প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৬ষ্ঠ সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৬, সফর-রবি আউঃ ১৪৩৭-৩৮ হিজরী, অগ্রহায়ন-পৌষ ১৪২৩বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
১. মানুষের সকল কাজে কোন না কোন মানসিক প্রেরণা থাকে। কেউ নাম ও যশের জন্য কাজ করে, কেউ দুনিয়ায় বিনিময় লাভের আশায় কাজ করে, কেউ দেখানোর জন্য এবং প্রদর্শনের জন্য কাজ করে। কেউ অপরের ভালবাসায় অথবা শত্রুতা সাধনের জন্য কাজ করে। এ সকল কাজের অনুপ্রেরণা মূলত আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছু। যেগুলো আল্লাহর স্থানে বসে গেছে। এ জন্যই কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে,
أَ رَ أَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إ ِلٰهَه هَوَاهُ
আপনি কি তাকে দেখেন না, যে তার প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? (সূরা ফুরকান : ৪৩)
২. এজন্য সবচেয়ে বড় দেবতা হচ্ছে সেটি, যা মানুষ স্বীয় অন্তরের দেবালয়ে প্রচ্ছন্ন রেখেছে। এই দেবালয়কে নির্মূল করলে সত্যিকার তাওহীদ পূর্ণতা লাভ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথাও বলেছেন যে, মানুষের সকল কাজের নির্ভরশীলতা তার অন্তরের অভিব্যক্তির উপরই ন্যস্ত। এ জন্য এক জন মুসলমানের সকল প্রকার কাজের মূল প্রেরণা হচ্ছে আল্লাহর ভয়, আল্লাহর আনুগত্য, আল্লাহর সন্তুষ্টি, আল্লাহর মহব্বত। মোটকথা, উদ্দেশ্য হবে একমাত্র আল্লাহ। মানুষ আল্লাহর উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোন নিয়ত বা উদ্দেশ্যে যে সকল কাজ নির্বাহ করে এমতাবস্থায় সে তার এ কাজের জন্য অন্য একজনকে আল্লাহ বলে সাব্যস্ত করে নেয়। যদিও সে ক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তি শাব্দিক বা নৈতিক শিরকের দ্বারস্থ নয়, কিন্তু আত্মিক ও অদৃশ্য শিরকের সে অনুসারী, তা সুস্পষ্টভাবে বলা যায়।
৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে দান করলো, এবং আল্লাহরই উদ্দেশ্যে বিরত রইল এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে কামনা করলো, আল্লাহরই উদ্দেশ্যে বিরুদ্ধাচারণ করলো, এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিবাহ করলো, সে প্রকৃতই স্বীয় ঈমানকে পরিপূর্ণ করে নিল। (মোস্তাদরেকে হাকেম, তিরমিজি)
৪. বিভিন্ন সাহাবীদের থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, রিয়া হলো প্রচ্ছন্ন শিরক। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: প্রচ্ছন্ন শিরক হলো এই যে, মানুষ কোন কাজ অন্যের উপস্থিতির কারনে নিষ্পন্ন করে। (মোস্তাদরেকে হাকেম: কিতাবুর রিকাক, ৪র্থ খ: ৩২৯ পৃঃ)
৫. হযরত শাদ্দাদ বিন আউস (রা:) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি লোক দেখানো নামাজ পাঠ করলো, সে শিরক করলো, যে লোক দেখানো রোজা রাখলো, সে শিরক করলো; যে লোক দেখানো খয়রাত করলো, সে শিরক করলো। (মোস্তাদরেকে হাকেম, ইবনে হাম্বল, মোসনাদে শাদ্দাদ বিন আউস ৪খ: প ৃ: ১২৬)
৬. একই সাহাবী হতে বর্ণিত, একবার সাহাবীদের সমবেত স্থানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছিলেন, আমি স্বীয় উম্মতের উপর সবচেয়ে বেশী যে বস্তুর ভয় করছি, তাহলো শিরক। তবে আমার কথার অর্থ এই নয় যে, তারা চন্দ্র- সূর্যের সিজদা করবে, কিংবা প্রতিমার পূজা করবে। বরং আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে না জানি তারা গায়রুল্লাহর জন্য কাজ শুরু করে দেয়, না জানি মনের গোপন খাহেশের মাঝে জড়িয়ে পড়ে। (সুনানে ইবনে মাজাহ)
৭. হযরত মাহমুদ বিন লবীদ আনসারী হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের লক্ষ্য করে বলেছেন, যে জিনিসটা তোমাদের উপর বেশী ভয় করি, তাহলো শিরকে আসগার বা ছোট শিরক। সাহাবীগণ আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! ছোট শিরক কি ? তিনি বললেন, কিয়ামতের দিন মানুষ যখন নিজ নিজ কাজের বিনিময় লাভ করবে, তখন আল্লাহপাক রিয়াকার লোকদের লক্ষ্য করে বলবেন, তোমাদের জন্য আমার কাছে কিছুই নেই। তোমরা ঐ সকল লোকের কাছে যাও, যাদেরকে দেখানোর জন্য দুনিয়াতে কাজ করেছিলে। (ইবনে হাম্বল: মোসনাদে মাহমুদ বিন লবীদ আনসারী, ৫খ: ৪২৮ পৃ, আবু দাউদ)
