প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৫ম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৬, মুহাররম-সফর ১৪৩৭-৩৮ হিজরী, কার্তিক-অগ্রহায়ন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
৬৭. শহীদ হলেও ঋণের অপরাধ মাফ হবে না
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, শাহাদাত (আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করা) কতই না বড় সৎকাজ। জীবন দিয়ে দেওয়া এর চেয়ে বড় আর কী হতে পারে? কিন্তু মানবাধিকার লংঘনকারীর কোনো ক্ষমা নেই। কারো কোনো কিছু নিজের উপর ওয়াজিব হলে ঋণ নিয়ে হোক বা অন্য কোনো কারণে কারো কোনো হক অপরিহার্য হলে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তা পরিশোধ করে দিবে। নিজের ইবাদত -বন্দেগী, নামায, রোযা, যিকির ইত্যাদি ব্যস্ততায় প্রতারিত হবে না। অনেকে ধারণা করে আমি তো অনেক বন্দেগী করি। এ থেকে প্রাপকদের প্রাপ্য অংশ দিয়ে দিব। এমন চিন্তা করা চরম নির্বুদ্ধিতা। দুনিয়ায় সামান্য জিনিস নিয়ে এর বিনিময়ে নামায, রোযা ইত্যাদি অন্যকে দিয়ে দোযখে যেতে হবে। এটা কতটুকু বুদ্ধিমানের কাজ। হযরত শায়খুল হাদীস র. বলেন, দুই পয়সার বিনিময়ে হকদারকে সাত শত রাকাআত কবুল নামায দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমি মৌলবী নাসির উদ্দীনকে (তার পাঠাগারের ম্যানেজার) বলেন, লেনদেনের ক্ষেত্রে অন্যের অধিকার আদায়ের প্রতি খুব লক্ষ্য রাখ। আমার তো সাত শত নামায কবুল নয়। এখন তুমি তোমার ব্যাপারে চিন্তা কর, তোমার কত নামায কবুল হবে?
হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা কী অবগত আছ অসহায়-দরিদ্র কে? তারা বলেন, আমরা দরিদ্র বলতে ঐ ব্যক্তিকে বুঝি যার টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত ইত্যাদি কিছুই নেই। এ কথা শোনার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার উম্মতের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে অসহায়-দরিদ্র ঐ ব্যক্তি যে, কিয়ামতের দিন নামায, রোযা, যাকাত ইত্যাদি নিয়ে উঠবে। অর্থাৎ সে নামায পড়েছে, রোযা রেখেছে, যাকাত দিয়েছে, তৎসত্ত্বেও হাশর মাঠে এ হিসেবে উঠবে যে, কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ গ্রাস করেছে, কারো অধিকার হরণ করেছে, কাউকে হত্যা করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। সেদিন চূড়ান্ত বিচারের দিন। তাই এমন ব্যক্তি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত হবে যে, সে যাদের কষ্ট দিয়েছে, অধিকার ইত্যাদি ক্ষুন্ন করেছে তাদের সকলের মধ্যে তার সওয়াবও পূর্ণ বণ্টন করে দেওয়া হবে। এভাবে সমস্ত প্রাপক ও অধিকারীর অধিকার আদায় করা হবে। অবশেষে তাদের অধিকার পূর্ণ হওয়ার পূর্বে তার সওয়াব শেষ হয়ে গেলে প্রাপকদের গোনাহসমূহ তার মাথার উপর রেখে তাকে দোযখের মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে। (সহীহ মুসলিম)
