার স্বামী আলকামা মূমূর্ষ অবস্থায় আছে। হে রাসূল, আমি আপনাকে তার অবস্থা জানানো জরুরী বলে মনে করেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৎক্ষণাৎ হযরত আম্মার , সুহাইব ও বিলাল রা. কে তার কাছে পাঠালেন। তাদেরকে বলে দিলেন যে, তোমরা তার কাছে গিয়ে তাকে কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করাও। তারা সেখানে পৌছে দেখলেন আলকামা মুমূর্ষ অবস্থায় রয়েছে। তাই তারা তাকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়াতে চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু সে কোন মতেই কলিমা উচ্চারণ করতে পারছিল না। অগত্য তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খবর পাঠালেন যে, আলকামার মুখে কালিমা উচ্চারিত হচ্ছে না। যে ব্যক্তি এই সংবাদ নিয়ে গিয়েছিল তার কাছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করেন : আলকামার পিতামাতার মধ্যে কেউ জীবিত আছে ? সে বলল হ্যাঁ, কেবল তার বৃদ্ধা মা বেঁচে আছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৎক্ষণাৎ তাকে আলকামার মায়ের কাছে পাঠালেন এবং বললেন : তার কাছে গিয়ে বল যে, তুমি যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে যেতে পারো তবে চলো। নচেৎ অপেক্ষা কর, তিনি তোমার কাছে সাক্ষাৎ করতে আসছেন। দূত আলকামার মায়ের কাছে উপস্থিত হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলেছিলেন তা জানালে আলকামার মা বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য আমার প্রাণ উৎসর্গ হোক। তার কাছে বরং আমিই যাবো। বৃদ্ধা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালামের জবাব দিয়ে বললেন: ওহে আলকামার মা, আমাকে আপনি সত্য কথা বলবেন। আর যদি মিথ্যা কথা বলেন, তবে আল্লাহর কাছে থেকে আমার কাছে ওহি আসবে। আপনার ছেলে আলকামার স্বভাব চরিত্র কেমন ছিল? বৃদ্ধা বললেন : হে আল্লাহর রাসূল, সে প্রচুর পরিমাণে নামায, রোযা ও সদকা আদায় করতো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : তার প্রতি আপনার মনোভাব কী? বৃদ্ধা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আমি তার প্রতি অসন্তুষ্ট। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কেন? বৃদ্ধা বললেন : সে তার স্ত্রীকে আমার ওপর অগ্রাধিকার দিতো এবং আমার আদেশ অমান্য করতো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : আলকামার মায়ের অসন্তোষ হেতু কালিমা উচ্চারণে আলকামার জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে গেছে। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : হে বিলাল যাও, তার জন্য প্রচুর পরিমাণ কা যোগাড় করে নিয়ে এসো।
বৃদ্ধা বললেন : হে আল্লাহর রাসূল, কা দিয়ে কী করবেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : আমি ওকে আপনার সামনেই আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেব। বৃদ্ধা বললেন : হে আল্লাহর রাসূল। আমার সামনেই আমার ছেলেকে আগুন দিয়ে পোড়াবেন। আমি তা সহ্য করতে পারবো না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : ওহে আলকামার মা আল্লাহর আযাব এর চেয়েও কঠোর এবং দীর্ঘস্থায়ী। যখন আপনি যদি চান যে, আল্লাহ আপনার ছেলেকে মাফ করে দিবেন, তাহলে তাকে আপনি মাফ করে দিন এবং তার উপর সন্তুষ্টি হয়ে যান। নচেত যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ তার কসম, যতক্ষণ আপনি তার ওপর অসন্তুষ্ট থাকবেন, ততক্ষণ নামায-রোযা ও সদকা দিয়ে আলকামার কোন লাভ হবে না। একথা শুনে আলকামার মা বললেন : হে আল্লাহর রাসূল, আমি আল্লাহকে, আল্লাহর ফেরেস্তাদেরকে এবং এখানে যে সকল মুসলামান উপস্থিত তাদের সকলকে সাক্ষী রেখে বলছি যে, আমি আমার ছেলে আলকামার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে গিয়েছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : ওহে বিলাল, এবার আলকামার কাছে যাও। দেখ, সে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলতে পারে কিনা। কেননা, আমার মনে হয়, আলকামার মা আমার কাছে কোন লাজ-লজ্জা না রেখে যথার্থ কথাই বলেছেন। হযরত বিলাল (রহ) তৎক্ষণাৎ গেলেন। শুনতে পেলেন, ঘরের ভেতরে থেকে আলকামার উচ্চস্বরে বলছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। অতঃপর গৃহে প্রবেশ করে উপস্থিত জনতাকে বললেন : শুনে রাখ, আলকামার মা অসন্তুষ্ট থাকার কারণে সে প্রথমে কালিমা উচ্চারণ করতে পারে নি। পরে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়ায় তার জিহ্বা কালিমা উচ্চারণে সক্ষম হয়েছে। অতঃপর আলকামা সেই দিনই মারা যায় এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: হে আনসার ও মুহাজিরগণ! যে ব্যক্তি মায়ের ওপর স্ত্রীকে অগ্রাধিকার দেয় তার ওপর আল্লাহ ফেরেস্তোগণ ও সকল মানুষের অভিসম্পাত! আল্লাহ তার পক্ষে কোন সুপারিশ কবুল করবেন না। কেবল তওবা করে ও মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহার করে তাকে সন্তুষ্ট করলেই নিস্তার পাওয়া যাবে। মনে রাখবে, মায়ের সন্তুষ্টিতেই আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং মায়ের অসন্তোষেই আল্লারহ অসন্তুষ্টি।
শিক্ষা : (১) আল্লাহর ইবাদতের সঙ্গে পিতা-মাতাকে সন্তুষ্ট রাখার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া উচিত এবং মৃত্যুর পূর্বে পিতা-মাতার কাছে থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়া উচিত।
(২) মুমূর্ষ ব্যক্তিকে কালিমা পড়ানোর চেষ্টা করা জ্ঞানী লোকদের কর্তব্য।
