প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১০ম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৬, জমা.সানী-রজব ১৪৩৭ হিজরী, চৈত্র-বৈশাখ ১৪২২ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
যারা আল্লাহর ওপর ঈমান আনে এবং আল্লাহর যিকির করে তাদের অন্তকরণ প্রশান্ত হয়, জেনে রেখো, আল্লাহর যিকিরই অন্তরসমূহকে প্রশান্ত করে
১
আল্লাহ ছাড়া আপনার জন্য
কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই
একলোক মসজিদে প্রবেশ করেছিল যদিও তখন সালাতের সময় ছিল না। সে মসজিদে একটি দশ বছরের বালক দেখতে পেল যে খুব কাকুতি মিনতি করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিল। বালকের দোয়া শেষ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত লোকটি অপেক্ষা করল। যখন বালকটির দোয়া শেষ হলোত, সে এসে তাকে শুভেচ্ছা জানালো এবং জিজ্ঞেস করল, তুমি কার সন্তান? বালকটি মাথা নিচু করে ফেলল এবং তার গাল বেয়ে অশ্র ঝরতে লাগল। অতঃপর সে তার মাথা উঠালো এবং বলল, হে চাচা! আমি একজন ইয়াতীম আমার পিতা মাতা নেই। লোকটি দুঃখ অনুভব করল এবং বলল, তুমি আমার সন্তান হবে?
বালকটি বলল, যদি আমি ক্ষুধার্ত হই আপনি আমাকে খাওয়াবেন?
হ্যাঁ যদি আমি অসুস্থ হই আপনি আমায় সুস্থ করে দিবেন?
হ আমার সন্তান!, আমি এটা করতে সক্ষম নই।
দি আমি মারা যাই তাহলে আপনি আমার জীবন ফিরিয়ে দিতে পারবেন?
আমি এটা করতে অক্ষম।
বালকটি বলল, আমাকে ছেড়ে দেন চাচা, সেই একক সত্ত্বা যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, যিনি আমার রক্ষণা বেক্ষণ করেন এবং যিনি আমার জীবিকার ব্যবস্থা করেন। তিনি একক সত্ত্বা, আমি অসুস্থ হলে তিনি সুস্থতা দান করেন। আমি আশা করি তিনি শেষ বিচারের দিন আমায় ক্ষমা করবেন। লোকটি নীরবে চলে গেল এবং বলল, আমি আল্লাহকে বিশ্বাস করি, যে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখে, আল্লাহ তাকে রক্ষা করেন।
তুমি যতই চল টানটানি কর না কেন। এটা কিছুই না অথবা মুখ থেকে যতই দুঃখ এবং হতাশার দীর্ঘশ্বাস ছাড় না কেন, অতীতের কোনো ঘটনাকে তুমি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম নও।
আর দয়া তো সব জিনিসকেই পরিবেষ্টন করে রেখেছে
২
সুখ বিরাজমান কিন্তু কে তাকে খুঁজে পেতে পারে ?
কোনো ব্যক্তি নিজের মধ্যে ছাড়া অন্য কোথাও সুখ খুঁজে পেতে পারে না। কিন্তু যদি নিজেকে সুখ খোঁজার সবচেয়ে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে। যেখানে তার প্রয়োজন এবং একাগ্রতাকে জড়ো হতে হবে, কৌতুহল, কঠোর পরিশ্রম, মানুষের প্রতি ভালবাসা, পরস্পর সহযোগিতা এবং এর কিছুটা খুব বাস্তব, যা অনেকে উপভোগ করে। আমরাও এটাকেই উপভোগ করতে পারি, যদি আমরা অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেই। জীবন থেকে যা চলে গিয়েছে তা চিন্তা করে লাভ নেই, যদি আমরা ধৈর্যশীল হই, আমরা ধৈর্য প্রকাশ করতে পারি এবং আমাদের মধ্য থেকে সবচেয়ে বেশি শিক্ষা অর্জন করি, অনেক শারীরিক এবং মানসিক জ্ঞানের মাধ্যমে আমরা নিজেদের পরিচালনা করতে পারি, ধৈর্য এবং ক্ষমতার বলে এবং আল্লাহ আমাদের যে জীবিকা দিয়েছে তার মাধ্যমে বাঁচাতে পারি, কৃতজ্ঞ, অবাধ্যতা অথবা কষ্ট।
নারীর সৌন্দর্য নষ্ট করতে দুঃশ্চিন্তার চাইতে বেশি খারাপ আর কিছুই নেই। যা তাঁর বয়সের চেয়ে তাকে বেশি বৃদ্ধ করে ফেলে
অল্পদিনের মধ্যেই তোমার মালিক তোমাকে (এমন কিছু) দেবেন যে, তুমি (এতে) খুশী হয়ে যাবে
(সূরা আদ দুহা : আয়াত ৫)
৩