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে আরও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি তার ভাইকে অসম্মান-অপমান করল বা অন্য কোনো অধিকার ক্ষুন্ন করল সে যেন আজই তার অধিকার আদায় করে বা মাফ চেয়ে নেয়। পরকালে যাওয়ার পূর্বে মাফ করিয়ে নিবে কেননা সেখানে টাকা-পয়সা, দীনার দিরহাম ইত্যাদি কোনো কিছুই নেই। তিনি আরও বলেন, তার যদি কিছু আমল ভাল (পূণ্য) থাকে তবে তা অত্যাচারের পরিমাণ অনুযায়ী নির্যাতিত, অত্যাচারিত ও প্রাপকদের দিয়ে দেওয়া হবে। আর যদি তার পূণ্য না থাকে তবে অত্যাচারিতদের পাপসমূহ অত্যচারীর মাথার উপর ঢেলে দেওয়া হবে। (সহীহ বুখারী)
উল্লিখিত হাদীসদ্বয় থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, কেবল টাকা-পয়সা আত্মসাত ও গ্রাস করা অত্যাচার নয়। বরং গালি দেওয়া ও অপমান করা ইত্যাদিও অত্যাচার ও অধিকার ক্ষুন্নের অন্তর্ভুক্ত। অনেকেই নিজেকে ধার্মিক বলে মনে করে কিন্তু উক্ত দোষসমূহ থেকে বিন্দুমাত্র সতর্ক ও দূরে থাকে না। প্রকাশ থাকে যে, আল্লাহ যদি ইচ্ছা করেন তবে স্বীয় অধিকারও তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে ক্ষমা করে দিতে পারেন। কিন্তু মানুষের অধিকার তখন মাফ হবে যখন তা আদায় করে দেওয়া হবে বা তাদের থেকে মাফ করিয়ে নেওয়া হবে।
আবার অনেকে মনে মনে এ ধারণা পোষণ করেন যে, আমি তো হজ্জ সম্পন্ন করেছি। আমার সমস্ত পাপ মাফ হয়ে গেছে। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুযদালিফায় মানুষের (বান্দাদের) হক মাফের জন্য দুআ করেছেন এবং তা কবুল হয়েছে। তাই যদি হক আদায় না করা হয় তবে কোনো ক্ষতি নেই। আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই, হাদীসের এমন অর্থ ও উদ্দেশ্য গ্রহণ করা অন্তরের কুমন্ত্রণা ও শয়তানের কত বড় ষড়যন্ত্র। এক হাজীর সাথে আমার সাক্ষাত হতো। তার কোনো এক বন্ধুর তার নিকট টাকা-পয়সা পাওনা ছিল। আমি তাকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলি, আপনি তার প্রাপ্য দিয়ে দিন। কেননা আপনি বৃদ্ধ হয়েছেন এবং মৃত্যুও অতি নিকটবর্তী। সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব দায়মুক্তি লাভ করা জরুরী। এ প্রস্তাবের পর তিনি একদা বলেন, মুযদালিফায় অবস্থান ও দুআ করার দ্বারা সমস্ত অধিকার মাফ হয়েছে। তখন আমি তাকে উদ্দেশ্য করে বলি আপনি হাদীসের ভুল অর্থ অনুধাবন করেছেন। হাদীসের সঠিক ও প্রকৃত অর্থ কখনও এমন নয় যে, হজ্জ করলে মানবাধিকারসমূহ তামাদি হয়ে যায়।
