প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ ৯ম সংখ্যা, মার্চ ২০১৭, জমা.আউ-জমা.সানি ১৪৩৮ হিজরী, ফাল্গুন-চৈত্র ১৪২৩বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

অন্যের প্রশংসা করা ভালো। তবে সীমাতিরিক্ত নয়। অনেককে দেখা যায় সবসময় কেবল মন্তব্য ও প্রশংসা করতেই থাকে। মোসাহেব প্রকৃতির এ লোকদের মুখে সব সময় প্রশংসার খই ফুটতে থাকে। তাদের মুখ কখনো বিরত হয় না। অথচ একটি প্রসিদ্ধ আরবি প্রবাদ হলো- ‘কোনো ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করা হলে হিতে বিপরীত হয়। আর নির্ধারিত সময়ের আগে কোনো কিছু পেতে চাইলে বঞ্চিত হতে হয়।’

তাই কেবল সেই সুন্দরেরই প্রশংসা করুন মানুষ যা দেখে আনন্দবোধ করে, যার জন্য অন্যের প্রশংসা কামনা করে কিংবা আনন্দদায়ক বিভিন্ন মন্তব্য শুনতে চায়। পক্ষান্তরে যেসব বিষয় অন্য কেউ জানলে মানুষ লজ্জাবোধ করে, অন্যের মন্তব্যে অপমান বোধ করে, আপনি সে ব্যাপারে চোখ বন্ধ করে রাখুন। না দেখার ভান করুন।
কোনো বন্ধুর বাসায় গিয়ে আপনি ড্রইং রুমে পুরোনো চেয়ার দেখতে পেলেন। আপনি তখন অপদার্থের মতো না চাইতেই পরামর্শ দিতে যাবেন না। আপনি বলতে যাবেন না, ‘এ চেয়ারগুলো বদলাচ্ছ না কেন? ঝাড়বাতির অর্ধেকই তো জ্বলছে না! নতুন ঝাড়বাতি কিনছ না কেন? আর দেয়ালের পেইন্ট তো অনেক পুরোনো হয়ে গেছে! নতুন পেইন্টিং করছ না কেন?’

ভাই! সে তো আপনার কাছে অভিযোগ ও পরামর্শ শুনতে চায় নি। আপনি তো ডেকোরেশন ইঞ্জিনিয়ার নন যার কাছে সে রুম ডেকোরেশনের জন্য পরামর্শ চেয়েছে। আপনি এ ব্যাপারে চুপ থাকুন। হতে পারে তার পরিবর্তনের সামর্থ্য নেই। হতে পারে সে আর্থিক সঙ্কটে ভুগছে কিংবা অন্য কোনো কারণ আছে। মানুষ লজ্জা পেতে পারে এমন বিষয়ে কথা বলা কিংবা মন্তব্য করার চেয়ে ভারী আর কিছু নেই।
মনে করুন আপনার বন্ধুর পোশাক পুরোনো কিংবা তার গাড়ির এসি নষ্ট হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করবেন না। সম্ভব হলে ভাল কিছু বলুন, নয় তো চুপ থাকুন।

অতীতকালের একটি ঘটনা। জনৈক ব্যক্তি তার এক বন্ধুর সাথে সাক্ষাত করতে গেল। বন্ধু তার সামনে রুটি ও খাওয়ার উপযোগী ভোজ্য তেল পরিবেশন করলো। অতিথি বন্ধু বললো, ‘রুটির সঙ্গে সবজি থাকলে বেশ ভালো হতো।’ ঘরে সবজি না থাকায় স্বাগতিক বন্ধু পাশের দোকানে গেল। কিন্তু তার কাছে নগদ টাকা ছিল না। দোকানির কাছে সে বাকি চাইল। দোকানী বাকিতে বিক্রি করতে অস্বীকার করলো। ফলে সে বাড়ি ফিরে তার অযু করার বদনাটি নিয়ে দোকানীর কাছে বন্ধক রেখে সবজি নিয়ে এলো। এভাবে সবজি এনে তা অতিথির সামনে পরিবেশন করলো। সবজি দিয়ে অতিথি বন্ধু মনভরে আহারের পর দোয়া করল, ‘আল্লাহর শোকর যিনি আমাদেরকে আহার করিয়েছেন, পানীয় পান করিয়েছেন এবং আমাদেরকে যা দান করেছেন তাতে সন্তুষ্ট রেখেছেন।’