প্রতিটি ভালো মানসিকতাই মহান দোয়া
প্রত্যেক মানুষ নিজেই নিজের আয়না। যদি সে ভালো আচরণ করে তাহলে অন্যের মধ্যে সে ভালো আচরণ দেখবে। তাই তার স্নায়ুগুলো শান্ত থাকবে এবং সে পরিতৃপ্ত হবে। সে অনুভব করবে যে, সে বন্ধুত্বপূর্ন পরিবেশে বসবাস করছে। কিন্ত যদি কোনো ব্যক্তি কারো সাথে খারাপ আচরণ করে তাহলে অন্যদের মধ্যেও খারাপ আচরণ দেখবে। সে দেখবে যে, অন্যেরা তার সাথে খারাপ উচ্চ কণ্ঠ এবং কটু ব্যবহার করছে। যার মানসিকতা ভালো সে মনের মধ্যে তাদের চাইতে বেশি শান্তি অনুভব করে থাকবে। যারা দুঃশ্চিন্তা, হতাশা অথবা নিজেদেরকে বেদনাদায়ক অবস্থার মধ্যে রাখে তারা কখনো সুখি হতে পারে না। অধিকন্তু ভালো মানসিকতা আল্লাহর ইবাদাত সমতুল্য। মহান প্রশংসিত আল্লাহ তায়ালা এই ব্যাপারে মানুষকে অধিক উৎসাহ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেনÑ (হে মোহাম্মদ!, এদের সাথে) তুমি ক্ষমার নীতি অবলম্বন কর, সাথে সাথেই তুমি আল্লাহ তায়ালার কাছে আশ্রয় চাও। অবশ্যই তিনি (সব কিছু) শোনেন এবং (সব কিছু) জানেন। (সূরা আরাফ : আয়াত ১৯৯)
এটা আল্লাহর এক (অসীম) দয়া যে, তুমি এদের জন্যে ছিলে কোমল প্রকৃতির (মানুষ, এর বিপরীতে) যদি তুমি নিুর ও পাষাণ হৃদয়ের (মানুষ) হতে, তাহলে এসব লোক তোমার আশপাশ থেকে সরে যেত। অতএব তুমি এদের (অপরাধসমূহ) মাফ করে দাও, এদের জন্যে (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং কাজকর্মের ব্যাপারে এদের সাথে পরামর্শ কর, অতঃপর (সে পরামর্শের ভিত্তিতে) সংকল্প একবার যখন তুমি করে নেবে তখন (তার সফলতার জন্যে) আল্লাহর ওপর ভরসা কর; অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা (তাঁর ওপর) নির্ভরশীল মানুষদের ভালবাসেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ঐ ব্যক্তি যার মানসিকতা সবচেয়ে ভালো এবং সবচেয়ে বিনয়ী। যিনি মানুষের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখেন এবং মানুষও তার সাথে ভালো সম্পর্ক রাখে। তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে ঘৃণিতÑযে বিদ্বেষপূর্ণভাবে মানুষের কুৎসা রটায় এবং বন্ধুত্বের মধ্যে ভাঙ্গনের সৃষ্টি করে, আর যারা নিষ্পাপ মানুষের ত্র“টি খুঁজে বেড়ায়।” (সূরা আলে ইমরান : আয়াত ১৫৯)
অস্থিরতা, শারীরিক অসাড়তা এবং আশা ছাড়া কোনো সমস্যায় পতিত হওয়া, এই সবকিছুই মানুষের মানসিকতাকে ভেঙ্গে দেয়।
আল্লাহ কখনো কাউকেই তার শক্তি সামর্থ্যরে বাইরে কোনো কাজের দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না।
(সূরা বাকারা : আয়াত ২৮৬)
৪
কীভাবে সুখী জীবন লাভ করা যায়
একজন আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী বলেন, সুখী জীবন যাপন করা একটি শিল্প যা নিম্নোক্ত দশটি জিনিসের মধ্যে নিহিত রয়েছে।
১. এমন একটি কাজ কর যা তুমি ভালোবাসো, যদি তুমি তা করতে না পার, তারপর একটি অভ্যাস খোঁজ কর যা তুমি ভালবাসো এবং এটার পেছনে তোমার যথেষ্ট সময় দাও এবং এটাকে আরো মজবুত কর।
২. তোমরা স্বাস্থ্যের যত্ন নাও। কেননা, এটা সুখের আত্মা। যার অর্থ পরিমিত আহার কর এবং প্রতিদিন ব্যয়াম কর এবং খারাপ অভ্যাস পরিত্যাগ কর।
৩. জীবনে একটি উদ্দেশ্য রাখ, যা তোমাকে প্রভাবিত করবে এবং শক্তি যোগাবে ও সাহায্য করবে।
৪. জীবনে যা আসে তাই সাদরে গ্রহণ করে নাও, খারাপ এবং ভালো উভয়টাকে গ্রহণ কর।
৫. বর্তমান নিয়ে বসবাস কর। অতীতের কোনো ঘটনা নিয়ে দুঃখ কর না এবং ভবিষ্যতের যা এখনো আসেনি তা নিয়ে দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ো না।