যদি এমন হতো তবে সাহাবীগণ হজ্জ সম্পন্ন করার পর বিশেষ করে ঐ সব সাহাবী যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় তার সাথে একত্রে হজ্জ সম্পন্ন করেছেন, তারা মানুষের সম্পদ লুটে নিতেন। ছিনতাই করতেন। অন্যদের অহেতুক মারপিট করতেন। মাফ হওয়া ধারণায় অন্যদের অধিকার ক্ষুন্ন ও আমানতের খিয়ানত করতেন। হযরত সাহাবায়ে কিরাম তো হাদীসের এ অর্থ বুঝেননি যে, জেনেবুঝে অন্যের অধিকার ক্ষুন্ন কর, সামর্থ থাকা সত্ত্বেও অধিকার আদায় করো না এবং মাফ না চেয়ে লেনদেন পরিষ্কার করো। হযরত সাহাবায়ে কিরামের পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো মুহাদ্দিস, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন (গবেষক ইমামগণ), অন্য কেউ, মাযহাবের কোন মুফতি বা কোনো ফিকহবিদ একথা বলেননি যে, মানবাধিকার, অত্যাচার ইত্যাদি থেকে দায়মুক্তির জন্য ইন্তোকালের পূর্বে একটি হজ্জ আদায় করে লও। তাহলে কাউকে কিছু দিতে হবে না বা মাফ চাইতে হবে না বা ঋণ আদায় করার প্রয়োজন হবে না। কোনো মুর্খ ব্যক্তি যদি হাদীসের এ অর্থ বুঝে যে, অধিকারসমূহ লংঘন কর, ধনসম্পদ আত্মসাত কর, মানুষের উপর যত পার অত্যাচার কর। অতঃপর একটি হজ্জ সম্পন্ন করে সমস্ত পাপ-পংকিলতা থেকে পরিষ্কার হয়ে যাও; তবে তা তার মূর্খতা ও বোকামি। যদি এমন হতো তবে মানুষ চুরি, ডাকাতি, খিয়ানত, ঋণ, আত্মসাত, গ্রাস ইত্যাদি বিভিন্ন উপায়ে প্রতি বছর লাখো রুপিয়া সঞ্চয় করতো এবং বিশ হাজার টাকা ব্যয় করে হজ্জ করে নিত। পরকালের পাকড়াও থেকে নিরাপদ হয়ে হাজারও লাভ হাসিল করত। এসব শয়তানের ষড়যন্ত্র। সে কত বড় উস্তাদ যে যেভাবে হোক মানুষকে পটিয়ে নেয়।
হাদীসের অর্থ ও মর্ম এতটুকু যে, আরাফার ময়দানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআ করেছেন যে, হে আমার প্রতিপালক! আপনি যদি ইচ্ছা করেন তবে অত্যাচারিতকে আপনি জান্নাতে দিয়ে দিন এবং অত্যাচারীকে ক্ষমা করে দিন। আরাফা প্রান্তরে এ দুআ কবুল হয় নি। অবশেষে মুযদালিফা প্রান্তরে তিনি পুনরায় উক্ত দুআ করেন। তখন কবুল হয়ে যায়। সুনানে ইবনে মাজার মধ্যে হাদীসটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে :
তিনি বলেন : হে আমার প্রতিপালক, আপনি যদি ইচ্ছা করেন তবে অত্যাচারিতকে জান্নাত থেকে বিনিময় দিয়ে দিন এবং অত্যাচারীকে ক্ষমা করে দিন। সন্ধ্যা পর্যন্ত দুআ কবুল হয়নি। যখন মুযদালিফায় সফল হয় তখন তিনি পুনরায় দুআ করেন। অতঃপর তিনি যা চান তা (তার দুআ) কবুল হয়।