৮. হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা:) বলেন, এক দল লোকের সামনে আমরা দাজ্জাল সম্পর্কে আপোষে কথাবার্তা বলছিলাম। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে তাশরীফ আনলেন এবং বললেন, দাজ্জাল হতেও বেশী ভয়ঙ্কর যে জিনিস আমার কাছে আছে, আমি তা তোমাদের নিকট প্রকাশ করব না? আমরা আরজ করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি অবশ্যই তা আমাদেরকে বললেন। তিনি বললেন, তাহলো গোপন শিরক। এর উদাহরণ হচ্ছে এই যে, কোন ব্যক্তি নামাজ পড়ছে। সে এজন্য ভালোভাবে নামাজ পড়ছে যে, অন্যলোক তার নামাজ দেখছে। (সুনানে ইবনে মাজাহ: কিতাবুর রিয়া এবং ছাময়া)
৯. হযরত আবু হুরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত , রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: আল্লাহপাক বলেছেন, আমি সকল অংশীদের থেকে সার্বিকভাবে মুক্ত ও পবিত্র। যে ব্যক্তি নিজের কোনও আমলে গায়রুল্লাহকে শরীক বানিয়ে নিয়েছে তবে সে যেন নিজের সাওয়াব গায়রুল্লাহর নিকট চায়। কেননা আল্লাহ পাক অংশীবাদীদের থেকে বেনিয়াজ। (সুনানে ইবনে মাজাহ, তিরমিজি, মুসনাদে ইবনে হাম্বল: রিয়া অধ্যায়)
১০. এ সকল শিক্ষার প্রভাব এতই কার্যকর হয়েছিল যে, সাহাবায়ে কেরাম প্রত্যেক কাজেই ছোট শিরক এবং গোপন শিরক হতে বেঁচে থাকতে প্রয়াস পেতেন। হযরত শাদ্দাদ বিন আউস (রা:) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পবিত্র হায়াতে রিয়াকে ছোট শিরক বলে সাব্যস্ত করতাম। (মোস্তাদরেকে হাকেম, কিতাবুর রিকাক, ৪খ: পৃঃ ৩২৯) একবার হযরত ওমর ফারুক কোথাও যাচ্ছিলেন। তিনি দেখলেন, হযরত মায়াজ বিন জাবাল (রা:) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবর মোবারকের পাশে বসে কাঁদছেন। হযরত ওমর (রা:) কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তিনি কবর মোবারকের দিকে ইশারা করে বললেন, এই কবরে সমাহিত পবিত্র সত্তা বলেছিলেন, রিয়া এর সামান্য চিহ্নও শিরক। (মোস্তাদরেকে হাকেম, কিতাবুর রিকাক, ৪ খ: ১৩২৮)
১১. অনুরূপভাবে একবার তাবেয়ী হযরত ওবাদাহ দেখলেন যে, সাহাবী হযরত শাদ্দাদ বিন আউস (রা:) স্বীয় জায়নামাজে বসে অঝোর ধারায় কান্না করছেন। তিনি কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। হযরত শাদ্দাদ (রা:) বললেন, একদিন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চেহারা মোবারকে চিন্তা এবং বেদনার ছাপ দেখতে পেলাম। আরজ করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার মাতা-পিতা কোরবান হোক, আপনার দুশ্চিন্তার কারণ কি? ইরশাদ হলো, আমি আমার পরে উম্মতের উপর একটি জিনিসের ভয় করছি। আরজ করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! সেটি কি? তিনি বললেন, শিরক এবং প্রচ্ছন্ন নফসানী খাহেশ। আমি দ্বিতীয়বার আরজ করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! তবে কি আপনার পর উম্মতগণ শিরকে জড়িয়ে পড়বে? তিনি বললেন, হে শাদ্দাদ! আমার উম্মত অবশ্যই সূর্য, চন্দ্র, প্রতিমা এবং পাথরের পূজা করবে না। কিন্তু তারা নিজেদের কাজের নুমায়েশ ও রিয়া করবে। আরজ করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! উহা কি শিরক ? তিনি বললেন, হ্যাঁ।
১২. এই ঘটনাবলী ও এর শিক্ষা গ্রহণ করে প্রত্যেকেই অনুমান করতে পারেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সঠিকভাবে কেমন করে শিরকের মূলোৎপাটন করেছেন এবং তাওহীদকে পূর্ণতা দান করেছেন। সেই আরব যারা গায়রুল্লাহর পূজায় উজাড় হয়ে পড়েছিল, তারাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শিক্ষার প্রভাবে তাওহীদ ও আল্লাহর ইবাদতের শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিলেন।