৬. যে কোনো কাজ এবং সিদ্ধান্তে কঠিন চিন্তা কর এবং যে কোনো সিদ্ধান্ত এবং এর পরিমাণের জন্য কাউকে দোষারোপ কর না।
৭. যারা তোমার চেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে তাদের দিকে তাকাও।
৮. প্রফুল্ল এবং হাসোজ্জ্বল থাকায় অভ্যস্থ হও এবং আশাবাদীদের সাথে পথ চল।
৯. অন্যদের সুখী করার চেষ্টা কর যাতে সুখের বায়ুমণ্ডল থেকে তুমি সুখ লাভ করতে পার।
১০. সর্বক্ষেত্রে সবচাইতে সুখ এবং আনন্দে থাক এবং যতটুকু পার তোমার সুখকে এনে দাও।
আজই তুমি সবচেয়ে বেশি আনন্দ কর, এমন জিনিস খোঁজ কর যা কোনো ঘটনা তোমাকে আঘাত করার পূর্বে তার ব্যথা লাঘব করবে
এই আকাশমণ্ডলী ও ভূমণ্ডলে যতো কিছু আছে সবাই নিজ নিজ প্রয়োজন তাঁর কাছেই চায়। (আর) তিনি প্রতিদিন (প্রতিমুহূর্ত) কোনো না কোনো কাজে তৎপর রয়েছেন।
৫
দুঃখ দুর্দশা থেকে মুক্তি পেতে আল্লাহর কাছে পানাহ চাও
আমি ভাবতে পারি না যে, একজন জ্ঞানী মানুষ হাসি ছাড়া জীবন যাপন করতে পারে অথবা একজন ঈমানদার মানুষ হতাশাবাদীদের অনুসারী হয়ে যায় এবং তার মন হতাশায় পূর্ণ হয়। একজন ব্যক্তি বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে যেতে পারে যা মন থেকে শান্তি প্রশান্তি দূর করে দেয়। কিন্তু এই ধরনের পরিস্থিতিতে সর্বক্ষমতার অধিকারী আল্লাহর ওপর আস্থা রাখতে হয়। সে যেই বিপদে পড়েছে আল্লাহ তাকে তা থেকে রক্ষা করবেন। যদি সে মানসিক হতাশায় পতিত হয় তাহলে এটাই তার সমস্ত মনোবলকে ভেঙ্গে দিতে শুরু করবে এবং তার সমস্ত কার্যকলাপ অসহায়ত্ব এবং অক্ষমতায় আক্রান্ত হতে থাকবে। তাই সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখবে।
আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর অনুসারীদেরকে তাদের সব সমস্যা সমাধানের জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া শিক্ষা দিতেন। আবু সাইদ খুদরী (রা) বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং সেখানে এক আনসার সাহাবীকে দেখলেন। যার নাম ছিল আবু উমামা। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আবু উমামা! এখন নামাযের সময় না তবুও কেন তুমি মসজিদে বসে আছ? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি দুঃখ এবং ঋণে জর্জরিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমায় এমন কিছু দোয়া শিখাব, যদি তুমি তা পাঠ কর, তাহলে আল্লাহ তায়ালা তোমার দুঃখ দূর করে দিবেন এবং তোমার ঋণ পরিশোধ করে দিবেন? সে বলল, হ্যাঁ! আল্লাহর রাসূল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সকাল সন্ধ্যায় সেই দোয়া পাঠ কর: দোয়াটি হলো
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযন, ওয়া আউযুবিকা মিনাল আজ্জি ওয়াল কাসাল, ওয়া আউযুবিকা মিনাল বুখলি ওয়াল যুবান ওয়া আউযুবিকা মিনাল গিবতি আদদায়িন ওয়াল কাহরি ওয়াল রিযাল।
অর্থ : হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে দুঃখ দুর্দশা থেকে পানাহ চাচ্ছি এবং আমি তোমার কাছে সমস্ত অক্ষমতা এবং অলসতা থেকে পানাহ চাচ্ছি এবং আমি তোমার কাছে কৃপণতা এবং কাপুরুষতা থেকে পানাহ চাচ্ছি এবং আমি তোমার কাছে ঋণের বোঝা এবং মানুষের অত্যাচার থেকে পানাহ চাচ্ছি। (আবু দাউদ হাদীস ১৫৪২)
আবু উমামা বলেন, আমি এই দোয়া পাঠ করেছিলাম এবং আল্লাহ তায়ালা আমার দুঃখ দুর্দশা দূর করে দেন এবং আমার ঋণ পরিশোধ করেন।
শরীরের ঘাঁ তোমার ভোগের প্রতিফল নয়, এটা হলো তোমাকে যা ভোগ করেছে তার প্রতিফল।