এ হাদীস এ কথা কোথায় আছে যে, যে ব্যক্তি হজ্জ আদায় করবে তার দায়িত্বে যত লোকের অধিকার ও ঋণ থাকবে, অত্যাচার থাকবে সবই হজ্জের বিনিময়ে মাফ হয়ে যাবে এবং পরকালে যেয়েও কোনো পাকড়াও ও হিসাব-নিকাশ হবে না। হাদীসে শুধু এতটুকু উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল এতটুকু বৈধতা নিয়ে এসেছেন যে, আল্লাহ যদি ইচ্ছা করেন তবে অত্যাচারিত ব্যক্তিকে নিজের কাছ থেকে কিছু বিনিময় দিয়ে দিবেন এবং অত্যাচারীকে ক্ষমা করে দিবেন। এ থেকে জানা গেল যে, এটা আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ যাকে পছন্দ করেন তার সাথে এমন আচরণ করবেন। এটি আল্লাহ তায়ালার বিশেষ অনুগ্রহ তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে দিবেন। সুতরাং সে-ই পাবে। যেমন আল্লাহ বলেন :
নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না; এ ব্যতীত সব কিছু যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।(নিসা : ১১৬)
হাদীসে তো একথা বলা হয় নি যে, আল্লাহ অত্যচারিতকে নিজের কাছ থেকে সমস্ত অধিকার দিয়ে অত্যাচারীকে অবশ্যই ক্ষমা করে দিবেন।
প্রকৃত পক্ষে এটি আল্লাহর ইচ্ছা ও নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয়। তিনি ইচ্ছা করলে ক্ষমা করবেন নাহলে না। অথচ তিনি (উক্ত হাজী) কোথা থেকে নিশ্চিত হলেন যে, যে-ই হজ্জ করবে তার সমস্ত অধিকার, ঋণ ও অত্যাচার ইত্যাদি নিঃশর্ত ক্ষমা করা হবে।
এটা তো হাদীসের বিষয়বস্তু সম্পর্কে আলোচনা গেল, যা শব্দের মধ্যে স্পষ্ট আছে। কিন্তু এর পাশাপাশি হাদীসের সনদের দিকেও দৃষ্টি দেওয়া উচিত। এ হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনে কিনানা একজন বর্ণনাকারী। তার সম্পর্কে সুনানে ইবনে মাজার টীকাকার আল্লামা সিন্ধী র. যাওয়ায়েদে ইবনে মাজা থেকে উল্লেখ করেছেন যে, অর্থাৎ ইমাম বুখারী বলেছেন যে, তার বর্ণিত হাদীস বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য নয়। তদ্রুপ হাফেজ ইবনে জওযী আব্দুল্লাহ বিন কিনানার পিতা কিনানার কারণে তিনি হাদীসটি জাল হাদীসসমষ্টির মধ্যে গণ্য করেছেন। যদি জাল হাদীস নাও হয় তবুও দুর্বলতা থেকে মুক্ত নয়। এমন দুর্বল হাদীসের উপর ভিত্তি করে অন্যের সম্পদ আত্মসাত করা, অধিকার ক্ষুন্ন করা এবং একটি হজ্জ করে নিজেকে পূত-পবিত্র মনে করা বিরাট বড় মুর্খতা, উদাসীনতা, অলসতা ও নফসের ষড়যন্ত্র। হাদীসের বিশাল ভা-ার ও সমষ্টির মধ্যে কী কেবল একটি হাদীসই আছে? যাকে মুহাদ্দিসগণের কেউ জাল এবং কেউ দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন। অসংখ্য হাদীসের মধ্যে মানুষের অধিকার ক্ষুন্ন করা সম্পর্কে যে সব হাদীস এসেছে সে সম্পর্কে আপনি উদাসীন (ভুলে) রয়েছেন কেন? কারো দোষ চর্চা করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, ইজ্জত-সম্মান হানি করা, ঋণ নিয়ে পরিশোধের ব্যবস্থা না করে ইন্তেকাল করা, আপোসে শরীকদের সাথে খিয়ানত করা, কারো জমি আত্মসাত করা বা অন্য যে কোনো উপায়ে অত্যাচার সংঘটিত হওয়া সম্পর্কে বিশুদ্ধ সনদে যে সব হাদীসে ধমক দেয়া হয়েছে তা থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে উদাসীন (অজ্ঞ) থাকলে পরকালে দায়মুক্তি হাসিল হবে কী? (নিশ্চয় না)