স্বাগতিক বন্ধু এ কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, ‘হায়! আল্লাহ যা দান করেছেন তাতে যদি তুমি সস্তুষ্ট থাকতে, তাহলে আমার অযুর বদনাটি আর বন্ধক রাখতে হতো না!’
অসুস্থ কোনো ব্যক্তিকে দেখতে গিয়ে আপনি বলবেন না, ‘হায়! হায়! আপনার চেহারা তো হলদে হয়ে গেছে। চোখ দুটো কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে!’ আশ্চর্য! আপনি তো তার চিকিৎসক নন। আপনি সম্ভব হলে সান্ত্বনা দিন, নয়তো চুপ থাকুন।

কথিত আছে, জনৈক ব্যক্তি একজন রোগীকে দেখতে গিয়ে তার পাশে কিছুক্ষণ বসল। এরপর তার রোগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো। রোগী তার রোগের কথা জানাল। রোগটি ছিল দূরারোগ্য। রোগটির কথা শোনা মাত্রই সাক্ষাৎকারী চিৎকার করে বলে উঠল, ‘হায়! হায়! কী বলেন! এ রোগ তো আমার অমুক বন্ধুর হয়েছিল, সে মারা গেছে! আমার ভাইয়ের বন্ধু অমুক তো এ রোগে দীর্ঘদিন কর্মক্ষমতা হারিয়ে শেষ পর্যন্ত মারাই গেল! আমার ভগ্নিপতির প্রতিবেশী অমুকও তো এ রোগে আক্রান্ত হয়েই মৃত্যুবরণ করেছে!’ রোগী তো তার কথা শুনে রাগে ফেটে পড়ার উপক্রম।
সাক্ষাতকারী কথা শেষ করে বিদায় নেয়ার আগে রোগী তাকে কিছু বলবে কি না জানতে চাইলে রোগী বললো, ‘হ্যাঁ, ভবিষ্যতে তুমি কখনও আমার কাছে আসবে না। আর কোনো রোগীকে দেখতে গেলে তার সামনে হতাশাব্যাঞ্জক কথা বলবে না।’

আরেকটি ঘটনা শুনুন। জনৈক বৃদ্ধ মহিলা জানতে পারল তার এক বৃদ্ধ বান্ধবী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সে তার সন্তানদেরকে এক এক করে অনুরোধ করলো তারা যেন তাকে ঐ অসুস্থ বান্ধবীর কাছে নিয়ে যায়। ছেলেরা প্রত্যেকেই নানা অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে গেল। শেষে এক ছেলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হলো। সে মাকে তার গাড়িতে করে রোগীর বাড়িতে নিয়ে গেল।
গন্তব্যে পৌঁছে তার মা গাড়ি থেকে রোগী দেখতে চলে গেল। ছেলে গাড়িতে অপেক্ষা করতে লাগল। মহিলা তার অসুস্থ বান্ধবীর কাছে গিয়ে নিল। ফিরে আসার সময় সে দেখতে পেল অসুস্থ মহিলার মেয়েরা বাড়ির হলরুমে বসে কান্নাকাটি করছে। তখন সে তাদেরকে লক্ষ্য করে নিঃসঙ্গোচে বললো, ‘আমি চাইলেও তোমাদের কাছে আসতে পারি না। তোমাদের মা তো মারাত্মক অসুস্থ। মনে হচ্ছে তিনি আর বাঁচবেন না, অতিসত্বর মারা যাবেন। আল্লাহ তায়ালা এখন থেকেই তোমাদের মায়ের মৃত্যুতে ধৈর্য ধরার তাওফিক দান করুন।’
হে প্রাজ্ঞ পাঠক! কেবল আনন্দ ও খুশির বিষয়েই মন্তব্য করুন, দুঃখ ও শোকের বিষয়ে মন্তব্য থেকে বিরত থাকুন।

সমস্যা…

পোশাকের অপরিচ্ছন্নতা কিংবা শরীরের দুর্গন্ধ
এ জাতীয় কোনো অনাকাঙ্খিত বিষয়ে যদি কথা বলতেই হয় তাহলে সুন্দরভাবে ও মায়াবি সুরে তাকে জানিয়ে দিন।
এটা করতে গিয়ে মেধা ও দুরদর্শিতার স্বাক্ষর রাখুন।