প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৫ম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৬, মুহাররম-সফর ১৪৩৭-৩৮ হিজরী, কার্তিক-অগ্রহায়ন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

৮৬. মসজিদ সুসজ্জিত ও কারুকার্যকরণে প্রতিযোগিতা

১. মসজিদ গুলোকে অত্যাধিক সুসজ্জিত করণ ও তা নিয়ে পরস্পর গর্ব ও প্রতিযোগিতা করা কিয়ামাতের আরেকটি আলামাত।

২. মসজিদ নির্মাণের মৌলিক উদ্দেশ্য হচ্ছে, একমাত্র আল্লাহ পাককে সন্তুষ্ট করতে সঠিকভাবে এবাদত পালনের সুযোগ তৈরী করা। বাহ্যিক কারু-কার্যকরণ যথাসম্ভব কমিয়ে নামাযের গুরুত্ব এবং ইসলামী শিক্ষার দিকে মনোনিবেশ করা।

৩. কিন্তু শেষ জমানায় মানুষ প্রচুর পরিমাণে মসজিদ নির্মাণ করবে, নানান কারুকার্য ও হরেক রকম ডিজাইন দিয়ে মসজিদ সাজিয়ে তুলবে। সবাই চাইবে, আমার মসজিদটি সবার থেকে আলাদ হোক। ফলে নামাযের চেয়ে কারুকার্যের দিকেই মানুষের দৃষ্টি বেশি থাকবে। মিডিয়াকে ব্যবহার করে তারা মসজিদগুলোর প্রচার-প্রসারে লিপ্ত হয়ে যাবে। (কারণ, সরাসরি নামায সম্প্রচারের ফলে সারা বিশ্বের দৃষ্টি মসজিদের উপর থাকবে)।

৪. আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন-কিয়ামাত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না মানুষ মসজিদ (কারু – কার্যরণ) নিয়ে প্রতিযোগিতায় মেতে উঠে। (আবু দাউদ, নাসারী ইবনে মাজা)

৫. সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) সবসময় মসজিদ সুসজ্জিত করা থেকে সর্তক করতেন। এবাদত, আল্লাহর স্মরণ এবং দ্বীনী শিক্ষার মাধ্যমেই মসজিদ আবাদ করার প্রতি তাগিদ দিতেন। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ অচিরেই তোমরা মসজিদগুলোকে ইহুদী-খ্রীষ্টানদের মত কারুকার্য করে গড়ে তুলবে। (মুসনাদে আহমদ আবু দাউদ)

৬. ইমাম বগভী (রহ.) বলেন- প্রাথমিক যুগে ইহুদী- খ্রিষ্টানদের উপসানালয়গুলো কারুকার্যমন্ডিত ছিল না, আসমানী কিতাব বিকৃত হওয়ার পর-ই তারা কারুকার্যকরণ প্রক্রিয়া শুরু করে। (ফাতহুল বারী)

৭. খাত্তাব (রহ.) বলেন- ইহুদী -খ্রিষ্টানরা যখন আসমানী কিতাব বিকৃত করে ফেলে আল্লাহর দ্বীনকে বিনষ্ট করে ফেলে, তখন-ই তারা গির্জা সুসজ্জিত- করণে আত্মনিয়োগ করে। (উমদাতুল কারী)

৮. মসজিদ ডিজাইনের কয়েকটি পদ্ধতি হতে পারেঃ

১। দেয়ালে বাহারি বর্ণিল ছাপ
২। মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের ছবি স্থাপন । যেমন, মক্কা-মদিনার ছবি।
৩। কারু-কার্যকৃত বা নকশাকৃত জায়নামায (কার্পেট) বিছানো।
৪। বিভিন্ন লেখা (কুরআনের বাণী, হাদিসের বাণী) দিয়ে মেহরাব সুসজ্জিত করণ।

৯. হিসেব করলে আপনি দেখবেন যে, একটি বড় মসজিদের ডিজাইন এবং মেহরাব কারুকার্য করতে গিয়ে যে টাকা খরচ হয়েছে, তা দিয়েই আরো চার/পাঁচটি ছোট মসজিদ অণায়াসে তৈরী করা যেত।
এর মাধ্যমে মসজিদগুলোকে দুর্বল গঠনে তৈরি করা বা সুন্দর কার্পেট অবহেলা করা উদ্দেশ্য নয়, বরং হাদীসে সুন্দর করতে গিয়ে সীমাতিরিক্ত করে ফেলা কিংবা প্রতিযোগিতায় মেতে উঠা থেকে সর্তক করা হয়েছে।