অনেক ধার্মিক দাবীদার ভাইয়ের মৃত্যুর পর তার স্ত্রীকে প্রাপ্য দেয় না। বরং তাকে তার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে বাধ্য করে। অগত্যা সে বিবাহে রাজি হয়ে যায়। এরপর সে মনে করে আমি শরীয়ত থেকে পাস করিয়ে নিয়েছি। কিন্তু বাস্তবিক বিবাহ দ্বারা তার স্বামীর মীরাস থেকে শরীয়তসম্মত যে অংশ পেয়েছিল তা গ্রাস করা আদৌ বৈধ হবে না। এসব বলে থাকে যে, মহিলাদের সহায়-সম্পত্তিতে ভাগ দিলে আমাদের জমি আংশিক হলেও অন্য বংশে চলে যাবে কিন্তু চলেই যদি যায় তবে তাতে কী যায় আসে? বিধবা মহিলার সম্পদ গ্রাস করা ও পরকালের কঠিন আযাব থেকে তো রক্ষা পাওয়া যাবে।
বর্তমানে অনেক সমাজে, অনেক স্থানে প্রচলিত আছে যে, মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তি তার মেয়েদের মধ্যে বণ্টন করা হয় না। বরং ভাইয়েরা গ্রাস করে নেয়। তারা সীমাহীন অত্যাচার করে এবং হারাম খেতে থাকে। আবার অনেকে বলে, তারা তো তাদের অংশ চায় না। বরং তাদের কাছে মাফ চাইলে মাফ করে দেয়।
প্রকাশ থাকে যে, কারো প্রাপ্য ও অধিকার না চাওয়ার মধ্যে এ প্রমাণ নেই যে, তারা নিজেদের প্রাপ্য ও অধিকার ছেড়ে দিয়েছে এবং যেভাবে মাফ চাওয়ার অভিনয় করা হয় তা মাফ হিসেবে গন্য হবে না। কেননা তারা জানে যে, আমাদেরকে তো দিবেই না সেহেতু অগত্যা ও নিরুপায় হয়ে মাফ করে দেয় এবং নিজের অধিকার চাওয়া থেকে বিরত (নীরব) থাকে। যদি তাদের প্রাপ্য অংশ বণ্টন করে তাদের সামনে রেখে বলা হয়, লও, এটা তোমার অংশ, জমির যতটুকু তার অংশ তাকে দেওয়া হয় তা সত্ত্বেও যদি যে গ্রহণ না করে মাফ করে দেয় তবে তা মাফ হিসেবে গণ্য হবে। বর্তমান সমাজে প্রচলিত বাধ্যতামূলক মাফ ধর্তব্য ও গ্রহণযোগ্য হবে না। অনেকে নিজের মনকে এভাবে বুঝায় যে, তাকে তার শ্বশুরবাড়ী থেকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসি, ছেলে- মেয়েসহ আসে, খানাপিনা খায়, এতে তার অধিকার আদায় হয়ে যাবে। এসব ধারণা ষড়যন্ত্র ব্যতীত আর কিছু নয়।
প্রথমত তার পিছনে এতটুকু সম্পদ খরচ হয় না যতটুকু সে মীরাস হিসেবে পায়। দ্বিতীয়ত : আত্মীয়তা যদি করতে হয় তবে নিজের টাকা দিয়ে কর। সম্পদ তার এবং সদাচরণ আপনার এতটুকু যে তাকে দাওয়াত দিয়েছেন এবং খরচ করেছেন তা এটা কোন ধরনের আত্মীয়তা?
তৃতীয়ত : তার সাথে যে আচরণ করা হয়েছে তাতে সে সন্তুষ্ট কি? এক তরফা সিদ্ধান্ত কীভাবে নিলেন?