১০. মসজিদ নির্মাণের একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মুসল্লীদেরকে গরম, ঠান্ডা ও বৃষ্টি থেকে রক্ষা করা। এ ছাড়া অন্য কিছু নয়।
উমর (রাঃ) মসজিদে নববী সংস্কারের সময় অধিনস্থ কর্মকর্তাকে এ বলে আদেশ করেনঃ মানুষকে বৃষ্টি থেকে রক্ষা করো। লাল বা হলদে বানাতে যাবে না, তা হলে মানুষ নামায থেকে অন্য মনষ্ক হয়ে যাবে। (ফাত্হুল্ বারী)
বর্তমান যুগে মসজিদগুলোকে শুধু লাল বা হলদেই বানানো হচ্ছে না, বরং উহাকে কাপড়ের নকশার মতো নকশাদার করা হচ্ছে। বিশ্বের বুকে এমন অনেক মসজিদ রয়েছে যা আজো কারুশিল্পের এক এক ভাস্কর দৃষ্টান্ত।

১১. মসজিদ ও কুরআনের কারুকার্য যখন ব্যাপক রূপ ধারণ করবে তখনই মুসলমানদের ধ্বংস অনিবার্য। আবূদ্দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ যখন তোমরা মসজিদ ও কুরআন মাজীদকে কারুমন্ডিত করবে তখনই তোমাদের ধ্বংস অনিবার্য। ( স’হীহুল্ জামি‘ ৫৯৯, ইবনে আবি দাউদ, তাহছীনে আলবানী রহ.)।

৮৭. মসজিদ গুলোকে পর্যটন ও পারাপারের পথ হিসেবে ব্যবহার

১. কিয়ামাতের পূর্বমুহূর্তে মসজিদকে মানুষের যাতায়াতের পথ ও পর্যটন কেন্দ্রের মত ব্যবহার করবে। নামায পড়তে নয়; মসজিদের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে দূর দুরান্ত থেকে মানুষ আসবে।

২. আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাসউদ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ কিয়ামাতের অন্যতম আলামত হচ্ছে এই যে, মসজিদগুলোকে তখন রাস্তা বানিয়ে নেয়া হবে। (ত্বায়ালিসী/মিনহাহ্ ২/১১২ ‘হাকমি ৪/৪৪৬)

৩. আনাস্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন ঃ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন – কিয়ামাতের অন্য আলামত হচ্ছে এইা যে, মসজিদগুলোকে রাস্তা বানিয়ে নেয়া হবে। (ত্বায়ালিসী/মিনহাহ্ ২/১১২ হাকমি ৪/৪৪৬)

৪. অত্যন্ত দুঃখের ব্যাপার হলো এই যে, বর্তমান যুগে বিশ্বের কিছু কিছু প্রাচীন মসজিদ যিকির ও ইবাদাতের জায়গা না হয়ে পর্যটন এলাকায় রূপান্তরিত হয়েছে। যাতে কাফির, মুশ্রিকরাও অবাধে প্রবেশ করে।

৮৮. আলীশান ঘরবাড়ী নির্মাণ ডিজাইন ও সুসজ্জিতকরণ

১. অত্যাধিক অপচয়, অনর্থক বিষয়ে প্রতিযোগিতা, অহংকার- এগুলো অতি-নিন্দনীয় ব্যাপার। আল্লাহ তাআলা বলেন- আর তোমরা সীমাতিরিক্ত ব্যয় করো না, নিশ্চয় আল্লাহ অপচয় কারীদেরকে পছন্দ করেন না। (সূরা আনআম-১৪১)

২. সম্পদের আধিক্যের ফলে শেষ জমানায় মানুষ বাড়িঘর/ বাংলো ডিজাইন করবে। দুয়ারে দামী চাদর ঝুলিয়ে রাখবে,সুগন্ধিময় কাঠ দিয়ে দরজা- জানালা নির্মাণ করবে,রকমারি টাইলস্ লাগিয়ে ঘরের শোভা বৃদ্ধি-র চেষ্টা করবে।

৩. আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন- কিয়ামাত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না মানুষ সু-বিশাল বাড়ী নির্মাণ করবে। ডোরাকাটা মহামূল্যবান চাদর দিয়ে দেয়ালকে সুসজ্জিত করবে।(বুখারী)

অর্থাৎ চাদর যেমন সুন্দর ডিজাইনে বুনা হয়, দেয়াল-ও সে রকম কারুকার্যে বানানো হবে। ঘরকে সুদর্শন করতে চাদর ঝুলানো -হারাম কিছু নয়; কিন্তু এক্ষেতেও সীমাতিরিক্ত অপচয়, অহংকার এবং প্রতিযোগিতায় মত্ত হওয়া হারাম।