তদ্রুপ মোহরের বিষয়ে চিন্তা করুন যে, স্ত্রী মাফ দ্বারা মাফ হবে না; যতক্ষণ সে সন্তুষ্টচিত্তে মাফ না করে। সে যদি এ মনে করে মাফ করে দেয় যে, মাফ করি বা না করি আমাকে তো দিবেই না। তবে এ ধরনের মাফ প্রকৃতপক্ষে মাফ হিসেবে গণ্য হবে না। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে :
সুতরাং তোমাদের স্ত্রীরা যদি সন্তুষ্টচিত্তে কিছু মোহর ছেড়ে দেয় তবে তোমরা তা আনন্দের সাথে ভোগ করতে পার। (নিসা : ৪)
এ বিষয়ে মানুষ এমন কৌশল অবলম্বন করে যে, তার মোহর তার হাতে দিয়ে দেয়। অতঃপর স্বীয় খুশিতে সে মাফ করে দেয়। তখন স্বামী নির্দ্ধিদায় তা নিয়ে নেয়।
আবার মেয়ে বিবাহ দেওয়া হয়। অথচ তার মোহর তার পিতা বা অন্য কোন অভিভাবক আদায় করে নিজেই নিয়ে নেয়। এক্ষেত্রে মেয়ের মালিকানা হিসেবে তা সংরক্ষণ করলে ঠিক আছে। কিন্তু মেয়ের অনুমতি ব্যতীত তার সম্পদ নিজের কাজে ব্যবহার করা এবং নিজের বলে মনে করা, অতঃপর পরে কখনও তা তাকে না দেওয়া বা উপরে উপরে লোক দেখানো উদ্দেশ্যে মিথ্যা কৌশল করে মাফ করিয়ে নেওয়া ইত্যাদি ছলচাতুরি বৈধ নয়।
অনেকে বলে যে, বিবাহ অনুষ্ঠানে আমি যে টাকা খরচ করেছি তার বিনিময়ে আমি এ টাকা উঠিয়ে নিয়েছি। বা যৌতুকের মধ্যে লাগিয়ে দিয়েছি। বস্তুত পিতা বা কোন অভিভাবক প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সে সমস্ত খরচ-খরচা করে থাকে তা সাধারণত সুনাম, যশ ও প্রশংসা পাওয়ার জন্য করে থাকে। এক্ষেত্রে অনেক কাজ শরীয়তবিরোধী হয়। বিভিন্ন প্রকার অবৈধ ও সমাজবিধ্বংসী নাচ-গান ও গান-বাদ্য হয়। লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে যৌতুক দেওয়া ও নেওয়া হয়। অনেক সময় এমন সব জিনিসপত্র যৌতুক হিসেবে দেওয়া হয় যা সারাজীবন কখনও কোন কাজে বা উপকারে আসে না। অথচ আমরা সবাই অবগত আছি যে শরীয়ত বিরোধী ও লোক দেখানো কাজে নিজের টাকা-পয়সা খরচ করাও বৈধ নয়। বরং হারাম। সুতরাং অবলা মেয়ের সম্পদ এভাবে খরচ করা কিভাবে বৈধ হতে পারে? সুতরাং যা কিছু খরচ কর, শরীয়তের সীমানা ও নিয়মের মধ্যে থেকে কর। সুতরাং নিজের নয় মেয়ের সম্পদ (মোহর) থেকে তার অনুমতি ব্যতীত খরচ করা অত্যাচার। তাকে জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করে না, অথচ তার সম্পদ উড়িয়ে দেয়। কেউ যদি দাবী করে যে, সে তো নীরব থাকে, এটাই তার অনুমতি ও সম্মতির লক্ষণ। তবে তা সঠিক নয়। কারণ প্রচলিত নীরবতা অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্র গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকৃতপক্ষে তার টাকা তাকে দিয়ে দাও। এ ব্যাপারে তার প্রতি কোন প্রকার বাধ্যবাধকতা আরোপ করো না বা কোন বদনাম ও প্রচলিত প্রথায় ভয়ভীতি দেখাবে না। এসব ছলচাতুরি ব্যতীত যদি সে সন্তুষ্টচিত্তে আপনাকে কিছু দিয়ে দেয় তবে আপনি তা নিজের মনে করে নিতে পারেন। তবে এ কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, শরীয়তের দৃষ্টিতে বিয়েতে কোন খরচ-খরচা নেই। ঈজাব ও কবুল (প্রস্তাব প্রদান ও গ্রহণের) মাধ্যমে বিবাহ বৈধ হয়ে যায়। তারপর জামাই-মেয়ে উঠিয়ে বা বিদায় দেওয়ার পালা। স্বীয় স্ত্রীকে বাড়ীতে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্বামী পরিবহন খরচ বহন করবে। পাত্রী বা পাত্রীর অভিভাবকের পক্ষে কোন খরচ আনবে না। টাকা পয়সা নিয়ে প্রচলিত কলহ বিবাদ ও লোক দেখানোর কিসসা শরীয়ত বিরোধী কাজে লাগিয়ে রেখেছে।
